সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

একটি দোয়া | অনন্তের পথে


[ QR - আরবি আবৃত্তিসহ বাংলা অনুবাদ শুনতে স্ক্যান করুন]




বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।


আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ।


হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আকুতি জানাই তোমার ‘রহমত’-এর উসিলায় যা সমস্ত কিছুকে পরিব্যাপ্ত করে।


আর তোমার পরাক্রমের উসিলায় যা দিয়ে তুমি সমস্ত কিছুকে পদানত করো এবং যার কাছে বস্তুনিচয় আনত হয় ও আনুগত্য প্রদর্শন করে।


এবং তোমরা প্রতাপের উসিলায় যা দিয়ে তুমি সমস্ত কিছুকে বিজিত করেছ।


এবং তোমার মহামর্যাদার উসিলায় যার সম্মুখে কোন কিছুই দাঁড়াতে পারে না।


এবং তোমার অপার মহিমার উসিলায় যা সমস্ত কিছুর ওপর বর্তমান।


এবং তোমার কর্তৃত্বের উসিলায় যা সমস্ত কিছুর ওপর কর্তৃত্বশীল।


এবং তোমার আপন সত্তার উসিলায় যা সমস্ত কিছু ধ্বংস হয়ে যাবার পরও স্থায়ী থাকবে।


এবং তোমার নামসমূহের উসিলায় যা সমস্ত কিছুর ওপর তোমার ক্ষমতা প্রকাশ করে।


এবং তোমার মহাপ্রজ্ঞার উসিলায় সমস্ত কিছু যার অধীন।


এবং তোমার সত্তার নূরের উসিলায় যা সমস্ত কিছুকে আলোকিত করে।


হে নূর! হে পবিত্রতম! হে তুমি যে অনাদিকাল হতে বিরাজমান। হে তুমি যে সবকিছু শেষ হয়ে যাবার পরও থাকবে।


হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে দেয়।


হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা দুর্যোগ ডেকে আনে।


হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা তোমার নেয়ামতসমূহকে (গজবে) পরিবর্তিত করে দেয়।


হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা দোয়া কবুল হওয়ার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।


হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা দুর্ভাগ্য (বা কষ্ট) ডেকে আনে।
 
 
হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা আশাকে বিনষ্ট করে দেয়।


হে আল্লাহ! আমার কৃত সমস্ত পাপ ও ত্রুটি ক্ষমা করে দাও।


হে আল্লাহ! তোমার স্মরণের (জিকির) মাধ্যমে তোমার নৈকট্য লাভের সাধনা করি।


এবং আমি তোমার কাছে আবেদন জানাই আমার পক্ষ হতে সুপারিশ করার জন্য।


আমি তোমার কাছে তোমার মহানুভবতার উসিলায় আবেদন জানাচ্ছি যেন তুমি আমাকে তোমার নৈকট্য দান কর।


এবং আমাকে তওফীক দাও যেন আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ হই এবং আমাকে অনুপ্রাণিত করো তোমার স্মরণের প্রতি ও নিয়ত তোমাকে ডাকার প্রতি।


হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে নিবেদন জানাই পূর্ণ আনুগত্যে, বিনয়াবনত চিত্তে ও ভীত-বিহ্বল অন্তরে।


যেন আমার প্রতি তুমি ক্ষমাশীল ও দ্য়ার্দ্র হও এবং তোমার দেয়া বরাদ্দে যেন খুশী ও পরিতৃপ্ত থাকতে পারি, আমাকে এমন তওফীক দাও।


আর আমাকে যে কোন পরিস্থিতিতে বিনম্র ও বিনয়ী রাখো।


হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা জানাই এমন এক ব্যক্তির মতো যে চরম সংকটে নিপতিত হয়ে তোমার কাছে তার প্রয়োজন ভিক্ষা করছে এবং তোমার কাছে যা আছে তা তার আশাকে বহু গুণ বর্ধিত করেছে।


