সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

খোদার ন্যায়বিচার | অনন্তের পথে


প্রশ্ন: এমনও অনেকে আছে, যারা ইসলামের নামও শোনেনি, যাদের কাছে কুরআন পৌঁছায় নাই, তাদের কী হবে? তারা কেন জাহান্নামে যাবে? তাদের কী দোষ? কোথায় খোদার ন্যায়বিচার?

নাস্তিকদের একটা কমন প্রশ্ন এটা। এবং প্রশ্নটা অবশ্যই অত্যন্ত যৌক্তিক। কিন্তু আফসোস! অধিকাংশ মুসলমানই ইসলামকে যৌক্তিক ও দার্শনিক মানদণ্ডে যাচাই করে তারপর সত্য হিসেবে গ্রহণ করে মানে না, বরং তারা মানে বাপ-দাদার ধর্ম হিসেবে, (অন্ধ)বিশ্বাসের বস্তু হিসেবে। আর তাই এসকল প্রশ্নের যৌক্তিক সত্য জবাবও তারা দিতে পারেন না। দেবেনই বা কিভাবে, নিজেই তো জানেন না! উপরন্তু নিজের (অন্ধ)বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার জন্য গোঁজামিলে পরিপূর্ণ ভুলভাল ব্যাখ্যা হাজির করেন। তাই তারা বলেন, “মুসলমান না হলে জান্নাতে যেতে পারবে না। অমুসলিম মাত্রেই জাহান্নামী”, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ একটা পতিতালয়ে যে মেয়েটির জন্ম হয়, সে মেয়েটি কী দোষ করেছিল তাহলে? ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে এমন সব প্রশ্নকে দূরে ঠেলে “মুসলিম না হলে জান্নাতে যেতে পারবে না ব্যস” বলে বসেন। অথচ জন্ম ও বেড়ে ওঠার উপর কারো হাত নেই। দুনিয়ার প্রতিটা মানুষই ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে জন্ম নিচ্ছে ও বেড়ে উঠছে। শুধুমাত্র “কুরআন” নামক একটি বই যারা পেয়েছে, তারাই মুক্তি পাবে, তওবা করে সাতখুন মাফ পেয়ে যাবে, আর যারা সেই বইটি চোখে পর্যন্ত দেখেনি, তারা আজীবন মাদার তেরেসার মত মানব সেবা করে গেলেও (দুনিয়ার মুসলমানদের চোখে) “মুসলিম” না হবার অপরাধে (!) জাহান্নামী হবে – কোনো সুস্থ বিবেকবান মানুষ একথা মেনে নিতে পারে না, প্রিয় পাঠক! প্রিয় পাঠক, আপনাকে যেই নিরপেক্ষ বিচারকের আসনে বসিয়েছিলাম, সেটার মর্যাদার প্রতি নিবেদন করে তাই কুরআন থেকে এ ব্যাপারে কিছু কথা বলতে চাই।


আল্লাহর ন্যায়বিচার

পরকালীন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার মানদণ্ড সম্পর্কে সূরা বাকারায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,



إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَارَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ (٦٢)


“নিঃসন্দেহে যারা ‘ঈমান’ এনেছে এবং যারা ইহুদী, খ্রিষ্টান ও সাবেঈন – (তাদের মধ্যে) যে-ই ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিবসের প্রতি এবং ‘আমলে সালেহ’ (সৎকাজ, যথোপযুক্ত কর্ম, উপযুক্ত করণীয় কর্ম) করেছে, তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার নিকট প্রতিদান রয়েছে। আর তাদের কোনই ভয়-ভীতি নেই, তারা দুঃখিতও হবে না।” (সূরা বাকারা, ২:৬২)

একই কথা আল্লাহপাক বলছেন সূরা তালাক্ব এর ১১ নং আয়াতে:



وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ وَيَعْمَلْ صَالِحًا يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ

“আর যে-ই আল্লাহতে ঈমান আনে ও আমলে সালেহ (যথোপযুক্ত কর্ম) সম্পাদন করে, তিনি তাকেই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।”

