সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

I know you’re tired, but… | অনন্তের পথে


Parallel Universe
বিভিন্ন জগতে উঁকি দেবার মত ব্যাপার যেমন ঘটতে পারে, তেমনি চর্চার মাধ্যমে ভিন্ন জগতে সচেতন বিচরণের মত ব্যাপারও ঘটা সম্ভব। আবার অনেকসময় কোনো জগত বিদ্যুৎ ঝলকের মত এসে দেখা দিয়ে যায়।

কোয়ান্টাম ফিজিক্স এজাতীয় কিছু বিষয় আলোচনা করে। তারা কেবল এধরণের সম্ভাব্যতা সাজেস্ট করে। অথচ এই ব্যাপারে ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্ম অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে আরো আগেই। আলটিমেটলি, মানুষের জ্ঞানই তো! কোয়ান্টাম ফিজিক্স দিয়ে প্যারালেল ইউনিভার্স না বুঝে ইরফান (অধ্যাত্মবাদ) দিয়ে বুঝলে দোষ কী? যেখানে কোয়ান্টাম ফিজিক্স কেবল ইন্টেলেকচুয়ালি পসিবিলিটি ‘সাজেস্ট’ করে, ইরফান সেখানে (জ্ঞানের চেয়ে) উচ্চতর স্তরে বিষয়টাকে ‘নিশ্চিত’ করে। ট্রু ইনফিনিটি যেমন গণিতের বিষয় নয়, বরং দর্শনের বিষয়, ঠিক তেমনি প্যারালেল ইউনিভার্স মূলতঃ ইরফানের বিষয়। যারা কোয়ান্টাম ফিজিক্স দিয়ে প্যারালেল ইউনিভার্সের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছেন, সেটাকে আমার কাছে অনেকটা ব্লেড দিয়ে ফল কাটার মত মনে হয়, অথচ ব্লেড দিয়ে কখনোই ছুরির মত সহজে সুন্দরভাবে ফল কাটা সম্ভব নয়।

তো, অন্য একটি জগত যখন বিদ্যুত চমকের মত এসে উঁকি দিয়ে যায়, তখন ঐ মুহুর্তের জন্য উভয় জগতের অস্তিত্ব সন্দেহাতীতভাবে পরিস্ফূট হয়। কিন্তু বিদ্যুত চমক বন্ধ হয়ে যাবার পর চারিদিক আবার অন্ধকার। এরপর তার এই অন্ধকার জগতে অবস্থান করাটা যতই দীর্ঘায়িত হবে, ততই অপর জগতটাকে তার কাছে ভ্রম বলে মনে হবে, এবং একসময় সে হয়ত অপর জগতের অস্তিত্বই অস্বীকার করে বসবে। আর ঠিক এই মুহুর্তেই যেন তার হৃদয়টা তালাবদ্ধ হয়ে গেল, এখন আর সেখানে আলো প্রবেশের কোনো সম্ভাবনা নাই; কারণ সেতো আর ঐ জগতে প্রবেশের চেষ্টাই করবে না! কিন্তু যদি সে আধ্যাত্মিক ইয়াক্বিন অর্জন না করুক, অন্ততঃ ইন্টেলেকচুয়ালি নিজের কাছে এটুকু স্বীকার করে রেখে দেয় যে, হ্যাঁ, আরেকটি জগতের অস্তিত্ব আছে, আমি এক ঝলক দেখেছিলাম, সেই পথে অগ্রসর হলে আবারো হয়ত দেখতে পা’ব – তবে সে দরজাটি দেখতে পায়। যদিও দরজাটি তালাবদ্ধ এবং তার কাছে হয়ত এই মুহুর্তে কোনো চাবি নেই, কিন্তু সে জানে যে চাবি পাওয়া সম্ভব, তালা খোলা সম্ভব, এবং এর মাধ্যমে অপর জগতের সত্যগুলিকে উদঘাটন করা সম্ভব, বিচরণ করা সম্ভব।


“My soul is from elsewhere, I'm sure of that, and I intend to end up there.” – Rumi


সাইর ওয়া সুলুক
ইরফানে এই গোটা ব্যাপারটাকে ‘সাইর ওয়া সুলুক’ বলা হয়। অর্থাৎ পথিক (সালিক) ও তার অভিযাত্রা (সাইর)। যখন সে আল্লাহর ইচ্ছায় বিদ্যুৎ চমকের মত অপর একটি জগতকে দেখতে পায়, তখন ঐ জগতের আলোকে সে দুনিয়াটাকে দেখে। যেন অনেকটা এমন যে, অমাবশ্যার রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যদিয়ে একজন পথ চলছে, সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, তবু সামনের দিকে হাঁটছে, এমন সময় হঠাৎ আকাশে বিজলি চমকালে চারিদিক আলোকিত হয়ে উঠলো, আর সামনে পিছনে ডানে বামে সাপ, বিচ্ছু, বাঘসহ নানান ভয়ানক প্রাণী দেখতে পেল, সেইসাথে বড় বড় খাদ, গর্ত দেখতে পেয়ে আঁতকে উঠলো। ঐ বিদ্যুত চমক ছাড়া সে এগুলো দেখতেই পেত না, বরং নির্ভাবনা হয়ে পথ চলত। আর এই অন্ধকারে চলতে চলতে হঠাত খাদে পড়ে ধ্বংস হয়ে যেত। এখন সে খুবই অজানা আশঙ্কায় আছে। কে জানে আবারও এই অন্ধকারে পথ চলতে চলতে হয়ত সে কোনো একমুখী পথে ঢুকে পড়েছে, যেটার সামনেই আছে বড় এক খাদ! এমতাবস্থায় সে বারবার বিদ্যুত চমকের আশা করে, আর হয়ত মাঝে মাঝে তা পেয়েও যায় : অপর জগতটিকে সে দেখতে পায়। তখন ঐ জগতের আলোকে সে এই দুনিয়ায় সাবধানে পথ চলে। আল্লাহর উপর ভরসা করে এভাবে অগ্রসর হতে থাকলে একসময় বিদ্যুত চমক আরো বেশি বেশি ঘটে, এবং খোদামুখী যাত্রার পথিক মোটামুটিভাবে পাপ এড়িয়ে দুনিয়াতে পথ চলে। কিন্তু সে এখনও হাঁটার ছন্দ, গতি ও কৌশল রপ্ত করতে পারেনি, একইসাথে সে যে গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, সেই গন্তব্য সম্পর্কেও তার ভালো ধারণা নেই। এগুলো সবই সে ধীরে ধীরে অর্জন করে।