হে আল্লাহ! বিশাল তোমার সাম্রাজ্য এবং মহিমান্বিত তোমার মর্যাদা।


তোমার পরিকল্পনা দৃশ্যাতীত, তোমার ক্ষমতা স্পষ্ট, তোমার শক্তি বিজয়ী, তোমার কর্তৃত্ব সর্বব্যাপী এবং তোমার সীমানা থেকে পলায়ন অসম্ভব।


হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া আমার পাপ ক্ষমা করার কিংবা আমার ঘৃণ্য কাজগুলো গোপন করে রাখার আর কেউ নেই।


আমার মন্দ ক্রিয়াগুলোকে সদগুণে রূপান্তরিত করার জন্যও তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।


তুমি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই এবং সমস্ত প্রশংসা তোমারই। আমি আমার আত্মার ওপর জুলুম করেছি এবং আমার এ ধৃষ্টতা জন্মেছে আমার অজ্ঞতার কারণে। পাপ করতে গিয়ে আমি নির্ভর করেছিলাম আমার অতীত যিকির এবং আমার প্রতি তোমার অতীত দয়ার ওপর।


হে আল্লাহ! আমার কত জঘন্য পাপকে তুমি গোপন করেছ, আমার কত কঠিন কষ্টকে তুমি সহনীয় করে দিয়েছ।


এবং কত বিচ্যুতি হতে আমাকে তুমি রক্ষা করেছ, কত নোংরা কাজ হতে আমাকে দূরে রেখেছ এবং আমার যোগ্যতার তুলনায় কত বেশি প্রশংসা তুমি চতুর্দিক ছড়িয়েছ!


হে আল্লাহ! আমার যাতনা হয়েছে অসহনীয় এবং দুর্দশা অপরিমেয়, অপরাধপ্রবণতা তীব্র, অথচ সৎ কর্ম নগণ্য এবং আমার (পাপের) বোঝা হয়েছে কঠিনতর।


এবং মিথ্যা আশার মরীচীকা আমাকে আমার মঙ্গল থেকে দূরে রেখেছে এবং দুনিয়া তার মোহমায়ায় আমাকে আবিষ্ট করেছে এবং আমার আপন সত্তা পরিণত হয়েছে বিশ্বাসঘাতকতা ও ছলনাপ্রবণতার শিকারে।


অতএব, হে আমার প্রভু! তোমার মহত্ত্বের নামে আমি কাতর মিনতি জানাই, আমার পাপ ও অপকর্মগুলো যেন আমার দোয়াকে তোমার দরজায় পৌঁছতে বাধাগ্রস্ত না করে এবং তুমি কিছুতেই তোমার জানা আমার গোপন বিষয়গুলো প্রকাশ করে দিয়ে আমাকে অপমানিত করো না এবং আমার অপরাধপ্রবণ মন, অজ্ঞতা, অতিরিক্ত লালসা ও গাফিলতির কারণে যেসব পাপ আমি গোপনে করেছি এবং আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে যেসব দোষ যুক্ত হয়েছে সেসবের কারণে আমার শাস্তি ত্বরান্বিত করো না।


হে আল্লাহ! আমি তোমার মহত্ত্বের উসিলায় তোমার কাছে নিবেদন জানাই সর্বাবস্থায় আমার প্রতি করুণাময় হতে এবং প্রতিটি বিষয়ে আমার প্রতি সদয় দৃষ্টি দিতে।


হে আমার প্রভু! প্রতিপালক! তুমি ছাড়া কি আমার এমন কেউ আছে যার কাছে আমি বিপদ মুক্তির আবেদন করতে কিংবা আমার সমস্যা অনুধাবনের প্রার্থনা জানাতে পারি?