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তায়ালার কাছে উত্তীর্ণ হবার মৌলিক শর্ত (base criteria) তিনটি:

১. আল্লাহতে ঈমান

২. শেষ দিবসে ঈমান

৩. আমলে সালেহ তথা উপযুক্ত কর্ম করা।


আল্লাহ তায়ালা ন্যায়বিচারক। এটা হতে পারে না যে, উপরোক্ত তিনটি শর্ত শুধুমাত্র আরবের কিছু মানুষ পূরণ করতে পারবে, কিংবা পৃথিবীর ২০০ কোটি মানুষ পারবে, বাকী ৫০০ কোটি মানুষ পারবে না! যেখানে পৃথিবীর ৫০০ কোটি অমুসলিমের মাঝে অনেকেই আছে সারাজীবনে এমনকি ইসলাম শব্দটিও শোনে নাই, কিংবা কুরআন চোখেও দেখে নাই। কুরআন নাযিল হবার পর বিগত ১৪০০ বছরে এমন হাজারো কোটি মানুষ আসছে-গেছে, যারা ইসলাম কিংবা কুরআনের ছোঁয়া পায় নাই। তাহলে তারা কি পরকালে উত্তীর্ণ হবার মৌলিক তিনটা শর্ত পূরণ করতে পারবে না? এ কেমন অবিচার?

অবশ্যই পারবে। প্রিয় পাঠক, বইয়ের তৃতীয় ভাগের First Cause পর্বে আমরা একটি অনুসিদ্ধান্তে এসেছিলাম যে, first cause বা আদি কারণ তথা পরম স্রষ্টার ধারণা প্রতিটি মানুষের মাঝে জন্মগত। এছাড়াও, বইয়ের একেবারে প্রথম বাক্যটিই ছিলো: “উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য।” অর্থাৎ, স্রষ্টাভাবনা তো সৃষ্টিরই কাজ। এমতাবস্থায়, কেউ “আল্লাহ” শব্দটি না শুনলেও পরম স্রষ্টার ধারণা তার ভিতরে আসবেই। এটা মানুষের রক্তের ভিতরে আছে। তাই প্রতিটি মানুষই জন্মগতভাবে স্রষ্টায় বিশ্বাসী, আস্তিক। মানুষকে তাই আলাদাভাবে আস্তিক হতে হয় না। বরং নাস্তিক হতে চাইলেই মানুষকে তার স্বভাব/ প্রকৃতির বিরুদ্ধে যেতে হয়: স্রষ্টাবিহীন সৃষ্টির অবাস্তব কনসেপ্ট প্রমাণের জন্য নানা ফ্যালাসির আশ্রয় নিতে হয়, যা আমরা তৃতীয় ভাগে দেখে এসেছি।

একইভাবে ‘শেষ দিবস’ তথা ভালো কর্মের ভালো প্রতিফল, মন্দ কর্মের মন্দ প্রতিফল – এই ধারণা মানুষের মাঝে জন্মগত। আর আমলে সালেহ তথা উপযুক্ত কর্ম করার জন্যও প্রতিটা মানুষের মাঝে আছে বিবেক, এবং সেটিও প্রতিটি মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য।

অতএব, সমাজের প্রচলিত সংজ্ঞায় মুসলিম হয়ে নামাজ-রোজা ইত্যাদি করলেই শুধু মুক্তি, নাহলে অনন্ত আগুন – এগুলি হলো অন্ধবিশ্বাসীদের নিজেদের মনে তৈরী বিভিন্ন ধারণা মাত্র।


প্রিয় পাঠক!

