সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মানুষ কেন নাস্তিক হয়? | অনন্তের পথে


স্রষ্টায় অবিশ্বাসী প্রতিটা মানুষেরই নাস্তিক হয়ে ওঠার পিছনে একটা গল্প থাকে। সেই গল্পটা আমরা দেখার চেষ্টা করি না। অথচ একজন প্রকৃত গবেষক সেই পিছনের কারণটি দেখার চেষ্টা করেন। ঠিক যেভাবে ডাক্তারেরা যে কেবল রোগ-ই সারান তা নয়, বরং রোগের কারণ খুঁজে বের করেন; তারপর সেটার প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার করেন, যেন তা খেয়ে মানুষ ভবিষ্যতে ঐ রোগ থেকে বাঁচতে পারে। আমাদের মুসলমানদের অনেক দায়িত্ব। আমাদের একদিকে যেমন অশান্ত হৃদয়গুলিকে শান্তির পথ দেখাতে হবে, অপরদিকে আর কেউ যেন নাস্তিক হয়ে না ওঠে, সেই ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে। আর সেজন্যে প্রথমে রোগের কারণ অনুসন্ধান করা আবশ্যক। আমাদের তাই দেখতে হবে, মানুষ কেন নাস্তিক হয়?


১. ধর্মের নামে অধর্ম মানুষকে নাস্তিক্যবাদের দিকে ঠেলে দেয়

আরজ আলী মাতুব্বরের কিশোর বয়সে তার মা মারা যান। আজীবন তাহাজ্জুদ গুজার মানুষ ছিলেন তিনি। আরজ মাতুব্বর শহর থেকে ক্যামেরাম্যান আনিয়ে তার মৃত মায়ের একটা ছবি তোলেন স্মৃতি হিসেবে। “ছবি তোলা হারাম” (!?) আর ছেলে সেই “হারাম” (!?) কর্ম করার দায়ে মানুষজন তার মায়ের জানাজা পড়তে রাজি হলো না। এই ঘটনা কিশোর আরজ মাতুব্বরের মনে গভীরভাবে দাগ কাটল। সে শুরু করল “সত্যের সন্ধান”। তাই থেকে সে হয়ে উঠল নাস্তিক। ‘নিরপেক্ষতার’ আড়ালে মূলতঃ ইসলামকের মিথ্যা ও অসার প্রমাণের চেষ্টাই করে গেল আজীবন। তারপর তার হাত ধরে আরো কত বাংলাদেশী নাস্তিক হলো… গোটা এক বিষবৃক্ষ জন্ম নিল। অথচ এই বিষবৃক্ষের বীজ বপন করেছিল কারা? ‘ধার্মিকেরা’, যারা ধর্মের নামে অধর্ম করেছে, এবং ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে মানুষকে ইসলাম থেকেই দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আজকে আরজ মাতুব্বর ও তার অনুসারীদের নাস্তিকতার পাপের জন্য কি সেই তথাকথিত ‘সহীহ’ ধার্মিকদের একটুও দায় নেই?

এইভাবে অনেকে ইসলামকে বিকৃতভাবে চর্চা ও উপস্থাপন করেছে ও করে যাচ্ছে, ফলস্বরূপ বহু মানুষ স্রষ্টাবিমুখ হয়ে যাচ্ছে। ওসব মানুষের এই খোদাবিমুখতার দায় কি বিকৃত ইসলাম চর্চাকারীদের উপর একটুও আসবে না? কে তাদেরকে বলেছিল ইসলামের পবিত্র পতাকা হাতে তুলে নিতে? ইসলামের পতাকা যদি যেনতেন মানুষই হাতে তুলে নিতে পারবে, তাহলে আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসুলগণের মত নিষ্পাপ ব্যক্তিদেরকে প্রেরণ করতেন না। আমরা কি চিন্তা করি না?


