সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমাদের করণীয় | অনন্তের পথে


প্রথম কাজ: বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মগঠন
১. মানবের দুইটি জগত: জ্ঞানের জগত ও হৃদয়ের জগত। দুই জগতেই সমানতালে অগ্রসর হতে হবে। সূরা ইখলাস আমাদেরকে অনন্তের পথের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় মাত্র, এর মানে এই নয় যে জ্ঞানের জগতে আমাদের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। বরং ভারসাম্যপূর্ণভাবে উভয় জগতে এমনভাবে অগ্রসর হতে হবে যেন একটি গ্লাস আকারে সুউচ্চ হচ্ছে, সেইসাথে তার ভিতরে পানির পরিমাণও বাড়ছে। এখানে শুধু গ্লাসটি হলো জ্ঞানের জগত, আর পানি হলো হৃদয়ের জগত।
২. জ্ঞান অর্জনের সঠিক পদ্ধতির প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখতে হবে। নিরপেক্ষ ও অপ্রভাবিত মন ছাড়া সত্যজ্ঞান কখনোই অর্জিত হয় না। মেজরিটি কখনো সত্যমিথ্যা নির্ধারণ করে না। বাপ-দাদার ধর্ম সত্য হলেও তা অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরে থাকা যাবে না, বরং বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে যাচাই করে দেখতে হবে।
যুক্তি ও দর্শনের ব্যাপক চর্চা করতে হবে। নিজেদের জিনিস ‘সহীহ’ লেবেলকৃত হলেই চোখবুঁজে মেনে নেব, আর অন্যদের ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ করব – এধরণের ফ্যালাসি থেকে মুক্ত থাকতে হবে। নিরপেক্ষতা যেন নষ্ট না হয়, সে লক্ষ্যে নিজের মনে নিজের সাথে যুক্তিতর্ক করার অভ্যাস করতে হবে। এভাবে নিজে নিজেই অধিকতর সত্যযুক্তি ও দর্শনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
৩. পরম স্রষ্টার পরিচিতিমূলক সংজ্ঞা অবশ্যই নিজ প্রচেষ্টায় নিরপেক্ষ যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমে জানতে হবে। এ ক্ষেত্রে কারো অনুসরণ করলে চলবে না। পরম স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা-ই যে true infinity – কোনোরূপ সীমাবদ্ধতা যে তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় – ইত্যাদি মৌলিক বিষয় নিজের বুদ্ধিতে চিন্তা-গবেষণা-ধ্যান করে বুঝতে হবে। (এক্ষেত্রে দার্শনিক স্রষ্টাভাবনার আটটি প্রস্তাব দেখা যেতে পারে।)
৪. ঈমান অর্থ বিশ্বাস নয়। ঈমান অর্থ নিরাপদকরণ। মুসলিম হলেই ঈমান অর্জন হয় না। বরং ঈমান হলো ক্বলবের বিষয়। ইসলামে (অন্ধ)বিশ্বাসের স্থান নেই। মুসলমানদেরকে অবশ্যই বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে, বরং এটিই হলো ঈমানের দুয়ার।
৫. তাক্বদীর অর্থ ভাগ্য নয়। তাক্বদীর অর্থ সুপরিমিত করা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে স্বাধীন এখতিয়ার দিয়েছেন। বিভিন্ন তাক্বদীরে (ফাংশনে) ইনপুট দিয়ে মানুষ বিভিন্ন আউটপুট পায়। কিন্তু তাহলে কেন আল্লাহ বলেন যে, “আমি পথভ্রষ্ট করি? কেন তিনি বলেন না যে, তারা নিজে নিজে কার্যকারণবিধি মোতাবেক পথভ্রষ্ট হয়েছে?” এটা এই কারণে যে, মানুষ যেন কার্যকারণবিধি/ প্রকৃতিকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কহীন, নিজে থেকে অস্তিত্বমান কোনোকিছু (অর্থাৎ স্বয়ম্ভু বা খোদা) মনে না করে।
অপরদিকে, তাক্বদীর সংক্রান্ত অধিকাংশ প্রশ্নই থার্ড অবজার্ভার প্রবলেমের ফাঁদে আটকা পড়া প্রশ্ন। বাস্তবতা হলো, সৃষ্টি ও পরম স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ ছাড়া আর তৃতীয় কোনো পারস্পেক্টিভ নেই। মানুষের ভাগ্য সংক্রান্ত সকল প্রশ্নের আসল রূপটি হলো, “স্রষ্টার দৃষ্টিকোণ থেকে সময় ব্যাপারটা কেমন?” আর পরম স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ অর্জন ছাড়া কেউ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না।