আমি জানি না আপনি কোন ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ: নাস্তিক নাকি আস্তিক! তবে আপনি যদি যুক্তিবাদী হয়ে থাকেন, তবে যেই ব্যাকগ্রাউন্ডেরই হোন না কেন, আপনি নিশ্চয়ই এতক্ষণে কুরআনকে মেনে নিয়েছেন, মেনে নিয়েছেন যে, আল্লাহ হক্ব! কিন্তু আফসোস, আমাদের সমাজের অধিকাংশ ‘ধার্মিকই’ যুক্তি ও দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে থাকেন। তারা বলেন, ধর্ম হলো বিশ্বাসের বিষয়, আর যুক্তি হলো শয়তানের হাতিয়ার। (অথচ যদিও আমরা কুরআন থেকে জানি যে আক্বল, অর্থাৎ যুক্তিবুদ্ধি প্রয়োগ করা হলো ঈমানের হাতিয়ার।) এমতাবস্থায় যখন যুক্তি ও দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উত্তর দিলাম যে, পরকালে উত্তীর্ণ হবার তিনটি শর্ত যেকোনো মানুষই পূরণ করতে পারে, সে সমাজের প্রচলিত নামাজ-রোজা করা ধার্মিক হোক বা না হোক, তখন আমি জানি যে, অধিকাংশ (অন্ধ)বিশ্বাসী ধার্মিকের কাছেই তা প্রত্যাখ্যাত হবে। কী আশ্চর্য স্ববিরোধিতা, দেখুন, এই বইয়ের শুরু থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত আমি যুক্তি ও দর্শন ব্যবহার করে নাস্তিক্যবাদকে খণ্ডন করেছি, ততক্ষণ তারা খুশি ছিলেন, কিন্তু যেইমাত্র সেই একই যুক্তি ও দর্শন তার “প্রচলিত ধর্মীয় ধারণার” থেকে ভিন্ন কিছু বলল, তখনই তারা যুক্তি ও দর্শনকে অপছন্দ করলেন!

যাহোক, পাঠক, কোনো ব্যক্তিকে আঘাত করা বা কষ্ট দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। নাস্তিকদেরকে অপদস্থ করার নীতিতেও যেমন বিশ্বাসী নই, তেমনি (অন্ধ)বিশ্বাসী ধার্মিকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে এলোপাথাড়ি আঘাত করাতেও বিশ্বাসী নই। আমি কেবল বিনয়ের সাথে আমার বক্তব্য পেশ করতে চাই, অতঃপর বিবেচনার ভার পাঠকের উপর রইল। কেননা, যুক্তি ও দর্শন তো সকল মানবের জন্মগত গুণ, আর এটাই হলো পৃথিবীর সকল আস্তিক-নাস্তিকের কমন গ্রাউন্ড (common ground)। অতএব, আপনাদের যুক্তিবোধের নিকট আমি আমার এই বইটি নিবেদন করছি।

তবে একইসাথে এটাও সত্য যে, কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াতে কথাগুলি দেখতে পারলে আমাদের হৃদয় শান্ত হয়। উক্ত তিনটি শর্ত পূরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় গুণ যে সকল মানবের মাঝে জন্মগত, দেখুন কুরআনও সেই একই কথাই বলছে। সূরা ফুসসিলাতের ৫৩ নং আয়াতে আল্লাহপাক বলছেন,



سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ



“শীঘ্রই আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাদি দেখাবো দিগন্তসমূহে (অর্থাৎ সৃষ্টিজগতে), এবং তাদের নিজেদের সত্ত্বার ভিতরে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তিনি(অর্থাৎ আল্লাহ)ই হক্ব (সত্য)।…” (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৫৩)

অতএব, উৎসুক মানব মনতো আপনা-আপনি চিন্তা করে পরম স্রষ্টাকে খুঁজে পায়ই, উপরন্তু আল্লাহপাক নিজে থেকেও মানুষের সত্ত্বার ভিতরে পরম প্রভুর অনুভুতি জাগ্রত করে দেবেন – এটাই তাঁর ওয়াদা, আলহামদুলিল্লাহ।

আর বিবেকও যে প্রতিটা মানুষের জন্মগত গুণ, সেটা কুরআনেই আল্লাহপাক ঘোষণা করছেন:



وَلا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ (٢)

“শপথ তিরস্কারকারী সত্তার (অর্থাৎ বিবেক)।” (সূরা ক্বিয়ামাহ, ৭৫:২)



وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا (٧) فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا (٨)