২. পাপ

পাপ মানুষকে দুইভাবে নাস্তিক্যবাদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। প্রথমতঃ, একদিকে বিবেকের দংশন ও অপরদিকে প্রবৃত্তির টান – এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে প্রবৃত্তিকে বিজয়ী করতে গিয়ে। এই প্রকারের নাস্তিকতা পুরোপুরিই সামাজিক। কেননা, এক্ষেত্রে ব্যক্তি পাপ করতে গেলে সমাজ তাকে ধর্ম/ স্রষ্টার দোহাই দিয়ে নিষেধ করে থাকে, আর তাই স্রষ্টাকে অস্বীকার করার মাধ্যমে নিজেকে “যা-খুশি-তাই” করার ছাড়পত্র দেবার চেষ্টা করে সে। যদি সমাজের মানুষেরা ধর্ম/ স্রষ্টার কথা না বলে রাষ্ট্রীয় আইনের দোহাই দিত, তখন সে নাস্তিক না হয়ে অ্যানার্কিস্ট (রাষ্ট্রবিরোধী) হত। যদি লোকেরা তাকে রাষ্ট্র/ ধর্ম/ স্রষ্টার দোহাই না দিয়ে বিবেকের দোহাই দিত, তখন সে বলত, বিবেক বলে কিছু নাই, মানুষ শুধুমাত্র রক্তমাংসের একটি পশু। তখন সে নিজেকে বানরের বিবেকহীন বংশধর বলার চেষ্টা করত। (যদিও বানর বিবেকহীন প্রাণী নয়, তারা এতটা বিবেকহীন কখনো হয় না, যতটা মানুষ হয়!)

পাপ থেকে উৎসরিত দ্বিতীয় ধরণের নাস্তিকতাটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। হয়ত কেউ খুব বড় ধরণের কোনো পাপ করে ফেলেছে, তারপর বিবেকের দংশন আর সহ্য করতে পারছে না। নিজের কাছেই নিজেকে পশুর মত নিকৃষ্ট মনে হচ্ছে। সমাজের আশেপাশের মানুষের দিকে তাকালে ভাবছে, এরা সবাই কত সহজ সাধারণভাবেই না চলছে, অথচ আমি কত নিকৃষ্ট, আমি এতটুকু প্রবৃত্তিকে দমন করতে পারলাম না! ইত্যাদি নানান ভাবনা তাকে দহন করে যখন শুদ্ধির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তখন শয়তান এসে তাকে হতাশার বাণী শুনাচ্ছে: “তুমি শেষ, কোনো তওবাতেও কাজ হবে না, তোমার কোনো আশা নেই...।” তখন সেই ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা থেকে নিরাশ হয়ে যায়; আত্মপ্রতারণামূলক নাস্তিকতা বেছে নেয়। বারংবার নিজেকে বুঝানোর চেষ্টা করতে থাকে: স্রষ্টা বলে কেউ নেই, কিছু নেই, ইসলাম খারাপ, আল্লাহ খারাপ ইত্যাদি। প্রবলভাবে নাস্তিকতাকে ধারণ করার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দেয়। বইপত্র যোগাড় করে, ফেইসবুকে বিভিন্ন গ্রুপ/ পেইজ/ ব্যক্তিকে ফলো দেয়, এবং আরো যত যা করা দরকার, তা করে। অথচ কিছুই না, তার শুধু দরকার ছিল গভীর রাত্রিতে জায়নামাজটা বিছিয়ে সাহস করে একবার তাঁর সামনে দাঁড়ানো, তারপর সুন্দর একটি প্রার্থনার মাধ্যমে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া! আফসোস, সেইসব সুন্দর প্রার্থনাও আমাদের সমাজ আমাদেরকে শিখায়নি, বরং কেবল দেখিয়েছে আজাবের ভয়! তেমন একটি সুন্দর প্রার্থনা এই বইয়ের শেষে সংযুক্ত করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পাঠক এই গোটা বইয়ের চেয়েও সেই প্রার্থনাকে অধিকতর মূল্যবান হিসেবে পাবেন, ইনশাআল্লাহ।


