সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমার বন্ধু মোর্শেদ | অনন্তের পথে


বইটি যেভাবে রচিত হলো

প্রিয় প্রকাশক,

সালামুন আলাইকুম। সংযুক্ত পিডিএফ ফাইলটি "স্রষ্টাভাবনা" শিরোনামের একটি লেখা, যা ২৩টি ছোট ছোট পোস্ট আকারে বিভক্ত করে ফেইসবুকে প্রকাশ করেছিলাম ২০১২ সালে। তখন এটিকে কোনো বইয়ের রূপ দেবার পরিকল্পনা বা চিন্তা, কিছুই ছিল না। সম্প্রতি আরিফ আজাদ সাহেবের একটি বই আপনারা প্রকাশ করেছেন আস্তিকতা-নাস্তিকতা বিষয়ক ("প্যারাডক্সিকাল সাজিদ"), এবং সম্ভবতঃ উনার দ্বিতীয় বইটিও আপনারাই প্রকাশ করবেন হয়তোবা: "আরজ আলী সমীপে"।

আরিফ আজাদ সাহেবের উক্ত বই সংক্রান্ত সাম্প্রতিক এক পোস্টে আমি আমার দুইটি লেখার লিঙ্ক দেই:

১. আরজ আলী মাতুব্বরের "সত্যের সন্ধানে" বইয়ের যুক্তিখণ্ডন ও

২. নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে স্রষ্টার অস্তিত্ব বিষয়ক সিদ্ধান্তমূলক পর্যালোচনা: "স্রষ্টাভাবনা"।

সেখানের সূত্র ধরে কয়েকজন আমাকে অনুরোধ করলেন বই আকারে আমার লেখাগুলি প্রকাশ করতে। সেই সূত্রেই আপনার কাছে লেখাটি পাঠালাম।

আস্তিকতা-নাস্তিকতা, কিংবা নাস্তিক্যবাদের যুক্তিখণ্ডন করে বাংলা ভাষায় কাজ হয়েছে খুব কম। আপনার প্রকাশিত বইটি খুব সাড়া ফেলেছে এবং অনেকের ক্ষুধা মিটিয়েছে, বিশেষতঃ ইন্টারনেটের যুগে যেখানে তরুণসমাজ নাস্তিক্যবাদী চিন্তাধারার সম্মুখে exposed হচ্ছে খুবই সহজে। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের ইসলামপন্থীদের যুক্তি খুবই দুর্বল। এমনকি প্যারাডক্সিকাল সাজিদ বইটিতেও এধরণের বেশকিছু দুর্বলতা দেখতে পেয়েছি, যেখানে নাস্তিক্যবাদের যুক্তিখণ্ডন সঠিকভাবে হয়নি। এই সমস্যাটি আমাদের ইসলামপন্থীদের হয়ে থাকে যুক্তিশাস্ত্র অধ্যয়ন না করার কারণে।

যুক্তিশাস্ত্রের উপর আমার ব্যক্তিগত অধ্যয়ন ও চর্চার উপর ভিত্তি করে লেখা এই "স্রষ্টাভাবনা"-কে আপনি একটি ফান্ডামেন্টাল রাইটিং হিসেবে পাবেন, ইনশাআল্লাহ। যুক্তির কোয়ালিটির সাথে কম্প্রোমাইজ না করে লেখাটিকে যথাসম্ভব সহজবোধ্য করেছি, যেন সাধারণ পাঠকের বোধগম্য হয়। মুখরোচক করার দিকে কখনো নজর দেইনি।

সংযুক্ত পিডিএফটি সেই ২৩টি পোস্টের সংকলন। বিষয়বস্তুতে চোখ বুলিয়ে দেখবেন ইনশাআল্লাহ। যদি আপনি বই আকারে প্রকাশ করতে সম্মত হন, সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন ইত্যাদি আমি নিজেই করে দিতে পারব, কেননা এই দিকে আমার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে, এবং সম্প্রতি আমার সম্পাদনায় একটি ইংলিশ বই-ও ক্যানাডা থেকে পাবলিশ হতে যাচ্ছে।

আরো একটি বিষয় হলো, আমি ইউরোপে থাকি পড়াশুনার জন্যে, সেখানে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত আছি, কিন্তু এই মুহুর্তে বাংলাদেশে অবস্থান করছি। সামনের বছর ফেব্রুয়ারির আগেই আমার ছুটি শেষ হয়ে যাবে এবং চলে যেতে হবে। আপনি বইটি প্রকাশের ব্যাপারে আগ্রহী হলে আমার পক্ষে ফিজিকালি দেখা করা সম্ভব এবং আপনার গাইডলাইন মোতাবেক বইটিকে সাজানো ও পরিমার্জন করা সম্ভব হবে।

FOSS এ বিশ্বাসী একজন সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমি কপিরাইট আইন পছন্দ করি না, কিন্তু ইত্যাদি বিষয় আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এছাড়াও, যেহেতু বইটি/ লেখাটি মূলতঃ ইসলামের খেদমতেই নিঃস্বার্থভাবে তৈরী করেছিলাম ২০১২ সালে, সেহেতু এটি বই আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হলেও তা থেকে কোনোরূপ লাভ গ্রহণ করাকে আমি নিজের জন্যে সঙ্গত মনে করি না। এমতাবস্থায়, পাবলিশার হিসেবে বইটির ফিউচার মার্কেট যাচাই করে যদি আপনি বইটি প্রকাশের খরচ বহন করেন, কিংবা যদি আমাকে বহন করতে হয়, কিংবা পার্শিয়ালি উভয় পক্ষকে বহন করা সম্ভব হয় – সেক্ষেত্রেও, এমনকি আমার ব্যক্তিগত খরচ হলেও, বই বিক্রি বা ইত্যাদির কোনো ধরণের লাভ আমি গ্রহণ করতে পারবো না। এমতাবস্থায় আপনার পাবলিশিং কোম্পানির নিয়মনীতির সাপেক্ষে আমার প্রস্তাবটি বিবেচনা করে মতামত জানালে খুশি হবো।



ওয়াসসালাম।

নূরে আলম মাসুদ

ঢাকা,

অক্টোবর ২৮, ২০১৭

ফিরতি মেইলে প্রকাশককে কিছুটা আগ্রহী মনে হলো। তখনোও কোনো ফাইনাল কথা হয়নি, তবে আমি বইটিতে হাত দিলাম: প্রকাশ হোক বা না হোক, বই আমার লেখা হোক! এই ভাবনা থেকে পাঁচ বছরের পুরনো লেখা বের করলাম। ভেবেছিলাম, ফেইসবুক পোস্টগুলোকে টুকটাক এডিট করে একদিনেই কাজটা শেষ করে ফেলব। কিন্তু পুরো লেখাটা নতুন করে পড়তে গিয়ে এর অসম্পূর্ণতা চোখে পড়লো। না, যুক্তি ও দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে সে লেখা এখনো অনেক দৃঢ়, কিন্তু অসম্পূর্ণতাটা আমি দেখলাম অন্য জায়গায়। সেটা হলো, ঐ লেখায় হৃদয়ের জগতের কোনো কথা বলা হয়নি। অথচ মানুষ নিছক ইন্টেলেকচুয়াল প্রাণী নয়। তার হৃদয় আছে, আবেগ আছে। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতেও যেমন দৃঢ় ভিত্তি থাকা চাই, তেমনি হৃদয়ের জগতেও বিচরণ থাকা প্রয়োজন। নতুবা কেবল ব্রেইনের ক্ষুধাই তৃপ্ত হবে, আত্মার ক্ষুধা নয়। বরং উল্টা মানুষকে “আমিই সঠিক” এর অহঙ্কারে অহঙ্কারী করে তুলবে!

কিবোর্ডে Ctrl+A চেপে পুরো ফাইলটার সব লেখা মুছে দিলাম। নতুন করে লেখা শুরু করলাম। নতুন করে আবারো সমস্ত পূর্বজ্ঞান দূরে সরিয়ে রেখে “উৎসের সন্ধান” দিয়ে শুরু করলাম। এবং সেটা আমাকে নতুন পথে নিয়ে গেল। বইয়ের স্ট্রাকচার চেইঞ্জ হতে লাগলো বারবার। লিখতে লিখতে হঠাত হঠাতই দুই-দশ পেইজ একটানে মুছে ফেলছি, আবারো লিখছি, আবারো ভাবছি: আমি নিজেই জানি না আমি কী লিখছি, কী লিখব, কিভাবেই বা লিখব। বইটি যেন নিজে নিজেই লিখিত হয়ে যাচ্ছে! আমি যেন নতুন করে যাত্রা করছি অজানার পথে: যেখানে পথ হাঁটতে থাকলেই পথ প্রকাশ পায়। এমনই সব অনুভূতি হচ্ছিলো আমার।

কয়েক সপ্তাহের মাঝে বইয়ের একটা স্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে গেল। এর মাঝে কত হাজার শব্দ লিখেছি আবার মুহুর্তের ভাবনায় একটানে তা মুছে দিয়েছি, তার হিসেব নেই। আমি কখনো এতটা ‘এলোমেলোভাবে’ কিছু লিখিনি, কিন্তু এই বইটা সেভাবেই লিখিত হতে লাগলো। ওদিকে প্রথমদিকে যারা উৎসাহ দিয়েছিলেন, তাদের মাঝে ইমরান হোসাইন নামে একজন খুব করে লেগে রইলেন। বই কতদূর হলো, কেমন লিখছি, প্রকাশক কী বলেছে, ইত্যাদি। বললাম, একটা পাবলিকেশান্সে মেইল করেছি, তিনি খসড়া পাণ্ডুলিপি পড়ে জানাবেন বলেছেন। ইমরান ভাই বললেন, আমি যেন আরো কয়েকটা পাবলিশারের সাথে কথা বলে রাখি। বললাম, একাধিকের সাথে কথা বলাটা ন্যায়সঙ্গত হবে না মনে হয়; আল্লাহ ভরসা, দেখা যাক উনি কী বলেন। ইমরান ভাই বললেন, আপনিতো তাদের সাথে চুক্তিতে যাননি এখনো। বললাম, প্যারালেল একাধিকজনের সাথে কথা চালালে পরে একজনের সাথে চুক্তিতে গেলে অন্যদেরকে না করব কী বলে?

উনি পীড়াপীড়ি করলেন। কিন্তু আমি তা করলাম না। এটা আমার কোনো ব্যবসা নয় যে, প্ল্যান এ, বি, সি ইত্যাদি করে রাখব। আমি বইটা নিয়ে কাজ করে যেতে লাগলাম। ইতিমধ্যেই ফেইসবুকের “স্রষ্টাভাবনা” পেইজে বই থেকে টুকটাক অংশ তুলে পোস্ট করছিলাম। ওদিকে মাস্টার্সের প্রজেক্ট চলছে। সবমিলিয়ে খুব ব্যস্ত সময় যাচ্ছিল। ২৪ নভেম্বর প্রজেক্ট ডিফেন্স শেষ করে বাসায় আসলাম। পরদিন রাতে বই থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফেইসবুকে পোস্ট করলাম: বিশ্বাস, জ্ঞান ও ঈমান। ঈমানের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে মানুষ ‘বিশ্বাস’ মনে করে, অথচ আসলে ঈমান একেবারেই ভিন্ন একটি বিষয় – এই ধারণাটি আস্তিক-নাস্তিক উভয়কেই সমানভাবে আলোড়িত করবার মত। আমার পোস্টে পরিচিত যারা কমেন্ট করে, তারাই কেউ কেউ কমেন্ট করলো। অপরিচিতদের মাঝে কমেন্ট করলো মোর্শেদ।


মোর্শেদের গল্প

মোর্শেদকে আমি চিনি না, তবে কমেন্টটা খুব গুছানো ছিল। কমেন্ট পড়ে বুঝলাম, মুসলিম-অমুসলিম উভয় অবস্থানকেই সতর্কভাবে এড়িয়ে গিয়ে তৃতীয় অবস্থান থেকে মন্তব্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। আর এমন নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির কথাই তো আমি গোটা বই জুড়ে বলছি! আমি কমেন্টের রিপ্লাই দিলাম, তারপর কমেন্ট-পাল্টা কমেন্ট চলতে লাগলো। জ্ঞান, সত্য, প্রতিষ্ঠিত সত্য, সত্য কি অবজেক্টিভ নাকি সাবজেক্টিভ, ইত্যাদি বিষয়ে কমেন্টে কথা হলো। এত সিস্টেম্যাটিক কনভার্সেশান খুব কম মানুষের থেকেই পাই: বেশ কৌতুহল হলো আমার। ফেইসবুক প্রোফাইলে ঢুকলাম। সেখানে লেখা: আত্মকেন্দ্রিক, অসামাজিক, অজ্ঞেয়বাদী। ঝুলে থাকা অ্যাড রিকোয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট করে মেসেঞ্জারে নক দিলাম। রাত সাড়ে দশটা মতন বাজে। লিখলাম:

সালাম। আপনার চিন্তাপদ্ধতি ভালো লাগল। খুবই সিস্টেম্যাটিক।

- ♥ ধন্যবাদ। ইউনিভার্সিটির একজনকেই পেয়েছি, যার সাথে কথা বলে ভালো লাগছে।

আমারও অনেকটা তা-ই। আপনি ট্রিপল-ই তে?

- জ্বী। ২০১৫ তে ভর্তি হয়েছি। এখন থার্ড ইয়ারে।

বিশেষভাবে এই ভার্সিটিই কেন?

- ইসলামী মানুষদের ভেতরটা দেখবার তুমুল ইচ্ছা, বলতে পারেন!

এভাবে কথা চলতে লাগলো। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি অ্যাগনস্টিক, তাই না? মোর্শেদ বলল, হুম। কিন্তু আমার জন্য বিস্ময় অপেক্ষা করছিলো এর পরে। সব মানুষেরই কিছু না কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে। আমারও আছে, মোর্শেদেরও আছে। মোর্শেদের সেই ‘ইসলামিক’ ব্যাকগ্রাউন্ডটা জেনে আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এই ব্যাকগ্রাউন্ডের মধ্যে থেকে অ্যাগনস্টিক হলেন কিভাবে! আপনার অ্যাগনস্টিক হয়ে ওঠার গল্পটা বলবেন?