“শপথ (মানুষের) ব্যক্তিসত্তার - যাকে তিনি নিখুঁতভাবে সুবিন্যস্ত করেছেন। অতঃপর তাতে ইলহাম (inspire) করে দিয়েছেন তার মন্দসমূহ ও তাক্বওয়া সমূহ (ভালো-মন্দের সহজাত জ্ঞান)।” (সূরা শামস, ৯১:৭-৮)

আর দুনিয়ার জীবনে ‘আমলে সালেহ’ তথা যথোপযুক্ত কর্ম করার জন্য এই বিবেকই যথেষ্ট, আলহামদুলিল্লাহ।

এছাড়াও আমাদের আক্বল তথা বিচারবুদ্ধি বলে যে, প্রতিটা ক্রিয়ারই একটা প্রতিক্রিয়া আছে। অতএব, ভালো কর্মের ভালো ফল, মন্দ কর্মের মন্দ ফল পেতেই হবে। আর এটাই হলো শেষ দিবস বা প্রতিফল দিবস: যেদিন আমাদের কর্মের প্রতিধ্বনি আল্লাহ তায়ালা ফিরিয়ে দিবেন আমাদের কাছে। এই আক্বল তথা বিচারবুদ্ধিও প্রতিটা মানুষের জন্মগত জ্ঞান। ইন ফ্যাক্ট, আক্বল তথা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ ছাড়া ঈমান-ই অর্জন হয় না:



وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تُؤْمِنَ إِلا بِإِذْنِ اللَّهِ وَيَجْعَلُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لا يَعْقِلُونَ (١٠٠)



“আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ ঈমান (অর্থাৎ পরকালীন জীবনে সুরক্ষা) অর্জন করতে পারে না। আর যারা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে না তিনি (আল্লাহ) তাদেরকে কলুষলিপ্ত করে রাখেন (ফলে তারা ঈমানের সুযোগ পায় না)।” (সূরা ইউনুস, ১০:১০০)

অতএব, সূরা বাকারার ৬২ নং আয়াতের তিনটি মৌলিক শর্ত পূরণ করা পৃথিবীর যেকোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

প্রশ্ন: “কিন্তু আল্লাহ বলেছেন, তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না। কুরআনে আছে, “যারা ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম সন্ধান করবে, তার সেই ধর্ম (আল্লাহর নিকট) কবুল করা হবে না এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (৩:৮৫)” অতএব, সূরা আলে ইমরানের এই আয়াত দ্বারা ২:৬২ আয়াত রহিত হয়ে যাচ্ছে।”


প্রিয় পাঠক!

নাস্তিকতার গোঁড়ামি ত্যাগ করে ইসলামে আসা সহজ। কিন্তু ইসলামের ভিতরে যদি কেউ গোঁড়ামি করে, তবে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করবে কে? যেহেতু ছোটবেলা থেকে বাপ-দাদার ধর্ম আঁকড়ে ধরে এসেছে, এবং শিখে এসেছে যে “আমরা ছাড়া দুনিয়ার বাকী সব মানুষ জাহান্নামে যাবে”, সেহেতু এখন যখন দেখছে কুরআন ভিন্ন কথা বলছে, তখনও সেটা মেনে নিতে পারছে না। কুরআনেরই এক আয়াতকে আরেক আয়াতের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নিজের (অন্ধ)বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখতে চাইছে! প্রিয় পাঠক, কী করব বলুন! নিজের পছন্দমত আয়াতটিকে আঁকড়ে ধরে তার (বাহ্যতঃ) বিপরীত আয়াতটিকে রহিত ঘোষণা করছে! অথচ আল্লাহত কুরআনে বলেননি যে, ৩:৮৫ আয়াত দ্বারা ২:৬২ আয়াত রহিত করা হলো?