৩. আইডেন্টিটি ক্রাইসিস

“আমি কে?” এই প্রশ্নের উত্তর চায় মানুষ। (এ বিষয়ে আত্মদর্শন পর্বে কিছুটা আলোচনা করেছি।) যখন তাকে তার ‘প্রকৃত আমি’-র সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় না, তখন সে বহু জায়গা থেকে ধার করে একটা ‘আমি’ তৈরীর চেষ্টা করে। অর্থাৎ, একটা পরিচয় বা আইডেন্টিটি তৈরী করার চেষ্টা করে। “দেশের রাজনীতির বিষয়ে সবারই একটা মতামত আছে, আমারও থাকা উচিত”, “ধর্ম নিয়ে সবাই কিছু না কিছু বলে, আমারও নিজস্ব একটা মত থাকা উচিত” – ইত্যাদি অনুভূতি দ্বারা তাড়িত হয়ে অনেকেই তড়িঘড়ি একটা উত্তর পেতে চায়। প্রচলিত ধার্মিকদের তুলনায় নাস্তিকদেরকে তুলনামূলক বেশি স্মার্ট, যুক্তিবাদী, উদারমনা পেয়ে ‘নাস্তিক’ আইডেন্টিটি গ্রহণ করে অনেকে। এই বিষয়টা ধর্মজগতেও মানুষের মাঝে কাজ করে। যেমন, “তারাবী ২০ রাকাত নাকি ৮ রাকাত? আমার একটা পক্ষে থাকা উচিত। আমিতো সবার দেখাদেখি ২০ রাকাতই পড়ি। যাই, এর পক্ষে কিছু দলিল নিয়ে আসি তাড়াতাড়ি, যেন কেউ প্রশ্ন করলে জবাব দিতে পারি।” কিংবা, “২০ রাকাত তো কষ্ট, যাই ৮ রাকাতের দলিল খুঁজি। তাহলে সহজও হলো, আবার কেউ জিজ্ঞাসা করলে জবাবও দিতে পারব।” একইভাবে দেখুন: “আমি শিয়া, নাকি সুন্নি? ওহ, এতদিন তো সামাজিকভাবে সবকিছু সুন্নিদের মতই করে এসেছি, তাহলে যাই, তাড়াতাড়ি সুন্নিদের দলিলগুলো শিখে নেই, যেন কোনো শিয়া এসে প্রশ্ন করলে ওকে জবাব দিতে পারি। তাহলে আমার সমাজ-পরিবারের বিরুদ্ধেও যাওয়া লাগলো না, বরং তাদেরকে সাথে পাওয়া গেল।” কিংবা সুন্নিদের ভিতরে হলে দেখুন, “আমার বাপ-দাদারা এতকাল হানাফিদের মত নামাজ পড়েছে, এখন মানুষ এটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যাই তাড়াতাড়ি হানাফির পক্ষে দুইটা দলিল মুখস্থ করে আসি, যেন কেউ জিজ্ঞাসা করলেই তার মুখের উপর ছুঁড়ে দিতে পারি।” এধরণের অনুভূতি-তাড়িত হয়ে যখন কেউ ‘জ্ঞানঅর্জন’ করে, তখন সেটা নিরপেক্ষ হয় না। সেটা আদতে জ্ঞানার্জন-ই হয় না, সেটা হয় দলাদলি, রেসলিং। প্রকৃত জ্ঞানার্জন কেবলমাত্র নিরপেক্ষ ও অপ্রভাবিত মনে দার্শনিক পন্থায়ই সম্ভব। আর সেই পন্থায় জ্ঞানার্জন করলে প্রচলিত ধার্মিকদের দুই চারটা জিনিসের সাথে মিলে যেতেও পারে, না-ও পারে, নাস্তিকদের সাথে কিছু বিষয় মিলে যেতেও পারে, না-ও পারে, আবার একেবারেই ভিন্নধরণের কিছু বিষয় আবিষ্কার হতে পারে, যা আস্তিক-নাস্তিক রেসলিং শো-র ঊর্ধ্বের কোনো ব্যাপার। আমাদের ক্ষেত্রেও তেমনটিই হয়েছে।