৬. যাদের ক্বলবে ঈমান প্রবেশ করে, তারা হয় মুমিন। মুমিন ব্যক্তি true infinity-র সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ সে প্যারালেল ইউনিভার্সে বিচরণ করে এবং প্যারালেল কনশাসনেস অর্জন করে। সে পরম স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ অর্জন করে। সে আল্লাহতে বিলীন (ফানা) হয়ে যায়। যারা আল্লাহতে বিলীন হতে পারে, কেবল তাদের অস্তিত্বই টিকে থাকবে। কেননা, একমাত্র আল্লাহর অস্তিত্ব ছাড়া আর সকল কিছু ধ্বংসশীল। আর যারা তাঁর সাথে সংযুক্ত হতে পারবে না, তারা সময় তথা পরিবর্তনশীলতার ক্ষতিতে নিমজ্জিত হবে এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
৭. সূরা ইখলাস যেমন আমাদেরকে ইন্টেলেক্ট এর শেষ সীমা দেখিয়ে দিয়ে অনন্তের পথে যাত্রার আহবান জানায়, তেমনি সূরা আসর আমাদেরকে সময় নিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে। আসলে সময় বলে আলাদা কোনো কিছু নেই। সময় হলো খোলস মাত্র, ভিতরের মূল জিনিস হলো পরিবর্তনশীলতা। নিশ্চয়ই মানুষ এই পরিবর্তনশীলতার ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে যারা ঈমান এনেছে, তারা ছাড়া। কারণ যাদের ক্বলবে ঈমান প্রবেশ করেছে, তাদের আত্মা আল্লাহতে বিলীন হয়ে গিয়েছে, ফলে তারা সকল পরিবর্তনশীলতার ক্ষতি থেকে মুক্তি পেয়েছে। কেননা, আল্লাহ তায়ালা পরিবর্তনশীলতা তথা সময়ের ঊর্ধ্বে।
৮. কুরআন কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়। কুরআন এক জিনিস, আর অন্য সকল গ্রন্থ আরেক জিনিস। কুরআন প্রতিদিন অর্থসহ বুঝে বুঝে অধ্যযন করতে হবে। তবে অবশ্যই সমাজের প্রচলিত ইসলামের চশমা দিয়ে দেখে নয়। বরং নিরপেক্ষ ও অপ্রভাবিত মনে কুরআন পড়তে হবে। কুরআনের যুক্তি ও দর্শন দ্বারাই কুরআনকে বুঝতে হবে। একইসাথে এটা মনে রাখতে হবে যে, কুরআনের যুক্তি ও দর্শন-ই নিরপেক্ষ-অপ্রভাবিত মানবমনের যুক্তি ও দর্শন।
৯. ঐশী কিতাবের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য ও নবীর অপরিহার্য গুণাবলী সম্পর্কে নিরপেক্ষ ও অপ্রভাবিত মনে “দার্শনিক” যাত্রা করুন। বৈশিষ্ট্যগুলি নিরপেক্ষ মনে চিন্তাভাবনা করে বের করুন। এর দ্বারা ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারকে যাচাই করুন। এই মানদণ্ডে যা গ্রহণযোগ্য, তা গ্রহণ করুন ও যা বর্জনীয়, তা বর্জন করুন। সমাজের প্রচলিত ইসলামের (অন্ধ) অনুসরণ করবেন না, কিংবা ব্যক্তিগত দুর্বলতার কারণে নিজের “পারিবারিক-সামাজিক ইসলামকে” জাস্টিফাই করার চেষ্টা করবেন না।
দ্বিতীয় কাজ: আধ্যাত্মিক ও আখলাক্বী আত্মগঠন
১. মানুষ শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী নয়। আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল ও স্পিরিচুয়াল চাহিদা – উভয়ই আছে। শুধুমাত্র ইন্টেলেকচুয়াল ইসলাম মানুষের হৃদয়কে শান্ত করতে পারে না, বরং বুদ্ধিমত্তার অহঙ্কারই বৃদ্ধি করে। অপরদিকে, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ছাড়া ক্বলবের জগতের দরজা খোলে না। তাই, বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মগঠনের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক ও আখলাক্বী আত্মগঠন করতে হবে।