- কোনো গল্প নেই। ছোটবেলা থেকেই উৎসুক ছিলাম, এখনো আছি। ছোটবেলা থেকেই বই পড়তে পছন্দ করতাম। নিজের বেশ কিছু জিজ্ঞাসা ছিল, এখনো আছে।

তারপর সেই জিজ্ঞাসাগুলো আমি জেনেছিলাম। যে মানুষটা মাদ্রাসা থেকে পড়াশুনা করে এসেছে, তারপর নাস্তিক হয়েছে, তার সাথে আমি কী বিতর্ক করব? তাকে আমি কী বলব? ইসলামের নামে প্রচলিতভাবে যাকিছুর চর্চা হয়, তার ভুলগুলো তো ওর কাছে খুব স্পষ্ট। তার উপর খুব ইন্টেলেকচুয়াল ছেলে ও, অল্প সময়েই নাস্তিক্যবাদী দৃঢ় সব আর্গুমেন্ট শিখে নিয়েছে, সেইসাথে শিখে নিয়েছে অ্যাগনস্টিকদের যত কূলকিনারাহীন যুক্তি।

এরমাঝে একফাঁকে বললাম, আমি এখন একটা বই লিখছি: স্রষ্টাভাবনা। আপনার হয়ত ইন্টারেস্টিং লাগতেও পারে। শেষ হলে আপনাকে দিতে চাই। মোর্শেদ বলল, অবশ্যই, পড়তে চাই। কিন্তু তখন কে জানত যে, মোর্শেদই সেই বইয়ের অংশ হয়ে উঠবে?

যাহোক, মোর্শেদের জটিল সব নাস্তিক-অ্যাগনস্টিক আর্গুমেন্ট শুনছিলাম আমি। তবে একপাক্ষিক শুনে যাওয়া নয়। অ্যাগনস্টিক/ এথিয়েস্টিক আর্গুমেন্টকে কিভাবে যুক্তিতে ধরাশায়ী করতে হয়, সে বিদ্যা আমার খুব ভালোভাবে জানা। আমিও জবাব দিয়ে তার দিকেই কথা ফিরিয়ে দিচ্ছিলাম। কিন্তু স্রষ্টায় অবিশ্বাসী প্রতিটা মানুষেরই নাস্তিক হয়ে ওঠার পিছনে একটা গল্প থাকে। আমি মোর্শেদের সেই গল্পটাকে দেখেছিলাম। কেজানে, হয়ত আমার হৃদয় তা আগেই দেখতে পেয়েছিল, আর তাই মস্তিষ্ক যখন যুক্তিতর্ক করে যাচ্ছিল, তখন তা দূরত্ব সৃষ্টিকারী না হয়ে সুসম্পর্কই রচে’ যাচ্ছিল! যেমন, আমি যখন মানবের বৈশিষ্ট্যের একটা তালিকা করলাম, তখন মোর্শেদ একটা কারেকশান দিলো, আমি মেনে নিলাম। তারপর আবার বিতর্কের একটা পর্যায়ে আমার কথাটাও মোর্শেদ মেনে নিল, যখন বললাম-

তাহলে এটা কি সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, নিজের অবচেতনের সাথে ফাইট করে নিজের অবচেতন মনকে পর্যন্ত নিরপেক্ষ রাখা – এটা হলো প্রকৃত সত্য উন্মোচনের পথে প্রথম ধাপ?

- হ্যাঁ, যায়।

বাহ! ♥♥♥ কিন্তু কখনো কি কোনো আস্তিক-নাস্তিক-অ্যাগনস্টিক বিতর্কে এমন কথা আগে শুনেছিলেন?

- নাহ। কারণ তারাও প্রচলিত নাস্তিক, তাই। কিন্তু আমাদের এখানে কি বিতর্ক হচ্ছে?

হাহাহা। নাহ। আপনাকে আমার ভালো লাগে, তাই গল্প করছি। যদিও বাইরের লোক দেখলে মনে করবে ডিবেইট করছি।

- আমি আপনাকে জানছি। মানুষ জানতে আমার ভালো লাগে। ♥

তারপর ‘মানুষকে জানা’ চলতে লাগল। কতক্ষণ? অনেক্ষণ। সময়ের অনুভূতি তো আপেক্ষিক। তবে ঘড়ির কাঁটায় ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে একদিন পেরিয়ে দ্বিতীয় দিনে গড়ালো, কিন্তু কথা থামলো না। মাঝখানে আমার একটু উঠে নামাজ পড়া কিংবা এমন টুকটাক দু-একটা কাজ। আমার চা-সিগারেটের অভ্যাস নেই, কোনোকিছু ছাড়াই আমি ব্রেইনকে জাগিয়ে রাখতে পারি দিনের পর দিন। তবে ঐদিকে চা আর সিগারেট চলতে লাগল। আর ফেইসবুক মেসেঞ্জারে চললো মানুষ জানার এক অদ্ভুত গল্প! উচ্চস্তরের ইন্টেলেকচুয়াল আলাপ, আর সেইসাথে হৃদয়ের জগতের মিশেলে এক অপূর্ব গল্প রচিত হল। সেকথার সবটা বলতে গেলে আলাদা গল্পই লিখে হবে, কিন্তু আমি শুনছিলাম। যখন মোর্শেদ কোনো ভুল যুক্তি দিচ্ছিল, তখন সেটাকে ঠিকই ফিরিয়ে দিচ্ছিলাম। কিন্তু হৃদয়ের আলাপের সময় আবার মন পেতে শুনছিলাম। মোর্শেদের গল্প শুনতে শুনতে আমি চোখের সামনে যেন একটা মুভি দেখতে পাচ্ছিলাম: একটা ব্যথিত হৃদয়ের নাস্তিক হয়ে ওঠার গল্প!

হ্যাঁ, স্রষ্টায় অবিশ্বাসী প্রতিটা মানুষেরই নাস্তিক হয়ে ওঠার পিছনে একটা গল্প থাকে, আর সেটা আমি দেখছিলাম। আমরা এমনভাবে কথা বলছিলাম, যেন অনেকদিনের পুরনো বন্ধু, যেখানে কোনো কথা বলতেই বাধা থাকে না। যেখানে নিজেকে লুকানোর কিছু নেই, এমনকি নিজের অবচেতনকেও না। দুইদিনের পরিচয়েই সেটা কিভাবে সম্ভব হলো, সেকথা বলতে পারব না; তবে কিছু একটাতো নিশ্চয়ই ছিল! তাই মোর্শেদ অকপটে বলল, “আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না যে, আপনি ধার্মিক। কখন নতুন ফাঁদে পড়ি, সেই ভয়!”

বললাম, আপনার এই ভয় তৈরীর পিছনে দায়ী অন্ধবিশ্বাসী ধার্মিকেরা। আপনাকে এটা পীড়া দিচ্ছে যে, আমি মুসলিম, ইসলামের কোনো না কোনো ফর্ম মেনে চলি। কিন্তু এইখানে আমি অসহায়। আমি আপনাকে ভালোবাসি, কিন্তু আমার এই ‘আমিটা’ হলো এই ধর্মপ্রেমী মানুষটাই। এইটা আমার ব্যক্তিসত্তার অংশ। আমার যাকিছু সুন্দর, তা এই ধর্মের গুণে… এটাকে বাদ দিলে আমাকে তুমি ভালোবাসবে না ভাই!

- নিজের গুণ দিয়ে ধর্মটাকে ঢাকতে চাচ্ছেন!!

এমনিভাবে কথা চলতে লাগলো। লাগামহীন ব্রেইন যখন মানুষের ঘাড়ের উপর চেপে বসে, তখন তাকে দিয়ে সবরকম অপ্রয়োজনীয় চিন্তা করিয়ে নেয়। নিতান্তই নির্দোষ একটা জিনিসের পিছনেও অনেক কারণ ভাবিয়ে আবিষ্কার করায়। মোর্শেদের সাথে কথা বলতে বলতে একদিকে আমি ব্যথা অনুভব করছি মানুষটার জন্য, অপরদিকে আমার ব্রেইন ঠিকঠিক প্রসেসিং করে চলেছে, কারণগুলি আইডেন্টিফাই করছে: ওমুক জায়গায় পরিবারটা ইম্পর্ট্যান্ট, ওমুক জায়গায় সমাজ, ওমুক জায়গায় প্রচলিত বিকৃত ধর্মচর্চা দায়ী, ইত্যাদি…।


মানুষ জানতে ভালো লাগে…


২৭ নভেম্বর, ভোর।


মোর্শেদ, আমি আপনাকে বাসায় আসতে বলতাম, আমি ঘরকুনো, তাই সব জুনিয়রকেই বাসায় আসতে বলি, বাসায় বসে আড্ডা দেই, আমার বাসাকে ওরা দরবার বলে। কিন্তু পরে মনে হলো, আপনি ভয় পাবেন।

– ভয়?

হুম। ঐযে, ধর্মের দিকে টানার চেষ্টা করি যদি? নানান সূক্ষ্ম কথার কৌশলে, ভালোবাসার ছলে! আপনার অবচেতন মনের ভয়।

– হাহাহা।

আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছা নাই আপনার?

– এ কেমন কথা!

কারণ আমি ধার্মিক যে! :’(

– বাসায় আসবো?

হ্যাঁ, please!

– কী খেতে দিবেন?

ভালবাসা + চা-বিস্কুট।

– শুধু নাস্তা দিয়েই বিদায়?

আপনি জানেন না বোধহয়, আমার দরবারে রাতে থাকা, দিনে গোসল করা, বিকালে রেস্ট নেওয়া ও তিনবেলা খাবারের সুব্যবস্থা আছে।

– হাহাহা।

এজন্যেইতো ওরা নাম দিয়েছে, সুফির দরবার!

– বাহ! দরবারে কি শুধু ভক্তরাই আসে? আমি কী হিসেবে আসবো?

ভক্ত আসে, সাধারণ দর্শনার্থীও আসে ;-)

থাকা-খাওয়ার সুবিধার পাশাপাশি যারা ইংরেজি শিখতে চায়, তাদেরকে ইংরেজি শিখানো হয়। যারা বাংলা শিখতে চায়, বাংলা শিখানো হয় (যেহেতু সাংবাদিকের বাসা)। আরবি-ফার্সির এক্সপার্ট আছে, অর্থনীতির এক্সপার্টও আছে। প্রোগ্রামিঙের জন্য আমি আছি। সেইসাথে অধ্যাত্মবাদ, ইসলাম, বিপ্লব, সমাজ – ইত্যাদি সব ফ্রি। যার যা লাগে।

– ওয়াও! আমি কি সবগুলোতেই ভর্তি হতে পারব?

হুম, সব। এখানে সব দরজা খোলা!


২৭ নভেম্বর, সকাল


ফজরের পর একটা নতুন দিন শুরু হলো। চ্যাটিং চলছেই। সকালের নাস্তার পর বললাম,

আজকে যদি হঠাৎ আপনার বাসায় হাজির হই, ভয় পাবেন?

– না। ভয় পাবো ক্যান?

ক্যান, ঐযে, ধার্মিক বানানোর জন্য তাড়াতাড়ি ছুটে আসছে! :P

– হাহাহা।

আপনি ভালোবাসার মায়ায় পড়ে ক্রিটিকাল থিংকিং হারিয়ে ফেলতেছেন দেখতেছি। হাহাহা...

– হুম, সব হারিয়ে ফেলতেছি। এমনকি নিজেকেও।

একজন নাস্তিক যখন একজন মুসলিমকে ভালোবাসে, আর মুসলিমও যখন তাকে ভালোবাসে – তখন আমার মনে হয় একটা মিরাকল ঘটে। দুনিয়ার আর কেউ সে গল্প না দেখলেও অলক্ষ্যে সৃষ্টিকর্তা ঠিকই দেখেন। আর তিনি সেটা পছন্দ করেন বলেই আমার বিশ্বাস।


“When fire loves water, it’s a miracle.”


২৭ নভেম্বর, বেলা এগারো।


ফার্মাসি ডিপার্টমেন্টের কয়েকজনের নাম বলল মোর্শেদ, ওদেরকে চিনি কিনা। বললাম,

হুম, ওদেরকে তো চিনিই। আপনি চেনেন কিভাবে?

– কমরেড মুসলমান্স।

হাহাহা। সরাসরি পরিচয় আছে?

– নাহ। বিপ্লবী মানুষদের নিয়ে একটু জানার চেষ্টা করি আরকি। হেহেহে

ওগুলা বিপ্লবী নারে ভাই। হুদাই ফাল পাড়ে। স্বকীয়তা নাই কিছু না। যাহোক, ওদেরকে আমি সম্মানও করি। আমার অনেক ঘনিষ্ঠ ছিল এককালে। কিন্তু ওদের ধর্মীয় গোঁড়ামি ওদের আর আমার পথ আলাদা করে দিয়েছে।

– সম্মান করেন কি ওদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে? (জঘন্য প্রশ্ন করার জন্য স্যরি)

ওদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে?? মোর্শেদ, আমার আক্রমণ থেকে বাঁচতে ওরা পালাবে। ওরা সেটা খুব ভালো করেই জানে। আমি নিজেও জানি আমার যোগ্যতা কতদূর। ওদের এসব কপি-পেস্ট বিপ্লব আর হ্যান ত্যান এর গোড়া আমার নাড়াচাড়া করা আছে। কিন্তু ওদের সাথে ভালোবাসার সুসম্পর্ক ছিল।

– এখন নেই?

২০১৪ তে ছিল, ১৫-র মাঝামাঝি থেকে নষ্ট হতে শুরু করেছিল। ওরা ধর্মীয় গোঁড়ামি আঁকড়ে ধরেছিলো। দল, মাযহাব ইত্যাদি। আমি তা করিনি। ঐ পয়েন্টে এসে তাই আমাদের পথ আলাদা হয়ে গেছে। কিন্তু অনেক ভালোবাসা ছিল, অনেক। অনেক ছবি, অনেক স্মৃতি ওদের সাথে।

– হুম। ওদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবি মিরাজ আমার পরিচিত। চেনেন?

নাহ, চিনি না। এসবের ভিতরে কিছু নাইরে ভাই। বাইরে দিয়ে অনেক আড়ম্বর, দেখতে শুনতে বিশাল। কিন্তু ভিতরে যদি মানবপ্রেম না থাকে, তবে দিনশেষে সবই শুন্য।

আসলে ইসলাম তো এর সূচনালগ্ন থেকেই একটা বিপ্লবী ধর্ম। আত্মবিপ্লব করাই হলো ইসলাম। “হ্যাঁ, আমি আগে ওমুক মাজহাব অনুসরণ করতাম, আমি ওমুক দল করতাম, আমি ওমুক অন্ধ বিশ্বাসে ছিলাম, আমি আজকে নিজের কাছেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে আত্মবিপ্লব করব। এবং এই আত্মবিপ্লব থেমে থাকবে না। আমৃত্যু চলবে।…”


২৭ নভেম্বর, বেলা একটা।


আপনি বাসায় আসলে সোফায় বসতে দিব। আপনি তখন একগাদা অভিযোগ করবেন। সব গোঁড়া ধার্মিকদের বিরুদ্ধে।

– নাহ, করব না।

ক্যান? এইভাবে মন খুলে কি আর কোনো ধার্মিকের সাথে কথা বলার সুযোগ হবে?
– উঁহু, বলব না। কারণ আপনি তখন সব কেটেকুটে বলবেন, খণ্ডিত!