৪. প্রশ্নের সঠিক উত্তর না পাওয়া

মানুষ একইসাথে ইন্টেলেকচুয়াল ও স্পিরিচুয়াল, অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক প্রাণী। তার যেমন আত্মার চাহিদা থাকে, তেমনি ব্রেইনের চাহিদাও থাকে। বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক – উভয় চাহিদাই ইসলাম পূরণ করে, তবে সেটা প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ ইসলাম। আফসোস, বর্তমান পৃথিবীতে যারা ইসলামের পতাকা নিজের হাতে তুলে নিয়েছে, তাদের মেজরিটিই এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বেখবর। একদিকে যারা মানুষের আত্মার ক্ষুধা মেটাচ্ছে, সেইসব সুফি-দরবেশ-পীর-বাউলেরা ইন্টেলেকচুয়াল ক্ষুধা মিটাতে পারছে না: ইসলামের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য ইন্টেলেকচুয়াল দিকগুলো দেখাতে পারছে না; অপরদিকে যারা ইসলামের শরীয়ত, বিভিন্ন বিধিবিধান ও সমাজে ‘ইসলাম কায়েম’ নিয়ে ব্যস্ত আছে, তারা মিটাতে পারছে না আত্মার ক্ষুধা। পারবে কিভাবে, তারা নিজেরাই তো হৃদয়ের জগতে নেই! বরং তাদের বেশিরভাগই ‘বাপ-দাদার ধর্ম’ হিসেবে সমাজের প্রচলিত ইসলামকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, এবং সেটাকেই সঠিক প্রমাণের জন্য দিনভর গোঁড়ামির চর্চা করে যাচ্ছে। আর গোঁড়ামির মধ্য থেকে কখনো দৃঢ় ভিত্তি সম্বলিত উত্তর পাওয়া যায় না। অতএব, যেসব ছেলেমেয়েদের চিন্তাশক্তি উন্নত, তারা এসব মানুষদের কাছে বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ের ‘হাস্যকর, দুর্বল ও যুক্তি-দর্শনের বিচারে অগ্রহণযোগ্য’ উত্তর দেখে শেষমেষ ধর্ম থেকেই দূরে সরে যাচ্ছে। এইভাবে যারা নাস্তিক হয়, তারা অনেকটা মডারেট ও উদারমনা হয়। অর্থাৎ, বলা চলে যে, তারা হন অ্যাগনস্টিক। তারা অনেকটা সেই “নিরপেক্ষ বিচারকের” আসন থেকে কথা বলেন যে, “স্রষ্টার সপক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।” কিংবা, “ইসলাম শান্তির ধর্ম- এর সপক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।” তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে আমি সম্মান করি, এবং আমি আশা করব যে, এই বইয়ে আমি যতটুকু বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক বিষয় উপস্থাপন করেছি, সেগুলি গ্রহণযোগ্য হলে তারা অন্ততঃ অতটুকু গ্রহণ করে নেবেন। কিন্তু যেন ওটুকুর সূত্র ধরে “প্রচলিত সামাজিক ইসলামের” সবটা আঁকড়ে ধরতে গিয়ে নতুন করে অন্ধত্বে পতিত না হন। বহু মানুষ এভাবে এক অন্ধত্ব থেকে আরেক অন্ধত্বে গিয়ে পতিত হয়। আমার অনুরোধ, আপনারা এ ব্যাপারে সচেতন থাকবেন।


৫. প্রাণহীন ধর্মচর্চা

বহু মানুষের ধর্মবিমুখ হবার কারণ হলো আধ্যাত্মিকতা-বিবর্জিত রুক্ষ-শুষ্ক ইসলাম। প্রথমতঃ, ইসলামের ইন্টেলেকচুয়াল দিকগুলিকে দৃঢ় যুক্তি ও সত্য দর্শনের ভিত্তিতে প্রমাণ করতে না পারাটা বহু মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। ইনফ্যাক্ট, এই আক্বলী চর্চাগুলি না করার ফলে খোদ মুসলমানরাই ঈমান অর্জন করতে পারছে না, নাস্তিকদের পথ দেখাবে কী!

দ্বিতীয়তঃ, এমনকি যদি আপনি দৃঢ় যুক্তি ও সত্য দর্শনের উপর ভিত্তি করে ইসলামকে ইন্টেলেকচুয়ালি প্রতিষ্ঠা করেনও, প্রমাণ করেনও, তবু খুব সম্ভবতঃ সেটা কাজে দেবে না। কেননা, সেটা মানুষের আত্মার ক্ষুধাকে তৃপ্ত করবে না। মানুষ একদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্নের উত্তর চায়, অপরদিকে সে ভালোবাসাও চায়। আপনার কাছে এসে সে ভালোবাসা পায় না। আপনার কাছে সে আসে মারমুখী যুদ্ধংদেহী ভঙ্গিতে, আপনিও এগিয়ে যান রেসলিং খেলতে: যুক্তি, দর্শন, বিজ্ঞানের তলোয়ার ঝনঝন করে ওঠে, কিন্তু দিনশেষে দুজনই শূন্য: “আমার কী লাভ!” এধরণের প্রাণহীন ধর্মচর্চা বা নাস্তিক্যবাদ চর্চা – উভয়টাই আমাদেরকে খোসাসর্বস্ব মানুষ করে তোলে: যার বাইরেটা দৃঢ় দৃঢ় সব আইডেন্টিটি-আমিত্ব, কিন্তু ভিতরটা শূন্যতায় হাহাকার করা এক হৃদয়, যে তর্ক-বিতর্কের ঊর্ধ্বের জগতে উঠে সবসময় ভালোবাসা সিক্ত থাকতে চায়: নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ, আস্তিক-নাস্তিক – সবার ভালোবাসা!