كُلَّمَا أَضَاءَ لَهُمْ مَشَوْا فِيهِ وَإِذَا أَظْلَمَ عَلَيْهِمْ قَامُوا



“বিদ্যুতালোকে যখন তাদের জন্য (পরিবেশ) সামান্য আলোকিত হয়, তখন তারা তাতে কিছুটা পথ চলে। আবার যখন তাদের ওপর অন্ধকার নেমে আসে তখন তারা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে।...” সূরা বাকারা, ২:২১

এভাবে করে পথ চলতে চলতে একসময় বিদ্যুত চমকের বদলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে একটি আলো উপহার দেয়া হয়। আর সেটা খুব ছোট, টিমটিমে আলো, যেন ছোট্ট এক কুপিবাতি। এই আলোতে সে শুধু পায়ের সামনের একটুখানি দেখতে পায়, কিন্তু এর বেশি কিছু বুঝতে পারে না। তবু সে মোটামুটিভাবে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট না করে পথ চলে। এভাবে সালিক (পথিক) নানান স্তর অতিক্রম করে, এবং আল্লাহ তায়ালা তাকে আরো আলো দান করেন। একসময় সূর্যের আলোর মত দুনিয়ার সবকিছু সে স্পষ্ট দেখতে পায়।



اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالأرْضِ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِنْ شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لا شَرْقِيَّةٍ وَلا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ نُورٌ عَلَى نُورٍ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَنْ يَشَاءُ



“আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের জ্যোতি, তাঁর জ্যোতির উদাহরণ যেন একটি কুলঙ্গি, যাতে আছে একটি প্রদীপ, প্রদীপটি একটি কাঁচপাত্রে স্থাপিত, কাঁচপাত্রটি উজ্জ্বল নক্ষত্র সদৃশ্য। তাতে পুতঃপবিত্র যয়তুন বৃক্ষের তৈল প্রজ্বলিত হয়, যে যয়তুনের বৃক্ষ প্রাচ্যেরও নয় এবং পাশ্চাত্যেরও নয়। অগ্নি স্পর্শ না করলেও তার তেল যেন আলোকিত করে। জ্যোতির উপর জ্যোতি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ দেখান তাঁর জ্যোতির দিকে।…” সূরা আন নূর, ২৪:৩৫

[QR - আধ্যাত্মিক সফর]

(আধ্যাত্মিক) আলোবিহীন মানুষ দুনিয়ার যেটাকে খুব আকর্ষণীয় ভাবে, যার পিছনে ছোটে, সালিক হয়ত সেখানে বিপদ দেখতে পায়, আগুন দেখতে পায়। আবার আলোবিহীন মানুষ যেটাকে দুঃখ-কষ্টের পথ ও বোকামি মনে করে, সেখানে হয়ত সালিক মণিমুক্তা দেখে, আল্লাহকে দেখে, রাসূলকে দেখে, ওলি-আউলিয়াদের দেখে। আল্লাহর ইচ্ছায় এই আলোর মাত্রা বৃদ্ধি পেলে তা চোখ ঝলসানো আলোতে পরিণত হয়, এবং অন্ধকার থেকে হঠাত আলোতে এসে পড়লে মানুষের যে অবস্থা হয়, সালিকের তেমন অবস্থা হয়, এবং সে আলো ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। তখন সে আচ্ছন্ন অবস্থায় চলে যায়। অবশ্য ধাতস্থ হলে ‘পর সে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

“The moment you accept what troubles you’ve been given, the door will open.” – Rumi

এই পথ চলতে চলতেই সে তার গন্তব্য (আল্লাহ তায়ালা) সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে, তাঁকে জানার চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষের ‘জানা’, অর্থাৎ ‘জ্ঞান অর্জন করার’ পদ্ধতিতে আল্লাহ তায়ালাকে যেভাবে জানা হয়, সেটাকে সে পর্যাপ্ত মনে করে না, এতে সে তৃপ্ত হয় না। কারণ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতা আছে; আর এই সীমার মধ্যে থেকে যে সীমিত জ্ঞান অর্জন করা হয়, তা পরিপূর্ণ নয়।