হে আমার উপাস্য! হে আমার প্রভু! তুমি আমার (জীবনে চলার) জন্য বিধান নির্ধারণ করেছ, কিন্তু তার পরিবর্তে আমি আমার হীন কামনার দাসত্ব করেছি এবং আমি শত্রুর প্ররোচনার বিপরীতে সতর্ক থাকিনি।


সে আমাকে নিরর্থক আশার মায়াজালে বেঁধে নিয়েছে যা আমাকে টেনে নিয়েছে অধঃপাতে এবং নিয়তি তাকে সহায়তা দিয়েছে এ কর্মে। এভাবে আমি তোমার কিছু নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করেছি এবং আমি তোমার কিছু কিছু আদেশ অমান্য করেছি; অতএব, ঐ সমস্ত বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে তোমার (যথার্থ) অভিযোগ রয়েছে এবং আমার প্রতি তোমার রায়ের বিরুদ্ধে আমার কোন অজুহাত নেই।


তাই আমি (যথার্থভাবেই) তোমার বিচারের যোগ্য হয়েছি এবং শাস্তির উপযুক্ততা অর্জন করেছি। কিন্তু এখন আমি কর্তব্যহীনতা ও আমার আত্মার বিরুদ্ধে সীমা লঙ্ঘনের অপরাধে অপরাধী হওয়ার পর ক্ষমাপ্রার্থী অন্তরে অনুতপ্ত হয়ে ভগ্ন হৃদয়ে তোমার কাছে অবনত মস্তকে (আমার অপরাধ) স্বীকার করে তোমার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করছি; কেননা, আমার কৃতকর্মের প্রতিফল ভোগ হতে মুক্তির কোন উপায় আমি দেখছি না এবং তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং তোমার দয়ার বিশাল রাজ্যে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা ব্যতিরেকে আমার কোন পথও নেই। হে আল্লাহ! আমার তওবা কবুল করো এবং আমার তীব্র যাতনার ওপর দয়ার্দ্র্য হও এবং আমাকে আমার (মন্দ কর্মের) ভারী শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করো। হে পালনকর্তা! আমার দুর্বল শরীরের ওপর দয়ার্দ্র্য হও এবং আমার কোমল ত্বক ও ভঙ্গুর হাড়গুলোর ওপর করুণা করো।


প্রভু! যে তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ, আমাকে ব্যক্তিত্ব দিয়েছ এবং আমার সুষ্ঠু প্রতিপালন নিশ্চিত করেছ এবং আমাকে রিযিক দিয়েছ দয়া করে আমার ওপর তোমার সেই পরিমাণ রহমত ও বরকত বর্ষণ পুনরায় আরম্ভ করো, যে পরিমাণ ছিল আমার জীবনের সূচনালগ্নে।


হে আমার ইলাহ! আমার মালিক! আমার প্রভু! আমার পালনকর্তা! তুমি কি তোমার প্রজ্বলিত আগুনে আমাকে দগ্ধ হয়ে শাস্তি পেতে দেখবে যদিও আমি তোমার একত্বে ঈমান এনেছি? যদিও আমার অন্তর পরিপূর্ণ তোমার (পবিত্র) জ্ঞানে, আমার জিহ্বা বারবার উচ্চারণ করেছে তোমার প্রশংসাধ্বনি এবং তোমার ভালবাসায় আমার অন্তর হয়েছে প্রেমার্ত এবং যখন আমি তোমার কর্তৃত্বের কাছে একান্ত হৃদয়ে ভুল স্বীকার করেছি এবং আকূল হৃদয়ে প্রার্থনা জানিয়েছি? না, যাকে তুমি নিজেই লালন-পালন করেছ তাকে ধ্বংস করা কিংবা যাকে তুমি নিজেই রক্ষণাবেক্ষণ করেছ তাকে তোমার থেকে দূরে তাড়িয়ে দেয়া, কিংবা যাকে তুমি নিজে আশ্রয় দিয়েছ কিংবা যাকে তুমি আদর-যত্ন করেছ এবং যার প্রতি তুমি দয়ার্দ্র্য থেকেছ, তাকে যন্ত্রণার মাঝে ত্যাগ করে ফেলে রাখার মতো তুমি নও। তুমি অনেক উঁচু স্তরের দয়ার অধিকারী, করুণাময়, দাতা।


