সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জ্ঞানের জগত ও হৃদয়ের জগত | অনন্তের পথে


একটা শিশু জন্মের পর থেকে নানাভাবে প্রভাবিত হতে শুরু করে। সমাজ, পরিবার, পারিপার্শ্বিকতা তাকে প্রভাবিত করে নানাভাবে। এর সবটাই যে খারাপ ও ‘ব্রেইনওয়াশিং’, তা নয়। কিন্তু এর সবটা আবার ভালোও নয়। সবচেয়ে বড় কথা, এটা মানুষকে একটা বৃত্তে বন্দী করে ফেলে: তার চোখে একটা চশমা পরিয়ে দেয়। ঐ চশমা দিয়ে যে দেখতে ভালো, সে-ই ভালো, অন্যরা সব খারাপ ও অগ্রহণযোগ্য।

কিন্তু বিচারবুদ্ধি তথা যুক্তি ও দর্শন প্রতিটা মানুষের জন্মগত গুণ, তেমনি মানুষের জন্মগত গুণ হলো বিবেক। আর এইসব সহজাত গুণই মানুষকে তার প্রথম বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার অনুপ্রেরণা যোগায়। কিন্তু সেখানেই শেষ না। প্রথম বৃত্ত থেকে বেরিয়ে তখন সে দ্বিতীয় বৃত্তে এসে পড়ে। আর সেটা হলো ইন্টেলেকচুয়ালিটির জগত তথা জ্ঞানের জগত। আর বেশিরভাগ মানুষ এই বৃত্তে এসেই থেমে যায়। যুক্তি ও দর্শন ব্যবহার করে “দার্শনিকের সরলরৈখিক যাত্রায়” অগ্রসর হতে থাকে। মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করে সে। কেউবা গল্প-উপন্যাস-সাহিত্য নিয়ে মেতে ওঠে। কেউবা পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্য নিয়ে আরো বেশি জ্ঞানগবেষণা করে, আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় নিজেকে নিয়োজিত করে। অনেকে মেতে ওঠে রাষ্ট্রচিন্তা, সমাজব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে। আর অনেকে মেতে ওঠে ধর্ম নিয়ে: ধর্মীয় জগতের নানান পক্ষ-বিপক্ষ বিষয়ে ইন্টেলেকচুয়াল ডিসকোর্স (বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপচারিতা) চালিয়ে যেতে থাকে। শুধু তা-ই না, একে অপরকে প্রবলভাবে টানতে থাকে নিজের দিকে: যুক্তি ও দর্শন ব্যবহার করে পাওয়া তার সিদ্ধান্তই যে সঠিক, সেটা বুঝানোর চেষ্টা করতে থাকে। যেমনটা আমিও করেছি এই বইয়ে।

পাঠক! আমি সেখানেই বইটা শেষ করে দিতে পারতাম, কিন্তু এটা হয়ে যেত – yet another book on theology (ধর্মতত্ত্বের অসংখ্য বইয়ের জগতে আরো একটা বই)। কিন্তু আমি কষ্ট করে এই চতুর্থ ভাগটি লিখছিই শুধুমাত্র একারণে যে, পাঠককে যেন দ্বিতীয় বৃত্তের বাইরে বের করে আনতে পারি। আর সেই দ্বিতীয় বৃত্তটা হলো, জ্ঞানের জগত।

প্রথম বৃত্তটি হলো সমাজ ও পরিবারের শিখানো নানান ‘ধারণা’, যার মাঝে সত্য-মিথ্যা দু-ই থাকে। দ্বিতীয় বৃত্তটি হলো জ্ঞানের জগত, যেখানে আপনি যুক্তি ও দর্শন ব্যবহার করে সত্যের সন্ধান করেন। এবং এই জগতে এসেই আর কূলকিনারা পান না: পক্ষ-বিপক্ষ নানান বই পড়ে, নিজে শতরকম চিন্তা করে আর অনলাইনে বিতর্ক করতে করতেই কবরে প্রবেশের সময় এসে যায়। অথচ এই জ্ঞানের জগতের ঊর্ধ্বে একটা জগত আছে, সেটা হলো হৃদয়ের জগত: অসীমের জগত। সূরা ইখলাসের শেষ আয়াত আমাদেরকে যে জগতের দিকে হাতছানি দিয়ে ডাকে, সেই জগত।

সাধারণতঃ নাস্তিকেরা ক্বলবের (হৃদয়ের) জগতকে স্বীকার করেন না। তারা মানুষকে নিছক জৈবিক বস্তু হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। মানুষের সুখ-দুঃখ, ধর্মচিন্তা, স্রষ্টাভাবনা – সবই হলো “মস্তিষ্কের খেলা”, নিউরনের অনুরনন – এই হলো তাদের দাবী। আর হার্ট হলো শুধুই দেহে রক্ত পরিচালনা করার একটি মেশিন, এরচেয়ে বেশি কিছু নয়। সোজা কথা, হৃদয়ের জগতকে অস্বীকার করেন তারা। দুঃখজনক হলেও সত্য, বেশিরভাগ ধার্মিকেরও অবস্থা একই। তারা হৃদয়ের জগতকে সরাসরি অস্বীকার না করলেও, এই জগত সম্পর্কে তারা বেখবর। অথচ “হৃদয়ের জগত” বলে আলাদা একটি ব্যাপারই আছে, এটি নিছক রূপক অর্থে ব্রেইনের কিছু অনুভূতির নাম নয়। পবিত্র কুরআন থেকে সেই জগত সম্পর্কে আমি কিছু ইঙ্গিত দিতে চাই মাত্র। এখানে আমি কোনো যুক্তিতর্ক করবো না, বরং শুধুমাত্র সেই জগতের কিছু ইঙ্গিত দিয়ে যাব।


