সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আল্লাহ কেন পথভ্রষ্ট করেন? | অনন্তের পথে


নাস্তিকের প্রশ্ন: কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ কাফিরদের ক্বলবে (হৃদয়) মোহর মেরে দেন (অর্থাৎ সত্য গ্রহণে অক্ষম করে দেন)। আর স্বয়ং আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তাকে হেদায়েত করে কার সাধ্য? অতএব, পৃথিবীতে যতজন নাস্তিক আছে, তাদের এই অবস্থার দায় আল্লাহর; আল্লাহর কারণেই তারা ঈমান আনতে পারছে না।

জবাব: আপনাকে যদি খাবার খেতে দেয়া হয়, কিন্তু আপনি ইচ্ছা করে না খান, এবং আপনার এই “কর্মের ফল” হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই আপনার শরীর শুকিয়ে যায়, তাহলে কি সেটা তার দোষ, যে আপনাকে খাবার দেয়? একইভাবে আল্লাহ তায়ালা নবীর মাধ্যমে সত্যবাণী দিয়েছেন, আর কাফিররা সেটা গ্রহণ না করে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই “গোঁড়ামির কর্মফল” হিসেবে তাদের অন্তর তালাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। এটা তাদের নিজেদেরই কর্মফলমাত্র।

প্রশ্ন: তাহলে আল্লাহ কেন এভাবে বললেন যে, “তিনি তালাবদ্ধ করে দেন?” কেন এভাবে বললেন না যে, “সত্য প্রত্যাখ্যান করার কারণে “গোঁড়ামির কর্মফল” হিসেবে কার্যকারণবিধি মোতাবেক তাদের অন্তরে মোহর পড়ে যায়”?

পাঠক! আমরা জানি যে, আল্লাহর কালামে যখন একটি কথা বলা হয়, তখন সেটিই হলো সবচে’ উপযুক্তভাবে প্রকাশিত বক্তব্য। এরচেয়ে আর ভালোভাবে বলা সম্ভব নয়।[QR - ফাসাহাত বালাগ্বাত] তাই কুরআনের আয়াতকে “ভুলভাবে উপস্থাপিত বক্তব্য” বলে মনে না করে বরং আমাদের বুঝে নিতে হবে যে, আমার অযোগ্যতার কারণেই আমি এই কথাটির রহস্য বুঝতে পারছি না। এইযে বিভিন্ন বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা নিজের কর্তৃত্বকে সংযুক্ত করে কথা বলছেন, নিশ্চয়ই এর কোনো কারণ আছে, রহস্য আছে। উৎসুক মন নিয়ে সেই রহস্যটি জানার চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।


আবার দেখুন, কুরআনে আল্লাহপাক বলেন, “আমি বৃষ্টি বর্ষণ করি।” অথচ আমরা জানি পানিচক্রের মাধ্যমে প্রাকৃতিক নিয়মানুসারে বৃষ্টিপাত হয়। তাহলে কেন তিনি বললেন, “আমি বৃষ্টি বর্ষণ করি”? এমন আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে কুরআন থেকে, যেখানে আল্লাহ তায়ালা নিজের কর্তৃত্বকে সংযুক্ত করেছেন। অথচ ব্যাপারটি এমন এক ঘটনা, যেটা কার্যকারণবিধি (law of causality) মোতাবেক স্বাভাবিকভাবেই হয়।

থার্ড অবজার্ভার প্রবলেমের সলিউশান

হ্যাঁ, পাঠক, এখানেই নিহিত আছে solution to the Third Observer Problem। একদিকে পরম স্রষ্টা, আরেকদিকে তাঁর সৃষ্টিজগত। এর বাইরে কোনো তৃতীয় পক্ষ নাই। তাই কার্যকারণবিধিকে যেন কেউ তৃতীয় পক্ষ (খোদা, স্বয়ম্ভূ - নিজ হতে অস্তিত্বমান) মনে করে না বসে। “প্রাকৃতিক নিয়মেই বৃষ্টিপাত হয়”, “ন্যাচারালি এটা ঘটেছে”, “গোঁড়ামির ন্যাচারাল পানিশমেন্ট এটা” – এভাবে কথা বলতে বলতে মানুষ যেন আবার প্রাকৃতিক নিয়ম তথা কার্যকারণবিধিকে শতভাগ স্বাধীন ও স্রষ্টাসম্পর্কহীন মনে না করে। বিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগে নিত্যনতুন কার্যকারণবিধি আবিষ্কার করতে করতে মানুষ যেন প্রকৃতিপূজা কিংবা বিজ্ঞানপূজা শুরু করে না দেয়। বরং মুগ্ধ যদি হতেই হয়, ভক্তি যদি করতেই হয়, তবে সেটা যেন কার্যকারণবিধির স্রষ্টার প্রতিই হয়, সকল ‘বিজ্ঞানের’ স্রষ্টার প্রতিই হয়। একারণেই আল্লাহপাক কার্যকারণবিধি মোতাবেক সংঘটিত স্বাভাবিক ব্যাপারগুলোর সাথেও নিজের কর্তৃত্ব সংযুক্ত করে কথা বলছেন।