হে আমার মালিক! আমার ইলাহ ও প্রভু! আমার জানতে ইচ্ছে করে তুমি কি ঐসব মুখকে অগ্নিতে প্রজ্বলিত করবে যেসব মুখ তোমার মহত্ত্বের সম্মুখে সিজদাবনত হয়েছে কিংবা ঐসব জিহ্বাকে যেগুলো একনিষ্ঠভাবে তোমার একত্ব ঘোষণা করেছে এবং সব সময় তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছে অথবা ঐ সব হৃদয়কে দগ্ধ করবে যেগুলো তোমার প্রতি পূর্ণ অনুগত হওয়া পর্যন্ত জ্ঞান আহরণ করেছে কিংবা ঐসব হাত-পা প্রজ্বলিত করবে যেগুলো তোমার ইবাদতের স্থানগুলোয় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তোমার ক্ষমা ভিক্ষার কঠোর প্রয়াস চালিয়েছে? এ তোমার কাছ থেকে কিছুতেই আশা করা যায় না। কেননা, তোমার দয়ার্দ্র্য স্বভাবের সাথে এরূপ আচরণ একেবারেই বেমানান, হে করুণাময়!


হে প্রভু! তুমি জানো যে, এ দুনিয়ার সামান্য কষ্ট এবং পৃথিবীর অধিবাসীদের ওপর নিপতিত ক্ষুদ্র আযাব সহ্য করাও আমার জন্য কতো কষ্টকর, যদিও সে আযাব স্বল্পস্থায়ী, সামান্য ও দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়।


তবে আমি কেমন করে পরকালের কষ্ট আর সেখানকার শাস্তি সইব, যে শাস্তির মেয়াদ দীর্ঘ, যার স্থায়িত্ব বিরাট, যার কোন বিরাম নেই, যা তোমার ক্রোধ ও কঠোর ন্যায়বিচারের পরিণতি, যা আসমান ও জমিন সহ্য করতে অক্ষম?


হে প্রভু! তবে আমার কি হবে, আমি তোমার দুর্বল, ক্ষুদ্র, হীন, নগণ্য ও ম্রীয়মান দাসানুদাস?


হে আমার উপাস্য! আমার মালিক! আমার প্রভু! আমার লালনকর্তা! কোন বিষয়ে আমি তোমার কাছে অভিযোগ জানাব, আর কোনটা নিয়ে আমি অশ্রু ঝরাব, আর বিলাপ করব- শাস্তির যাতনা ও তার তীব্রতার জন্য, নাকি শাস্তির মেয়াদের দীর্ঘতার জন্য? অতএব, যদি তুমি আমাকে তোমার শত্রুদের সাথে শাস্তি দিতে নিয়ে যাও এবং তোমার আযাব ভোগকারী লোকদের সাথে আমাকেও জড়ো করো, আর তোমার আউলিয়াদের কাছ থেকে আমাকে পৃথক করে নাও, তাহলে হয়তো হে প্রভু! হে মালিক! হে ইলাহ! হে প্রতিপালক! আমি তোমার এ সমস্ত শাস্তি ধৈর্যের সাথে সয়ে নেবো। কিন্তু তোমার থেকে বিচ্ছিন্নতা আমি সহ্য করব কীভাবে?


কিংবা ধরা যাক। আমি তোমার আগুনের প্রজ্বলন সহ্য করতে পারলাম, কিন্তু কেমন করে আমি তোমার ক্ষমা ও দয়ার বঞ্চনা সয়ে নেব? কেমন করে আমি আগুনের মাঝে বসবাস করব যখন তোমার ক্ষমার ওপর ভরসা করে আমি আশার ভেলা ভাসিয়েছি?