ক্বলবের দর্শন, শ্রবণ ও বয়ান


“The soul has been given it's own ears

to hear things that the mind does not understand.” - Maulana Rumi

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,



أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الأرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا فَإِنَّهَا لا تَعْمَى الأبْصَارُ وَلَكِنْ تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ (٤٦)


“তারা কি জমিনে ভ্রমণ করে নি যাতে তারা এমন ক্বলবের (হৃদয়ের) অধিকারী হতে পারে যার ফলে তারা বিচারবুদ্ধি দ্বারা অনুভব করতে পারবে অথবা এমন কর্ণের (অধিকারী হবে) যা দ্বারা তারা (অনুধাবন করার মতো করে) শ্রবণ করবে? নিঃসন্দেহে (সত্যকে জানতে পারা ও গ্রহণের ব্যাপারে) দৃষ্টিসমূহ অন্ধ হয় না, বরং বক্ষস্থিত ক্বলব (হৃদয়) সমূহই অন্ধ হয়।”

(সূরা হজ্জ্ব, ২২:৪৬)


এই আয়াতে আল্লাহপাক চোখ এবং হৃদয়কে স্পষ্টভাবে আলাদা করে দিচ্ছেন। আমরা জানি, আমাদের চোখ মস্তিষ্কের সাথে সম্পর্কযুক্ত। চোখ দিয়ে যা দেখি, ব্রেইনের নিউরনে তা সংরক্ষিত হয়। এই চোখটা নষ্ট হয়ে গেলে, কিংবা মস্তিষ্কের সংশ্লিষ্ট নিউরনগুলি নষ্ট হয়ে গেলে মানুষ আর দেখতে পায় না: অন্ধ হয়ে যায়। এটা হলো চোখের অন্ধত্ব। আল্লাহপাক বলছেন, “নিশ্চয়ই চোখ অন্ধ হয় না, বরং বক্ষস্থিত ক্বলব অন্ধ হয়” -- তার মানে কী?

তার মানে হলো, আমাদের ক্বলব তথা হৃদয়ও দেখতে পায়, আবার বিভিন্ন কারণে তা অন্ধও হয়ে যায়! আমাদের চোখ যা দেখে, হৃদয় নিশ্চয়ই সেই একই জিনিস দেখে না। দেখার জন্য চোখ আলোর উপর নির্ভরশীল, ক্বলব নিশ্চয়ই আলোর উপর নির্ভরশীল নয়। চোখ যেভাবে অন্ধ হয়, ক্বলব নিশ্চয়ই সেভাবে অন্ধ হয় না!

অর্থাৎ, চোখের যেমন দর্শন (vision - দৃষ্টিশক্তি) আছে, তেমনি ক্বলবেরও দর্শন (vision-দেখার ক্ষমতা) আছে। আর এটা কোনো আলঙ্কারিক কথা নয়। লক্ষ্য করুন, এখানে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছেন যে, “বক্ষস্থিত ক্বলব”। অর্থাৎ, এখানে ক্বলব বা হৃদয় শব্দটি আলঙ্কারিক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। বরং আমাদের বুকের ভিতরে যে হৃৎপিণ্ড আছে, সেটার কথাই বলা হচ্ছে। অর্থাৎ, ক্বলবের দর্শন (vision) আছে, যা আলোর উপর নির্ভরশীল নয়। তবে তা কেমন? সে চিন্তা নাহয় আপাততঃ থাক। কিন্তু ক্বলব দেখতে পায়, সে কি শুনতেও পায়? আল্লাহপাক কুরআনে বলেন,



وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ


“আর আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে জিজ্ঞাসা করে আমার ব্যাপারে (তখন তাদেরকে বলুন,) নিঃসন্দেহে আমি (তাদের) অতি নিকটে। কোনো প্রার্থনাকারী যখন আমার কাছে আর্তি জানায়, আমি তার সে আবেদনে সাড়া (জবাব) দিয়ে থাকি।…” (সূরা বাকারা, ২:১৮৬)


কিন্তু কই, আল্লাহর সেই জবাব আমরা শুনতে পাই না কেন? কারণ আমরা যে সেই জবাব কান দিয়ে শোনার চেষ্টা করি, চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করি! অথচ আল্লাহ তো উত্তর দেন ক্বলবের ভিতরে। ক্বলবের যেমন দর্শন (vision) আছে, তেমনি তার শ্রবণশক্তিও আছে। কিন্তু সেটা আমাদের কানের মত বায়ু ও শব্দতরঙ্গের উপর নির্ভরশীল নয়। আমাদের ক্বলব কি কথাও বলতে পারে? দেখুন সূরা আর রহমানে আল্লাহ তায়ালা কী বলছেন–



الرَّحْمَنُ (١)

عَلَّمَ الْقُرْآنَ (٢)

خَلَقَ الإنْسَانَ (٣)

عَلَّمَهُ الْبَيَانَ (٤)



আর রহমান (পরম দয়াময়)

আল্লামা আল কুরআন (শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন)

খলাক্বাল ইনসান (সৃষ্টি করেছেন মানব)

আল্লামাহু আল বায়ান (শিখিয়েছেন বায়ান (উত্তম ও সূক্ষ্ম প্রকাশকৌশল))। (সূরা আর-রহমান, ৫৫:১-৪)