জ্বী না। যারে ভালোবাসি, তার সাথে ঐসব যুক্তিতর্কের কাটাকুটিতে আমি নাই। তাকে আমি আমার মত করে ভালোবাসব। ভালোবাসাই তাকে পথ দেখাবে। কেননা, মওলানা বলেছেন, If light is in your heart, you will find your way home.


২৭ নভেম্বর, দুপুর দুইটা।


– ধর্মের কাজ কী?

মানুষকে হৃদয়ের জগতে তুলে দেয়া। সেজন্যে তার যত সাধনার দরকার হয়, সেসব সাধনার পথ দেখানো।

– যারা সেসব সাধনা করে না, তাদেরকে মেরে ফেলার নির্দেশ কেন?

কোথায় সে নির্দেশ?

– কোরানে।

কোন আয়াত?

– আচ্ছা। আমার দাগানো আছে। আমি পাঠাবো আপনাকে।

পাঠাতে হবে না। ২:১৯১ আয়াত: “তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা করো।”

– দুঃখিত, আমার এসব মুখস্থ নেই।

আমার আছে ;-)

– ভালো।

আচ্ছা মোর্শেদ?

– জ্বী।

আমরা ঐসব তর্ক না করলেও তো চলে?

– হুম, চলে।

করতে সমস্যা নাই, কিন্তু সেটা যেন আমাদের সুসম্পর্কে ব্যাঘ্যাত না ঘটায়।

– হুম, আপনি মহান, তাই।

মানে?!

– অবশ্যই মহান। নিজেকে না জিতিয়ে বিধানকে জিতাতে চান।

বিধানকে জিতাতে চাইলাম কখন?

– মনে মনে, ভালোবাসা দিয়ে।

তর্কে আমি জিতবোরে ভাই। এবং ফ্যালাসি করে না, বরং সঠিক যুক্তি দিয়েই।

– হুম, জানি।

কিন্তু আমার ভালোবাসাকে আপনি ঐ উদ্দেশ্যে ভাবতেছেন। :-(

– আমি না, আমার ব্রেইন। আজকাল ভালোবাসাকেও ভয় পায়, খুব ভয়।


২৮ নভেম্বর, সকাল।


তোমার মত দুষ্ট বালককে ধারণ করার মত পুরু দেয়াল আমার হৃদয়ে নাই। একটু পরপর তোমার লাগামহীন ব্রেইনের শত প্রশ্নের হাত ছোঁড়াছুঁড়িতে দেয়ালগুলি ভেঙে যাচ্ছে। আমি মেরামত করে নিচ্ছি অবশ্য। তবু মোর্শেদ হৃদয়ে থাকুক।

– হতাশ হবেন। আল্লা বের করে দিছে। আপনি মহান হলেও, মানুষতো!

আল্লাহতে বিশ্বাস করো? বলো, ভাইয়া!

– না। প্রাক্তন প্রেমিকা, স্বীকার করতে নেই।

সব নাস্তিকই কি এমন? জানে, বোঝে, তবুও নাস্তিকতার বেশ ধরে?

– হাহা। আসলে নাস্তিকরা যেমন নাস্তিক না, ধার্মিকরাও তেমন ধার্মিক না।

কারণ কেউ-ই খোদাকে চেনে না, চিনতেও চায় না, নিরপেক্ষ স্রষ্টাভাবনা করে না?

– না। আসলে পিছু হটতে হটতে যখন আটকে যায়, তখন সবটুকুন শক্তি দিয়ে ভালোবাসে নিজেকেই, বাধাগুলো উপড়ে ফেলতে চায় যতটুকু শক্তি আছে, তা দিয়ে।

কেন তুমি নাস্তিকতাকে বেছে নিলে, ভাইয়া?

– দুঃখ থেকেই ভাবনার শুরু। ধার্মিকদেরকে বড় বাধা বলে মনে হয় নিজের কাছে। সবকিছুতেই ওদের বাড়াবাড়ি।

তুমি জানো ভাইয়া, আল্লাহর থেকে দূরে সরে কোথাও যাওয়া যায় না? ওসব মানুষেরা যদি তোমাকে প্রভাবিত করে, তবে শেষমেষ ক্ষতিগ্রস্ত তুমিই হবে। ওরাও যেমন হবে একভাবে, তুমিও তেমনি হবে, শুধু আরেকভাবে। তোমার জীবনের মোড় ঘুরাবার কারণ ওদেরকে হতে দিও না ভাইয়া!

আমার ফেইসবুক ফিড, আর ইউটিউব… এগুলোর আনাচে কানাচে দেখবে এসব ধার্মিকেরা আমার সাথে কী আচরণ করেছে, এখনও করে। কিন্তু আমি ভারসাম্যে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কেউ যখন ভারসাম্যে থাকে, তখন শুধু বাম থেকে আঘাত আসে না; ডান, বাম, সামনে-পিছনে, … সবদিক থেকে আঘাত আসে। একদিকে নাস্তিকরা, আরেকদিকে অজ্ঞেয়বাদীরা, আরেকদিকে শরীয়তবাদী ধার্মিক, আরেকদিকে শরীয়তত্যাগী প্রেমবাদী ধার্মিক... সবার আঘাত চারিদিক থেকে মোকাবিলা করেও নিজের নিরপেক্ষ যাত্রা করে চলেছি… আর সেই যাত্রায়ই পেয়েছি মানবপ্রেম… সেই প্রেমই তোমার সাথে বন্ধুত্বকে সম্ভব করেছে, ভাইয়া!

– আপনি মহান, তাই। অন্যেরা শুধু আগুনের ভয় দ্যাখায়। বাসায় গেলে আম্মুর সামনে খুব নামাজ পড়তে ইচ্ছে করে, পড়তে পারিনা।

আম্মুটা তবুও ভালোবাসে, আম্মুরা তবুও ভালোবাসে…। আল্লাহ আরো মহান… আল্লাহ এখনো পথ চেয়ে আছেন, তুমি ফিরে যাবে তার কাছে।

– আম্মুর কাছে না ফিরলেও আগুনে পোড়াবেনা, তাই ফিরি। ভালবাসা আছে বলে ফিরি।

আমি তোমার কাছে দাওয়াত দিচ্ছি না, নাস্তিকদের মত ওভাবে ভেবো না, কিন্তু আমি যা ভাবছি, তা-ই বলছি। আল্লাহর কাছে ফিরতে কিচ্ছু লাগে না… মায়ের চেয়েও আরো কত, কত বেশি ভালোবাসা আছে সেখানে! সেই সাধনা কিছুটা হলেও করেছি বলে জানি। ঐ উপর থেকে তিনি প্রেম না দিলে আমি কাউকে ভালোবাসতে পারতাম না, ভাই আমার!

– আপনি মহান।

অনেক কিছুই জানেন আপনি।

কিন্তু দিনে পাঁচবার নামাজের নামে তার কাছে আর নমঃনমঃ করা সম্ভব না।

সব কল্পনা

সব মিথ্যা

এখানেই শান্তি

নেই ভাবার মধ্যে।


২৮ নভেম্বর, বেলা এগারোটা।


– কোরানকেই কেন বেছে নিলেন? সর্বশেষ বলে?


আমার খোদা কোরানে সীমাবদ্ধ নন, কোরানের আগেও তিনি খোদা ছিলেন। কোরান যারা পায়নি, তাদের জন্যেও তিনি খোদা। তিনি সবাইকেই ভালোবাসা দেন। কুরআনের ভিতর থেকে আমি খোদাকে বের করিনি, খোদাকে চিনেছি নিজের মত ধ্যান করে…। তারপর সেই খোদা আমাকে চিনিয়েছে কোরান। সেই খোদা যদি কোরান না-ও চিনাতো, তবু আমি তাঁকে চিনেছি, কোরানেরও আগে।

You know what, why do we not have miracles in our lives? Because we are too tired souls, tired minds. We are so afraid to launch a journey into the unknown… We are not adventures. ক্লান্ত মানুষ তার পরিচিত গল্পের ভিতরে আশ্রয় খোঁজে। সে রিস্ক নিতে চায় না, সমাজের দেয়া ধর্মের মাঝে আশ্রয় খোঁজে। কিংবা সেখান থেকে পালাতে গিয়ে আরেক সমাজের দেয়া নাস্তিকতার মাঝে আশ্রয় খোঁজে। নিজের পথকে ক্ষণে ক্ষণে বদলাবার সাহস নিয়ে ক'জন দুনিয়ায় পথ চলে? নাস্তিকেরা যেমন ক্লান্ত মন, তারচেয়ে বেশি ক্লান্ত মন হলো প্রচলিত ধার্মিকেরা, যারা বাপ-দাদার দেখাদেখি ধর্মটাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।

তুমি বলেছিলে, “আল্লা কেন আপনার মত ভালো হয় না”। আপাততঃ এভাবেই চলুক! তারপর কখনো যদি তুমি মাসুদ হয়ে ওঠো, তখন দেখবে তোমার আল্লাহ আরো কত মহান। আর মাসুদ আসলে কতই না পাপী, আর তাকে ক্ষমা করে প্রেম দিয়ে তিনিই ভালোবাসা শিখিয়েছেন!

– এই মুহূর্তে কী বলা উচিত জানি না।


হযরত আলী (রা.) শাসনক্ষমতায় থাকাকালীন এক গভর্নরকে লেখা চিঠিতে বলেছিলেন, “মনে রেখো, তোমার অধীনস্থদের মাঝে দুই ধরণের মানুষ আছে: এক. যারা তোমার সাথে একই ধর্মের অনুসারী, তারা তোমার ভাই, আর দুই. যারা তোমার ধর্মের নয়, তারাও তোমার মতই মানুষ। মানুষের যতরকম দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা আছে, তাদের উভয়েরই সেসব আছে। তারা জেনে-না জেনে কিংবা বোকামী করে পাপ করে, তাদের কর্মের ভয়াবহতা উপলব্ধি না করেই। এই অবস্থা থেকে তাদেরকে উদ্ধার করার জন্য তুমি সেইভাবে দয়া-মায়া করো, যেইভাবে তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার নিজের ক্ষেত্রে দয়া ও ক্ষমা আশা করো।”

আমি মনে করি, এমন সম্পর্ক পৃথিবীর সব মানুষের মাঝে থাকা দরকার, যেখানে ইগো প্রবলেম নাই, জ্ঞান জাহির করার ইস্যু নাই, কিংবা নিজের কোনো ভণ্ড খোলস ধরে থাকবার প্রয়োজন নাই...। তখন আমরা এইভাবে গল্প করতে পারি, একে অপরকে সাহায্য করতে পারি! যখন “আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না যে আপনি ধার্মিক” – এই ভয় থেকে উঠে এসে মানুষটা বলবে,


– ধরেন, আপনি এখন ঘুমাচ্ছেন। ফজরের আজান দিচ্ছে, আমি আপনাকে ডাকতেছি।

কিভাবে ডাকতেছেন?

– ওঠেন, ওঠেন। নামাজ পড়তে হইবোনা?

আচ্ছা, তারপর?

– আপনি উঠবেন, নামাজ পড়বেন। আমি কিন্তু পড়ব না। রাগ করা যাবে না কিন্তু!

হাহাহা। রাগ করব কেন? আমাদের ফ্যামিলি কতটা লিবারেল চিন্তা করতে পারবেন না। প্রত্যেকে চূড়ান্ত ব্যক্তিস্বাধীনতা ভোগ করি আমরা। কখনো পারিবারিক বা সামাজিক চাপে নামাজ-রোজা করিনি। এখন যে করি, সেটাও কোনো চাপ থেকে না।

– আধুনিক মডারেট মুসলিম ফ্যামিলি, হাহাহা।

নিজের মত করে পড়াশুনা করে আমার দার্শনিক যাত্রা আমার হাতে যা তুলে দিয়েছে, সেটাকেই আমি চর্চা করি। একারণে বহুত লেবেলিং ও ট্যাগিং এর শিকার হই। কিন্তু তাতে কী! নিরপেক্ষভাবে আপনমনে দার্শনিক যাত্রা করে সত্য পাবার যে আনন্দ, তার সাথে কোনোকিছুই তুলনীয় নয়। তখন একদম একাকীও থাকা যায়। ঐটাই আমার শক্তির জায়গা। একাকী নাস্তিক/ অ্যাগনস্টিকদের সাথে পার্থক্যটুকু ওখানেই।

– নাস্তিকরাই বরং সবচে’ একা। আপনারতো মওলা পাশে থাকে, আল্লাহ পাশে থাকে। আর নাস্তিক? সেতো একা! আমার মত! সকালের আজানের মত!

তারপর ফজরের আজান হলো। মোর্শেদ বলল, “আজান হচ্ছে। মহৎ হতে ডাকা হচ্ছে।” আমি বললাম, হুম, কিন্তু এগুলো তো আপনার কাছে অসার বস্তু! তবু মোর্শেদ কাঁদলো। মেসেঞ্জারের টেক্সট আর ইমোটিকন ছাপিয়ে সেই অশ্রু আমাকেও স্পর্শ করলো। আমি নামাজে দাঁড়ালাম। আমিও কাঁদলাম। আমার কাঁদবার জায়গা কেবল ওখানেই।


মাসুদের বাসায়

টানা দুইদিন মেসেঞ্জারে কথা বলার পর ভোরবেলা মোর্শেদ বাসায় এলো দেখা করার জন্য। সিকিউরিটিতে কল দিয়ে বললাম, আমার গেস্ট, উপরে এনে দিন। সেইমতো মোর্শেদকে দরজা পর্যন্ত দিয়ে গেল। দরজা খুলে মোর্শেদকে রুমে নিয়ে আসলাম। ফেইসবুকের ওপারের মানুষটা জীবন্ত হয়ে উঠল।

আমি তাকালাম। আমার চেয়েও শুকনা, টিঙটিঙে স্বাস্থ্যের একটা ছেলে। সবুজ পাঞ্জাবীর হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো: এটাই হালের ফ্যাশন। আমি মোর্শেদকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। আমরা ‘ইসলামিক’ লোকজন কোলাকুলি করায় খুব অভ্যস্থ, কিন্তু এর বাইরের মানুষেরা বোধহয় এই সৌন্দর্য থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। আমার আলিঙ্গনে মোর্শেদ হতবিহবল, কিছুই বলতে পারছে না, কেবলই ঢোক গিলছে। কিন্তু আমি জানি ওর ভিতরে কী চলছে! আর তারচেয়েও বেশি জানে আমার ক্বলব। আমি মোর্শেদকে কখনোই ইসলামের দাওয়াত দেই নাই, মোর্শেদ এখনও নাস্তিক এবং আমি তাকে সেভাবেই স্নেহ করি, ভালোবাসি, কিন্তু যখন একজন নাস্তিক আজান শুনে কাঁদে, বলে, নামাজ পড়তে খুব ইচ্ছা করে কিন্তু পারি না, তাই শুনে অপরপাশে একজন মুসলিমও কাঁদে – সম্ভবতঃ ওপারে খোদাও তখন কেঁদে ওঠেন। আর তাতে পৃথিবীর বাঁধগুলো সব ভেঙে যায়।