হে আমার প্রভু! তোমার মহামর্যাদার শপথ, তুমি যদি দোজখের আগুনের মধ্যেও আমার বাকশক্তি রক্ষা কর, তাহলে আমি সেখানে বসে একজন দৃঢ় আশাবাদীর আশা নিয়েই তোমার কাছে কাতর আকুতি জানাতে থাকবো।


আমি তোমার কাছে একজন সহায়হীনের মতোই সাহায্য প্রার্থনা করব, একজন নিঃস্বের মতোই আমি তোমার কাছে আকুল হয়ে কাঁদব, আর তোমাকে ডাক ছেড়ে বলব, হে মুমিনদের সহায়! হে ঈমানদারদের একমাত্র ভরসা! হে সাহায্য প্রার্থীদের বন্ধু! হে জগতের সমস্ত অধিবাসীর প্রভু! কোথায় তুমি?


হে খোদা! সমস্ত প্রশংসা আর মর্যাদা তোমারই, তুমি কি একবারও ফিরে দেখবে না যে, একজন মুসলমান দাস তার অবাধ্যতার কারণে দোযখের আগুনে বন্দী এবং অন্যায় আচরণের কারণে এর শাস্তি ভোগ করেও তোমার দয়ার ওপর দৃঢ় আস্থা নিয়ে তোমার প্রতি তীব্র আবেদন জানাচ্ছে এমন সব ব্যক্তির মতো যারা তোমার তাওহীদে দৃঢ় বিশ্বাসী এবং তোমার প্রভুত্বের কাছে আভূমি নতজানু?


ইয়া মাওলা! তোমার অতীত ক্ষমা, অনুকম্পা ও রহমতের ওপর পূর্ণ ভরসা রাখার পরও কেমন করে সেই বান্দা কঠিন আযাবের মাঝে নিমজ্জিত থাকবে?


জানো সে কি ভীষণ দুর্বল? কিংবা কেমন করে সে দোযখের স্তরগুলোর চাপে নিষ্পিষ্ট হতে থাকবে যখন তুমি তার নিষ্ঠার কথা জানো? কিংবা কেমন করে দোযখের প্রহরীরা তাকে কষ্ট দেবে যখন সে কেবলই ডাকছে ‘ইয়া রব্ব!’ বলে?


কেমন করে তুমি তাকে ফেলে রাখবে (দোযখের মাঝে) যখন তার দৃঢ় বিশ্বাস যে, তোমার অপার করুণা তাকে এখান থেকে মুক্ত করবে? হায়! এমনটা তোমার থেকে আমরা আশা করি না, তোমার করুণার চোহারাও এমনটা নয়, কিংবা তোমার একত্বে বিশ্বাসীদের প্রতি তুমি যে করুণা প্রদর্শন করো, তার সাথেও এর কোন মিল নেই।


অতএব, আমি নিশ্চিত হয়ে ঘোষণা করছি যে, যদি তুমি অবিশ্বাসীদের জন্য শাস্তি নির্ধারণ না করতে এবং তোমার শত্রুদের আবাস হিসাবে দোযখকে নির্ধারিত না করতে, তাহলে তুমি দোযখকে শীতল ও প্রশান্তিময় করে তুলতে এবং কোন মানুষকেই কষ্টকর দোযখবাস করতে হত না; কিন্তু পবিত্র তোমার নাম, তুমি শপথ করেছ যে, তুমি জ্বিন ও মানুষের মধ্যে যারা অবিশ্বাসী তাদের দিয়ে দোযখ পূর্ণ করবে এবং একে তোমার কঠোর বিরুদ্ধবাদীদের চিরস্থায়ী নিবাসে পরিণত করবে।


আর মহিমান্বিত তোমার গুণাবলী, তোমার অপার অনুগ্রহে তুমি ঘোষণা করেছ, ‘একজন মুমিন আর একজন ফাসেক কি সমান? তারা সমান হতে পারে না।’ (আল কুরআন, ৩২:১৮)