ইসলাম, যা কিনা মূলতঃ ভালোবাসার ধর্ম, সেই প্রকৃত ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দিনশেষে ঐ দুই পক্ষই নাস্তিক রয়ে যায়। একজন নাস্তিক-নাস্তিক, আরেকজন নাস্তিক-মুসলিম, কিন্তু কেউ-ই প্রেমিক নয়: না খোদাপ্রেমিক, আর না খোদাপ্রেমের তরে মানবপ্রেমিক। এধরণের প্রাণহীন ধর্মচর্চা দ্বারা আমাদের মাদ্রাসাগুলো আমাদের সমাজকে বহু জাঁদরেল নাস্তিক উপহার দিয়েছে। আর যারা মানবপ্রেমের কথা বলে, সেইসব মুসলিমদেরকে বিভিন্ন ‘সহীহ’ (!) ‘দলিল’ দিয়ে কাফির, মুশরিক, বিদাতী, পূজারী ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে দূরে সরিয়ে রেখেছে। অথচ তাদের উচিত ছিল ঐসব মানুষের থেকে ইসলামের প্রাণরসটি শিক্ষা করে সেই মানবপ্রেমকে শরীয়তের পাত্রের ধারণ করা। অথচ তারা শূন্য পানপাত্র নিয়েই পড়ে রইলো। আর যে গ্লাসে পানি নেই, তা যত চকচকেই হোক, তৃষ্ণার্তকে তা মোটেই উপকৃত করে না। বুদ্ধিবৃত্তিক এই শূন্য পানপাত্র তাই মানুষের আত্মার ক্ষুধা মেটাতে পারছে না। যাদের আত্মার ক্ষুধা বেশি, তারা তাই শরীয়তের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন বাউল/ সুফি ধারার দিকে চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে বিভিন্ন ‘মেডিটেশান’ এর দিকে – অথচ সেগুলিও ‘আংশিক ইসলাম’, কেননা, তারা অধিকাংশই শরীয়ত বর্জন করেছে। শরীয়ত ও মারেফত এই দুটি মিলেই যে ইসলাম, তা উভয় ধারার অধিকাংশ চর্চাকারীই ভুলতে বসেছে। ফলে কেউ-ই মানবজাতিকে এক গ্লাস, শুধুমাত্র এক গ্লাস পানি দিতে পারছে না। কেউবা এগিয়ে আসছে শূন্য গ্লাস নিয়ে, আর কেউবা মেঝের উপর ঢেলে দিচ্ছে পানি, যা দিয়ে বড়জোর একটু গলা ভিজানো যেতে পারে, কিন্তু তৃপ্তি কখনোই মেটে না। এই দুইয়ের সম্মিলন যেখানে হয়েছে, আল্লাহর অশেষ রহমত, তেমন ব্যক্তির মুখনিঃসৃত দুটো কথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তাঁর উপর অজস্র সালাম!


মানুষের প্রকৃতিগত দুর্বলতা

মানুষ যেই অপূর্ণতা দ্বারা তাড়িত হয়ে সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে, সেই একই অপূর্ণতার কারণে মানুষ কোনো জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, দল, ব্যানার ইত্যাদির নিচে আশ্রয় নেয়। আমার মনে হয় এটা মানব প্রকৃতির সহজাত দুর্বলতা ও অপূর্ণতা থেকে উৎসরিত। সমাজের দ্বারা সে উপকৃত হয়, সমাজ তার এমন অনেক অভাব পূরণ করে যা সে নিজে করতে পারছে না, এমতাবস্থায় সমাজে সে টিকে থাকার চেষ্টা করে, এমনকি সেজন্যে যদি সমাজের অনেক অন্যায়ের বিপরীতে নীরব থাকতে হয়, তবুও। বিভিন্ন ধরণের জাতীয়তাবাদ লালন করা, বিভিন্ন ধর্মীয়/ রাজনৈতিক দলের দোষত্রুটি জানা সত্ত্বেও তার সাথে লেগে থাকা – এগুলোর অধিকাংশই প্রতিটা ব্যক্তির মানুষ হিসেবে যে সহজাত দুর্বলতা ও অপূর্ণতা, তার কারণে ঘটে থাকে। এমনকি অপর মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করাটাও বহুলাংশে মানুষ করে থাকে আপন দুর্বলতার কারণে।