এই পর্যায়ে এসে সালিকের নতুন যাত্রা শুরু হয়। এতক্ষণ পর্যন্ত তার যে যাত্রা ছিল, তা আসলে তার নিজের থেকে নিজের দিকেই। কিন্তু এখন সে নিজের থেকে আল্লাহর দিকে যাত্রা শুরু করে। অর্থাৎ নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা, নিজের থেকে নিজেই আলাদা হয়ে যাওয়া এবং নিজেকে আর ফিরে পাবার কোনো আশা না রেখে পরিপূর্ণভাবে ত্যাগ করে আল্লাহর দিকে যাত্রা। এটাই সালিকের হিজরত। কিন্তু এই অবস্থা (হাল) যে আসলে কেমন, এই অভিযাত্রার (হিজরতের) স্বরূপ-ই বা কী, সেটার বর্ণনা কোনো মানবীয় ভাষা ধারণ করতে পারে না। কারণ এই হিজরতে সালিক নিজেকেই ত্যাগ করেছে (মানবীয় সীমাবদ্ধতাগুলি থেকে মুক্ত হবার জন্য)।

বাকি বর্ণনাটুকু খুবই সংক্ষিপ্ত। হিজরত শেষে সে আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়, এবং আল্লাহতে বিলীন (ফানা) হয়ে যায়। বড় বড় আ’রেফগণ বলে গেছেন যে, এই ফানাফিল্লাহ অবস্থাটি স্থিতিশীল নয়, বরং এরও পরবর্তী স্তর হলো বাক্বাবিল্লাহ (আল্লাহতে স্থায়ী হওয়া)।

এরপর আল্লাহর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সালিক দুনিয়াতে ফিরে আসেন এবং মানবজাতিকে ইসলামের পথে দীক্ষিত করেন। তবে এই হিজরত, ফানাফিল্লাহ ও বাক্বাবিল্লাহ, সবই একজন সালিকের মাঝে ঘটে থাকে দুনিয়াতে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড করা জীবনেই। এবং “মানুষকে ইসলামে দীক্ষিত করার জন্য আল্লাহর কাছ থেকে দুনিয়াতে ফিরে আসা” কথাটা দ্বারা এটা বুঝানো হয়নি যে সে তার পূর্বে অর্জিত অবস্থা ত্যাগ করে, বরং সে আল্লাহতে বিলীন ও স্থায়ী হওয়া অবস্থাতেই মানুষের মাঝে ইসলামের আলো ছড়ানোর কাজ শুরু করে। আর এটাই তাঁর দুনিয়ায় ফিরে আসা।

এইধরণের ব্যক্তি ছাড়া ইসলাম প্রচারক হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ বলেন, কেন তোমরা যা করো না তা বলো? অতএব, এটা গ্রহণযোগ্য নয় যে, “প্রচার করো একটি আয়াত হলেও”। প্রচারের দায়িত্ব সকলের নয়। সকলে সেজন্য যোগ্যও নয়।


Parallel Consciousness
এখন বোঝা যায় যে, যখন একজন আ'রেফ বলেছিলেন, বিগত ত্রিশ বছর যাবৎ মানুষ মনে করেছে আমি তাদের মাঝেই ছিলাম, অথচ আমি তাদের মাঝে ছিলাম না – কথাটার কী তাৎপর্য থাকতে পারে। কিংবা একজন সূফী কিভাবে তার প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাস সম্পর্কে প্রতি মুহুর্তে সচেতন থেকে parallely দুনিয়ার সমস্ত কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। অথচ কোনোটাতেই বিঘ্ন ঘটে না। এ অবস্থায় তাঁরা সত্যিকারের parallel consciousness অর্জন করেন।


ওস্তাদ/ পীর/ ইনসানে কামেল
একজন সালিক এই পথ অতিক্রম করতে গিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানান সমস্যায় পড়ে। এমনকি ভুল পথে চলে যাবার আশঙ্কাও থাকে। তাই সালিকের এই আধ্যাত্মিক অভিযাত্রা যদি একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে ঘটে, তাহলে মোটামুটি আশঙ্কামুক্ত হওয়া যায়, ধৈর্য্য ধারণ করে আশাবাদী হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। এই অভিজ্ঞ ব্যক্তি, যিনি ইতিমধ্যেই খোদামুখী আধ্যাত্মিক যাত্রার বিভিন্ন স্তর পার করে ফেলেছেন, এবং যিনি নবীন অভিযাত্রিককে চলার পথে গাইড করেন, তাঁকেই ইসলামী পরিভাষায় পীর (বয়স্ক ব্যক্তি), ইনসানে কামেল (পূর্ণতাপ্রাপ্ত মানব) ইত্যাদি বলা হয়। ‘পীর ধরা’ কথাটার আসল অর্থ হলো একজন ইনসানে কামেল এর তত্ত্বাবধানে জীবন পরিচালনা করা। তবে ইসলাম ও আধ্যাত্মিক চর্চার নামে ব্যবসা ফেঁদে বসা ভণ্ড লোকেরা এই কথাটার অপব্যবহার করে থাকে।