২. জ্ঞানের জগত ও হৃদয়ের (ক্বলবের) জগত দুটি ভিন্ন বিষয়। হৃদয়ের জগতের অস্তিত্ব আছে, এটি কোনো রূপক বিষয় নয়। ক্বলবের দর্শন, শ্রবণ ও বয়ান আছে। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দর্শন-শ্রবণ ও বয়ান বস্তুমাধ্যমের উপর নির্ভরশীল। পক্ষান্তরে, ক্বলবের দর্শন, শ্রবণ ও বয়ান বস্তুজগতের উপর নির্ভরশীল নয়। যারা ক্বলবের দর্শন, শ্রবণ ও বয়ান অর্জন করতে পারে, তারা একে অপরের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে: পরস্পরকে দেখতে, বলতে ও শুনতে পারে, তা সেই ব্যক্তিদের দেহ মাটির নিচেই থাক (মৃতব্যক্তি) কি মাটির উপরেই থাক (জীবিত ব্যক্তি)।
৩. আধ্যাত্মিক যাত্রার মাধ্যমে ক্বলবের দুয়ার খোলে। এই যাত্রার প্রাথমিক কাজ হলো সকল ফরজ কাজ করা ও সকল হারাম থেকে দূরে থাকা। সকল ফরজ ও হারাম সম্পর্কে জানতে হলে অবশ্যই প্রতিদিন কুরআন গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। এই যাত্রার দ্বিতীয় কাজ হলো নফল ইবাদত করা। এর মাঝে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো তাহাজ্জুদ নামাজ। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-পারিবারিক চ্যারিটিও নফল কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
৪. আত্মশুদ্ধি বা তাযকিয়ায়ে নাফস যেকোনো সালিকের (আধ্যাত্মিক অভিযাত্রিকের) জন্য একটি অপরিহার্য বিষয়। গভীর রাত্রিতে ধ্যানের মাধ্যমে (অর্থাৎ তাহাজ্জুদ নামাজের মাধ্যমে) নিজের অবচেতন মনকে উন্মোচন করতে হবে, তারপর তাকে আল্লাহপাকের সামনে লজ্জিত-অবনত মস্তকে পেশ করতে হবে এবং তাঁর কাছে সকল আত্মার রোগের ওষুধ চাইতে হবে। ([QR - আধ্যাত্মিক যাত্রার পূর্বপ্রস্তুতি])
৫. অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে একজন ইনসানে কামেলের তত্বাবধানে আধ্যাত্মিক যাত্রা করার। যদি তেমন উপযুক্ত দ্বীনদার ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া না যায়, তবে অন্ততঃপক্ষে আল্লাহর ধ্যান (তাহাজ্জুদ নামাজ) ও আল্লাহর জ্ঞান (কুরআন) – এই দুটির চর্চা চালিয়ে যেতে হবে প্রতিদিন। এই দুটিই আপনাকে পথ দেখাবে। [QR - আধ্যাত্মিক সফর]
৬. “দুটি বিষয়ের সকল দিক একই হলে তা আর দুটি ভিন্ন বিষয় হত না, বরং একটি বিষয়ই হত” – এই দর্শনের উপর ভিত্তি করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে হবে। এর বুদ্ধিবৃত্তিক গুরুত্বের পাশাপাশি অবশ্যই আধ্যাত্মিক ও আখলাক্বী গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। আল্লাহপাক বলেছেন, মুমিনগণ তাদের সালাতে সার্বক্ষণিক কায়েম থাকে– পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সাথে এই কথার সামঞ্জস্য কী, তা চিন্তা করলে প্রতিদিনকার নামাজই নতুন রূপে নতুন শক্তিসহকারে ধরা দেবে।
৭. সর্বদা লক্ষ্য রাখতে হবে যে, শরীয়ত হলো মারেফতের ধারণপাত্র। শরীয়ত বোঝা খুবই সহজ, কেননা তা বুদ্ধিবৃত্তির কাজ। আধ্যাত্মিক ব্যক্তি নামে সুপরিচিত ব্যক্তিকে যদি সুস্পষ্ট শরীয়ত লঙ্ঘন করতে দেখেন, তবে তার থেকে সাবধান থাকবেন। রাসুল (সা.) কখনোই শরীয়ত ত্যাগ করেননি এবং শরীয়তবিহীন আধ্যাত্মিকতা শিক্ষা দেননি। অতএব, এই বিষয়ে সাবধান থাকবেন।
৮. একইসাথে ভুলে যাবেন না যে, এই শরীয়ত হলো শূন্য পানপাত্র, আধ্যাত্মিকতা তথা খোদাপ্রেমের সুধা ভিতরে সঞ্চিত না হলে এই রুক্ষ শুষ্ক শরীয়তের কোনো মূল্য নেই।