এইযে আল্লাহ তায়ালা বয়ান (بَيَانَ) তথা অনুভূতির উত্তম ও সূক্ষ্ম প্রকাশকৌশল শিক্ষা দিয়েছেন, এটা মানুষের মুখের ভাষাও বটে, তবে মূলতঃ এটা হলো ক্বলবের ভাষা। অর্থাৎ, ক্বলবের মেসেজ পাঠানোর ক্ষমতা। আল্লাহপাক আমাদের ক্বলবকে যেমন দেখার শক্তি দিয়েছেন, শোনার শক্তি দিয়েছেন, তেমনি আমাদের ক্বলবকে বয়ান তথা কথা বলা শিখিয়েছেন। তবে নিশ্চয়ই সেই দেখা, শোনা ও বলা আমাদের ব্রেইনের সাথে সংযুক্ত চোখ-কান-মুখের মত করে নয়, বস্তুজগতের মাধ্যম (বায়ু ও আলো) ব্যবহার করে নয়। ক্বলব বা হৃদয় যখন যোগাযোগ করে, তখন সেটি বস্তুজগতের কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে করে না। ফলে এটা অসম্ভব নয় যে, কোনোরকম মাধ্যম ছাড়াই একজন সাধক ব্যক্তি বহুদূরে অবস্থিত আরেকজন সাধকের ক্বলবের সাথে সংযোগ স্থাপন করবেন এবং যোগাযোগ করবেন; কেননা, তারা উভয়েই ক্বলবের দর্শন, শ্রবণ ও বয়ানে সক্ষম।


আমাদের প্রার্থনা কেন কবুল হয় না?

আমরা বছরের পর বছর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, কিন্তু কাজ হয় না কেন? কারণ আমরা ব্রেইন দিয়ে চিন্তা করে প্রার্থনা করি, তারপর চোখ দিয়ে সেটার প্রতিফলন দেখার চেষ্টা করি, কান দিয়ে শোনার চেষ্টা করি। আমরা মুসলিম হয়েও সীমা/ মাত্রার জগতে নিজেদেরকে বন্দী করে রাখি, মাত্রার ঊর্ধ্বে ওঠার চেষ্টা করি না। ফলে আমাদের মুসলিম থেকে মুমিনে উত্তোরণ ঘটে না। আমরা আল্লাহ তায়ালাকে ক্বলবের (হৃদয়ের) চোখ দিয়ে দেখি না, ক্বলব দিয়ে তাঁর উত্তর শুনি না, ক্বলব দিয়ে তাঁর কাছে প্রার্থনা করি না। বুদ্ধিবৃত্তির জগতে আমরা অনেকে বড় বড় বিতার্কিক, দার্শনিক, যুক্তিবিদ, আলেম ইত্যাদি, কিন্তু হৃদয়ের জগতে আমরা বেশিরভাগই শিশু – অ-আ-ক-খ-ও জানি না!

আমরা ছোটবেলায় যেমন কয়েক বছর ধরে অ-আ-ক-খ শিখেছি, ১-২-৩-৪ শিখেছি, তেমনি আমাদেরকে ক্বলবের জগতের অ-আ-ক-খ-ও শিখতে হবে। তারপর যখন আমরা ক্বলব দিয়ে প্রার্থনা করতে শিখব, তখন দেখব যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকল আর্তিরই জবাব দিচ্ছেন।


“For every cry- O Lord, there are thousand replies: Here I am!” - Maulana Rumi


ক্বলবের অন্ধত্ব

কাফিরদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,



صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لا يَرْجِعُونَ (١٨)



“তারা বধির, বোবা ও অন্ধ। সুতরাং তারা (সত্যের দিকে) ফিরে আসবে না।” (সূরা বাকারা, ২:১৮)

অথচ কই, তারা তো ঠিকই চলেফিরে খাচ্ছে, কথা বলছে, বরং বেশিই বলছে! চোখ দিয়ে দেখছে, বরং যা দেখা উচিত নয়, তা-ও দেখছে! কান দিয়ে শুনছে, যা শোনা উচিত নয়, তা-ও শুনছে! আসলে এই অন্ধত্ব হলো ক্বলবের অন্ধত্ব। কারো চোখদুটি যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাতে পৃথিবীর সৌন্দর্য কিছুমাত্র কমে না, সূর্যটাও মিথ্যা হয়ে যায় না। বরং সে-ই আর সৌন্দর্য দেখতে পায় না, নিজেকে দূরে সরিয়ে ফেলে সৌন্দর্য থেকে। রহমান আল্লাহ তায়ালা যে বয়ান শিক্ষা দিয়েছেন, তা ব্যবহার করে সে আর কথা বলতে পারে না, পরম স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করতে পারে না। পরম স্রষ্টা যদি তাকে ডাকেনও, সে আর তা শুনতে পায় না, কেননা পাপ করতে করতে সে নিজের ক্বলবকে খতম করে ফেলেছে। সে হয়ে গিয়েছে বধির, বোবা ও অন্ধ, যদিও সে কথা বলে, চোখে দেখে এবং কানে শোনে! একারণেই আল্লাহপাক বলছেন,




إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ ءَأَنْذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنْذِرْهُمْ لا يُؤْمِنُونَ (٦) خَتَمَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَعَلَى سَمْعِهِمْ وَعَلَى أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ

“নিশ্চিতই যারা কাফির হয়েছে (অর্থাৎ সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে), তাদেরকে আপনি সতর্ক করুন বা না-ই করুন, তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের ক্বলব সমূহের ওপর মোহর করে দিয়েছেন (তাদের হৃদয়কে সত্য অনুধাবনে অক্ষম করে দিয়েছেন), আর তার শ্রবণশক্তিকেও (মোহর করে দিয়েছেন) এবং তাদের (সত্য-) দর্শনশক্তির ওপর আছে পর্দা।” (সূরা বাকারা, ২:৬-৭)