যেমন, এমন একজন ইনসানে কামেল যদি আপনাকে প্রতিদিন ১০০ বার সুবহানাল্লাহ যিকর সাজেস্ট করেন, আপনার উচিত ওষুধের মত সেটাই গ্রহণ করা। কারণ এই যিকর আপনার মস্তিষ্কে আঘাত করবে, আপনাকে ইন্টেলেক্ট এর জগত থেকে সীমার ঊর্ধ্বে যাবার জন্য অনুপ্রাণিত করবে, পরম প্রমুক্ত সত্তার বিপরীতে আপনার নিজের সীমাবদ্ধতার কথা উন্মোচিত করবে। এখন, ডিমে কতটুকু তা দিলে সেটা উপযোগী, সেটা কি ডিম নিজে বোঝে? বেশি বাড়াবাড়ি করলে বেটাইমে খোলস ভেঙে যেতে পারে। তাই আপনাকে যদি তিনি ১০০ বার একটি বিশেষ যিকর দেন, তবে সেটি চর্চা করুন, কারণ তিনি আপনার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ।

[প্রসঙ্গতঃ, ‘পীর না ধরলে মুক্তি নাই’, এজাতীয় কথাকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করায় অনেক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্যই একজন ইনসানে কামেলের তত্ত্বাবধানে দীক্ষা নিলে সেখানে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি ও ভুল-ভ্রান্তির আশঙ্কা কম, কিন্তু তার মানে এই নয় যে ইনসানে কামেলের গাইডেন্স ছাড়া মানুষ কখনো আল্লাহর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য অর্জন করতে পারবে না, জান্নাত লাভ করতে পারবে না। বরং এজাতীয় কথার মূল তাৎপর্য হলো, পীরের গাইডলাইন ছাড়া চলা খুবই কঠিন। কারণ আল্লাহ তায়ালার অন্যতম গুণ ‘ন্যায়বিচারক’ এর অন্যতম তাৎপর্য এই যে, প্রতিটা মানুষ, তা সে যে পরিবেশেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন, আল্লাহ তায়ালা ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করতে সক্ষম।

ঠিক তেমনি শিয়া মাযহাবের প্রচলিত একটা কথা: ‘যে তার যামানার ইমামকে চিনলো না এবং মারা গেলো, সে যেন জাহেলিয়াতের মৃত্যু বরণ করলো’। আসলে একথার মানে এই নয় যে যামানার ইমামকে (বর্তমানে ইমাম মাহদী (আ.)) চেনে না এমন প্রতিটা ব্যক্তির মৃত্যুই জাহেলিয়াতের মৃত্যু। বরং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনেকটা এমন যে, যামানার ইমামকে না চিনলে একজন ব্যক্তি (অর্থাৎ যার কাছে ইমামের পরিচয় পৌঁছায়নি, সে) অনেক আলো (অর্থাৎ ইমাম মাহদী (আ.)) থেকে বঞ্চিত হলো, আর যে ব্যক্তির কাছে ইমামতের জ্ঞান পৌঁছেছে, সে যদি যামানার ইমামের আনুগত্য না করলো, তবে তার মৃত্যু অন্ধকারের মৃত্যুর মত হলো।

একইভাবে ‘বায়াতবিহীন মৃত্যু জাহেলিয়াতের মৃত্যু’ কথাটির ক্ষেত্রেও আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। যে ব্যক্তির কাছে ‘বায়াত’ এর প্রকৃত ইসলামী কনসেপ্ট পৌঁছায়নি, তার ক্ষেত্রে কথাটি প্রযোজ্য নয়। কিন্তু যে ব্যক্তি ইসলামে বায়াতের সঠিক কনসেপ্ট জানে, এবং আনুগত্য করবার মত উপযুক্ত আধ্যাত্মিক, চারিত্রিক ও জ্ঞানগত বৈশিষ্ট্যের মানুষও তার নাগালের মধ্যেই আছে, তখন যদি সে তার আনুগত্য না করলো, তাহলে তার এই বায়াতবিহীন মৃত্যু হলো গোঁড়ামি ও অন্ধত্বের মৃত্যু, জাহেলিয়াতের মৃত্যু।]

যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা ইনসানে কামেল (পূর্ণতাপ্রাপ্ত মানব, যেমন নবী-রাসূল) প্রেরণ করেছেন, যাঁরা মানবজাতিকে এই পথে গাইড করেছেন। তবে এটাও সত্য যে, পৃথিবীর ইতিহাসে কম মানুষই নবী রাসূলগণের শিক্ষাকে পূর্ণরূপে আয়ত্ত করতে পেরেছে। ইতিহাসের অনেক নবীকে উগ্র লোকেরা হত্যা করেছে, আবার কোনো কোনো নবীর সারাজীবন ইসলাম প্রচার সত্ত্বেও অল্প কিছু সত্যান্বেষী মানুষ ছাড়া বাকি সবাই অন্ধকারেই রয়ে গেছে। এমনকি শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কেও আধ্যাত্মিক যাত্রার পথপ্রদর্শক হিসেবে খুব কম মানুষই গ্রহণ করেছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাঝেও কম মানুষই তাঁর আলো পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন।