৯. কুরআনকে এক পাল্লায় রাখলে যা ওজন হবে, রাসুল (সা.) এর রক্তের আত্মীয়দের (মাঝে যাঁরা নিষ্পাপ, তাঁদের) প্রতি ভালোবাসাকে অপর পাল্লায় রাখলে সমান ওজন হবে। অতএব, আল্লাহর চোখে কুরআন চোর হবেন না। কুরআনের মুল্য পরিশোধ করার চেষ্টায় সদা রত থাকবেন। আর এটা কেবল মুখে “ভালোবাসি” বলার মাধ্যমে নয়, বরং তাঁদেরকে অনুসরণের মাধ্যমেই এই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হবে। অতএব, ইসলামের সকল শরীয়ত ও মারেফত তাঁদের কাছ থেকেই শিক্ষা করুন। যারা রাসুলের (সা.) রক্তের আত্মীয়দের থেকে ইসলাম শিক্ষা করে না, বরং অন্যত্র তা সন্ধান করে, তাদের থেকে সাবধান থাকবেন। তারা কুরআনের মূল্য পরিশোধ করেনি, ফলে কুরআনের স্বরূপ তাদের সামনে উন্মোচিত হয়নি। ডাক্তার ইনজেকশান দেবার আগে যেমন জায়গাটিকে অ্যান্টিসেপ্টিক দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নেয়, তেমনি কুরআনের ইনজেকশান নেবার আগে আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে হৃদয় ও মনকে ধৌত করতে হবে। তবেই কেবল কুরআন উপকারী হবে। তা না হলে অপরিষ্কার ত্বকে ইনজেকশান পুশ করলে যেমন ইনফেকশান হয়, তেমনি প্রেম-ভালোবাসাহীন মানুষ কুরআন পড়লে আইসিস জন্ম নেবে।
১০. বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি, উভয়টিকেই সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এগিয়ে নিয়ে যান। আপনার সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যয় করে আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে অগ্রসর হোন।
তৃতীয় কাজ: সমাজে প্রবেশ (মানবপ্রেম ও সমাজ সংস্কার)
১. আত্মগঠন না করে সমাজে প্রবেশ করবেন না। এরচেয়ে ঘরের কোনে একাকী থাকা উত্তম। কেননা, আপনার অসাবধানতাবশতঃ কোনো মানুষের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। একইসাথে এটা সত্য যে, একজন প্রকৃত সাধকের মৃত্যু পর্যন্ত আত্মোন্নয়ন কখনো শেষ হয় না। তার যাত্রা সদা গতিশীল। তবুও, ধার্মিক-অধার্মিকদের কাছে অনন্তের যাত্রার আহবান নিয়ে যাওয়ার নিজের ভিতকে শক্ত করুন। নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আখলাক্বী ভিত দৃঢ় করুন। আপনার বাড়ির ভিত্তি ঠিক আছে তো? প্রয়োজনে নিজেই নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করুন। এভাবে কমপক্ষে মৌলিক বিষয়াবলীতে অকাট্য জ্ঞান অর্জন করুন। তারপর আধ্যাত্মিক জগতে পা ফেলুন। অন্ততঃপক্ষে বৃত্তের বাইরে বের হয়ে আসুন এবং ক্বলবের জগতে প্রবেশ করুন। নিজের ধর্মচর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনাকে বজায় রেখে তারপর সমাজের দিকে তাকান।
২. প্রেমময় হোন। রাসুল (সা.) প্রেমময় ছিলেন। তিনি ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। রাসুল (সা.) এর নামে যা-তা বর্ণনা বিশ্বাস করবেন না। কুরআন থেকে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জানুন। নবীর অপরিহার্য গুণাবলী-র ভিত্তিতে ইতিহাস গ্রহণ-বর্জন করুন। রাসুল (সা.) সকলের প্রতি রহমদিল ছিলেন। তিনি দুঃখ করতেন যে, কেন মানুষ ঈমানের পথে আসছে না! সেই একই প্রেম আমাদেরকেও হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আমরা যদি নাস্তিক কিংবা ইসলামের ভিতরেই ভিন্ন চিন্তাধারার মানুষের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি হৃদয়ে, তবে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে যে, রাসুল (সা.) এমনকি তাঁর শত্রুদের জন্যও প্রেমময় ছিলেন। আফসোস, আমরা বেশিরভাগ মুসলিমই এই আখলাক্ব ও প্রেম সহকারে সমাজে প্রবেশ করি না। অবস্থা এমন হয়েছে যে, রাসুল (সা.) চলিলেন এক পথে, উম্মত চলিলো আরেক পথে। অবশ্য উম্মতের অধিকাংশই যে কুরআনের পথে চলবে না, বরং কুরআনকে পরিত্যক্ত করে রাখবে, তা তৎকালীন মুসলমানদের কর্মফলে অবধারিত হয়ে গিয়েছিলো আগেই: “এবং (কিয়ামতের দিন) রাসুল বলবেন, হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমার ক্বওম এই কুরআনকে পরিত্যক্ত করে ফেলে রেখেছিলো!”