এবং তার এই দুরবস্থার দায় আল্লাহর নয়। বরং প্রথমে সে ফাংশনে ইনপুট দিয়েছে (সত্য উপস্থাপিত হবার পর তা প্রত্যাখ্যান করেছে, নিজের জন্য মন্দ তাক্বদীরকে বেছে নিয়েছে), ফলে আল্লাহ তায়ালা তাকে ফাংশনের আউটপুট পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছেন: তার ক্বলবকে খতম করে দিয়েছেন। আর কেন আল্লাহ তায়ালা এভাবে নিজের কর্তৃত্বকে সংযুক্ত করে কথা বলেন, তা আমরা আগে আলোচনা করেছি।


ঈমান হলো ক্বলবের বিষয়



قَالَتِ الأعْرَابُ آمَنَّا قُلْ لَمْ تُؤْمِنُوا وَلَكِنْ قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الإيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ

“আরবরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। বলুন, তোমরা ঈমান আনোনি, বরং বলো - ‘আমরা আত্মসমর্পন করেছি’ (‘আসলামনা’ - ইসলাম গ্রহণ করেছি)। এখনও তোমাদের ক্বলবসমূহে ঈমান প্রবেশ করেনি।…” (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৪)


অর্থাৎ, ইন্টেলেকচুয়ালি (বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে, ব্রেইন ব্যবহার করে) আল্লাহর অস্তিত্ব, নবীর সত্যতা, ঐশী কিতাবের সত্যতা – ইত্যাদি তোমরা মেনে নিয়েছ ঠিকই, কিন্তু বৃত্তের বাইরে পা ফেলোনি, জ্ঞানের জগত থেকে হৃদয়ের জগতে আসোনি, হৃদয়ের জগতে আমাকে ইয়া রব বলে ডাকোনি‍! তুমি এখনো প্রার্থনা করো ব্রেইনকে ব্যবহার করে, অথচ তোমার ব্রেইনকে আমি দিয়েছিলাম যেন তুমি এটা ব্যবহার করে মস্তিষ্কের শেষ সীমা ছুঁয়ে ফেলো, সূরা ইখলাসের দর্শনের উপর ভিত্তি করে অনন্তের পথে পা বাড়াও!


অনন্তের পথে…

কিন্তু আপনি অনন্তের পথে পা বাড়াবেন কিভাবে? সেই শক্তি কি আপনার আছে? মানুষ হিসেবে সর্বশেষ বৃত্তের বাইরে পা ফেলার শক্তি আমাদের নেই। সেজন্যে বাইরে থেকে আল্লাহর সাহায্য আসতে হবে। আপনি-আমি বড়জোর ইন্টেলেচুয়ালি স্রষ্টাভাবনা করতে করতে মানব মস্তিষ্কের শেষ সীমাটাকে ছুঁয়ে ফেলতে পারি। তারপর যখন বৃত্তের সীমায় এসে পড়ে যাব, প্রকৃত অসীম (true infinity) পরম স্রষ্টাকে নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে বারবার স্তম্ভিত হয়ে যাব, ভাগ্যপ্রশ্নের উত্তর পেতে গিয়ে পরম স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ অর্জনের চিন্তা করব – তখন ঐপারে খোদাতায়ালা দেখবেন যে, তাঁকে পাবার জন্য বান্দা কতই না কষ্ট করছে! তখন তিনি আপনাকে-আমাকে ডেকে তুলবেন। টেনে নিয়ে যাবেন বৃত্তের বাইরে, অনন্তের পথে। আর তিনি যে ডাকবেন, সেই ওয়াদা সত্য। আল্লাহপাক কুরআনে বলেন,



سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ



“শীঘ্রই আমি তাদেরকে (পরম স্রষ্টার) নিদর্শন দেখাবো দিগন্তসমূহে (অর্থাৎ সৃষ্টিজগতে), এবং তাদের নিজেদের সত্ত্বার ভিতরে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তিনি(অর্থাৎ আল্লাহ)ই হক্ব (সত্য)।…” (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৫৩)


এইযে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তার সত্তার ভিতরে পরম স্রষ্টার ব্যাপারে আধ্যাত্মিক অনুভূতি (spiritual inspiration-ইলহাম) দান করবেন, যেন মানুষ বুঝতে পারে যে তিনি (আল্লাহ) সত্য – এটাই হলো মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা, বৃত্তের বাইরে নিয়ে আসা।


আল্লাহ তায়ালার এই ওয়াদা অবশ্যই পূরণ হবে। অতএব, নিশ্চয়ই প্রতিটা মানুষ তার অন্তরে আল্লাহ তায়ালাকে এমনভাবে অনুভব করবে যে, তাতে কোনোই সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। অতঃপর যে ব্যক্তি হৃদয়ে অনুভব করা স্রষ্টাকে মান্য করবে, সে মুক্তি পাবে, এবং যে ব্যক্তি সেই আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার (spiritual inspiration) বিপরীতে চলবে, সে বন্দী হয়ে পড়বে। সেই বিস্ময়কর মুহুর্ত যে কার জীবনে কখন কোন সূত্রে কিভাবে আসবে, তা বলা কঠিন। তবে অন্ততঃ এতটুকু বলা যায় যে, হয় আপনি তা ইতিমধ্যে পেয়ে গেছেন, নতুবা সামনে তা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। এমন এক মুহুর্ত, যখন আপনি সর্বান্তঃকরণে আল্লাহ তায়ালাকে অনুভব করছেন, যেদিকেই তাকাচ্ছেন, শুধু তাঁকেই দেখতে পাচ্ছেন। সমস্ত দেহ-মন-আত্মা যেন হঠাতই এক পবিত্র পানিতে বিধৌত হয়ে আপন আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে। জীবনের এই মহা ক্ষণটির কথা আপনি কাউকে বলতে পর্যন্ত পারছেন না, কেননা, প্রথমবারের মত অনুভব করতে পারছেন যে, স্রষ্টা আপনাকে কিনে নিয়েছেন, তাঁর অনুমতির বাইরে আপনার কিছুই করার শক্তি নেই।