প্রচলিত ধর্মচর্চা
এদেশে প্রকৃত ইসলামের আলো গ্রহণের পথে সবচে' বড় অন্তরায় হয়ে আছে প্রচলিত (বিকৃত) ইসলাম চর্চা। শুধু আমাদের দেশে না, দুনিয়ার মোট ধর্মচর্চার সিংহভাগই এমন। অন্ধ আবেগ, অসংযত অযৌক্তিক আচরণ ও অনমনীয়তা – আমাদের প্রচলিত ধর্মচর্চার সাথে এই শব্দগুলো জড়িয়ে গেছে। আসলে, প্রচলিত অধিকাংশ ধর্মচর্চাই মানুষকে বদ্ধ করে ফেলেছে; রুদ্ধ করে দিয়েছে আত্মিক-আধ্যাত্মিক-বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির দ্বার। সেটা কি শিয়া কি সুন্নি, কি মাযহাবী-লা মাযহাবী কিংবা বিভিন্ন নামের দল। চিন্তা ও অনুভূতির জগতে স্বাধীন বিচরণ করে নিজহাতে মণিমুক্তা অন্বেষণের পথকে শিরক, বিদআতসহ নানান আখ্যা দিয়ে মানুষকে জান্নাত হারানোর ভয় দেখিয়ে এবং বদ্ধ জ্ঞান ও অনুভূতির দলীয়/ গোত্রীয় ধারার ধর্মচর্চাকে জান্নাতের একমাত্র উপায় হিসেবে লোভ/ ভয় দেখিয়ে মানুষকে বন্দী করে রাখছে, শেকলবন্দী দাসে পরিণত করছে। মুক্তির পথে কাউকে ডাকলে তাই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়। যদি বলি, Come! Let us step outside of this captivity, together – let us explore, let us talk, let us think, feel and embark on a journey towards God, a new adventure, a miracle every moment – তখন তা হয়ত মাটিতে গিয়ে পড়ে, কিংবা রুক্ষ জবাব হয়ে ফিরে আসে। তবু আল্লাহর অশেষ রহমত যে, এমন মানুষ তিনি দান করেছেন, যার পাশে বসে "মানুষ নিজেই নিজের জ্ঞানের উৎস হতে পারে" একথা বললে কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নেড়ে বলে, "হুম..."। অস্থির হয়ে কুরআন, হাদীস কিংবা ধর্মশাস্ত্রের মর্যাদা ও অপরিহার্যতা প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয় না।

“প্রচলিত অর্থের ধার্মিক” মানুষদের চেয়ে “প্রচলিত অর্থের সেকুলার” মানুষদেরকে তাই প্রায়ই বেশি উদারমনা হিসেবে দেখতে পাই: তারা নিজেদের সহজাত জ্ঞানকে “অর্জিত ধর্মীয় জ্ঞানের” পর্দা দ্বারা আবৃত করে ফেলেনি...।

এটা খুবই বেদনাদায়ক, কিন্তু প্রচলিত ধর্মচর্চা হয়ে গিয়েছে অনেকটা পৌত্তলিকতার মতই: কোনোকিছু অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরা! যেই বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ পৌত্তলিকতা ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, যেই অন্ধত্ব ত্যাগের ফলে ইসলামের আলো পেয়েছিলো, ইসলামে এসে আবারও সেই অন্ধত্বকেই আঁকড়ে ধরেছে, সেই বিচারবুদ্ধিকে ত্যাগ করেছে। আর এখন শয়তান সেটার সুযোগ নিয়ে ভুল ভ্রান্তি প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে, আর মানুষও তা প্রাণপনে “ইসলাম, আল্লাহ, রাসূল” ভেবে আঁকড়ে ধরে রাখছে!


“I know you’re tired, but come! This is the way.” – Rumi


জ্ঞানের উৎস
এক দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞান দুই প্রকার: সহজাত ও অর্জিত।

মানুষের সহজাত জ্ঞান কমপক্ষে তিনটি: বিবেক, বিচারবুদ্ধি এবং স্রষ্টার ব্যাপারে আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা। আর এই সহজাত জ্ঞান ব্যবহার করেই মানুষ জ্ঞান অর্জন করে, অর্থাৎ ‘অর্জিত জ্ঞান’ এর অধিকারী হতে থাকে। নামাজ, রোজা ইত্যাদিসহ ইসলামের যে বিষয়গুলোতে আমাদেরকে জ্ঞান ‘অর্জন’ করতে হয়, যা আমরা আপনা আপনি বুঝে ফেলি না, তা-ই অর্জিত ধর্মীয় জ্ঞান। আল্লাহ তায়ালা পরকালে মুক্তির জন্য ও তাঁর কাছে গৃহীত হবার জন্য সহজাত জ্ঞানের বাইরে কোনো অর্জিত ধর্মীয় জ্ঞানকে বাধ্যতামূলক করেননি।

আমরা যদি আমাকের অর্জিত জ্ঞানকে আঁকড়ে ধরি, তবে আশঙ্কা আছে যে আমরা আমাদের সহজাত জ্ঞানের বিপরীতে যাবো। কিন্তু আমরা যদি আমাদের সহজাত জ্ঞানকে আঁকড়ে ধরি, তবে সম্ভাবনা আছে যে, আমরা জ্ঞান অর্জন করতে পারব।

মানুষ নিজেই নিজের জ্ঞানের উৎস হতে পারে। ধ্যান করার মাধ্যমে এটা অর্জন করা সম্ভব।

মানুষের বুদ্ধিমত্তা আল্লাহর এক বিস্ময়কর দান। এ দ্বারা হৃদয়ের পর্দা উন্মোচন করা সম্ভব হয়। আবার হৃদয়ের চর্চার দ্বারা জ্ঞানের পর্দা উন্মোচন সম্ভব হয়। তবে জ্ঞানের পর্দা উন্মোচন ছাড়া অপর জগতে প্রবেশ অসম্ভব-প্রায়, কারণ জ্ঞান হলো হৃদয়ের জগতে প্রবেশের দ্বার। একারণেই বলা হয়েছে: জ্ঞানের পর্দা হলো সবচে' বড় পর্দা।