একারণেই দেখবেন, মুসলমানদের মাঝে ভালোমন্দ সব বিষয়ের সাথে আল্লাহকে সম্পৃক্ত করে কথা বলার রীতি চালু আছে: “আল্লাহ আমাকে দুটো সন্তান দিয়েছেন”, “আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে স্বচ্ছলতা দান করেছেন”, “আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন” ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ যদিও সে নিজেই জৈবিক ক্রিয়া সম্পাদনের মাধ্যমে সন্তান জন্মদান করেছে, কিংবা নিজে পরিশ্রম করে স্বচ্ছল হয়েছে, কিংবা কোনো সন্ত্রাসী তার সন্তানকে হত্যা করেছে – তবু মুসলমানেরা আল্লাহ তায়ালাকে সম্পৃক্ত করে কথা বলে। এর ফলে এটা তার সর্বদা স্মরণ থাকে যে, সকল কিছুর উপর আল্লাহ তায়ালা ক্ষমতাবান: তিনিই কার্যকারণবিধির স্রষ্টা (ইন্নাল্লহা ‘আলা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বদির)। তিনিই এই ফাংশনগুলি তৈরী করে দিয়েছেন বলে আজকে আমি সন্তান জন্ম দিচ্ছি, স্বচ্ছলতা অর্জন করছি, কিংবা কাউকে হত্যা করার মত পাপ করতে পারছি। তিনিই স্বাধীন এখতিয়ার দিয়েছেন বলে এসব ফাংশনে ইনপুট দিতে পারছি। তিনি যতটুকু ইনপুট দেবার অনুমতি দিয়েছেন, তার বাইরে যাবার ক্ষমতাও আমার নেই।

নাস্তিক্যবাদী তত্ত্ব: God of the Gaps

লক্ষ্যনীয় যে, বর্তমান যুগের নাস্তিকেরা বিজ্ঞান ব্যবহার করে God of the Gaps থিয়োরী দাঁড় করিয়েছে। তারা বলে যে, “ধার্মিকেরা যেসব বিষয়কে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না, সেইগুলিকে বলে: “আল্লাহর লীলাখেলা”। তারপর যখনই বিজ্ঞান সেটার ব্যাখ্যা আবিষ্কার করে ফেলে, তখন আর বলে না যে, “ঐটা আল্লাহর কাজ”, তখন তারা চুপ হয়ে যায়। অর্থাৎ, যত জায়গায় গ্যাপ বা অজানা/ অনাবিষ্কৃত আছে, তত জায়গায় ধার্মিকেরা God কে স্থান দিয়েছে। কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করতে না পারলে “খোদার ইচ্ছা,” আর ব্যাখ্যা করতে পারলে “বৈজ্ঞানিক/ প্রাকৃতিক নিয়ম”। এভাবে করে সকল গ্যাপ পূরণ করতে করতে বিজ্ঞান একদিন খোদাকে নাই করে ফেলবে।”

Science: The New Religion?

অর্থাৎ বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ সাধন হলে তখন বিজ্ঞান, খোদাকে পরিপূর্ণরূপে অপসারণ করে ফেলবে!! এই হলো নাস্তিকদের গড অব দ্য গ্যাপস থিয়োরি। আফসোস, এইসব নাস্তিকেরা প্রকৃতি/ বিজ্ঞান/ কার্যকারণবিধির পূজারী হয়ে উঠেছে। এবং আরো আফসোসের বিষয় যে, আধুনিক মুসলিমদের মাঝে ইসলামকে “বিজ্ঞানসম্মত” প্রমাণ করার জোর প্রচেষ্টা দেখা যায়। অর্থাৎ, ভাবটা এমন যে, বিজ্ঞান হলো নতুন ধর্ম, আর বিজ্ঞানীরা হলেন সেই ধর্মের দেবতা। বিজ্ঞানীদের মুখনিঃসৃত বাণী চোখবুঁজে মেনে নিতে হবে (যেমনটা নাস্তিক আরজ মাতুব্বর করতেন)। তারপর দেবতা বিজ্ঞানীদের সেই কথা দ্বারা ইসলামকে জাস্টিফাই করে আমাদের বাপ-দাদার ধর্মটার মুখরক্ষা করতে হবে! আফসোস, আমরা কোথায় চলে যাচ্ছি! ইসলামকে “বিজ্ঞানসম্মত” প্রমাণ করার জোর প্রচেষ্টার মধ্যেই যে আমাদের লজ্জাজনক বিজ্ঞানপূজারী (তথা কার্যকারণবিধি-পূজারী) অবস্থান প্রকাশ পাচ্ছে, তা কি আমরা মোটেও খেয়াল করছি?

অথচ বিজ্ঞান কী? বিজ্ঞান হলো পৃথিবীতে বিদ্যমান বিভিন্ন কার্যকারণবিধি আবিষ্কার করা মাত্র। আমরা এসকল কার্যকারণবিধি আবিষ্কার করলেও এর (কার্যকারণবিধির) স্রষ্টার অস্তিত্ব এতে নাকচ হয় না।

আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে একদা মুসলিম জাতি আলো হাতে পথ দেখিয়েছে মানবজাতিকে। কই, সেই বিজ্ঞানীদের মাঝেতো “বিজ্ঞান দ্বারা ইসলামকে” জাস্টিফাই করার প্রবণতা ছিল না! বরং তাঁরা যত বেশি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করতেন, ততই বিস্মিত হতেন আল্লাহর সৃষ্টিক্ষমতার সূক্ষ্মতা ও মহাপরিকল্পনা দেখে। আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান বেড়ে যেত তখন। একজন প্রকৃত মুসলিমের তো এমনই হওয়া উচিত!

_______________________________

আল্লাহ সকল কার্যকারণবিধির স্রষ্টা। কার্যকারণবিধি তথা বিজ্ঞানের পূজা থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন নিয়মমাফিক কর্মের সাথে তিনি নিজ কর্তৃত্ব সংযুক্ত করেছেন কুরআনে।

আপনি কী ভাবছেন? শেয়ার করুন

মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…