ব্যক্তিগত মুক্তি অর্জনের পথে একজন মানুষ যত এগিয়ে যাবে, অর্থাৎ মানবিক দুর্বলতা ও অপূর্ণতাগুলিকে জয় করবে, ততই সে দলীয়/ গোত্রীয়/ সামাজিক সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে। বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতিই এই মুক্তি এনে দেবে। তখন একজন মানুষ তার চাহিদা পূরণের জন্য আল্লাহ ছাড়া আর কারো উপর নির্ভরশীলতা অনুভব করবে না। একারণে একইসাথে বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক – দুটো যাত্রাই শুরু করতে হবে। এবং দুটি জগতেই বিচরণ করতে করতে উচ্চতার শিখরে পৌঁছে যেতে হবে। এভাবেই মানবের প্রকৃতিগত দুর্বলতা থেকে মুক্তি মিলবে। ততই ঝড়ের মত ডাইন্যামিক হওয়া যাবে: যে ব্যক্তি সকল পিছুটান ফেলে মুহুর্তে সত্যকে আঁকড়ে ধরে, নিজেকে বদলাতে যে লজ্জা করে না, যে নিজের ভিতরেই নিজে ঝড়ের মত, এবং তার চারিপাশের মানুষের মাঝেও সে ধুমকেতু হয়, ঝড় হয়, বিপ্লব হয়!


পরিবার: যাকে আমরা উপেক্ষা করি

আমাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ আমাদের মানসিকতাকে গড়ে দেয়, আর এর কেন্দ্রে আছে পরিবার। পরিবারে উপযুক্ত পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। “উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য” - সেই উৎসুক মন নিয়ে মানুষ জন্ম নেয় ঠিকই, কিন্তু এরপর তাকে প্রভাবিত করা শুরু হয়। আর সেটা হয় পরিবারেই। পরিবার তাকে ‘পারিবারিক ও সামাজিক’ ধর্মে দীক্ষিত (কিংবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কমবেশি ব্রেইনওয়াশিং) করে। শুধু তা-ই না, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবারই ‘দিয়ে দেয়’। এইভাবে করে পরিবার নানান জিনিস কপি-পেস্ট করতে থাকে সন্তানের ব্রেইনে। আমরা কয়জন দাবী করতে পারব যে, আমাদের পরিবার ইসলামকে শুধু “উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ধর্ম” হিসেবে না শিখিয়ে “যুক্তি ও দর্শনের” দৃষ্টিকোণ থেকেও যাচাই করে দেখিয়েছে? কিংবা আমাদের যুক্তি ও দর্শনের শিক্ষা দিয়েছে, তারপর ছেড়ে দিয়েছে যে: এবার নিজেই উৎসের সন্ধান করে দেখ, স্রষ্টা আছেন কিনা? ইসলামকে অবজেক্টিভলি যাচাই করে দেখো, তোমার বাপ-মা অন্ধবিশ্বাসী ধার্মিক, নাকি যুক্তিবাদী দার্শনিক?

যুক্তি ও দর্শনের উপর দুটো বই পড়লেই নিরপেক্ষ-অপ্রভাবিত মন অর্জন হয়ে যায় না। আমি জানি, এই বইয়ের শুরু থেকে যতই “নিরপেক্ষ ও অপ্রভাবিত” মনের কথা বলে এসেছি, তবুও অধিকাংশ পাঠকই হয়ত তা ধরে রাখতে পারেননি। প্রিয় পাঠক! দয়া করে আবার “কী মনে করেন নিজেকে, হ্যাঁ? শুধু আপনিই নিরপেক্ষ, আর আমরা সব বায়াসড মাইন্ড?” – এধরণের চিন্তা করবেন না। ব্যক্তিচিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে নিজেকে নিয়ে ভাবুন। নিজের পরিবার ও বেড়ে ওঠার পরিবেশের দিকে চিন্তা করুন। সেসব পরিবেশ আপনাকে কতটা গভীরে গিয়ে প্রভাবিত করেছে? কতটা মরিচা পড়েছে? তা ঘষে ঘষে তুলতে কতদিন সময় লাগবে? কতটা কষ্ট হবে সেজন্য, আর তারপর আয়নাটা পরিষ্কার হবে? আপনার নিজেরই যাত্রা এটা, অতএব, আপনমনে নিজেকে নিয়ে ভাবুন, পৃথিবীর আর সবার কথা ভুলে যান।

যুক্তি ও দর্শন একটি প্র্যাকটিকাল বিষয়। পরিবারই এটা চর্চার সর্বোত্তম স্থান। পরিবারেই যদি ধর্মীয় গোঁড়ামি থাকে, তবে দেখা যায় সে পরিবারের সন্তান অনেকসময় একেবারে উল্টে যায়: নাস্তিক পর্যন্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ, এক চরমপন্থা থেকে গিয়ে আরেক চরমপন্থার কোলে গিয়ে পড়ে। সরল দোলকের মত: ভারসাম্য অবস্থানে স্থির হতে পারে না – হয় চারম ডানপন্থী, নাহয় চরম বামপন্থী হয়ে পড়ে। কিঙবা আবেগের বশে হয়ত ইসলামে ফিরে আসে, কিন্তু সেখানে এসেও চরমপন্থীভাবে ইসলাম চর্চা করে। অর্থাৎ, তার ব্যক্তিগত অবস্থা দ্বারা তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত হয়।