৩. আল্লাহ বলেন, মন্দের জবাবে তা-ই বলুন, যা সর্বোত্তম। আপনি যখন যুক্তি ও দর্শনের কষ্টিপাথরে যাচাই করে ধীরে ধীরে ইসলামের দিকে অগ্রসর হবেন এবং নব আবিষ্কৃত সত্যগুলি মানুষের সামনে তুলে ধরবেন, তখন সবদিক থেকে আঘাত পাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। কিন্তু মন্দের জবাব মন্দ দিয়ে নয়। অন্ধকারকে গালি দিলেও অন্ধকার দূর হয় না, পিটালেও অন্ধকার দূর হয় না। কেবল আলো আনলেই অন্ধকার দূর হয়। আর আলো দিতে হলে নিজেকে নিঃশেষ হয়ে যেতে হয়, এটাই জগতের নিয়ম।
To give light, one must first burn. - Maulana Rumi
৪. আল্লাহ বলেন, তাদের বিরুদ্ধে এই কুরআনের সাহায্যে জিহাদ বা প্রচেষ্টা করুন। এটা অস্ত্রের যুদ্ধ নয়। বরং কুরআন দ্বারা আঘাত করে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জট খুলে দেয়া, তাদের বদ্ধ ক্বলবের দরজা খুলতে সাহায্য করা।
৫. আস্তিক-নাস্তিক রেসলিঙে জড়াবেন না কখনোই। মনে রাখবেন, সত্যদর্শন ও অকাট্য যুক্তির ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ভালোবাসাগৃহ নির্মাণ করাই আপনার কাজ। এমন এক মজবুত গৃহ, যা বিপদগ্রস্ত মানুষের আশ্রয়। অশান্ত হৃদয়ের শান্তির আশ্রয়। মানুষের দিকে প্রেম নিয়ে অগ্রসর হোন। এই অঞ্চলে যেসব সুফি সাধক এসেছিলেন, তারা প্রেম দিয়েই হৃদয় জয় করেছিলেন। প্রেম যেখানে উপস্থিত, অহঙ্কার সেখানে দুর্বল, ফলে সত্য গ্রহণের পথ সুগম। তাই আগে হৃদয় জয় করুন। তারপর সত্য দর্শন ও অকাট্য যুক্তি পেশ করুন।
৬. সমাজবিমুখ ধর্মচর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। হ্যাঁ, আপনি গভীর রাতে একাকী নামাজ পড়বেন। কুরআন পড়বেন। তসবিহ পড়বেন। কিন্তু ওটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না। কুরআন আমাদেরকে সে শিক্ষা দেয় না। বরং সামাজিক বিষয়াবলীতেও নজর দিতে হবে। ইতিহাসের শুরু থেকেই মানবজাতি দুইভাগে বিভক্ত: জালিম ও মজলুম। জালিমের জুলুমের কলাকৌশল জানতে হবে। যেমন, আমাদের কাগজের নোটভিত্তিক আধুনিক অর্থব্যবস্থা ও ব্যংকিং সিস্টেম হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শোষণের হাতিয়ার। এই সমস্যার বুদ্ধিবৃত্তিক সমাধান করতে হবে। [QR - মানি মেকানিজম সিরিজ]
আমাদের পরিবারগুলোতে ভারসাম্যের শিক্ষা নেই। পরিবারগুলিকে পারফেক্ট ফ্যামিলিতে পরিণত করার কর্মকৌশল চিন্তা করতে হবে। স্কুল-কলেজের টিনএজ ছেলেমেয়েদেরকে একাকীত্বের জগতে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। তাদের হৃদয়ের দাবীগুলো শুনতে হবে, জানতে হবে, পূরণ করতে হবে। [QR - প্রসঙ্গ সুইসাইড: কিছু হৃদয়ের কথা]