কারো ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি তাকে দেয়া উচিত নয়, আমি মোর্শেদকে ছেড়ে দিলাম। আমার সুইভেল চেয়ারটায় বসতে দিলাম, আর আমি পিছনে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাইরে সূর্যটা তখনো ঠিকমত উঠে সারেনি, শীতের প্রথম ঘন কুয়াশা পড়েছে সেদিন। এর মাঝে মোর্শেদ এতদূর হেঁটে এসেছে। হজ্জ্বে নাকি হেঁটে যেতে হয়।

“কানদুটো ঠাণ্ডা হয়ে আছে, শীতের কাপড় পরোনি কেন? সকালে কিছু খেয়েছিলে? চুল পেকেছে কিভাবে? এই বয়সেই চুল পেকে গেল?” দ্রুত কথা বলি আমি, আর বেশি কথা বলার অভ্যাস। কিন্তু আমি যত কথাই বলি, মোর্শেদ কেবল মাথা নেড়ে নীরবে উত্তর দেয়। ফেইসবুকে আর মেসেঞ্জারে যে মানুষটা এত ‘ইন্টেলেকচুয়াল’, এত কথা বলে, বাস্তবে সে যেন একেবারেই ভিন্ন এক প্রাণী! আমি আর অনুভূতির বোঝা না চাপিয়ে চুপ করলাম, ওকে দম নেবার সুযোগ দিলাম। চেয়ার থেকে উঠে মোর্শেদ শুধু বলল, “শোবো।”

আমার শোবার জায়গায় একটা খেজুর পাতার পাটি বিছানো আছে, আর একটা কাঁথা আছে। কিন্তু এতেই মোর্শেদের শোবার খুব ইচ্ছা, মেসেজে বলেছিল। তখন আমি বলেছিলাম, অভ্যাস না থাকলে কষ্ট হবে, পাটির বুননের দড়িগুলোতে গায়ে ব্যথা করবে, কিন্তু “নাস্তিকেরা কারো কথা শোনে না” – মোর্শেদ সেখানেই শু’লো। তারপর ওর কানে আমি ফিসফিস করে বলে দিলাম ঘুমের রহস্য!

মোর্শেদের দৃষ্টিতে যেই কুরআন ও ইসলাম অমানবিক, সেই ‘অমানবিক’ ধর্মের অনুসারী আমি, তা জেনেও মোর্শেদ আসলো, বসলো, শু’লো, ঘুমালো। মায়ের কোলে ঘুমালে মানুষের চেহারায় যেমন প্রশান্তির ছাপ লেগে থাকে, তেমন প্রশান্তি সহকারে! আমি পাশটিতে বসে সেই চেহারা চেয়ে চেয়ে দেখলাম। যেই মহান রব্বুল আলামিনের দেয়া রিজিক প্রতি মুহুর্তে আমরা আস্তিক-নাস্তিক সবাই ভোগ করছি, সেই তিনি তো নাস্তিকের অক্সিজেন কেড়ে নিচ্ছেন না! সৃষ্টিজগতের প্রতিটা অনু-পরমাণুর উপরে তো তাঁর সুপ্রিম কমান্ড! তিনি তো অক্সিজেনকে আদেশ করছেন না যে, নাস্তিকের ফুসফুসে তুমি প্রবেশ কোরো না, তুমি থেমে যাও! রহমান রহিম খোদাতায়ালা যখন এতকিছুর পরেও সৃষ্টিজগতের সবাইকেই এত বেশি দিতে পারেন, তখন নিজেকে তাঁর দেয়া বিধানের অনুসারী দাবী করতে লজ্জা হয়, যখন আমার মাঝে মানুষ অনুরূপ আচরণ খুঁজে পায় না! যখন আমি আল্লাহর রঙে রঙিন হই না, দুনিয়ার জীবনেই বেহেশতের রঙে জীবন রাঙাই না! লজ্জা আমার জন্যে!

মোর্শেদ দীর্ঘক্ষণ ঘুমালো। দুইদিনের না ঘুমানো ক্লান্ত দেহমন। আমি বসে রইলাম। আমিও দুইদিন জেগে আছি, তবে আমার ঘুম নাহয় পরে হবে, মোর্শেদ ঘুমাক আগে! তারপর বিকেল হলে খাবার এনে ডাকলাম। একসাথে খেলাম। আল্লাহর দেয়া রিজিক, দুইজনই খাচ্ছি। একজন আল্লাহকে মুখে অস্বীকার করে অবাধ্য, আর অপরজন মুখে স্বীকার করেও কতভাবেই না আল্লাহর অবাধ্য! অথচ তাঁর কতই না প্রেম, তিনি কারো রিজিক বন্ধ করেন না।

খাওয়া শেষ হলে মজা করে বললাম, খাওয়ার পর পাঁচ মিনিট বসতে হয়, এটা সুন্নত। “নাস্তিককে সুন্নত পালন করতে বলা?” মোর্শেদ হাসল। আমিও হাসলাম। তারপর সোফায় বসলাম। আমার এক গুরুর একটা বাণী উপহার দিয়েছিলাম সেদিনই; সেটা বুকে নিয়ে, আর আমার অপর এক গুরুর ছবি হাতে নিয়ে মোর্শেদ সোফায় বসল। নাস্তিকের হাতে সেই পীরের ছবি দেখলে “নাস্তিক সমাজ” ওকে বহিষ্কার করবে, কিংবা নাস্তিককে আশ্রয় দেবার কারণে “ধার্মিক সমাজ” বহিষ্কার করবে আমাকে – কিন্তু আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। “খোদাতায়ালা তো কারো রিজিক বন্ধ করেন না!” কতটা প্রেমময় হলে এটা সম্ভব? মানবজাতির আর কত ক্ষতি হলে ‘পর আমরা সিবগাতুল্লাহ অর্জনের গুরুত্ব বুঝবো? আর কত?

মোর্শেদ সোফায় চুপচাপ বসে আছে, আমিও বসে আছি। আমার গুরুর ছবি আমি চোখ বুঁজলে দেখি, আর মোর্শেদ দেখছে চোখ খুলে, পার্থক্য কেবল এটুকুই। দেখুক! কিন্তু এই দেখাটাতো চোখের কাজ নয়, ওটা যে হৃদয়ের কাজ! চোখ তার ক্ষমতার বৃত্তের শেষ সীমা স্পর্শ করে ফেলবে, ক্লান্ত হয়ে যাবে, বুঁজে আসবে – আমি জানি! মোর্শেদ ঘুমিয়ে গেলো। তারপর সোফায় বসে থেকেই কখনো আমার কাঁধে মাথা রেখে, কখনো গলা জড়িয়ে ধরে মোর্শেদ ঘুমাতে লাগল। নীরবতার জগতে যে অনবদ্য গল্প খোদাতায়ালা রচনা করছিলেন, আমি তার সাক্ষী হয়ে রইলাম।

সেদিন রাতে বাসায় ফিরে মোর্শেদ আরো ঘুমাল। সারারাত। ব্রেইনকে বিশ্রামে পাঠিয়ে হৃদয়ের জগতে কতটা পথ পাড়ি দিয়েছে সে কে জানে! পরদিন সকালে আমি একটা মেসেজ পেলাম:

– আজকের রাতটা কেমন যেন প্রশান্তিতে কেটেছে।


মোর্শেদের বাসায়

ঘটনাক্রমে তার পরেরদিনই আমাকে একটা কাজে ঐদিকে যেতে হবে, যেখানে মোর্শেদ থাকে। মোর্শেদকে জানালাম, আমি দেখা করব। সাততলার উপরে বাসা, দুই বন্ধু ভাড়া নিয়ে থাকে। বন্ধুটি কওমী মাদ্রাসা থেকে পাশ করা, সে আরো বড় নাস্তিক। এসবই আমি আগে শুনেছিলাম মোর্শেদের কাছে।

আমি রাস্তাঘাট ভালো চিনি না কখনোই। তবে মোটামুটি খোঁজাখুঁজি করে বাসাটা পেয়ে গেলাম। গেটের কাছে এক টিংটিঙে শুকনা দারোয়ান বসে আছে। দাড়ি নাই, তবে গোঁফ রেখেছে ভালো। “নাস্তিকদের অদৃশ্য প্রভাবে কি দারোয়ান বেচারাও দাড়িবিরোধী হয়ে উঠেছে?” দেখা হলে মোর্শেদকে এমন কিছু বলব বলে ভাবছি, এমন সময় দারোয়ান মহা চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। আমাকে সে ঢুকতে দেবে না। আমার চুল-দাড়ির আকার-আকৃতি দেখেই তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া কিনা, কে জানে। এখন কী করব? বললাম, আমি ওমুক ভার্সিটির ছাত্র, এখানে আমার জুনিয়রের সাথে দেখা করতে এসেছি। কোনো কাজ হলো না। ভাবলাম, বাংলাদেশের নামকরা ভার্সিটির পরিচয়ে কাজ হয় না, তাহলে কি ISIC কার্ড বের করে দেখাবো? পরে ভাবলাম, থাক, ঐ আইডি কার্ডও তো সে চিনবে না। অগত্যা মোর্শেদকে কল দিতে হল। মোর্শেদ এসে আমাকে উপরে নিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে শুনলাম, বুড়ো লোকটা রাগে গজগজ করছে। এই মানুষের সাথে ইন্টেলেকচুয়াল তর্ক বিতর্কে কাজ হবে না, কিন্তু ভালোবাসার ভাষাটা সবাই-ই বোঝে, সেই ভাবনায় আমি উপরে উঠতে লাগলাম।

রুমে ঢুকতেই দেখি, এই শীতের মাঝেও ঘরটা বেশ গরম। উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করতেই মোর্শেদ রুমের সংলগ্ন কিচেনে চলে গেল। ওকে অনুসরণ করে ঢুকে দেখি সেখানে চুলা অন করে রাখা। বললাম, “আরে ধুর, এ করেছ কী! গ্যাস অপচয় হচ্ছে, বন্ধ করো।” মোর্শেদ দুর্বলভাবে হাসে। আমি কপট রাগ করি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভালোবাসাটা ঠিকই অনুভব করি: মোর্শেদ জানে যে কন্ট্রোলড টেম্পারেচারে না থাকলে আমি অসুস্থ হয়ে যাই, আমার রুমে ভারী কার্পেট, পর্দা, হিটিং সিস্টেম – এগুলো সে দেখে গিয়েছে। আমি আসব বলে রুম গুছিয়ে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে তারপর নিশ্চয়ই ভেবে ভেবে বের করেছে, আর কী কী বিষয় হলে আমার কোনো কষ্ট হবে না! তাই ঘরটা গরম করতে এই বুদ্ধি করেছে।

তখনও দিনের আলো ঘরে পুরোপুরি প্রবেশ করেনি। রুমের দিকে তাকালাম আমি। একপাশে শোবার ব্যবস্থা, আরেকপাশে একটা টেবিল। সেখানে একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার রাখা। স্ক্রিনের দিকে একঝলক তাকিয়েই দেখলাম, ওয়ালপেপারে আমার গুরুর বাণী দিয়ে রেখেছে। তাই দেখে বললাম, “সেকি, তুমি গুরুর বাণী দিয়ে রেখেছ? আমি কি তাহলে তোমাকে ব্রেইনওয়াশ করে ফেললাম? না না, এ হতে দেয়া যায় না। তুমি একজন মুক্তমনা, তুমি কেন এই মোমিনের গুরুর কথা ডেস্কটপে দিয়ে রাখবে?” মোর্শেদ হাসে। আমিও হাসি। আমার মনে হয়, অলক্ষ্যে খোদাও তখন স্মিত হাসেন!

এরপর মোর্শেদের সাথে বসে আমার তর্ক-বিতর্ক হলো। আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক। কিন্তু সে বিতর্কে কোনো মারামারি নেই, উত্তেজনা নেই, আঘাত নেই… হাসতে হাসতে বিতর্ক! মোর্শেদ যখনই একটা নাস্তিক/ অ্যাগনস্টিক আর্গুমেন্ট বলা শুরু করে, আমি ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বাকীটুকু বলে দিই। কিংবা “ধর্ম ও বিজ্ঞান” বিতর্ক তোলার চেষ্টা করলে আমিই গড অব দ্য গ্যাপস থিয়োরী বলে দিই। মোর্শেদ আবারো হাসে। আমি বলি, কেন, তুমি গড অব দ্য গ্যাপস থিয়োরী জানতে না আগে? মাথা নেড়ে না বলে মোর্শেদ। আমি বলি, তাইলে কিসের নাস্তিক হইলা? একটু শিখো আমার কাছ থেকে, বুচ্ছো? নাস্তিক হতে চাইলেও আমার কাছে শিখো।

মোর্শেদ তখন বেশ করে হেসে দেয়। আমিও হাহাহা করে হেসে উঠি। আর মনে মনে আফসোস করি, আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কে যারা কিবোর্ডে ঝড় তুলে ফেলছে, তারা যদি বিতর্কগুলি এভাবে করত! মনে হয় পৃথিবীটা ঐদিনই আরেকটু সুন্দর হয়ে যেত!

তারপর অনেক্ষণ চললো “মোমিন মুসল্মান” ও “নিরপেক্ষ নাস্তিকের” এই বিতর্ক। বিতর্কে আমি হারি না, কারণ আমি শুধুমাত্র সেই বিতর্কই করি যেখানে আমি নিশ্চিত জিতব; আর নাস্তিকতার বিপরীতে বিতর্কে তো আমি জিতবোই, যুক্তিবিদ্যার সেই জ্ঞান অধিকাংশ নাস্তিকের চেয়ে আমার ঢের বেশি – কিন্তু মোর্শেদ জিতে গেল। কারণ মোর্শেদ যে হাসতে জানে! যুক্তিতে না পারলেও হাসি দিয়ে ও জিতে গেল। আর দিনশেষে একটা মানুষের হৃদয় জয় করতে পারার চেয়ে বড় অর্জন আর নাই।

অনেক্ষণ বিপুল বিক্রমে আস্তিক-নাস্তিক ‘মারামারি’ করে দুজনই ক্লান্ত। আমি বললাম, “খিদে লাগসে।”

– সকালে কী খেয়েছেন?