হয়ত ভাবছেন, কই আমার তো তেমন আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা কখনো হলো না? হয়ত আল্লাহ ডেকেছেন, কিন্তু আপনি ফের ঘুমিয়ে পড়েছিলেন! হয়ত এই লেখাটিই আপনাকে সেই ডাক সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে, কে জানে! তবে হতাশ হবেন না। তিনি দেখা দিয়ে যাবেনই, “যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনার কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তিনি(অর্থাৎ আল্লাহ)ই হক্ব।” এটাই আল্লাহপাকের ন্যায়বিচারের দাবী। আপনি শুধু ফের ঘুমিয়ে যেয়েন না!


“The breeze at dawn has secrets to tell you,

do not go back to sleep!” - Maulana Rumi


শুধু জ্ঞান দ্বারা ঈমান অর্জন হয় না

পাঠক! বইয়ের দ্বিতীয় ভাগে বিশ্বাস, জ্ঞান ও ঈমান নিয়ে আলোচনা করেছি। বিশ্বাস (belief), জ্ঞান (knowledge) ও ঈমান (spiritual protection) এর পার্থক্য সেখানে আলোচনা করেছি। বিশ্বাস হলো অনিশ্চিত বিষয়ের ক্ষেত্রে ধারণা মাত্র। জ্ঞান বা ইলম হলো কোনো বিষয় নিশ্চিতভাবে জানা। যেমন, যুক্তিপ্রমাণ দিয়ে নিশ্চিতভাবে জানা যে, আল্লাহ তায়ালাই বিশ্বজগতের স্রষ্টা। এরপর এটা মেনে নিয়ে সে অনুযায়ী কাজ করলে তখন মানুষ পরকালীন শাস্তি থেকে নিরাপদ হয়ে যায়, অর্থাৎ মুমিন হয় বা ঈমান অর্জন করে। যেমন, ইবলিশ “বিশ্বাস/ ধারণা” করতো না যে আল্লাহ তায়ালাই বিশ্বজগতের স্রষ্টা, বরং সে “জানতো” যে আল্লাহ তায়ালা বিশ্বজগতের প্রতিপালক, রব। তাইতো আল্লাহ তায়ালা তাকে অভিশপ্ত করে বের করে দেবার সময় সে আল্লাহকে “ইয়া রব” সম্বোধন করে বলেছিল, “হে আমার রব! আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন।”

অর্থাৎ, সে জানতো (তার জ্ঞান ছিল), কিন্তু মানে নাই (জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে নাই), তাই তার ঈমান অর্জন হয়নি। সে ছিল জ্ঞানপাপী।

পক্ষান্তরে, আমরা সাধারণ মুসলমানেরা (অথবা যেকোনো অমুসলিম/ নাস্তিক) যখন বিশ্বাসের স্তর থেকে উঠে জ্ঞান স্তরে প্রবেশ করি এবং মুসলিম হই, আমরা জ্ঞান অর্জন করি মাত্র, কিন্তু ঈমান তথা নিরাপত্তা অর্জিত হয় না তখনো। সেই জ্ঞান অনুযায়ী আমল করলেই কেবল ঈমান অর্জন হয়। পক্ষান্তরে, সেই জ্ঞানের বিপরীতে গেলে শয়তানের মত জ্ঞানপাপী হয়। শয়তানের থেকে আমাদের পার্থক্য কেবল এটুকু যে, সে জ্ঞান অর্জন করেছে কিন্তু জেনেশুনে জ্ঞানের বিপরীতে গিয়েছে (আল্লাহর অবাধ্য হয়েছে), আর আমরাও জ্ঞান অর্জন করলাম, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আক্বল (বিচারবুদ্ধি) প্রয়োগ করে আল্লাহ ও কুরআন যে সত্য, তা মেনে নিলাম, তবে আমরা এখনও বিপরীতে যাইনি (তাই শয়তানের মত জ্ঞানপাপী হয়ে অভিশপ্ত হইনি), কিন্তু আমরা তার অনুকুলেও যাইনি (ফলে এখনো ক্বলবে ঈমান প্রবেশ করেনি)। আমাদের বর্তমান অবস্থা নিম্নোক্ত আয়াতের মত:



قَالَتِ الأعْرَابُ آمَنَّا قُلْ لَمْ تُؤْمِنُوا وَلَكِنْ قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الإيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ

“আরবরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। বলুন, তোমরা ঈমান আনোনি, বরং বলো - ‘আমরা আত্মসমর্পন করেছি’ (‘আসলামা’ - ইসলাম গ্রহণ করেছি)। এখনও তোমাদের ক্বলবসমূহে ঈমান প্রবেশ করেনি।…” (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৪)


শুধুমাত্র কথার জগত শয়তানের কাজ

পাঠক, আশা করি এতক্ষণে পরিষ্কার হয়েছে যে, শুধুমাত্র জ্ঞানের জগত যথেষ্ট নয়। শয়তান চায় যে, আমরা যেন শুধুমাত্র জ্ঞানের জগতেই বন্দী হয়ে থাকি, বৃত্তের বাইরে অনন্তের পথে পা না বাড়াই, ক্বলবের জগতে প্রবেশ না করি। এই লক্ষ্যে শয়তান নাস্তিক-ধার্মিক সবাইকেই ধোঁকা দিয়ে থাকে, এবং মানুষকে ভুলিয়ে দেয় যে, অনন্তের জগতে সংযুক্ত হবার চ্যানেল তার ভিতরেই আছে (অর্থাৎ, তার ক্বলব)।



وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيَاطِينَ الإنْسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا



এমনিভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্যে শত্রু করেছি শয়তান, মানব ও জিনকে। তারা ধোঁকা দেয়ার জন্যে একে অপরকে কারুকার্যখচিত কথাবার্তা শিক্ষা দেয়।…(সূরা আনআম, ৬:১১২-১১৩)


নাস্তিকদেরকে শয়তান ধোঁকা দেয় এই বলে যে, পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বাইরের সবই হলো কল্পনা, স্রষ্টাকে চোখে দেখা যায় না অতএব পরম স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই, মানুষ হলো শুধুমাত্র জৈবিক সত্তা, আত্মা বলে কিছু নেই, ব্রেইন-ই সব, ইত্যাদি। অপরদিকে ধার্মিকদেরকেও শয়তান ধোঁকা দেয়, বরং ধার্মিকদের পিছনেই শয়তান আরো বেশি লেগে থাকে, যেন ইসলামের নাম করেই তাকে ক্বলবের জগত থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়। এই লক্ষ্যে শয়তান ও তার মানব এজেন্টরা ধর্মপ্রচারক সেজে বসে, দেশে দেশে ইসলাম প্রচার করে বেড়ায় এবং মানুষকে ইসলাম, ঈমান, তাক্বদীর ইত্যাদি বিষয়ের ভুল অনুবাদ ও বিকৃত ব্যাখ্যা শিক্ষা দেয়। ফলে অধিকাংশ মুসলমান ইসলাম, ঈমান ও তাক্বদীর এর প্রকৃত তাৎপর্য জানতে পারে না। শয়তানের এজেন্ট ধর্মপ্রচারকেরা তাকে ক্বলবের জগত সম্পর্কে বেখবর করে রাখে, এবং যে কেউ আধ্যাত্মিক জগতের সাথে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিতে চায়, তাকে ইসলামবহির্ভুত, বেদাতী, কাফির ইত্যাদি নানান আখ্যা দিয়ে নিজেদের ধর্মীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখে। একইসাথে তারা এইসব ভ্রান্ত ধারণাকেই ইসলাম হিসেবে তুলে ধরে নাস্তিকদের সম্মুখে, ফলে নাস্তিকরা যদিওবা ইন্টেলেকচুয়ালি সেগুলিকে গ্রহণ করে, তারাও প্রকৃত ঈমানের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়, এবং ক্বলবের জগতে হৃদয় থেকে হৃদয়ে সংযোগ স্থাপনের সুধা থেকে বঞ্চিত হয়। মূলতঃ এগুলো সবই শয়তানের সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র। সে তো মানুষের প্রকাশ্য দুশমন।


জ্ঞান কখন ক্বলবের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়?

আল্লাহপাক কুরআনে বলেন,



أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً

“আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে তার প্রবৃত্তিকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে? আল্লাহ তাকে জ্ঞানের উপর গোমরাহ (পথভ্রষ্ট) করেছেন; তিনি (সত্য শ্রবণ ও গ্রহণের ব্যাপারে) তার শ্রবণশক্তি ও তার ক্বলবের ওপর মোহর করে দিয়েছেন এবং (সত্য দর্শনের ব্যাপারে) তার দর্শনশক্তির ওপর পর্দা ফেলে দিয়েছেন।” … (সূরা জাসিয়াহ, ৪৫:২৩)

অর্থাৎ, যারা নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব করে, তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ আল্লাহপাক জ্ঞানপাপী (জ্ঞানের উপর গোমরাহ) করে দেন। ফলে জ্ঞানের জগত ব্যবহার করে সে অনন্তের পথে যাত্রা করবে কি, এই জ্ঞানের জগতই তাকে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে, এবং তাকে অনন্তের পথে যাত্রা করবার মুক্তিবেগ অর্জন করতে দেয় না। “আমি এতদিন ধরে নাস্তিক, আমার এত পরিচিতি, এত লেখালেখি, এত নামডাক, এখন আমি ইসলামকে মেনে নেব? লোকে কী বলবে আমাকে? এটাতো আমার জন্য লজ্জাজনক। নাস্তিকদের ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ জগতের বাহবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হব? উল্টা তাদের নিন্দা শুনতে হবে? ” অর্থাৎ, তাকে আত্মবিপ্লবের পথ থেকে সরিয়ে রাখে। একই অবস্থা অবশ্য ধার্মিকদের মাঝেও হতে পারে: “আমি এতদিন যেভাবে বাপ-দাদার ধর্ম জেনে এসেছি, সেই মতের পক্ষ নিয়ে এত বিতর্ক করেছি, তর্কে জিতেছি, লেখালেখি করেছি, আজকে সেগুলিকে সব ভুল বলে স্বীকার করব? সত্য গ্রহণ করে নিলে লোকে আমাকে ওমুক মাযহাবের ট্যাগ লাগিয়ে দেবে, ওমুকপন্থী বলে ডাকবে। আর বহু লোকের বহু প্রশ্নের জবাবও দিতে হবে…” এসব ভাবনাই মানুষকে সত্য ও অনন্তের পথে যাত্রা করবার মুক্তিবেগ অর্জন করতে দেয় না।