আপনার সন্তানকে পরিবারের মধ্যেই সাম্যের শিক্ষা দিন। ছেলে-মেয়ে বৈষম্য করবেন না। সকলের মতামতকে সমান গুরুত্ব দিন। এই অবস্থা ততদিন পর্যন্ত বজায় রাখুন, যতদিন পর্যন্ত না সন্তানদের প্রত্যেকেই এটা বুঝে নিচ্ছে যে, “যার জ্ঞানগত যোগ্যতা বেশি, তার মতামতকে প্রাধান্য দেয়াটাই ন্যায়বিচার; আর এটাও সত্য যে, সকল বিষয়ে আমার জ্ঞানগত যোগ্যতা সবার উপরে নয়।” অর্থাৎ, নিজের জ্ঞানগত যোগ্যতার ক্ষেত্র ও সীমা যখন প্রত্যেকটা সদস্য বুঝতে পারবে, তখন দেখবেন যে, পরিবারের ছোট সদস্য হলেও জ্ঞানগত বিষয়ে তার মতামতটা হয়ত সবাই মেনে নিচ্ছে। কিংবা আমল-আখলাক্ব-আধ্যাত্মিকতায় যে অগ্রগামী, তার মধ্যস্থায় উত্তপ্ত পরিবেশ শান্ত হচ্ছে…।

কুরআন থেকে সর্বোন্নত যুক্তি ও দর্শন শিক্ষা করুন। তারপর পরিবারে সেই যুক্তি ও দর্শন কায়েম করুন। বাবা-মাকে যদি কখনো ভুল স্বীকার করতে না দেখে, ঐ সন্তান তখন গোঁড়া হবেই। তার নিজেরও আত্মসংশোধন ও আত্মশুদ্ধির চর্চা হবে না। কুরআনের দর্শন হলো, “এমনকি নিজের বিরুদ্ধে হলেও সত্যকে স্বীকার করতে হবে”। পরিবারে বাবা-মা ভাই-বোনের মাঝে যখন এই দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন দেখবে, তখন একটা সন্তানের গভীরে এই দর্শনটা প্রবেশ করবে। সে তখন হয়ে উঠবে নিরপেক্ষ বিচারক। তারপর তার সামনে নাস্তিক্যবাদী যত যুক্তি তুলে ধরুন, পাশাপাশি কুরআনের সব যুক্তি তুলে ধরুন। কিংবা তাকে নিজে নিজেই স্টাডি করতে দিন: ইনশাআল্লাহ সে নিরপেক্ষ বিচারকের মত করেই বলবে যে, “আমাদের সামাজিক ধর্মের এগুলি ভুল, এগুলি সঠিক, নাস্তিকতার অতটুকু ভুল, অতটুকু সঠিক, আর প্রকৃত ইসলাম আমার বুঝ অনুযায়ী আসলে এইরকম।”

নিতান্তই ধার্মিক মানুষটাও উত্তেজনার মুহুর্তে খুব খারাপ গালি দিয়ে বসেছে। কারণ হয় তার পরিবারে গালির চর্চা আছে, নয়তো তার চলাফেরা-বেড়ে ওঠার পরিবেশে সেটা পেয়েছে। যে পরিবারে সন্তান “নারীর উপর শারীরিক-মানসিক জুলুম” দেখে বড় হয়, সে নারী-পুরুষ সংক্রান্ত বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ মতামত দিতে পারে না। মনের অজান্তেই পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যায়।

যদি আশঙ্কা করেন যে, বাইরের পরিবেশে মিশলে সন্তান ভারসাম্যহীন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবে, তাহলে তাকে ঘরের মধ্যেই রাখুন। আর যদি নিজেরা ঝগড়া-গালিগালাজ-মারামারি করেন, তাহলে অন্ততঃ বাসার বাইরে গিয়ে করুন। কিন্তু ঘরের মধ্যে সন্তানকে সত্যিকার মানুষ করে গড়ে তুলুন। তারপর যখন সে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টি ও তার উপর দৃঢ়তা অর্জন করবে, তখন তাকে ছেড়ে দিন: এবার যা, দুনিয়ার বুকে চরে খা!