মারেফাতুল্লাহ অর্জনের মাধ্যমে জীবনের সকল জিজ্ঞাসার জবাব পাওয়া সম্ভব।


Blindness of the Heart: To lose vision after the vision
মানুষের ব্রেইনের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেমন চোখ, কান, মুখ আছে, যা দিয়ে আমরা দেখতে, শুনতে ও বলতে পারি, তেমনি মানুষের হৃদয়েরও দর্শন, শ্রবন ও বাকশক্তি আছে। যা দ্বারা সে আল্লাহ ও তাঁর বন্ধুদেরকে দেখে, তাদের সাথে কথা বলে, তারা জবাব দিলে তা শুনতে পায়। প্রতিটা মানুষের সহজাত জ্ঞানই তাকে হৃদয়ের দর্শন, শ্রবণ ও বাকশক্তি দিয়ে থাকে। কিন্তু মানুষ নিজের উপর জুলুম করে তা হারিয়ে ফেলে। তাই যখন সে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহর সেই ওয়াদার বাস্তবায়ন দেখতে পায় না, যেখানে আল্লাহ বলেছেন যে, তাঁর বান্দা আর্তি জানালে তিনি জবাব দিয়ে থাকেন। সেই জবাব আর শুনতে পায় না। কারণ সে জবাব তো কানে নয়, সে জবাব তো এসেছে হৃদয়ে।

আজকে আমরা চোখ দিয়ে সবকিছু দেখছি। চক্ষুষ্মান কোনো মানুষ যদি আগামীকাল হঠাৎ অন্ধ হয়ে যায়, তার জীবনটা কতই না দুর্বিষহ হয়ে উঠবে! কতই না সে মিস করবে সবকিছু, আবার এই সুন্দর পৃথিবীর যত রঙ দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকবে প্রতিটা মুহুর্ত।

আমরাও তেমনি করে হৃদয়ের আয়নায় খোদাকে দেখতে পেতাম, তাঁর কাছে হৃদয় থেকে প্রার্থনা করতে পারতাম, এবং খোদা জবাব দিলে ‘পর হৃদয়ের মাঝে তা ধারণ করতে পারতাম। কিন্তু আফসোস! আমাদের সেই দৃষ্টিশক্তিই যে আমরা শুধু হারিয়ে ফেলেছি তা-ই নয়, আমরা আমাদের হৃদয়ের বাকশক্তি ও শ্রবণশক্তিও হারিয়েছি। তাই আমাদের প্রার্থনা হৃদয় থেকে না এসে মস্তিষ্ক থেকে আসে, প্রার্থনার জবাব আমরা হৃদয়ে শুনতে না পেয়ে রক্তমাংসের চোখ দিয়ে দুনিয়ার ভিতরে খোঁজার চেষ্টা করি। আমরা আমাদের এই বধির, বোবা ও অন্ধ অবস্থাতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি, অথচ একবারও ভেবে দেখছি না, আমিও একসময় আধ্যাত্মিক জগতের সবকিছু দেখতাম, কথা বলতাম, শুনতাম। কতইনা আফসোস, আমরা দৃষ্টিশক্তি পাবার পরেও তা হারিয়ে ফেলেছি, অন্ধ হয়ে গিয়েছি!

“Everyone sees the unseen in proportion to the clarity of his heart, and that depends upon how much he has polished it. Whoever has polished it more, sees more - more unseen forms become manifest to him.” – Rumi


এক ও আরেক

“দুটি বিষয়ের সমস্ত দিক একই হলে তা আর দুটি ভিন্ন বিষয় হত না, বরং এক হয়ে যেত।” - এটা দার্শনের একটি মূলনীতি। এর উপর ভিত্তি করে আমাদেরকে ক্বলবের জগত সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে। বস্তুজগতের সাথে ক্বলবের জগতের সম্পর্কটা কিভাবে করা হয়েছে? নীরবে যদি মনে মনে বলি, ‘আল্লাহ’, আর যদি সশব্দে বলি, ‘আল্লাহ’ – তবে পার্থক্য কী? নীরব যিকরে মুহাম্মদী আর সরব যিকরে মুহাম্মদী – দুটির পার্থক্য কী? বস্তুজগতে এর কী প্রভাব পড়ে? বস্তুর সাথে মনের সম্পর্ক কোথায়? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন চিন্তাশীল মনে আসবেই।

লক্ষ্য করে দেখবেন, কোনো নামাজ আমরা নীরবে পড়ি, কোনোটা আবার সরবে পড়ি। এগুলি মহান আল্লাহপাক আমাদেরকে দিয়ে দিয়েছেন, রাসুল (সা.) আমাদেরকে দিয়েছেন, যেন আমরা trial and error করে শিখতে গিয়ে পিছিয়ে না পড়ি। একটা কাঁচের ঘরে বিশেষ কম্পাঙ্কে শব্দ উৎপন্ন করলে কাঁচগুলো ভেঙে পড়বে। বস্তুজগতের উপর শব্দের এমন কিছু কিছু প্রভাব আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু অবস্তুজগতের উপর শব্দের প্রভাব কেমন? আল্লাহ ও হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নীরবে স্মরণ ও সশব্দে স্মরণের প্রভাবগত পার্থক্য কী? এগুলি একজন আ’রেফ/ ইনসানে কামেল/ পীর/ ওলি-আউলিয়া আপনাকে শিক্ষা দেবেন।


গায়েবে ঈমান ও আমাদের প্রার্থনা
“গায়েব” এর বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য আছে। আমার কাছে এর একটা অনুভূতি এমন: “জ্ঞানের ঊর্ধ্ব”। এমনকি অনুভবেরও ঊর্ধ্ব। কোনো প্রকার ধারণা, পরিকল্পনা – কোনো কিছুতেই যাকে ধারণ করা যায় না। যেটাকে মানুষ miracle-ও বলে!