কুরআনের এক আয়াত দ্বারা আরেক আয়াতকে রহিত করার এই ভ্রান্ত ধারণাটি মুসলমানদের মাঝে তৈরী হয়েছে (বাহ্যিকভাবে) পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন আয়াতের সামঞ্জস্য খুঁজে না পেয়ে। এই বইয়ে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করার সুযোগ নেই। কিন্তু আসলে কুরআনের অভ্যন্তরে নাসেখ (রহিতকারী) ও মানসুখ (যা রহিত হয়েছে) ধারণাটি গ্রহণযোগ্য নয়। এ নিয়ে পরবর্তীতে “কুরআন ও মুহাম্মদ (সা.)” পর্বে কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে।


সারকথা: গাইডেন্স এর স্তরভেদ

মানুষের দুনিয়ার জীবনটা হলো উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এক অবস্থা। দুনিয়ার যাত্রা শেষ হলে সে আবার তার উৎসের কাছে ফিরে যাবে। দুনিয়ার এই যাত্রাটা আমরা যেন সঠিকভাবে পার করতে পারি, সেজন্যে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন স্তরের গাইডেন্স (হেদায়েত - পথ চলার আলো) দান করেছেন। এর মাঝে প্রথম স্তর হলো “মৌলিক/ সর্বজনীন স্তরের গাইডেন্স”। এই গাইডেন্স সকল মানুষের মাঝে সহজাত। যে কেউ এই গাইডেন্সকে অনুসরণ করবে ও সৎকর্ম করবে, পরকালে সে মুক্তি পাবে, তার কোনো ভয় থাকবে না। আর সর্বজনীন এই গাইডেন্স হলো তাওহীদ ও আখিরাতের অনুভুতি, এবং বিবেক ও বিচারবুদ্ধি। কোনো মানুষ ইসলামের সাথে পরিচিত না হলেও সে যদি শুধু এই চারটি অনুভুতিকে যথাযথভাবে অনুসরণ করে পথ চলে, তবে সেটাই তাকে পরকালে উৎরে দেবে। এটা আল্লাহরই ওয়াদা। তাওহীদ ও আখিরাতের অনুভূতি এবং বিবেক ও বিচারবুদ্ধি – এই চারটি বিষয় যে সকল মানুষের মাঝে সর্বজনীন, সহজাত – কুরআনে সেকথার প্রমাণও বিদ্যমান।

১. বিবেক সম্পর্কে বলা হয়েছে ৭৫:২-এ ও ৯১:৮-এ (ভালো-মন্দের বোধ ইলহাম করে দেয়া)

২. ৮:২২-এ বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ না করার জন্য আল্লাহ তিরস্কার করেছেন, অর্থাৎ “বিচারবুদ্ধি তো আছেই, কেবল তারা প্রয়োগ করে না”। এছাড়াও ১০:১০০-তে বলা হয়েছে যে, এই বিচারবুদ্ধিই হলো ঈমানের চাবি। এই বিচারবুদ্ধিই মানুষকে ভালো-মন্দ কর্মের প্রতিফল তথা শেষ দিবসের জ্ঞান দান করে।

৩. আল্লাহর পক্ষ থেকে পরম স্রষ্টার ব্যাপারে নিজের অস্তিত্বের ভিতরে আধ্যাত্মিক অনুভূতি (স্পিরিচুয়াল ইনস্পিরেশান) মানুষ পাবেই (৪১:৫৩)।

অতএব, মানুষের ফিতরাত তথা জন্মগত গুণবৈশিষ্ট্যই তার পথচলার জন্য যথেষ্ট। প্রতিটা মানবের মাঝেই এই সহজাত আলো বিদ্যমান। আসলে এটিতো স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে, কেননা, তিনি মানুষকে তাঁর (কিছু) গুণবৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন:



فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا


“আল্লাহর ফিতরাত (বৈশিষ্ট্য) যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন… ” (সূরা রুম, ৩:৩০)

কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম দয়ার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মানুষের এই যাত্রাকে সহজ করতে কমপক্ষে আরো তিনটি স্তরের গাইডেন্স দান করেছেন। পরবর্তী এই তিনটি স্তরের মাঝে যে ব্যক্তি যত বেশি স্তরে পৌঁছতে পারবে, তার সিরাতুল মুস্তাকিমে চলা ততই সহজ হবে। আর এই তিনটি স্তর হলো:

১. ঐশী কিতাব (আমাদের জন্য কুরআন মজীদ)

২. নবুওয়্যাত (আমাদের জন্য হযরত মুহাম্মদ (সা.))