কিছু না। জাস্ট একটু মধু খেয়েছি।

– মধু খাওয়া সুন্নত।

এই বলে মোর্শেদ হাসি দেয়। আমিও হাসি। সুন্নত সম্পর্কে মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ‘নাস্তিক’ আমার চেয়ে অনেক বেশিই জানে। তবু এটা লিখবার মত গল্প এই কারণে যে, দুই বিপরীত মেরুর দুই মানুষ আমরা পাশাপাশি বসে হাসতে শিখে গেছি।

“আপনি একটু রেস্ট নেন, আর আমি বাজারটা করে আসি” – মোর্শেদ বলল। সে নিজে রেঁধে খাওয়াবে আমাকে, তাই। বসে থেকে কী করব, আমিও উঠলাম বাজার করতে। সুপারশপ থেকে চিকেন আর সালাদের যতরকম উপকরণ নিয়ে আসলাম। সাততলা পর্যন্ত হেঁটে উঠে দুজনই ক্লান্ত। বালিশে হেলান দিয়ে রেস্ট নিতে নিতে টুকটাক কথা বলছিলাম, মোর্শেদ ঘুমিয়ে গেল। এ ঘুমের রহস্য আমি জানি।

এদিকে বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে, বাজার আনা হয়েছে অনেক্ষণ হলো, রান্না করতে হবে যে! আমার গলার উপর থেকে মোর্শেদের হাতটা আলতো করে সরিয়ে আমি উঠলাম। কিচেনে ঢুকলাম। কিচেন অ্যাপ্লায়েন্স বলতে তেমন কিছুই নেই: মাংস কাটার একটা চাপাতি, আর একটা কাটিং ম্যাট। তাই দিয়ে মুরগি কেটে তেল-মশলা সব রেডি করে চাপাতি দিয়ে অদ্ভুতভাবে পিঁয়াজ কাটছি, এমন সময় মোর্শেদ এসে হাজির। তার ঘুম ভেঙে গেছে। চাপাতিটা কাটিং ম্যাটের উপর রেখে আমি দুর্বলভাবে হাসলাম: ধরা পড়ে গেছি। কারণ, রান্না তো মোর্শেদের করবার কথা, আমি তার মেহমান। দুইহাতে আমার গলা চেপে ধরে গোটা কতক ঝাঁকি দিয়ে বলল, এত ভালো ক্যান আপনি? মেরে ফেলতে ইচ্ছা করে।

বললাম, অসুবিধা কী, মেরে ফেল! মরে গেলে তো বেঁচে গেলাম। পরদিন পত্রিকায় নিউজ হবে: নাস্তিকের ভালোবাসার চাপে ধার্মিক নিহত, হা হা হা। তারপর পিঁয়াজ কাটার জন্য চাপাতিটা আবার হাতে নিয়েছি, মোর্শেদ সেটা কেড়ে নিয়ে আমাকে সরিয়ে দিয়ে বলল, একদম এই চাপাতি দিয়ে মেরে ফেলব। বললাম, তাহলেতো আরো ভালো, পত্রিকায় নিউজ হবে: নাস্তিকের চাপাতির কোপে মুসলিম নিহত! হাহাহা…।

তারপর রান্না হলো। আমরা খেতে বসলাম। আমি বিসমিল্লাহ বলে খেলাম, আর মোর্শেদ বিসমিল্লাহ ছাড়া। আল্লাহরই দেয়া রিজিক, আলহামদুলিল্লাহ! সীমার উর্ধ্ব, প্রকৃত অসীম মহান আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসার একটুখানি চর্চা করে আমরা দুনিয়ার জমিনে বেহেশতের রঙ নিয়ে আসলাম। তবে সেটা কেউ জানলো না, কোনো পত্রিকায় নিউজ হলো না। হয়ত দু’জনের একজন চাপাতির কোপে নিহত হলে সেটা নিউজ হত। কারণ সাংবাদিকতায় বলে, Bad news is the good news, আর তাই এই গল্পটি কোনো পত্রিকায় জায়গা করে নিলো না।

খাওয়া শেষে প্লেট ধুয়ে রুমে এলাম। মোর্শেদের টেবিলে জার্মান-রাশান যত নাস্তিক্যবাদী গ্রন্থ, বাদ যায়নি দুই বাংলার খ্যাতনামা নাস্তিকেরাও। ইলেকট্রিকাল এঞ্জিনিয়ারিঙের বইও আছে, তবে তুলনায় তার সংখ্যা কম। বইগুলোর দিকে একঝলক তাকিয়ে বললাম, “হুম… প্রগতিশীল!” তাই শুনে মোর্শেদ হাসে। আর আমি একটা একটা করে বইয়ের নাম দেখি। আর বলি, এইটা ওমুক বিষয়ের বই, এই বইয়ের মূলকথা এই, এটাতো আমি সেই কবেই ছোটবেলায় শেষ করে এসেছি, এইটা হলো বিপ্লবের হ্যান ত্যান কথা বলে শুধুই বাগাড়ম্বর, সারবস্তু ভিতরে কিচ্ছু নাই, এইটা হলো মানবতার ছদ্মবেশে নাস্তিকতা…। মোর্শেদ হাসে, আর বলে, “আর আপনার বইটাই শুধু নিরপেক্ষ, না? ইসলামের পক্ষে গেলেই সেটা নিরপেক্ষ, না?” তখন আমিও হাসি।

মোর্শেদের টেবিলে অনেক বই। সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবাধিকার, ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন টপিকের বই। আমার মনের ব্যাকুল প্রত্যাশা যে, যেই কুরআনকে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে শত বইয়ে মোর্শেদের টেবিল ভরে উঠেছে, সেই কুরআনকে ও আবারও বুকে তুলে নেবে। ওর গোটা লাইব্রেরীর সকল বই ফেলে দিয়ে সেখানে শুধু একটি বই রাখবে: আল কুরআন। কেননা, এটি সেই গ্রন্থ, যার ভিতরে সকল কিছু আছে। পৃথিবীর সকল লাইব্রেরী এর মাঝে আছে। এটি যে স্বয়ং জ্ঞানের উৎস থেকে আগত!

মোর্শেদ আমার সাথে অকপট, আমি অকপট মোর্শেদের সাথে। আমার মনে যা আসে, তা-ই আমি বলে দিই। বলে মোর্শেদও। ওর পছন্দের বই বলে কোনো বইয়ের সমালোচনা করতে আমি ছাড়ি না। কিংবা মুসলমানদের কালিমালিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরে তা নিয়ে আমাকে খোঁচা দিতেও মোর্শেদ ছাড়ে না। আমি সরাসরিই বলি, না, তোমাকে ইসলামের দিকে ডাকা আমার কাজও নয়, এবং সেই চেষ্টা আমি করিও না। বইগুলো দেখিয়ে বললাম, এইযে এতকিছু দেখছ না? যত বড় লেখকই হোক আর যত বিশাল টপিকই হোক না কেন, এর সবই হলো ইন্টেলেক্ট এর জগতে। হাত দিয়ে টেবিলে একটা বৃত্ত আঁকার মত করে দেখালাম। তারপর বললাম, কিন্তু আমি তোমাকে এর উপরের স্তরে নিয়ে এসেছি। I don’t invite you to God, but ইনফিনিটি বলে যে একটা ব্যাপার আছে, তাঁর সাথে যে সংযুক্ত হওয়া যায়, প্যারালেল ইউনিভার্সে যে মানুষ বিচরণ করতে পারে, হৃদয়ের জগতে কথা বলতে পারে – আমি তোমাকে সেই জগতে নিয়ে এসেছি মোর্শেদ! ইন্টেলেক্টের ঐ ক্ষুদ্র জগতে তুমি আর বন্দী থেকো না। এইযে এতসব বই – এর অনেকগুলো আমি ছোটবেলায় শেষ করে এসেছি। যদি পৃথিবীর সব বইও শেষ করেও ফেলি, তবুও সেটা ইন্টেলেক্টের জগতের ক্ষুদ্র গণ্ডিতেই। আমি তোমাকে ক্বলবের জগত চিনিয়ে দিয়েছি, তুমি একে উপেক্ষা কোরো না মোর্শেদ!

এরপর আসরের আজান হলো। আস্তে করে মোর্শেদকে বললাম, আমার একটু নামাজের ব্যবস্থা করো। আমি ওজু করে এলাম, মোর্শেদ উঠে জায়নামাজ খুঁজল। তার রুমে নেই, পাশের রুমেও নেই – কেউ নামাজ পড়ে না। তখন আমি বললাম, সমস্যা নেই, এই মেঝেটার ধুলোবালি একটু পরিষ্কার করে নিলেই নামাজ পড়া যাবে। তখন মোর্শেদ নিজের জামা দিয়ে মেঝেটা মুছে দিল। আমাকে বলল, পশ্চিম এইদিকে। আমি কি বের হয়ে যাব? আমি বললাম, না, সমস্যা নেই, তুমি থাকো।

তারপর আমি নামাজে দাঁড়ালাম। আস্তিকের নামাজের জন্য নাস্তিক তার নিজের জামা দিয়ে মেঝে মুছে দিলো, তাই দেখে খোদাতায়ালা হাসলেন। তিনি নাস্তিককে ভালোবাসলেন।


তারপর…

তারপর মোর্শেদের গল্প চলতে লাগলো। তার সবটা বলতে গেলেতো আলাদা বই রচনা করতে হবে। আর সেটা আমি চাই-ও না। আস্তিক হোক, নাস্তিক হোক, আমার বন্ধু আমারই, সে গল্প আমার নিজের হয়ে থাকুক। তবে আমি মোর্শেদের গল্পের কেবল সেটুকু বলে যেতে চাই, যেটুকু এই বইয়ের সাথে জড়িয়ে গেছে!

মোর্শেদ আমাকে উৎসাহ দেয়। বলে, উঁহু, আপনার অত তাড়াতাড়ি মরা যাবে না। অনেক বই লিখা বাকি, অনেক ভালবাসা দেয়া বাকি। চারিদিকে বড্ড অন্ধকার যে! আলো জ্বালবে কে, আপনি না থাকলে!

আমি মনে করি, এটা একটা অর্জন। আমি আস্তিক-নাস্তিক রেসলিং শো খেলে আপনাদেরকে হাততালি এনে দেইনি, কিন্তু একটা অনন্য গল্প উপহার দিতে পেরেছি। এটা আমার অর্জন, আমাদের অর্জন, ইসলামের অর্জন।

আমি জানি না পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো এমনটা হয়েছে কিনা, তবে নাস্তিকতার যুক্তিখণ্ডন করে সম্ভবতঃ এটাই প্রথম বই, যার জন্য একজন নাস্তিক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে। পরিচয় হবার পর থেকে এমনকি আজকে পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই মোর্শেদ খোঁজ নিয়েছে, বই লেখার কতদূর হলো? পাবলিশারের সাথে দেখা করে আসার পর জিজ্ঞাসা করেছে, বই প্রকাশ হবে কি? এইভাবে মোর্শেদ অপেক্ষা করেছে। মোর্শেদ জানে না এই বইয়ে কী লেখা হচ্ছে, কিন্তু আমার ইন্টেলেক্ট এর উপর ওর আস্থা আছে, আর সেইসাথে আশা আছে যে, এই বইটি নিছক যুক্তিতর্কেরও ঊর্ধ্বে উঠে প্রেমময় হবে!

মোর্শেদ জানে এই বই তার বিশ্বাসের প্রাসাদকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে! তবু সে অপেক্ষা করেছে। কারণ নাস্তিকতার প্রাসাদ ভেঙে যায় যাক, এই বই তাকে হৃদয়ের প্রাসাদে পৌঁছে দেবে। সেইজন্যে সে নাস্তিকতাকে বিসর্জন দিতে রাজি আছে। আমি মনে করি, এটা বিশাল এক অর্জন। এ নিয়ে হয়ত দুনিয়ার পত্রপত্রিকায় নিউজ হবে না, কিন্তু ঐ ঊর্ধ্বলোকে ফেরেশতাদের জগতে নিশ্চয়ই খোদাতায়ালা গল্পটি ছেপে দিয়েছেন!

আমরা মুসলিম, আমরা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর অনুসারী। তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, ছিলেন সর্বোচ্চ প্রেমময়। আল্লাহ তায়ালার পরে সকল জ্ঞান ও রহস্যের ভাণ্ডার তিনিই। রহমান রহীম আল্লাহর পরে সর্বোচ্চ প্রেমময় ও দয়ালু তিনিই: তিনিই রহমাতুললিল আলামিন। সেই হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর অনুসারী হিসেবে আমরা কতটুকু জ্ঞানী? কতটুকু প্রেমময়? উম্মতে মুহাম্মদীকে একইসাথে জ্ঞানের জগতের সর্বোচ্চ শিখরে উঠতে হবে, সেইসাথে এতটা প্রেমময় হতে হবে, যা মানবজাতির ইতিহাসে আর কোথাও দেখা যায়নি।

যুক্তি ও দর্শনের দৃঢ় ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আমরা প্রেমময় হব। আমাদের বিল্ডিঙের ভিত্তি হবে খুব মজবুত। কিন্তু সে ভিত্তিটা থাকবে মাটির নিচে, উপরে থাকবে মানবজাতির আশ্রয়-গৃহ। চারিদিকে যখন দুঃখ-কষ্ট, অশান্তি আর অবিচার-অনাচারের ঘুর্ণিঝড় চলবে, তখন আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে এখানে এসে আশ্রয় পাবে: এইখানে, এই হৃদয়ে, মুমিনের ক্বলবে! We can, and we sure will win arguments, but we have not come to win arguments, we have come to win hearts. আমরা জয়ী হতে জানি, কিন্তু আমরা জয়ী হতে আসিনি। আমরা জয় করতে এসেছি। হযরত মুহাম্মদ (সা.) সত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত, তাই তিনি সদা জয়ী, কিন্তু তিনি জয় করতে এসেছেন, তিনি মানব হৃদয়কে জয় করেছেন। আমরা তাঁর অনুসারী, আমরা কেন তা পারব না? তাঁর মত অতটা না পারি, কিন্তু অন্ততঃ একটা হৃদয়কেও কি জয় করব না?