ব্রেইন ঘাড়ে চেপে বসা


পাঠক! সমাজ-পরিবারের বৃত্তটির সব খারাপ নয়, আবার সব ভালোও নয়। একইভাবে দ্বিতীয় বৃত্ত তথা জ্ঞান বৃত্তের সবটাই খারাপ নয় যে, একে ত্যাগ করতে হবে! তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, ইন্টেলেক্ট যেন আমাদের ঘাড়ের উপর চড়ে না বসে। আমরা যেন আমাদের ব্রেইনকে পরিচালনা করি; ব্রেইন যেন আমাদেরকে পরিচালনা না করে। আমাদের জ্ঞানের জগতের সকল চর্চাকে ব্যবহার করতে হবে বৃত্তের বাইরে যাবার জন্য, যেন অনন্তের পথে যাত্রা করতে পারি। এরমানে এই নয় যে জ্ঞানের জগতকে ত্যাগ করব, আমাদের মাঝে কোনো ইন্টেলেকচুয়ালিটি থাকবে না। জ্ঞানের স্তর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নাম আধ্যাত্মিকতা নয়। বরং জ্ঞানের স্তরকে ধরে রেখেই উর্ধ্বযাত্রা করার নাম আধ্যাত্মিকতা। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে কখনোই ত্যাগ করা যাবে না। বরং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাই তো ঈমানের দরজা। কিন্তু আমাদেরকে মূল লক্ষ্য ঠিক রাখতে হবে। শুধু জ্ঞানের জগতে সীমাবদ্ধ থাকতে চলবে না, আমাদেরকে অবশ্যই হৃদয়ের জগতে মেরাজ (উর্ধ্বযাত্রা) করতে হবে।

পক্ষান্তরে আমরা যদি ব্রেইনের লাগাম টেনে ধরে তাকে নিজেদের সুবিধামত ব্যবহার না করি, বরং ব্রেইন-ই আমার ঘাড়ে চেপে বসে, তাহলে দেখা যাবে আমরা “ইন্টেলেকচুয়াল ইসলামে” হাবুডুবু খেতে খেতেই মাথার চুল সাদা করে ফেলব, কিন্তু হৃদয়ের জগতে শূন্যহাতে পড়ে রইবো। ইসলামের দুনিয়াবী যত নিয়ম কানুন, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা, ব্যাংকিং, শরীয়তের সূক্ষাতিসূক্ষ্ম বিষয় কিংবা ভাগ্য সংক্রান্ত নিছক তাত্ত্বিক আলোচনা – ইত্যাদিতে ডুবে থেকে আমরা ভুলে যাবো যে: “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন।” আমরা ভুলে যাবো যে, আমাদের চলার পথ দার্শনিকের মত সরলরৈখিক নয়, বরং আ’রেফের (খোদাপ্রেমিকের) মত বৃত্তীয়: আমরা ফিরে যাবো সেখানে, এসেছি যেখান থেকে।


মানুষের মুখের ভাষার সীমাবদ্ধতা



هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلا اللَّهُ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ رَبِّنَا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلا أُولُو الألْبَابِ (٧)


“তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন; তাতে (বহু) সুস্পষ্ট আয়াত রয়েছে; সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্য (আয়াত) গুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা আছে, তারা ফিৎনাহ্ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তাতে (এ গ্রন্থে) যা যা রূপক (আয়াত) রয়েছে তার পিছনে লাগে এবং তার (মনগড়া) গূঢ় তাৎপর্যকে অবলম্বন করে। অথচ সেগুলোর গূঢ় তাৎপর্য আল্লাহ ও অকাট্য জ্ঞানের অধিকারীরা ব্যতীত কেউ জানে না। আর তারা (অকাট্য জ্ঞানীরা) বলে : আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি; এগুলোর সবই আমাদের রবের পক্ষ থেকে (অবতীর্ণ হয়েছে)। বস্তুতঃ প্রকৃত জ্ঞানবান লোকেরা ব্যতীত কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৭)

এটা খুবই স্বাভাবিক যে, সীমার উর্ধ্ব জগতের বিষয়াবলীকে মানবীয় ভাষায় বহিঃপ্রকাশ করা সম্ভব নয়। বড়জোর রূপকভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। যেমন, আলো, অন্ধকার, পতন, উর্ধ্বগমন, ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতভাবে অনুভব করতে হলে আল্লাহ তায়ালার পারস্পেক্টিভ অর্জন করতে হবে, যেটাকে বলা হয়: ফানাফিল্লাহ। আল্লাহ যাদেরকে সেসব জানাবেন, তারাই জানতে পারবে। কিন্তু সেটা ভাষার জগতের ঊর্ধ্বে, সরাসরি ক্বলব দিয়ে বুঝতে হবে। সেগুলি ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়। একারণেই আল্লাহপাক কুরআনে রূপকভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন শুধু।

[আধ্যাত্মিক বিষয়াবলী মানব সত্তাকে চুম্বকের মত টানে। এটার সুযোগ নিয়ে ইতিহাসে অজস্র ভণ্ডসাধু ধর্মব্যবসা করে গেছে ও করে যাচ্ছে। তারা সেইসব বিষয়কে স্পষ্ট মানবীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করে, যা স্বয়ং আল্লাহপাক মানবীয় ভাষায় প্রকাশ করেননি। প্রিয় পাঠক! তাদের ব্যাপারে খুব সাবধান থাকবেন! তারা কুরআন-হাদীস ব্যবহার করে এমনসব আধ্যাত্মিক কথা আপনাকে বলবে, যা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী, এবং অধিকাংশ সত্যও বটে, কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে এমনসব কথা বলবে, যা সুস্পষ্ট আক্বলবিরোধী। এধরণের সূক্ষ্ম ভণ্ডসাধুদের শনাক্ত করার উপায় হলো, তারা সরল মানবীয় ভাষায় আধ্যাত্মিক বিষয়াবলী বর্ণনা করে, অথচ আল্লাহপাক নিজে সেগুলিকে আয়াতে মুতাশাবেহ করেছেন - স্পষ্ট মানবীয় ভাষায় প্রকাশ করেননি, ইঙ্গিত দিয়েছেন শুধু।]