যুবকদেরকে হতাশা ও একাকীত্ব থেকে মুক্তি দিতে হবে। আপনি মুসলিম, আপনার একা একজনের পক্ষেই এর সবকগুলো বিষয়ই অর্জন করা সম্ভব। এগুলিকে অসম্ভব কিছু মনে করবেন না। এগুলিতো কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক কিছু কাজ মাত্র। যেখানে বুদ্ধিবৃত্তির ঊর্ধ্বের জগতে যাতায়াত আপনার, সেখানে আপনি কেন বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে ভয় পাবেন? নিজেকে অযোগ্য মনে করবেন? কেন পিছিয়ে থাকবেন? বরং আপনিতো তাদের চেয়ে বেশি এগিয়ে যাবেন, যারা শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে লিপ্ত। কেননা, আপনি প্রশান্ত হৃদয় অর্জন করেছেন। এমতাবস্থায় আপনি যখন ব্রেইনকে কাজে লাগান, তখন আপনি দশ মিনিটে যা পারেন, অন্যরা তা দশ ঘন্টায়ও পারবে না, এটাই স্বাভাবিক! কোনো একটা বিষয় আপনি মনোযোগ দিয়ে একবার পড়বেন, আর তা আপনার মাথায় ঢুকে যাবে। এটা কোনো অবাস্তব কথা নয়। আমি জানি বিধায় তা বলছি।
৭. একইসাথে ইবাদতবিমুখ সমাজমুখিতা থেকেও উঠে আসতে হবে। অনেকে “সামাজিক ইসলাম, ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম, পারিবারিক জীবনে ইসলাম” ইত্যাদি করতে করতে ভুলেই যান যে, প্রতিটা মানুষকেই ব্যক্তিগতভাবে ফিরে যেতে হবে, দুনিয়ার জীবনটা খেলতামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়, দুইদিনের একটা ব্যাপার মাত্র। অর্থাৎ, তারা মুখে আল্লাহর নাম নিলেও হৃদয়ের জগতে আল্লার সাথে সংযোগ হারিয়ে ফেলেন, ফলশ্রুতিতে “দুনিয়াবী ইন্টেলেকচুয়াল ইসলামের” জালে বন্দী হয়ে পড়েন। তখন সেই আস্তিকের ধর্মকথা আর নাস্তিকের ধর্মকথা, দুই-ই হয়ে যায় সাইঁজির সেই গানের মত: এসব দেখি কানার হাট বাজার! ক্বলবের জগতে নিজেই অন্ধ, অপরকে পথ দেখাবে কী!
৮. আমাদেরকে সর্বদা লক্ষ্য রাখতে হবে যে, একজন মুসলিম দার্শনিকও বটে, কিন্তু তারও ঊর্ধ্বে তার একটা পরিচয় হলো, সে আ’রেফ। অর্থাৎ, খোদাপ্রেমিক। দার্শনিক তার গন্তব্যের শেষ জানে না। “As you walk, the way appears” - এই নীতিতে বিশ্বাস করে দার্শনিক এগিয়ে যেতেই থাকে আরো জ্ঞান অর্জনের দিকে। এভাবে তার জীবদ্দশায় সে কখনোই জ্ঞানের সকল জগত বিচরণ করে শেষ করতে পারে না। সে হাঁটলে নতুন পথ তৈরী হয় ঠিকই, হাঁটার পথও সে পেতে থাকে, কিন্তু সে নিজেই আসলে জানে না – এইসব জ্ঞান দিয়ে চুড়ান্ত লাভ/ ফায়দাটা কী? কিন্তু একজন মুসলিম দার্শনিক তা জানেন। কুরআন তাকে বুদ্ধিবৃত্তির জগতের শেষ সীমাটা দেখিয়ে দেয়, তাকে অনন্তের পথে যাত্রা করার শক্তি দান করে। ফলে মুসলিম সমান্তরাল দুইটা পথে চলে: জ্ঞানের জগত ও হৃদয়ের জগত। মুসলিম তার গন্তব্যপথ জানে। দার্শনিকের যাত্রাপথ সরলরৈখিক, কিন্তু আ’রেফ তথা খোদাপ্রেমিকের যাত্রাপথ বৃত্তীয়। সে জানে, তাকে ফিরে যেতে হবে সেখানে, যেখান থেকে সে এসেছে। সেই শেষ গন্তব্যকে মাথায় রেখে সেই অনুযায়ী সে জ্ঞানের জগতে বিচরণ করে। ফলে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে দার্শনিক তত্ত্ব কপচায় না সে। সে যখন দর্শন চর্চা করে, তা হয় উন্নত, মানব সত্তার জন্য উপকারী ও কার্যকরী জিনিস। ইতিহাসের মুসলিম দার্শনিক ও আ’রেফগণ তাই মানবজাতিকে যা দিয়ে গেছেন, তা কোনো অমুসলিম দার্শনিক দিতে পারেনি।