হে মহাপ্রভু! তোমার কাছে আমি প্রার্থনা করছি তোমার অবিসংবাদিত কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্তের নামে যা তুমিই চূড়ান্ত ও কার্যকর করে থাকো এবং যা দ্বারা তুমি তাকে কর্তৃত্বাধীন রাখো যার ওপর সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়; দয়া করে আমাকে এ রাতের এ প্রহরে ক্ষমা করে দাও সেই সমস্ত সীমালঙ্ঘনের জন্য যেগুলোর অপরাধে আমি অপরাধী, সেই সমস্ত ঘৃণ্য কাজের জন্য যা আমি গোপন রেখেছি, সেই সমস্ত প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য অপকর্মের জন্য যা আমি করেছি- অন্ধকারে কিংবা দিবালোকে এবং সেই সকল মন্দ কাজের জন্য যা লিপিবদ্ধ হয়েছে সম্মানিত লিপিকারদের দ্বারা যাদের তুমি আদেশ করেছ আমার সমস্ত ক্রিয়া-কর্ম লিপিবদ্ধ করতে এবং শরীরের বিভিন্ন অংগ-প্রত্যংগের মতো আমার কার্যকলাপের সাক্ষী হতে আর তুমি নিজেই তো মহাপর্যবেক্ষক এবং তোমার অশেষ করুণায় তুমি যেসব মন্দ কর্ম তাদের কাছে গোপন রাখো তার সবই তো তোমার কাছে পরিষ্কার।


তোমার কাছ আরো প্রার্থনা করি, তোমার নাযিলকৃত প্রতিটি কল্যাণ, প্রতিটি দাক্ষিণ্য, প্রতিটি বরকত, প্রতিটি রিজিক বৃদ্ধি, পাপের ক্ষমা ও ত্রুটি গোপনের মতো প্রতিটি রহমত বর্ষণ হতে আমাকে একটি বিরাট অংশ দান করো। ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! হে উপাস্য প্রভু! হে মনিব! হে মাওলা ও হে আমার আজাদীর মালিক যিনি আমার ভাগ্য নিয়ন্তা ও আমার যাতনা ও নিঃস্বতা সম্পর্কে পরিজ্ঞাত, যিনি আমার দুঃস্থতা ও অনাহার সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! তোমার মহামর্যাদা, প্রবল প্রতাপ ও পরিপূর্ণরূপ নিখুঁত গুণাবলীর নামে এবং তোমার নামসমূহের উসিলায় আমি তোমার কাছে মিনতি করি, আমার সমস্ত প্রহর, দিবা ও রাত্রি যেন তোমার খেদমত ও যিকিরে অতিবাহিত হয় এবং আমার আচরণ এমনভাবে তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোল যেন আমার সমস্ত নামাজ, উপাসনা ও কর্ম সম্পাদন পরস্পর মিলিত হয়ে একই ইবাদতের ধারায় প্রবাহিত হয় এবং আমার সমগ্র জীবন যেন ব্যয়িত হয় তোমার অবিরাম, অবিরল খেদমত সাধনায়।


হে আমার প্রভু! যার ওপর আমার সমস্ত ভরসা, যার কাছে আমি আমার সমস্ত দুর্দশার কথা খুলে বলি! ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব! তোমার খেদমতের জন্য আমার দেহকে শক্তিশালী করে তোলো এবং আমার বাহুর শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখো; আর আমার মধ্যে প্রদান করো খোদাভীতি ও সর্বক্ষণ তোমার খেদমতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা।


খোদাভীতিই হচ্ছে বিশৃঙ্খলা, অপরাধ ও নীতিহীনতার বিরুদ্ধে একমাত্র রক্ষাকবচ। মানব রচিত আইনের শাস্তির বিধানসসমূহ এগুলো প্রতিরোধে অসর্মথ। আল্লাহর ভয় উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন আল্লাহ, তাঁর ক্ষমতা ও শাস্তিসমূহ সম্পর্কে মানুষের মনে সচেতনতা সৃষ্টি। “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।’ (আল কুরআন, ৩৫:২৮)