একজন নাস্তিক যদি আমার লেখা বইয়ের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে পারে, তবে কেন বিশ্বের সকল নাস্তিক কুরআনের জন্য অপেক্ষা করতে পারে না? নিশ্চয়ই আমরা মুসলমানরাই এর জন্যে দায়ী। কেননা, আমরা প্রেমময় হতে পারিনি। তাই স্রষ্টায় অবিশ্বাসীরা আমাদের মুসলমানদের মাঝেই চলাফেরা করেছে, কিন্তু আমাদের প্রেমে তারা পড়েনি। আমাদেরকে উন্মোচনের নেশায় মত্ত হয়নি; ভাবতে বাধ্য হয়নি যে, কিসে মুসলমানদের এত প্রেমময় করল? এমন ভাবনা থেকে কুরআনের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেনি।

রাসুল (সা.) এর কুরআন তেলাওয়াত কাফিররা চুরি করে শুনতো, আর একে অপরের কাছে ধরা পড়ে ওয়াদা করত যে আর শুনতে আসবে না, কিন্তু ঠিকই পরদিন আবার যেত। আমরা খুব গর্ব করে সেই ইতিহাস প্রচার করি, অথচ সেই একই কুরআন তো আজ আমরাও তেলাওয়াত করি, কিন্তু কই, নাস্তিকরা তো তা চুরি করে শুনতে আসে না! আমাদের ওয়াজ মাহফিল, আমাদের জুমার খুতবা তো লুকিয়ে শোনে না! কারণ আমরা ক্বলবের জগতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে দুনিয়াবী ইসলাম নিয়ে পথ চলছি। অথচ হৃদয়ের আলাদা ভাষা আছে। রাসুল (সা.) এর মুখে উচ্চারিত কুরআন তাদের মস্তিষ্ককে স্তম্ভিত করে দিত, কিন্তু তাঁর ক্বলব ওদেরকে চুম্বকের মত টানতো। ব্রেইনের খেলা খেলে আপনি জয়ী হতে পারবেন, কিন্তু জয় করতে পারবেন হৃদয় দিয়ে। উম্মতে মুহাম্মদী হিসেবে লাগামহীন ব্রেইনগুলোকে সত্যদর্শন ও দৃঢ় যুক্তির পথ দেখানোর কথা ছিলো আমাদের, একইসাথে অশান্ত হৃদয়গুলোকে প্রশান্ত করবার কথা ছিল। ইয়া আল্লাহ! আপনার হাবীবের সামনে আমরা কিভাবে মুখ দেখাবো! আমাদের ক্ষমা করুন, আমরা অনেক বড় জুলুম করে ফেলেছি।


সেজন্যে বিশ্বের সকল মানবের কাছে মুসলমানদের পক্ষ থেকে আমি করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি।


বই: ধার্মিকদের প্রতিক্রিয়া

এই বইটা অনেকটাই এলোমেলোভাবে লিখিত হয়েছে। লেখা শেষ হবার আগে আমি কখনো তা প্রকাশ করি না, কিন্তু এই বইটা ব্যতিক্রম। তবে সেজন্যে আল্লাহকে ধন্যবাদ, নতুবা মোর্শেদের গল্প হয়ত কখনোই রচিত হত না! এই মুহুর্তে, এখনও বইটা লেখা শেষ হয়নি, অথচ ইতিমধ্যেই ফেইসবুকে এটার প্রমোশন করা হয়ে গিয়েছে। ইন্ডিয়া থেকে এক প্রিয় ভাই ইভেন্টটা প্রমোট করে দিলেন। ব্যস, শুরু হলো প্রতিক্রিয়া। ফেইসবুক ইভেন্টে বইয়ের প্রথম পর্বটি তুলে দেয়া ছিলো: উৎসের সন্ধানে। আর সেটার একদম শেষেই লিখেছি: কোনো বিশেষ ধর্মের পক্ষেও নয়, বিপক্ষেও নয়; বরং নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মানবমনে “স্রষ্টাভাবনা” কেমন হতে পারে, সেটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এই বইয়ে।

ব্যস, আর যায় কোথায়। শুরু হয়ে গেল কমেন্টে ‘ধার্মিকদের’ প্রতিক্রিয়া!



হারামজাদা! নাস্তিকতার নতুন ভোল ধরে নাম রেখেছিস “নিরপেক্ষ”? তোর জন্মের পর তোর কানে কি আজান শুনিয়েছিল কেউ? যদি শুনিয়ে থাকে তবে তোর লাশের জানাজা পড়ার আজান ছিল ওটা। তোকে ধর্মের কথা শুনিয়ে লাভ নেই। তুই চুলোয় যা।


নওমুসলিম, নাকি কাদিয়ানী?


নাস্তিকতা ছাড়া কিছুই না।


আমি আপনার ধর্মীয় অবস্থান জানতে চাচ্ছি।


স্রষ্টাকে নিয়ে না ভেবে সৃষ্টিকে নিয়ে ভাবুন, তাহলে ঈমান মজবুত হবে।


বই বিক্রি বাড়ানোর জন্য ধর্ম আর নারী নিয়ে বাড়াবাড়ি মূর্খ জ্ঞানীদের পুরাতন ধান্দা।


মহান আল্লাহ যার জন্য জাহান্নাম বরাদ্দ করেছেন সেতো মহান স্রষ্টাকে চিনবে না, এটাই নিয়তি।


স্রষ্টার সৃষ্টি সম্পর্কে ভাবলে আপনার ঈমান বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু যদি আপনি স্রষ্টা সম্পর্কে চিন্তা করতে চান, তাহলে আপনি হয়ে যাবেন পাগল। যুক্তি দিয়ে কখনো স্রষ্টার বিচার করতে যাবেন না, বুঝলেন নাস্তিকের বাচ্চা? (পেইজ থেকে কমেন্টের রিপ্লাইয়ে সালাম দেবার পর–) আরে রাখ বেটা তোর মিষ্টি কথা। শয়তানও খুব বড় পণ্ডিত ছিল, তারপর ধ্বংস হল। সেও সুকৌশলে আদম সন্তানকে ধোঁকা দিছে, আর তোরা হইলি সেই শয়তানের বংশধর। U r son of devil.


কোনো যুক্তি ছাড়াই আল্লাহকে বিশ্বাস করি। কুরআন হাদীসের কথা বিশ্বাস করি, মেনে চলার চেষ্টা করি। (কমেন্টের রিপ্লাইয়ে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ সংক্রান্ত আয়াতের রেফারেন্স দেবার পর–) বেশি যুক্তি দেখাতে গিয়ে নাস্তিক হবার সম্ভাবনা হতে পারে। (জিজ্ঞাসা করলাম, একথা কি কুরআনে আছে? উত্তর–) না।


কাহিনী হলো, কিছু ছুপা নাস্তিক আছে, এরা সরাসরি নিজেদেরকে নাস্তিক বলে না। তারা ইনিয়ে বিনিয়ে নাস্তিকতার দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। … এই বইটা হয়ত বুঝাবে যে, নাস্তিকের মতবাদও ঠিকাছে, আস্তিকের মতবাদও ঠিকাছে, অতএব আমরা মিলেমিশে চলি।


তাক্বদীর সম্পর্কে কুরআন ও হাদীস থেকে যা জেনেছি এবং বুঝেছি তাই আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয়। আপনার উদ্ভাবিত চিন্তা গ্রহণের টাইম নাইযে আমার!


আগুনে হাত দিও না, হাত পুড়ে যাবে, পানিতে ঝাঁপ দিও না, ডুবে যাবে, বেশি ভাবতে যেও না, তার ছিঁড়ে যাবে, হুঁশিয়ার, সাবধান!


আসসালামু আলাইকুম ভাই। আপনি কি ধর্মের বিপরীতে নিরপেক্ষতা চান? তা জীবনেও হবে না, কারণ ইসলাম আল্লাহর মনোনীত দ্বীন। কারো বাপের ধর্ম নয় ইসলাম যে যেভাবে মন চাইলো সেভাবে বলতে নিলাম। ইসলামে সব বলা হয়েছে, কোনোটা বাদ নেই। কিন্তু আপনারা মানুষের মাঝে ফেতনা নিয়ে আসছেন। দয়া করে এইসব ফালতু বই বিক্রি করবেন না। না হলে ভালো হবে না। আপনাকে কে ইসলাম নিয়ে বলার অধিকার দিয়েছে? আপনি কি আলেম, নাকি ইহুদিদের দালাল? সাবধান হোন।


আরে জারজের বাচ্চা জারজ! শয়তান মানুষকে যুক্তি দেখিয়েই বেঈমান কাফের বানায়। Mother fu****, son of bitch.


শালা বেকুব, কুরআন পড়তে পারিস? সূরা আর রহমান পড়, তাহলে বুঝতে পারবি আল্লাহ বা স্রষ্টা কাকে বলে।


আমাদের মাদ্রাসাগুলো হয় বড় বড় নাস্তিক প্রোডিউস করেছে, নাহয় এমনসব ধর্মপ্রচারক তৈরী করেছে, যারা দেশময় ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের নামে এমন অধর্মই শিক্ষা দিয়েছেন যে, তার ফলাফল হলো এইসব প্রতিক্রিয়া। ব্যতিক্রম আলেম আছেন আমি জানি, তবে অধিকাংশই হলো অন্ধবিশ্বাস ও গোঁড়ামি দ্বারা পরিপূর্ণ, ধর্মের নামে অধর্মের চর্চাকারী, প্রকৃত ইসলাম থেকে দূরে, ঈমান শব্দের অর্থই জানে না, ঈমান অর্জন করে মুমিন হওয়া তো দূরের কথা।

সেই ইভেন্টে দু’জন নাস্তিকও কমেন্ট করলেন। একজন লিখলেন, বই পড়ার আগেই মুমিনদের গালাগালি শুরু হয়ে গেল। না জানি বই প্রকাশের পর লেখকের কী অবস্থা হয়।

আরেকজন নাস্তিক বললেন, আপনার শান্তি হোক। এই চমৎকার পদক্ষেপটির জন্য, রইলো আন্তরিক শুভকামনা।

মোর্শেদ এগুলির সবই দেখছে। প্রমোশন চলছে, কমেন্ট আসছে, আমার বই লেখা হচ্ছে, মোর্শেদের গল্পও রচিত হচ্ছে! আমি মোর্শেদকে বললাম, এখনই যে প্রতিক্রিয়া দেখছি, বই প্রকাশ করলে কেউ না কেউ নিশ্চিত এসে কল্লা ফেলে দিয়ে জান্নাত হাসিল করবে। উগ্র ধার্মিকের তো অভাব নেই। মোর্শেদ বলল, মোর্শেদও তাহলে উগ্র নাস্তিক হবে! আমি বললাম, উঁহু, ভালোবাসা দিতে হবে যে! তার ক’দিন যেতে একদিন মোর্শেদই উল্টা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলো- ভালোবেসে কথা বলতে হবে। সেই ঘটনাটা বলি।

প্যারাডক্সিকাল সাজিদ বইটা বের হবার পর থেকে শুরু করে আস্তিক-নাস্তিক রেসলিঙের বেশ কয়েকটি বই বেরিয়েছে। তাওয়া গরম থাকতে থাকতেই ভেজে নেয়া চলছে আরকি। ঈমান শব্দের ভুল অনুবাদ ‘বিশ্বাস’, আর সেই বিশ্বাসের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য ব্যাপক তোড়জোড় চলছে। চলছে নাস্তিক ধোলাই করে আত্মতৃপ্তি ও হাততালির উৎসব। একে কেন্দ্র করে ছোট একটা লেখক-পাঠক শ্রেণী গড়ে উঠেছে। তারা ফেইসবুকে একে অপরকে প্রমোট করেন, এবং তাদের গুরুমতন একজনও আছেন। তিনি ফেইসবুকে বছর শেষের রিভিউ পোস্টে যা লিখলেন তার সারকথা হলো, ২০১৭ সালটা নাস্তিকদের ধোলাই করে অনেকগুলো বই বেরিয়েছে, ২০১৮ তে আরো অনেকগুলো আসছে। গতবছর ওদের খুব খারাপ গিয়েছে, এই বছরটা ওদের আরো খারাপ যাক।

উম্মতে মুহাম্মদীর এহেন আচরণ আমার ভিতরে একইসাথে রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ ও হতাশা সৃষ্টি করে। অবশ্য কুরআনকে পরিত্যাগ করার শাস্তিই হলো এমন নিচু আচরণ। আর অধিকাংশ মুসলমান যে কুরআনকে পরিত্যাগ করবে, সেকথা আল্লাহপাক কুরআনেই বলে দিয়েছেন: “(শেষ দিবসে রাসুল বলবেন) হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমার লোকেরা এই কুরআনকে পরিত্যক্ত করে রেখেছিলো। (সূরা ফুরক্বান, ২৫:৩০)”


যাহোক, আমি সেখানে মন্তব্য করলাম: যারা ঈমান আনেনি, তাদের প্রতি রাসুল (সা.) এর দৃষ্টিভঙ্গির একেবারেই উল্টো দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হচ্ছে এসকল বইয়ে, এবং এই অন্যায় দৃষ্টিভঙ্গিকে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। পক্ষান্তরে, রাসুল (সা.) ছিলেন তাদের প্রতি দয়ালু, এবং আল্লাহ তায়ালা যেন ব্যথিত হয়ে তাঁর হাবীবকে বলছেন যে, "ওরা ঈমান আনে না দেখে দুঃখে বোধহয় আপনি নিজেকে শেষ করে ফেলবেন!" (সূরা কাহফ, ১৮:৬)

আমি জানি যে, এই সকল লেখকেরা যেই "আস্তিক-নাস্তিক রেসলিং" খেলায় মেতে উঠেছেন, তা থেকে তারা সহসাই বিরত হবেন না। তারা একটি পাঠক সমাজ পেয়ে গিয়েছেন, এবং খ্যাতির মোহসহ বিভিন্ন অনুভূতি তাদেরকে ভালোবাসার জগত থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।

"নতুন বছরটা ওদের আরো খারাপ যাক?" ???

রাসুল (সা.) কি এভাবেই দোয়া করতেন? নাকি তিনি তাঁর শত্রুদের জন্য দুঃখ করতেন, আল্লাহর কাছে এত বেশি কান্নাকাটি করতেন যে, আল্লাহ তায়ালা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, "আপনি না আবার দুঃখে নিজেকে শেষ করে ফেলেন!"

মুহাম্মদ (সা.) চলিলেন এক পথে, আর তাঁর উম্মত চলিলো আরেক পথে!

আমি আশা করব, ইসলামের নামে আরো বেশি ভুল পদক্ষেপ ফেলার আগেই সকলে সতর্ক হবেন।


প্রতি উত্তরে যা হবার, তা-ই হলো। সত্য আঁকড়ে ধরার ‘শাস্তিস্বরূপ’ বিভিন্ন দল, দেশ, মাযহাবের এজেন্ট ট্যাগিঙের শিকার আমি আজকে নতুন না, এবং ইনিও সেই একই কাজই করলেন। প্রসঙ্গ ঘুরানোর ফ্যালাসিটা ধরিয়ে দিয়ে বললাম, এহেন আচরণ দুঃখজনক। তারপর আরো দু-চারটা কমেন্ট চললো সেখানে। মোর্শেদের সাথে মেসেঞ্জারে চ্যাটিং চলছিলো তখন, আমি সেই লেখার লিঙ্ক দিলাম, যেখানে আমি কমেন্ট করেছি। নোটটা পড়ে মোর্শেদ প্রথমেই বলল, “জঘন্য।” খানিক পরে নিজেই বলছে, এইগুলানরে ভালোবাসা দিয়ে ঠিক করতে হবে। বললাম,

সেই ভালোবাসা বোধকরি মওলানা রুমির মত মানুষ ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে না। আমার হৃদয়টা আজও অত বড় হয়নি।

– এটা আপনার ভুল ধারণা। হৃদয়টা অত বড় না হলেও সেই রাস্তায় আছেন আপনি।

মানুষের প্রতি এত বিদ্বেষ হৃদয়ে নিয়ে এরা রাতে ঘুমায় কিভাবে? এরা কি কখনো প্রশান্তির ঘুম ঘুমায়নি জীবনে?