৯. রাহমাতুললিল আলামিনের অনুসারী হিসেবে পৃথিবীর সকলকে ভালোবাসুন। কিন্তু এই ভালোবাসার মাত্রা কতটুকু? এতে কি-ই বা লাভ হবে? ইত্যাদি প্রশ্ন যদি মনে এসে থাকে, তবে জানবেন যে, ভালোবাসার বিদ্যা কোনো কিতাবে নেই। ইসলামের যুদ্ধনীতি খুব সুস্পষ্ট বলা আছে, কিন্তু ভালোবাসার কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও মাত্রা নেই যে তা বলা সম্ভব! বরং ভালোবাসা এমনই জিনিস যে, তার যত চর্চা হয়, তত তা বৃদ্ধি পায়। রাসুল (সা.) তাদের জন্য দুঃখ করতেন, যারা ঈমান অর্জন করতে পারেনি। কতটা ভালোবাসলে এবং সেই ভালোবাসার জন্যে কতটা কাতর হলে এমন অবস্থা হয় যে, স্বয়ং আল্লাহ দুঃখ পেয়ে যান যে, “আহারে, ওদের জন্য দুঃখ করে সে বুঝি নিজেকে শেষই করে ফেলল!” নবী ইয়াকুব (আ.) তাঁর পুত্র ইউসুফ (আ.) এর জন্য শোক করতে করতে বৃদ্ধ হয়ে যান, কুঁজো হয়ে যান, এবং চোখ অন্ধপ্রায় হয়ে যায়। কোনো শরীয়ত বা আইন দিয়ে আপনি মানুষের ভালোবাসা বা শোককে বাঁধতে পারবেন না। ভালোবাসা একটা আলাদা জগত। হয় আপনি এর ভিতরে আছেন, নাহয় বাইরে আছেন আর হাজারো কথা বলে মিছে হয়রান হচ্ছেন। জ্ঞানের জগত থেকে ভালোবাসার জগতে মেরাজ করুন।
“Go, my friend, bestow your love even on your enemies. If you embrace them with love, what do you think will happen?” - Maulana Rumi
১০. ব্রেইনের ক্ষুধা ও আত্মার ক্ষুধা, উভয়ের দিকেই লক্ষ্য রাখতে হবে। আমি জানি যে, বই মানুষ পড়েই ব্রেইনের ক্ষুধা তৃপ্ত করার জন্য। তার উপরে ‘স্রষ্টাভাবনার’ মত বিষয়, যেটাতে আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কের গন্ধ আছে, তাতো মানুষ অবশ্যই ব্রেইনের ক্ষুধা মেটাতেই পড়বে। তাই আমি বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয় দিয়ে পাঠককে আকৃষ্ট করে তারপর তাকে হৃদয়ের জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছিধ এই সারপ্রাইজটুকু পাঠককে দিতে চেয়েছি আমি। যেন দিনশেষে সে তার ক্ষুধার শুধু একটি দিককে তৃপ্ত না করে, বরং ব্রেইনের ক্ষুধা ও আত্মার ক্ষুধা – উভয়টাকেই কিছু হলেও তৃপ্ত করতে পারে। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নিজেকে এইভাবেই পরিচালিত করতে হবে। যেন আপনার কাছে এলে একটা মানুষের ব্রেইনের ক্ষুধাও তৃপ্ত হয়, আত্মার ক্ষুধাও তৃপ্ত হয়। আর সেজন্যে আগে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক আত্মগঠন প্রয়োজন।
১১. সাগরতীরে তা-ই আছড়ে পড়ে, যা তার ভিতরে থাকে। যে সাগরের ভিতরে মণিমুক্তা থাকে, ঢেউয়ের সাথে তা-ই তীরে আছড়ে পড়ে। আর যার ভিতরে থাকে শুধু কাঁকড়া, শত চেষ্টা করলেও সে তা লুকিয়ে রাখতে পারে না। অমন সাগরতীরে কেউ তাই যেতে চায় না। আপনার নিজের ভিতরে কী আছে? মাটির নিচে যুক্তি ও দর্শনের ভিত্তি, আর উপরে প্রেমগৃহ? নাকি মাটির নিচে যা-ই থাকুক, উপরে শুধু যুক্তি ও দর্শনের ঢাল-তলোয়ারের ঝনঝনানি? কিংবা অহঙ্কার, বিদ্বেষ, ঘৃণা, ক্ষোভ? তাহলে জেনে রাখবেন যে, বাইরে বাইরে যতই ইসলামিক আদবের ভান করুন না কেন, ভিতরের জিনিস বেরিয়ে পড়বেই। আর ব্রেইনের জগতে মানুষকে বোকা বানানো যায়, হৃদয়ের জগতে নয়। আপনার ক্বলব যদি সত্যিই শুদ্ধ না হয়, অন্য ক্বলব আপনার কাছে এসে শান্তি পাবে না। এটা একটা ক্বলব থেকে আরেকটা ক্বলবে ঘটবে – আপনার মস্তিষ্ক যদিও সে ব্যাপারে বেখবর থাকবে। তাই কখনোই স্থায়ী বন্ধু, নির্ভাবনা বন্ধুত্ব, প্রকৃত সম্মান-শ্রদ্ধার সম্পর্ক, প্রগাঢ় প্রেমের সম্পর্ক – ইত্যাদি কখনোই আর এক্সপেরিয়েন্স করতে পারবেনা না। যেটুকু প্রেম-ভালোবাসার চর্চা হবে, সেটা হবে ভালোবাসার মোড়কে লালসা চরিতার্থ করা।