আমরা নিজেরা তেমন পরিবার না পেয়ে থাকলেও অন্ততঃ পরবর্তী জেনারেশানকে যেন তেমন একটি পরিবার দিতে পারি। সেজন্যে অনেক বেশি কষ্ট করতে হবে, তবে মানবজাতির স্বার্থে সেটা আমাদের করা উচিত!

ইসলামপ্রদত্ত সত্যিকার নারীর অধিকার আমার মনে হয় ৯৯% গৃহে উপেক্ষিত। এমনকি আমাদের নারীরা জানেই না যে, ইসলাম আসলে তাকে কী অধিকার দিয়েছে।[QR - ইসলামের নারীর অধিকার]



বিভিন্ন ‘ধার্মিকেরা’ যখন ইসলামপ্রদত্ত নারী অধিকার লঙ্ঘন করে, সেটা বিবেকবান মানুষকে “ঐ ইসলাম” থেকে দূরে সরিয়ে দেবেই। যেই হুজুর এত জোরে বউ পিটায় যে তার শব্দ পাশের ফ্ল্যাট থেকে শোনা যায়, ঐ হুজুর যখন মসজিদে গিয়ে ইসলামের উপর বয়ান দেয়া আর ওয়াজ মাহফিল করে, তখন ঐ ইসলামকে বড় তেতো জিনিস মনে হয়।

বেড়ে ওঠার পরিবেশ যে একটা মানুষকে কতটা গভীরে প্রভাবিত করে! আমাকে যখন ঘনিষ্ঠ স্নেহভাজন বলেছে, “ভাই, আমি ওকে কোনদিন যেন পিটায়ে শোয়ায়ে ফেলব...।” তখন আমি স্বভাবমতই খুব সহজভাবে যখন বলেছি যে, “না, এটা করা যাবে না। Raise your words, not your voice. It is rain that grows flower, not thunder.” তারপর বলেছি, “কলম আছে? দেন, কার্ডে বাণীটা লিখে দিই।” তখন বলেছে, “না ভাই, কথাটা হৃদয়ে লিখে নিলাম।” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে যখন বলেছে, “ভাই, আসলে আমি আপনার সাথে যখন চলি, তখন একরকম, কিন্তু যখন নিজের এলাকায় যাই, আমিতো আসলে ঐখানে ঐ পরিবেশে বড় হইসি, আমার অনেক সময় লাগবে এইটা চেইঞ্জ করতে।” তার চোখের দৃষ্টিতে আমি তখন প্রচণ্ড অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখতে পেয়েছি: নিজের সাথে প্রবলভাবে যুদ্ধ করছে সে।

চারিদিকে চোখ মেলে তাকান: প্রতিটা মানুষের কথা-কর্ম-আমল-আখলাক্বে সে যেন তার নিজের পরিবারের গল্প বলছে, বলছে তার বেড়ে ওঠার পরিবেশের গল্প। সেই পিছনের গল্পগুলি কি দেখতে পান? সেই পরিবারগুলি কেন এমন ভারসাম্যহীন হলো, সেটারও পিছনের গল্পও কি দেখতে পান? কিংবা তারও পিছনের গল্প? যদি দেখতে না পান, তবে জেনে রাখবেন যে, ক্যান্সার আক্রান্ত দেহকে আপনি কাপড় দিয়ে ঢাকবার চেষ্টা করছেন মাত্র। যে রোগের বীজ রক্তের মাধ্যমে দেহের এমাথা-ওমাথা ছোটাছুটি করছে, তার সেই গোড়ায় যেতে না পারলে আপনি কখনোই রোগ সারাতে পারবেন না। অযথাই হয়রান হয়ে মরবেন। এই দেহ, এই রক্ত, এই আত্মার গভীরে প্রবেশ করতে হবে আমাদের। আত্মদর্শন করতে হবে, নিজেকে জানার জন্য। আত্মদর্শন করতে পারলেই মানব দর্শন হবে। মানব দর্শন হলে মানবের সামাজিক সমস্যাবলীর স্বচ্ছ ধারণা লাভ হবে। একইসাথে মানবের আত্মিক-আধ্যাত্মিক-বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা মেটানোর সার্বিক কর্মপদ্ধতি জানা যাবে। মুক্তি মিলবে নিজের, মুক্তি মিলবে পরিবারের, মুক্তি মিলবে সমাজের।

_______________________________


ধর্মের নামে অধর্ম | পাপ | আইডেন্টিটি ক্রাইসিস | প্রাণহীন ধর্মচর্চা | পরিবার

নাস্তিকতার কারণ


আপনার দৃষ্টিতে নাস্তিকতার কারণগুলো শেয়ার করুন


মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…