৩. ইমামত (হযরত আলী হতে ইমাম মাহদী পর্যন্ত ১২ ইমাম)

কোনো ধর্মেরই অনুসারী নয়, এমন ব্যক্তি গাইডেন্স এর মৌলিক স্তরে রয়েছে (ফিতরাত তথা জন্মগত বিবেক-বিচারবুদ্ধি-আধ্যাত্মিক অনুভূতি)। ইসলাম, খ্রিষ্ট ধর্ম ও ইহুদী ধর্মের অনুসারীরা পরবর্তী তিনটি স্তরের মাঝে দুটি স্তরের গাইডেন্স পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে : ঐশী কিতাব (ইহুদিদের তওরাত, খ্রিষ্টানদের ইঞ্জিল, মুসলমানদের কুরআন) ও নবুওয়্যাত (ইহুদিদের মূসা (আ.), খ্রিষ্টানদের ঈসা (আ.), মুসলমানদের মুহাম্মদ (সা.))।

আর সর্বশেষ স্তরের গাইডেন্স ইমামত পর্যন্ত যারা পৌঁছাতে পেরেছে, মুসলমানদের মাঝে তারা আহলে বাইতের অনুসারী বলে পরিচিত। (অধিকাংশ পাঠকের কাছে ইমামত বিষয়টি অচেনা লাগতে পারে, তবে কুরআনে (২:১২৪, ১৭:৭১-সহ বিভিন্ন আয়াতে) এটা সুস্পষ্ট যে, ইমামত হলো নবুওয়্যাত ও রিসালাতের মতই আল্লাহ প্রদত্ত একটি দায়িত্ব, এবং আল্লাহ যাঁকে ইচ্ছা নবী, রাসুল ও ইমাম মনোনীত করেন। এ বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা এই বইয়ের স্কোপের বাইরে।) [QR - ইমামত: নবুওয়্যাতের ন্যায় আল্লাহ প্রদত্ত একটি দায়িত্ব]



ইসলাম গ্রহণের পদ্ধতি ও জন্মসূত্রে মুসলিমদের করণীয়
মানুষ নানাভাবে ইসলামের সংস্পর্শে আসতে পারে। কেউ পারিবারিক/ সামাজিকভাবে, কেউবা আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা লাভের মাধ্যমে, কেউবা কোনো মুসলিমের উত্তম আচরণে মুগ্ধ হয়ে, কেউবা আবার যুক্তিতর্ক করতে গিয়ে, আর কেউ হয়ত কুরআনের ভুল খুঁজতে এসে! যে যেভাবেই আসুক না কেন, স্বযং কুরআন যেখানে যুক্তি ও দর্শন ব্যবহার করে কথা বলছে এবং বলছে যে আক্বল তথা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করা হলো ঈমানের চাবিকাঠি, তখন আক্বল প্রয়োগ করা ছাড়া উপায় নেই। তাই ইসলামের কাছে যে যেভাবেই এসে থাকুন না কেন, সেটা আবেগের বশেই হোক কি গোঁড়ামির সূত্র ধরেই হোক, আসুন, আমরা নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে “উৎসের সন্ধান” করতে করতে স্রষ্টাভাবনায় মগ্ন হই, এবং ইসলাম সঠিক কিনা, তা আক্বল তথা “যুক্তি ও দর্শনের মানদণ্ডে” যাচাই করে দেখি। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর ইচ্ছা, এবং আমাদের জন্য অন্ধবিশ্বাস ছেড়ে ঈমানের দুয়ারে প্রবেশের চাবি।

_______________________________


প্রত্যেকের ক্বলবে দেখা দেয়া আল্লাহর ওয়াদা। (৪১:৫৩) মানুষ জন্মগতভাবেই আলোপ্রাপ্ত। (৩০:৩০)

ঐশী কিতাব, নবী ও ইমাম -- পথচলা সহজ করতে আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার।


সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং সত্যই হওয়া উচিত বিতর্কের লক্ষ্য। লেখক-পাঠক বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে নিচের কোডটি স্ক্যান করুন


মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…