গায়েবী সাহায্য আমি কিভাবে প্রার্থনা করব? আমি জানি যে, আমার বুদ্ধিতে যা কুলায়, আমি যেটাকে সর্বোচ্চ পাওয়া মনে করি, মানুষের জন্য আল্লাহর ভাণ্ডার তার চেয়েও অনেক বেশি। নিজের এই সীমাবদ্ধতা জেনে তবুও কি নিজ বুদ্ধিতে প্রার্থনা করব? নানান ‘কথা’ আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করব? বলব যে, এটা চাই ওটা চাই, এমন হোক অমন হোক? কেন আমি এত অল্পে সন্তুষ্ট থাকব, যেখানে অজানা সব উপহার অপেক্ষা করছে আমার জন্য?

তাই আল্লাহর কাছে যদি কিছু চাইতেই হয়, আমি বলি কি, কিছু চেয়ো না। যদি আমি কিছু চেয়ে বসলাম তো আমি আসলে খুব কমদামী কিছু চাইছি। কারণ আল্লাহর কাছে যে এর চেয়েও বেশি কিছু আছে! জান্নাত কামনা করব? কেন জান্নাত কামনা করব? আল্লাহর কাছে যে এর চেয়েও বেশি কিছু আছে! কুরআনে আমরা সর্বোচ্চ পুরস্কারের কথা পড়েছি। সেটা চাইবো প্রার্থনায়? কেন চাইবো? এর চেয়ে কি বেশি কিছু নেই? কী আছে? আসলে গায়েবে কী আছে?

আমি জানি না। কিন্তু আমি তা চাই। আমি তা-ই চাই, যার সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নাই। যদি কোনোকিছু আমার মস্তিষ্ক চিন্তা করে ফেলল তো সেটা আমি আর চাই না। আমি তা-ই চাই, আমার বুদ্ধিবৃত্তি যা ধারণ করতে অক্ষম। তাহলেই কেবল আল্লাহর ভাণ্ডার থেকে পানীয় পান করতে পারব! নিশ্চয়ই পারব! এই দুনিয়াতেই পারব!


“Never lose hope, my heart, miracles dwell in the invisible.” – Rumi

কিন্তু হায়, আজীবন শুধু বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে প্রার্থনা করে এসেছি। গায়েবীসাহায্য ও উপহার সম্পর্কে কিছুমাত্র ধারণা পাবার সাথে সাথে আজ মনে হচ্ছে, বৃথাই এত প্রার্থনা! এযাবৎ যত যা প্রার্থনা করেছি – হায়রে, কী প্রার্থনা করেছি! কিন্তু আমি কিভাবে এই গায়েবী উপহার, এই miracle এর জন্য প্রার্থনা করব? তা-ও জানি না। শুধু জানি যে, এই প্রার্থনার সময়টুকু অন্ততঃ নিজেকে ত্যাগ করতে হবে। নিজের বুদ্ধিবৃত্তিকে ছেড়ে দিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়া। তখন কলিজাটা মুচড়াতে থাকে শুধু! তখন যে কী হয়, সে সম্পর্কে মানুষ বেখবর। ভাষা তা ধারণে অক্ষম। মস্তিষ্ক তখন স্থবির। সেই প্রার্থনা তাই কেউ কাউকে শিখাতে পারে না। সেটার বর্ণনাও আজ পর্যন্ত কোনো ভাষা দিতে পারেনি, দেয়নি। যুগে যুগে আরেফগণ শুধু পথ দেখিয়ে গেছেন: এই দরজা অতিক্রম করো। কিন্তু দরজার ওপারে যে কী, তা রহস্যই র’য়ে গেছে। তা রহস্যই থেকে যাবে। এ এক অদ্ভুত বাজি! তবু মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মত ঐ দরজার দিকে না গিয়ে পারে না।


“We can't help being thirsty, moving towards the voice of water.” – Rumi



“Nothing I say can explain to you Divine Love. Yet all of creation cannot seem to stop talking about it.” – Rumi

“Let silence take you to the core of life.” – Rumi


“Silence is the language of God, all else is poor translation” – Rumi


“If words come out of the heart,
they will enter the heart.” – Rumi


“Don't scare us of being deprived of intellect, because the faculty of intellect, in our province, has no position.” – Hafiz


মানুষের প্রকৃতিগত দুর্বলতা
মানুষ যেই অপূর্ণতার দ্বারা পরিচালিত হয়ে সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে, সেই একই অপূর্ণতার কারণে মানুষ কোনো জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, দল, ব্যানার ইত্যাদির নিচে আশ্রয় নেয়। আমার মনে হয় এটা মানব প্রকৃতির সহজাত দুর্বলতা ও অপূর্ণতা থেকে উৎসরিত। সমাজের দ্বারা সে উপকৃত হয়, সমাজ তার এমন অনেক অভাব পূরণ করে যা সে নিজে করতে পারছে না, এমতাবস্থায় সমাজে সে টিকে থাকার চেষ্টা করে, এমনকি সেজন্যে যদি সমাজের অনেক অন্যায়ের বিপরীতে নীরব থাকতে হয়, তবুও। বিভিন্ন ধরণের জাতীয়তাবাদ লালন করা, বিভিন্ন ধর্মীয়/ রাজনৈতিক দলের দোষত্রুটি জানা সত্ত্বেও তার সাথে লেগে থাকা – এগুলোর অধিকাংশই প্রতিটা ব্যক্তির মানুষ হিসেবে যে সহজাত দুর্বলতা ও অপূর্ণতা, তার কারণে ঘটে থাকে। এমনকি অপর মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করাটাও বহুলাংশে মানুষ করে থাকে আপন দুর্বলতার কারণে।