– আপনি কি আরো রিপ্লাই দিয়েছেন? একটু খোঁচা দিয়ে ভালোবাসা দ্যান। ব্রেইনে খোঁচা দিয়ে হৃদয়ে ভালবাসা দিতে হবে।

যতটুকু ভালোবাসা দেবার, যেন বইটাতে দিতে পারি। এধরণের মানুষ থেকে আমি দূরে থাকতে চাই। এরা আমাকে ভালোবাসার জগত থেকে বের করে রাগ-বিদ্বেষ-মারামারির জগতে নিয়ে যাবে। আর সেই মারামারিতে আমি খুব জিততে পারি। কিন্তু আমি তা চাই না। নিজের হৃদয়ের মানবপ্রেমটুকু বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে ধর্মব্যবসায়ীদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলি।

বই লেখার এই দিনগুলিতে মাঝেমাঝে নিতান্তই অপরিচিত মানুষজন ফেইসবুকে নক করেছেন। দুই চারটা সালাম-কালাম করেই আকস্মিক প্রশ্ন “আপনি নাকি একটা বই লিখছেন?” আমি বুঝতে পারি, আমার বই নিয়ে উক্ত লেখক-পাঠক মহলের কেউ কেউ বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। “আনপ্রেডিক্টেবল” এর প্রতি মানুষের যেমন শঙ্কা কাজ করে, তেমন আশঙ্কা নিয়ে ভাবছেন, এই লোক আমাদের মিউচুয়াল সাপোর্ট সিস্টেমে বই লিখবে তো? এ আমাদের মাজহাব-মানহাজের লোক তো? আমাদের চেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়ে যাবে নাতো? আমাদের সাপোর্ট নিচ্ছে না কেন এখনো? আমাদের সাথে যোগাযোগ করছে না কেন?

এমন আরো অনেক ভাবনা হয়ত কাজ করছে। অথচ এই বই লেখাটা কতটা আকস্মিকভাবে শুরু হয়েছে, তা আপনারা জানেন। আর বই লিখে খ্যাতি কামানোর ইচ্ছাও আমার নেই, কিংবা আল্লাহ তায়ালা আমার জীবন-জীবিকাকে ধর্ম বেচার উপরেও নির্ভরশীল করেননি যে, ইসলামের খেদমতের নামে বই লিখব কিংবা লেকচার দিয়ে বেড়াব, আর তা থেকে ব্যক্তিগত লাভ গ্রহণ করব! বছর বছর বই প্রকাশের কোনো ভাবনাও নেই, চলার পথে হঠাতই লিখতে হলো, তাই লেখা হয়ে গেল, এই যা। কিন্তু এই নিয়ে অন্ধবিশ্বাসীদের মাঝে বড় ভয়!

এরপর একদিন জানতে পারলাম, ঐ লেখক-পাঠকগোষ্ঠী হলো সালাফি আকিদার মুসলমান, এবং আমাকে তারা তাদের শত্রু আকিদার মানুষ মনে করে। আমাকে নিয়ে বিশাল গবেষণা করে আমাকে ব্লক দিয়ে তারপর ফেইসবুক নোটও পাবলিশ করেছে, এবং সেটা আবার দলবদ্ধভাবে শেয়ারও করছে। এটা নাকি “ঈমান বাঁচানো”। আমি ভাবলাম, হায়, কোথায় মুসলিম, কোথায় মুমিন! সত্যকে এতই ভয় এদের! নাস্তিকদের সাথে যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করে, কিন্তু একজন মুসলিম যখন নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে যুক্তির চর্চা করেন, আর তাতে নাস্তিকতাও খণ্ডিত হয়, এবং ভেঙে পড়ে ধর্মের নামে অন্ধবিশ্বাসের দেয়াল, তখন তারা নাস্তিকদের চেয়েও বেশি ভয় পান খাঁটি ইসলামকে! হায় মানুষ!

একদম শুরু দিকে ইমরান নামে যে ভাইটি খুব উৎসাহিত করে আসছিলেন, ততদিনে সেই ভয় তার কাছেও পৌঁছে গিয়েছে ঐ লেখক-পাঠক গোষ্ঠীর কানাকানিতে। তিনি একদিন গুরুগম্ভীর স্বরে বিচারদিবসের ফাইনাল রায়ের মত করে আমাকে মেসেজ দিলেন যে, আমার ব্যাপারে অভিযোগ হলো, আমি ওমুক মাজহাবের অনুসারী। উত্তরে বললাম, সালাম, ব্যক্তি আলোচনার বস্তু হওয়া উচিত নয়। অভিযোগটি কার/ কোথায়?
উনি যে লিঙ্ক দিলেন, তা কোনো কারণে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। উনি তখন বললেন, যাইহোক, আপনার সালাম শুনেই প্রথমদিন কিছুটা খটকা লেগেছিল। আপনাকে উৎসাহ দেয়াটা আমার সবচেয়ে বড় একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। আমিন।

যাহোক, তিনি আমিন লিখেই গেলেন, আর আমিও মনে মনে আমিন বললাম, কেননা উনিসহ আরো যারা যারা উৎসাহ দিয়েছেন, তাদের প্রবল আগ্রহ না হলে এই বইটা লেখা হত না, রচিত হত না মোর্শেদের গল্প! এর মধ্যে আরো অনেকেই তাদের ধর্মীয়-মাজহাবী-দলীয় অন্ধবিশ্বাস ভেঙে যাবার প্রচণ্ড ভয়/ শঙ্কা থেকে আমাকে মেসেজ করেছেন, আমাকে নিরত করার চেষ্টা করেছেন। সামনাসামনি পেলে হয়তো হাত-মুখ চেপে ধরে সত্য উন্মোচনকে রোধ করতেন। আল্লাহর অশেষ রহমত, ইন্টারনেটের যুগে সে কাজটা অতটা সহজ নয়।


ভালোবাসার শিক্ষক

না, আমার সাথে ভালোবাসাপূর্ণ বন্ধুত্ব মানেই এই নয় যে, মোর্শেদ আল্লাহ, কুরআন, মুহাম্মদ (সা.), ইসলামকে সত্য বলে মেনে নেবে। ব্রেইনের জগতে স্রষ্টাভাবনা করার সেই পরিশ্রমটা ওর নিজেকেই করতে হবে। আমি আপনাদেরকে এমন কোনো গল্প উপহার দিতে আসিনি যে, অডিটরিয়ামে লাইভ শো-তে দুই-চারটা প্রশ্নের উত্তর পেয়েই একজন ইসলাম কবুলের ঘোষণা দেবে, আর তাতে সবাই বাহবা বাহবা করে উঠবে। তেমন কোনো সাজানো নাটকের গল্প নিয়ে আমি আসিনি। বই লিখতে লিখতে এইখানটিতে এসে আমি দিনলিপির মত করেই কথাগুলি বলছি। আমি জানি না মোর্শেদ শেষ পর্যন্ত ইসলামের ছায়াতলে আসবে কিনা। অনেক মানুষকে দেখা যায়, যারা শান্তি খুঁজতে খুঁজতে ধর্মজগতে এসে শান্তির ছোঁয়া পায়, তারপর চোখবুঁজে ধর্মপালন শুরু করে, যুক্তি ও দর্শনের সচেতন চর্চা দ্বারা ধর্মজগতের ভিতরের সত্যগুলিকে বের করে আনে না আর। ফলস্বরূপ আগে এক অন্ধত্বে ছিল, পরে আরেক অন্ধত্বে গিয়ে পড়ে। দৃঢ়যুক্তি ও সত্যদর্শন আগেও বাইরে পড়ে ছিল, ধর্মজগতে এসেও সেটা বাইরেই পড়ে থাকে! আমি জানি না আমার সান্নিধ্যে কিছুটা শান্তি পেয়ে ঐসব লোকদের মত করে মোর্শেদ ধর্মচর্চা শুরু করবে কিনা। আমি জানি না। মোর্শেদের এখনও অনেক unanswered questions আছে। এতকিছুর পরেও মোর্শেদের সাথে আমার তর্ক হয়।

একদিন নবীজীকে (সা.) নিয়ে মোর্শেদ বলল, তার চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত ভালোবাসি, এর পরে নয়। আমি বললাম, আফসোস, আমার দয়াল নবীকে কেউ চিনলো না। মুসলমানও চিনলো না, নাস্তিকরাও চিনলো না। আহা, আমার দয়াল নবী! বললাম, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র ৪৬ বছর হয়েছে, এখনই এর ইতিহাসের কতগুলো ভার্সন পাওয়া যায়। প্রত্যেকটা মানুষ একটা করে ভিন্ন ভার্সন দেয়। অথচ সেই যুদ্ধটা হয়েছিল রেডিও-টিভি-ক্যামেরার যুগে। আর সেখানে ১৪০০ বছর আগের ইতিহাস, যখন এতসব টেকনোলজিও ছিল না, তখন রাসুল (সা.) এর মৃত্যুর ২০০ বছর পরে সংকলিত হাদীসের চশমা দিয়ে রাসুলকে (সা.) দেখলে সেটা কতটুকু অথেন্টিক হবে? একজন নিরপেক্ষ মানুষ, যার বিভিন্ন ‘সহীহ’ লেবেলকৃত হাদীস ও সিরাত গ্রন্থের ব্যাপারে অন্ধ আবেগ নাই, তাকে জিজ্ঞাসা করলে সে কী বলত? আর শুধুমাত্র সেই চশমা দিয়ে যারা দেখে, তারা কেউ-ই আমার দয়াল নবীকে চিনলো না। আহা, আমার দয়াল নবী!

মোর্শেদের সাথে আমার বহু বিষয়ে তর্ক করা সম্ভব। আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক, মাযহাব নিয়ে বিতর্ক, ইসলামের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক, বিভিন্ন বিতর্কিত ফতোয়া… হাইলি ইন্টেলেকচুয়াল ছেলে ও। সেসব বিতর্ক যে হয় না, তা নয়। তবে সেগুলিকে ধারণ করে তার ঊর্ধ্বে আমি ভালোবাসাকে স্থান দিয়েছে। কারণ, এর মাধ্যমেই কেবল একটা হৃদয়কে উদার করে তোলা যায়। যে হৃদয় উদার মনে সত্যকে গ্রহণ করে নেবে… কারণ সত্য তো লুকিয়ে নেই। সত্য গ্রহণের পথে আমরা নিজেরাই বাধা। আর ভালোবাসায় তৃপ্ত হৃদয় অনেক সাহসী হয়: সে নিজের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও সত্যকে আঁকড়ে ধরার সাহস করতে পারে।


There are many ways to reach God, I choose love. - Maulana


মোর্শেদ বলে, আপনাকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি, আশ্রয় ভাবি।

আমি তখন ভাবি, আমরা সকল মুসলিম কেন বিশ্ব মানবতার জন্য আশ্রয় হতে পারি না?

নিতান্তই বন্ধুসুলভ আড্ডা, কিংবা আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কের ‘মারামারি’ করতে করতে মোর্শেদ হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি আস্তে করে বলি, মোর্শেদ, কী হয়েছে? কোনো রাখঢাকের চেষ্টা না করে মোর্শেদ অকপটে বলে, ভাই! অশান্তি লাগে যে! তখন আমি ওর পিঠে হাত রেখে বলি, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি গভীরভাবে অনুভব করি, খোদাতায়ালা তখন আমাদের দুজনকেই আলিঙ্গনে নিয়ে নেন, তা মোর্শেদ যতই তাঁকে অস্বীকার করুক না কেন।

আমি আর ওকে জিজ্ঞাসা করি না, কেন অশান্তি লাগে? হয়ত শত কারণ আছে। আমি জানি, হাজারটা কারণ থাকলেও সব অশান্তি দূর হয়ে যাবে, যখন হৃদয়ের ভিতরে আল্লাহর যিকর জারি হবে! “নিশ্চয়ই অন্তরসমূহ আল্লাহর স্মরণে প্রশান্তি লাভ করে।” কিন্তু এই আল্লাহকেই যে সে হৃদয় থেকে বের করে দিয়েছে। প্রশান্তির উৎসকে দূরে ঠেললে হৃদয় কিভাবে শান্ত হবে! আমার কাছে ওর অনুভূতিগুলো নিতান্তই অনাবৃত, অকপট। আহা, করুণাময় আল্লাহ, তবু ওর জন্যে ভালোবাসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এতটুকু সুযোগ করে দিয়েছেন যে, একটা মানুষের কাছে এসে বলবে, ভাই, অশান্তি লাগে যে!

এসবই আমার ভালোবাসার শিক্ষা। না, এগুলি কোনো কিতাব পড়ে অর্জিত হয়নি। কেননা, পড়া হলো ব্রেইনের কাজ, আর ভালোবাসা হলো হৃদয়ের কাজ। কিতাব পড়লেই জ্ঞানী হওয়া যায়, কিন্তু শত্রুকে বুকে না জড়ালে ভালোবাসা শিক্ষা করা যায় না। আমার ভালোবাসার শিক্ষককে আমি দেখেছি একটা ব্রাশ নিয়ে আমার জুতাজোড়া মুছে দিতে, যখন আমি তার বাসা থেকে বের হবার জন্য চেয়ারে বসে মোজা পরছি। মসজিদে ঢোকার সময় জুতাগুলোকে একটার পাশে একটা সাজিয়ে রেখে মসজিদে প্রবেশের শিক্ষা আজো মসজিদ থেকে দেয়া হয় না, সেই শিক্ষা আমি আমার ভালোবাসার গুরুর কাছে পেয়েছি, যখন আমার ঘরে ঢোকার সময় এলোমেলোভাবে ফেলে রাখা জুতাগুলোকে নিজহাতে সাজিয়ে দিয়েছেন। যখন তার সাথে দাঁড়িয়ে আমরা গুনমুগ্ধরা সবাই চা খেয়েছি, তখন চায়ের প্রথম কাপটা নিয়ে একটু দূরে বসে থাকা পা-বিহীন পঞ্চাশোর্ধ ভিক্ষুকের ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিয়েছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। লোকটি মুহুর্তে অশ্রুসজল হয়ে বলেছে, সারা জীবনে আমাকে কেউ কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় নাই। আমি তখন কেঁদেছি। আমি বাইরে কাঁদতে পারি না। আমি মনে মনে কেঁদেছি।


“ধুয়ে মুছে ফেলো তোমার যত বই, যদি তুমি তা-ই পড়ো, যা আমরাও পড়ি। কেননা, ভালোবাসার শিক্ষা কোনো কিতাবে নেই।” - মুভি, গোল্ড অ্যান্ড কপার (২০১১)।

আমি জানি এটা মাত্র দুটো মানুষের গল্প – কিন্তু তবু আমার মনে হয় আমি একটা বিপ্লব করে ফেলেছি। একটুখানি হলেও আমি ভালোবাসতে শিখে গেছি। কুরআনই আমাকে সেই পথ দেখিয়েছে। এই নিয়ে মোর্শেদ আমাকে প্রশ্নও করেছে। বলেছে, কুরআনের মাঝে একটা ভালোবাসার কথা দেখান দেখি, যেটা আপনার নিজের ভালো লাগে?