যেন আমি সহজেই যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগামীদের শামিল হয়ে তোমার পানে অগ্রসর হতে পারি এবং যারা তোমার দিকে তীব্র বেগে ধাবমান তাদের মধ্যে দ্রুততর হতে পারি, আর যারা একাগ্র নিষ্ঠায় তোমার নৈকট্য লাভ করেছে, তাদের মতোই যেন আমি নিজেকে তোমার নৈকট্য লাভের সাধনায় নিয়োজিত করতে পারি এবং ইয়াক্বীন (দৃঢ় প্রত্যয়) সম্পন্নদের মতোই যেন তোমাকে ভয় করে চলি এবং এভাবে যেন আমি তোমার নৈকট্যপ্রাপ্ত মুমিনদের মিছিলের একজন হয়ে যেতে পারি। হে আল্লাহ! যে আমার অনিষ্ট চায় তুমি তারই অনিষ্ট করো! আর যে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাকেই ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত করো এবং আমাকে তোমার শ্রেষ্ঠ দাসদের সঙ্গে এমন এক স্থান দান করো, যা তোমার অধিকতর নিকটে, নিশ্চয়ই ঐ স্থান তোমার অনুগ্রহ ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়। তোমার মহাকর্তৃত্বের বাহু আমার দিকে প্রসারিত করো এবং আমাকে রক্ষা করো তোমার অপার করুণায়! আমার জিহ্বা যেন সর্বক্ষণ নিয়োজিত থাকে তোমার স্মরণে এবং হৃদয় যেন প্রেমার্ত থাকে তোমার মুগ্ধতায়! করুণা করো আমার প্রতি একটি দয়ার্দ্র্য প্রত্যুত্তর দিয়ে, আমার পদস্খলনগুলো মুছে দাও এবং আমার ত্রুটিগুলো মার্জনা করে দাও! কেননা তুমিই তোমার বান্দাদের জন্য নির্ধারণ করেছ আনুগত্য, আদেশ করেছো প্রার্থনা জানাতে এবং নিশ্চয়তা দিয়েছ এ সবের জবাব দানের।


তাই তোমার পানেই হে প্রভু, আমি মুখ ফিরিয়েছি এবং তোমার কাছেই আমি হাত উঠিয়েছি, অতএব, তোমার মহামর্যাদার উসিলায় আমার দোয়া কবুল করো এবং আমার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করো। কিছুতেই আমাকে হতাশ কোরো না এবং তুমি আমায় রক্ষা করো জ্বীন ও মানুষের মধ্যে যারা আমার শত্রু তাদের অনিষ্ট হতে।


হে প্রভু! যে তুমি দ্রুত সন্তুষ্ট হও। তাকে তুমি ক্ষমা করো, দোয়া ছাড়া যার অন্য কোন সম্বল নেই। কেননা, তোমার যা ইচ্ছা তুমিতো তা-ই করতে পারো। হে প্রভু! যার নামে দুর্গতির মুক্তি, যার স্মরণেই সমস্ত কষ্টের প্রতিকার এবং যার আনুগত্যই সম্পদ। রহম করো তার ওপর, যার মূলধন শুধু আশা আর শুধু কান্না।


হে সমস্ত নেয়ামতের পূর্ণতা দানকারী ও সমস্ত দুর্যোগের ত্রাণকর্তা! হে অন্ধকারে পথভ্রান্ত একাকীদের দিশা! হে সর্বজ্ঞ! যাকে কখনো শেখানো হয়নি! মুহাম্মদ ও তাঁর বংশধরদের ওপর শান্তি বর্ষণ করো এবং আমার প্রতি তা-ই করো যা করা তোমাকে মানায়।


শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর রাসূলের ওপর এবং তাঁর বংশধরদের মধ্য হতে পবিত্র ইমামদের ওপর এবং তাদের দান করো অপার ও অসীম প্রশান্তি।

মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…