ব্যক্তিগত মুক্তি অর্জনের পথে একজন মানুষ যত এগিয়ে যাবে, অর্থাৎ মানবিক দুর্বলতা ও অপূর্ণতাগুলিকে জয় করবে, ততই সে দলীয়/গোত্রীয়/সামাজিক সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে। বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতিই এই মুক্তি এনে দেবে। তখন একজন মানুষ তার চাহিদা পূরণের জন্য আল্লাহ ছাড়া আর কারো উপর নির্ভরশীলতা অনুভব করবে না।


মানুষের গুণাবলী: ঝর্ণাধারাকে বাধাগ্রস্ত না করা
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁর গুণের উপর সৃষ্টি করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাই মানুষের মাঝে ঐশী আলো থাকে। আমাদের দায়িত্ব কেবল সেই গুণাবলীর চর্চা করা। দুনিয়ার বুকে আল্লাহর খলিফা হিসেবে মানুষের দায়িত্ব এটাই।

এ যেন এক ঝর্ণাধারার মত। যার হৃদয় যত কলুষিত, তার ঝর্ণার পথে তত বেশি পাথরের বাধা। তার কাছে গেলে পথিকের তৃষ্ণা মেটে না, কোথাও এক আঁজলা পানি পর্যন্ত নেই। আর যাদের হৃদয় পরিষ্কার – আহ, তেমন মানুষকে একটু দেখলেই যেন তীব্র রোদের মাঝে একঝলক সুশীতল পরশ এসে ছুঁয়ে যায়। তৃষিত পথিক তৃষ্ণা মেটায়। আলহামদুলিল্লাহ বলে।


Importance of Gathering: Spreading of the Spark



“O the morning bird! Learn the etiquette of love from the moth, for it found content in quietly burning once it found its beloved the flame.”


মানুষ একে অপরকে প্রভাবিত করে। প্রভাবিত হয়। সচেতনভাবে কিংবা অসচেতনভাবে। এটা সবসময় ঘটতেই থাকে। ইসলামে জামা’আত এর এত গুরুত্ব কেনো? এটাতো এজন্যেই যে, যেন একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। ঈমানের বিভিন্ন স্তরে অবস্থানকারী মানুষেরা নিয়মিত একত্রিত হবার মাধ্যমে পরস্পরের ঈমান থেকে উপকৃত হবে। একজনের মাঝে যে ঈমানের আগুন প্রজ্বলিত, তার ফুলকি গিয়ে পড়বে আরেকজনের গায়ে, আর ওমনি তার মাঝেও ঈমানের আলো প্রজ্বলিত হয়ে উঠবে..। Religious gatherings are nothing but sharing of these sparks…।

এখন এটা সিদ্ধান্তের ব্যাপার যে, আমি কোন স্ফূলিঙ্গের আশেপাশে থাকবো। এমন মানুষদের সাথে থাকবো, যাদের স্ফূলিঙ্গ আমার গায়ে এসে পড়লে আমার ঈমান উন্নত হয়, খোদার দিকে অগ্রসর হই, আত্মা পরিশুদ্ধ ও নম্র হয়; নাকি এমন মানুষের সাথে থাকবো, যার স্ফূলিঙ্গ কেবল অন্ধকারে টেনে নিয়ে যায়, হৃদয়কে দুনিয়ায় মত্ত, অহঙ্কারী, উদ্ধত, খোদাবিমুখ করে তোলে?


Anti-ism প্রসঙ্গে

সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত, স্বতঃপ্রতিষ্ঠিত। মিথ্যা দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। মিথ্যার বিরোধিতা করা কোনো মৌলিক কাজ হতে পারে না, কারণ মিথ্যা স্বয়ং দুর্বল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। (তবে সত্য প্রকাশের অংশ হিসেবে মিথ্যার বিরোধিতা আসতে পারে।) Anti-ism তাই কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।


তাই নাস্তিকতার বিরোধিতা করা কোনো মৌলিক কাজ নয়। বরং আলো হাতে এগিয়ে যাওয়াটিই মৌলিক কাজ।


খোদামুখী যাত্রা

সকল সমস্যার সমাধান হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা, তাঁর সান্নিধ্যঘনিষ্ঠ হওয়া, আর সবকিছু চেয়ে তাঁকেই বেশি ভালোবাসা। এই পথে অগ্রসর হবার সাথে সাথে সমস্যাগুলির সমাধান হতে শুরু করে। সাইর ওয়া সুলুকের তাই কোনো বিকল্প নেই...।


You have escaped the cage. Your wings are stretched out. Now fly. – Rumi

_______________________________


প্যারালেল ইউনিভার্স | প্যারালেল কনশাসনেস | ইনসানে কামেল

সাইর ওয়া সুলুক



মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…