যা আল্লাহপাক নিজে ভাষায় উন্মোচন করেননি, মানুষ কিভাবে তা প্রকাশ করবে? তা ইতিহাসে কোনো মানবের পক্ষে সম্ভব হয়নি, সম্ভব নয় আপনার-আমার পক্ষেও। আমি কেবল সেই রাজদরবারের দরজাটির কারুকাজের প্রশংসা করে গেলাম, সেই হৃদয়ের জগতের দিকে আহবান করে গেলাম। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলো যে “চাহিদার শ্রেণীবিভাগ তত্ত্ব” দিয়েছেন, যার চূড়ান্ত স্তর হলো self actualization, সেটার তো আসলে দুটি ভাগ রয়েছে। প্রথম, ইন্টেলেকচুয়াল, এবং চূড়ান্ত: স্পিরিচুয়াল। দ্বিতীয় ভাগটি সম্পর্কে যদিও মাসলো’ বেখবর ছিল, কিন্তু সেই দ্বিতীয় ভাগটির সাথে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিতেই এই বইটি লেখা।


Selft actualization এর চূড়ান্ত স্তর

পাঠক! আপনার আশেপাশে তাকিয়ে দেখুন। হয়ত অনেক মানুষকে দেখবেন যে, আরো বেশি দৈহিক আরাম আয়েসের পিছনে না ছুটে তারা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের পিছনে শ্রম দিচ্ছে। কারণ একবার যখন মানুষ ইন্টেলেকচুয়াল সুখ পেতে শুরু করে, তখন জৈবিক সুখকে আর পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাবার আগ্রহ থাকে না। তখন ওটাকে মোটামুটিভাবে চালিয়ে নেয় সে।

একইভাবে মানুষ যখন একবার আধ্যাত্মিক জগতের স্বাদ আস্বাদন করে, তখন এই “চাহিদা-পিরামিডের” নিচের আর সকল স্তরকে সে কেবল মোটামুটিভাবে চালিয়ে নেয়, কিন্তু মেতে থাকে সর্বোচ্চ স্তর নিয়ে। যাত্রা করে খোদাপ্রেমের পথে, অনন্তের পথে।


ক্বলবের দর্শন, শ্রবণ ও বয়ান তথা ঈমান অর্জনের পথ কী?

রাসূল (সা.) বলেন, "আল্লাহ তাআলা বলেন- যে ব্যক্তি আমার কোন ওলির সাথে শত্রুতা পোষণ করে আমি তার বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করি। আমার বান্দার প্রতি যা ফরয করেছি তা দ্বারাই সে আমার অধিক নৈকট্য লাভ করে। আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য হাসিল করতে থাকে। অবশেষ আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার কর্ণ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমি তার চক্ষু হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাই, যে পা দিয়ে সে চলাফেরা করে। সে আমার কাছে যাকিছু প্রার্থনা করে, আমি তাকে তা দেই। সে যদি আমার নিকট আশ্রয় চায়, তাহলে আমি তাকে আশ্রয় দেই।”

অতএব, সকল ফরজ কাজ করতে হবে। সকল হারাম থেকে দূরে থাকতে হবে। এতে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য হাসিল হবে। পাশাপাশি যখন নফল ইবাদত করতে থাকবেন, তখন আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসার বস্তুতে পরিণত হবেন। তখন মুমিন হয়ে যাবেন, আর তখন আপনার দৃষ্টি ফানাফিল্লাহ হয়ে যাবে।

আক্বল প্রয়োগ করে আমরা এই কর্মপন্থা বুঝতে পারি। একারণেই আক্বল বা যুক্তিবুদ্ধি প্রয়োগ করা হলো ঈমানের দরজা। কিন্তু দরজা খুলে ঈমানের জগতে প্রবেশ করতে হলে সকল ফরজ ও হারাম মেনে চলে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করে নিতে হবে। এটিই ফানাফিল্লাহর পথ। মানুষের ভাগ্যপ্রশ্নের উত্তর জানার পথও এটিই।

প্রশ্ন জাগতে পারে, ফরজ কাজগুলির বাইরে নফল আমল কতটুকু করবেন? এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই বইয়ের স্কোপের বাইরে।[QR - আধ্যাত্মিক যাত্রার পূর্বপ্রস্তুতি]



তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে, দুটি জিনিসকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করুন। এক. আল্লাহর ধ্যান ও দুই. আল্লাহর জ্ঞান। আল্লাহর জ্ঞান হলো কিতাব কুরআন, আর আল্লাহর ধ্যান হলো গভীর রাত্রির নামাজ। সঠিক পদ্ধতিতে আক্বল প্রয়োগ করে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কুরআন অধ্যয়ন করুন। পাশাপাশি প্রবল আশা নিয়ে অশ্রুসজল আনত মস্তকে খোদাতায়ালার সামনে দাঁড়ান, প্রতিরাতে। এই দুটি করলে আপনি ঈমান অর্জনের পথে এগিয়ে যাবেন। এই দুটিই আপনার জীবন চলার পথকে গাইড করবে। সামাজিক-পারিবারিক-ব্যক্তিগত দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেও আপনি আরো বেশি কিছু করতে পারবেন, মানুষের তৃষ্ণার পানি হবেন!

_______________________________


ক্বলবের দর্শন, শ্রবণ ও বয়ান আছে। এটি কোনো রূপক কথা নয়।

সাধনার মাধ্যমে এটি অর্জন করা সম্ভব।


আপনি কী ভাবছেন? কমেন্টে শেয়ার করুন



মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…