আমি বললাম,



وَلا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ (٣٤)


সমান নয় ভালো ও মন্দ। মন্দের জবাবে তা-ই বলুন, যা সর্বোত্তম। তখন (দেখবেন,) যে আপনার শত্রু, সে-ও হয়ে যাবে এমন যেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৪)

তারপর বললাম, মওলানা রুমির কবিতা তোমার এত পছন্দ, অথচ উনিতো বিশেষ কিছু বলেননি, কুরআনের কথাগুলোকেই কবিতায় রূপ দিয়েছেন! আমরা যখন একটা বাণীর শেষে লেখা দেখি, Rumi, the master of love, তখন সেটা কত সহজেই না গ্রহণ করি, অথচ এই ভালোবাসার উৎস যেই কুরআন, সেই উৎস থেকে সরাসরি গ্রহণ করতে পারি না! মওলানা বলেছেন,


Go, my friend, bestow your love even on your enemies. If you embrace them with love, what do you think will happen? - Maulana Rumi


সরল দোলক…

একদিন অকস্মাৎ মোর্শেদের প্রশ্ন–

– প্রশ্ন: আপনি সে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে চাননা, সেগুলাই যদি আপনার সামনে বারবার আসে তাহলে আপনার কি করা উচিত?

তাহলে খুঁজে দেখা দরকার, আমি কেন ঐ সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে চলতে চাচ্ছি। তারপর সেই দুর্বলতাগুলোকে ওভারকাম করা দরকার।

– অন্য সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য।

এক সমস্যা এড়াতে গিয়ে আরেক সমস্যায় পড়া?

– হুম। এভাবে অনেক জটিল হওয়া।

তারমানে সমস্যাকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় নাই।

– :-’’(

সমাধান হিসেবে যেটাকে দেখা হয়েছিল, সেটা আসলে ছিল নতুন সমস্যার সূচনা। এভাবে একের পর এক জটিলতার জাল তৈরী হয়ে গেছে।

– হুম।

সমস্যাকে সঠিকভাবে না দেখাটা নিজের উপরেই জুলুম। কেননা, সমস্যাকে ভুলভাবে দেখলে গৃহীত পদক্ষেপও ভুল হয়। আর এভাবে এক ভারসাম্যহীনতা থেকে আরেক ভারসাম্যহীনতায় গিয়ে আপতিত হয় মানুষ। সরল দোলকের মত অবস্থা হয় তখন। ভারসাম্য আর অর্জন করতে পারে না সহজে।

– হুম।

তখন বাইরে থেকে একটা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের দরকার হয়। যে কিনা ঐ সরল দোলককে ধরে থামিয়ে দেবে। আর ভুলপথে যেতে দেবে না। ভারসাম্যে এনে ধরে রাখবে। সেজন্যে ঐ তৃতীয় পক্ষকে অনেকটা আঘাত সহ্য করতে হবে যদিও।

– তারপর সে থামিয়ে চলে গেলে আবার দুলতে শুরু করবে।

এই বলে মোর্শেদ কাঁদলো। কারণ তখন আমার ছুটির আর চার সপ্তাহ আছে, এরপরই আমাকে চলে যেতে হবে। আমি নিজে হিসাব না রাখলেও আমার ফ্লাইটের দিনটা নিশ্চয়ই ও মনে মনে খুব হিসাব করে রাখে! আমি যাবার পর মোর্শেদ প্রশান্তির ঘুম কিভাবে ঘুমাবে? কে ওকে কানে কানে বলে দেবে সেই ঘুমের রহস্য? ও কি আবারো আস্তিক-নাস্তিক টানা-হেঁচড়ার মধ্যে পড়ে যাবে? ওর কী হবে?

নানান ভাবনা মুহুর্তে মাথায় খেলে গেলো। আমি শুধু মনে মনে বললাম, আল্লাহ! মোর্শেদকে তোমার হাওলায় দিয়ে দিলাম, তুমি ওর হৃদয়টাকে শান্তি করে দিও!

পরদিন মোর্শেদের সাথে সামনাসামনি বসে অনেক আলাপ করলাম। আমাদের আলোচনা বাধাহীন, প্রেজুডিস মুক্ত। কোনো মাজহাবী গোঁড়ামী নাই, আস্তিক-নাস্তিক উত্তেজনাও নাই। খুব সহজভাবে পাশাপাশি বসে সত্য ও মিথ্যার অকপট স্বীকারোক্তি। মোর্শেদ বলল, আপনার সাথে আমার এই আলোচনাগুলো ইউটিউবে দিতে পারলে বেশ হত। আমি নীরব হয়ে রইলাম। খানিক পরে বললাম, কিন্তু উগ্রপন্থীরা যদি তোমার কোনো ক্ষতি করে? ইচ্ছা তো আমারো হয়, কিন্তু সেই আশঙ্কায় দিতে পারি না। মোর্শেদ বলে, আমি নাহয় চেহারা দেখালাম না? আমি আর কিছু বলি না। থাক, নাহয় দুনিয়ার মানুষ আরো একটি অনন্য ভালোবাসার গল্প থেকে বঞ্চিত হোক, কিন্তু তবু মোর্শেদ বেঁচে থাকুক! ওর কোনো ক্ষতি না হোক!

মোর্শেদের ফোনটা হাতে নিয়ে ফেইসবুকে ঢুকলাম। ঢুকে একজন সুফির ফেইসবুক পেইজ সার্চ দিয়ে ওপেন করলাম। সেখানে লেখা, ওমুক ওমুক and 2 other friends like this. ও বিস্মিত হয়ে বলল, আমার এই ফেইসবুক ফ্রেন্ড যারা লাইক দিয়েছে, এরাতো সব ‘প্রগতিশীল’!

আমি হেসে বললাম, হুম। এতে বিস্ময়ের কী আছে। আত্মার খোরাক পেয়েছে, তাই তারা এখানে এসেছে। একজন প্রকৃত মুসলিমের ক্ষেত্রেতো এমনটাই হওয়া উচিত।

ইসলাম হলো এমন এক দস্তরখান, যেখানে এসে সব ধরণের মানুষ তার সব রকম চাহিদা মিটাতে পারে। আত্মার খোরাক চান? আছে। রাষ্ট্রব্যবস্থার টেকসই মূলনীতি চান? আছে। জুলুমবিহীন অর্থব্যবস্থা? আছে। পরিবারব্যবস্থা? আছে। কী চান আপনি? সবই আছে ইসলামে।


স্রষ্টার সাথে অভিমান…

মোর্শেদকে একদিন মেসেজে বললাম, তোমাকে আমার নাস্তিক মনে হয় না। ধর্মভীরু, খোদাপ্রেমিক মনে হয়।

মোর্শেদ বলে, “আপনি ভালোমানুষ, তাই এরকমটা ভাবেন।”

আসলে প্রতিটা নাস্তিকই ভিতরে ভিতরে গবীরভাবে ধার্মিক, আমার মনে হয়। যে যত বড় নাস্তিক, সে তার হৃদয়ের তত গভীরে স্রষ্টাকে লালন করে। আমরা যদি উপরের আবরণগুলি সরিয়ে দিতে পারি, ঠিকঠিক দেখব ভিতরে খোদাপ্রেমিক-মানবপ্রেমিক এক হৃদয় আছে!

একদিন মন খারাপ করে মোর্শেদকে বলছিলাম, মোর্শেদ, তুমি কতকিছু জানো, তবু তুমি ইসলাম থেকে দূরে :-(

ও বলল, স্রষ্টার সাথে অভিমান, আর হারামী ধার্মিকগুলার প্রতি রাগ, যা একসময় ঘৃণায় পরিণত হয়…

বললাম, আমার কাছে এসে যদি একটু হলেও প্রশান্তি পেয়ে থাক, তবে সেই সূত্র ধরো তুমি স্রষ্টার সাথে অভিমানটা মিটিয়ে নিও!

তখন আমার মনে পড়লো মওলানা জালালুদ্দিন রুমির কবিতা।

আমি কি তোমায় বলিনি

আমাকে ত্যাগ কোরো না, কারণ আমিই তোমার একমাত্র বন্ধু

আমিই প্রাণের উৎস।

এমনকি যদি তুমি রাগ করে হাজার বছরের জন্যও দূরে সরে যাও

তবু তুমি আমার কাছেই ফিরে আসবে, কারণ আমিই তোমার লক্ষ্য, আমাতেই তোমার সমাপ্তি।

আমি কি তোমায় বলিনি

এই রঙিন দুনিয়ার মায়ায় জড়িও না

কারণ একমাত্র আমিই মানুষের জীবন রাঙাই।

আমি কি বলিনি

তুমি এক মাছ, শুষ্ক ডাঙায় যেও না

কারণ আমিই গভীর সমুদ্র।

আমি কি বলিনি

পাখির মত করে জালে আটকা পড়ো না

কারণ আমিই তোমার ডানা, আলোর উৎস।

আমি কি বলিনি

তারা যেনো তোমার মনকে বদলে না দেয়, তোমায় বরফ করে না তোলে

কারণ আমিই আগুন, আমিই উষ্ণতা।

আমি কি বলিনি

তারা তোমায় পথভ্রষ্ট করবে, এবং ভুলিয়ে দেবে যে

আমিই সকল গুণের ঝর্ণাধারা।

আমি কি তোমায় বলিনি

আমার কাজকে প্রশ্ন কোরো না

কারণ সবকিছু নিয়মমাফিক চলছে – আমিই স্রষ্টা।

আমি কি বলিনি

তোমার হৃদয় তোমায় বাড়ি ফিরিয়ে আনবে

কারণ সে জানে, আমিই তোমার প্রভু।


বেহেশতের রঙ…

তারপর, একদিন মোর্শেদ আমার বাসায় এসেছে। কবে, তা ঠিক মনে নেই।

মোর্শেদ আমার হাত ধরে বলল, আচ্ছা, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও তো অন্ততঃ শান্তি থাকতে হবে। পৃথিবীর কোথাও কি আসলে শান্তি আছে?

আমি বললাম, আছে। ছেলেমানুষের মত করে বলল, চোখের পাতা না ফেলে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন?

তারপর আমার চেয়ারটায় বসে বলল, আচ্ছা, কেন নামাজই পড়তে হবে? আমি বললাম, কে বলেছে তোমাকে নামাজ পড়তে হবে? তুমি সৃষ্টি হিসেবে একক স্রষ্টাকে হৃদয়ে অনুভব করো, আর সৎকর্ম করো (২:৬২), কারো উপর জুলুম কোরো না। ব্যস। আর কী দরকার তোমার? এরচেয়ে বেশি কী করতে চাও তুমি? ও বলল, এটুকুই?

বললাম, হ্যাঁ। বাকীসব হলো জ্ঞান অর্জন সাপেক্ষে। যদি তোমার এই জ্ঞান অর্জন হয় যে, নামাজ আল্লাহর আদেশ, নামাজ পড়তে হবে, তখন যদি তুমি তা না করো, তখন সেটা পাপ হবে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সেইটা তুমি নিশ্চিত না, ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি এক আল্লাহকে হৃদয়ে ধারণ করো, আর সৎকর্ম করো। এরচেয়ে বেশি কী করতে চাও আর? ব্যস, এটুকুই তো যথেষ্ট!

ও বলল, তাহলে আমিও মুসলিম?

আমি বললাম, তোমার হৃদয় ঠিকই সে উত্তর জানে।

_______________________________


ডিসেম্বর মাস। আমার হাতে এখন খুব অল্প সময়। অর্ধমাসও নেই আর। আমার প্রজেক্ট রিপোর্ট এখনো জমা দেয়া হয়নি, পেপারতো করাই হয়নি -- সবকিছু একহাতে ঠেলে আমি বই নিয়ে মেতে রইলাম। আর মোর্শেদের সাথে! এদিকে দুই দেশে তিন ইউনিভার্সিটিতে অ্যাকাডেমিক কোঅর্ডিনেশান করে অনেককিছু ম্যানেজ করতে হচ্ছে। মোর্শেদ বলল, ভাইয়া, আপনি রিপোর্ট করবেন না? কবে করবেন? আমি বললাম, জানি না। এই বই আগে, ভালোবাসা আগে।…

এদিকে প্রফেসর নিজে উৎসাহী হয়ে বলেছেন, তোমার প্রজেক্টটার পেপার করে ফেলো। আমার সিভিতে খুব ভালো সংযোজন হবে সেটা, এত বড় একজন প্রফেসরের হাত দিয়ে আমার পেপার যাবে! আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহ! ঐ সিভি যায় যাক, আমি তোমাকে ভালোবেসেই মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছি, তোমার কাছে আমার যে সিভি আছে, তাতে তুমি এই গল্পটি লিখে নিও!


“Bringing joy to one heart with love is better than thousand repetetive prayer recitings.”

মোর্শেদের গল্প শেষ হয়নি, এই বইটি লেখার মুহুর্তে তা এখনো চলছে, এবং প্রতি মুহুর্তে বিপ্লব ঘটে চলেছে। তার সবটা আমি বলব না, কেবল বেহেশতের রঙটুকু বলে যাই!

ডিসেম্বরের শেষাশেষি। গল্প করতে করতে ঐদিন মোর্শেদ থেকে গেল আমার বাসায়। কথার কি আর শেষ আছে? ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস… কিংবা নিতান্তই সাধারণ গল্প, গ্রামের গল্প, মায়ের গল্প… এমনি করে রাতভর নানান আলাপ।

তারপর নামাজের সময় হলো। অ্যাটাচড ওয়াশরুম থেকে ওজু করে এলাম আমি। নামাজের জন্য খেজুরপাতার ছোট্ট পাটি আমার। পশ্চিমে সে পাটি বিছিয়ে চাদর গায়ে দাঁড়িয়েছি মাত্র, মোর্শেদ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বলল, “আমি কোন পাশে দাঁড়াব?” আমি বামে সরে দাঁড়ালাম, আমার ডানে এসে দাঁড়ালো ও। আমরা নামাজে দাঁড়ালাম। আমি আর মোর্শেদ। আমি দুই হাত তুলে বললাম, “আল্লাহু আকবার!” আমাদের চারিদিকে তখন বেহেশতের রঙ…

_______________________________


যদি হৃদয়ে আলো থাকে,

তুমি বাড়ি ফিরবেই!



মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…