১১. সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, আল্লাহকে পাওয়াই সব পাওয়া, বিতর্কে জেতা নয়, কিংবা অন্য কিছুই নয়। জীবনে অনেক লক্ষ্যই আসবে, আবার তা পূরণও হয়ে যাবে। কিন্তু মৃত্যু পর্যন্ত একটি লক্ষ্যকে ধ্রুব রাখা প্রয়োজন, আর তা হলো মহান আল্লাহর দিকে পবিত্র যাত্রা : the blessed journey towards Allah । পড়াশুনার লক্ষ্য অর্জন হয়ে যাবে, হালাল উপার্জনের লক্ষ্যও অর্জিত হবে, স্ত্রী-সন্তান-সংসার, অর্জিত হবে ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা, জালিম সরকারের উৎখাত, এমনকি ইসলামী রাষ্ট্রও... কিন্তু যে লক্ষ্য সর্বদা রয়ে যাবে, তা হলো আল্লাহর দিকে যাত্রা। আল্লাহর পবিত্র সান্নিধ্য লাভে প্রশান্ত হবার যাত্রা। আধ্যাত্মিক সাধকের যাত্রা। আর আল্লাহর দিকে এই যাত্রা করাই পরম সাফল্য।[QR - শেয়ার করতে স্ক্যান করুন]
“যে আল্লাহকে পেয়েছে, সে কী হারিয়েছে?
যে আল্লাহকে হারিয়েছে, সে কী পেয়েছে?” - ইমাম হুসাইন (আ.)
তারপর আপনি ঘরের দরজা খুলে বাইরে আসুন। চারিদিকে তাকান। আপনি একইসাথে প্রতিটা মানুষের ক্বলব ও মস্তিষ্ক – দুই-ই দেখতে পাবেন। বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় সে যেসব জায়গায় আটকে আছে, সেই জটগুলি খুলে দিন। তাকে দেখান অকাট্য যুক্তি ও দর্শন কী জিনিস। তাকে বলুন ঐশী কিতাবের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য, নবীর অপরিহার্য গুণাবলী, তাওহীদ, আখিরাত, রিসালাত, ইমামত – অকাট্য যুক্তি ও দর্শনের বিচারে তার কাছে এগুলি প্রতিষ্ঠা করুন।
হ্যাঁ, আরো কেউ কেউ হয়ত তা করে, কিন্তু তাদের সাথে আপনার পার্থক্য এই যে, তাদের হৃদয়ে প্রেম নেই, অতএব তারা অপরের হৃদয়কে তৃপ্ত করতে পারে না। তাদের এনে দেয়া শূন্য গ্লাসকে মানুষ “১০০% জীবাণুমুক্ত গ্লাস” বলে স্বীকার করতে বাধ্য হবে হয়ত, কিন্তু ওতে ঠোঁট ছোঁয়াবে না। কিন্তু আপনি যখন সেই একই যুক্তি ও দর্শনের কথা বলবেন, সেইসাথে তাকে রহস্য শিক্ষা দেবেন, তাকে বলবেন সূরা ইখলাসের দর্শন, সুবহানাল্লাহ যিকরের তাৎপর্য, যিকরে মুহাম্মদীর জগত, নামাজের রহস্য – তখন তার আত্মা তৃপ্ত হবে। কেবল তখনই সে ইসলামের শরীয়তরূপী এই পানপাত্রে ঠোঁট ছোঁয়াবে, কেননা সেখানে সে তৃষ্ণার পানি পেয়ে গেছে।
_______________________________
নবীজি (সা.) শরীয়তবিহীন আধ্যাত্মিকতা শিক্ষা দেননি।
শরীয়তের মাঝে প্রভূত কল্যাণ আছে। শরীয়ত মারেফতের ধারণপাত্র।

    


বিরতি

________________________________________________________________
























মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…