সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আরো কিছু ফ্যালাসি | যুক্তির কাঠগড়ায় ইসলাম


আসলে সবরকম ফ্যালাসিকে কখনোই তালিকাভুক্ত করা সম্ভব নয়, তাহলে সেটা এক বিশাল এনসাইক্লোপেডিয়া হয়ে যাবে। তবু যুক্তিবিদগণ নানান ফ্যালাসিকে শনাক্ত করেছেন এবং সেগুলির নামকরণ করে তাঁদের বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যেন বিতর্কের সময় আমরা ভুল যুক্তি এড়িয়ে চলতে পারি। ফ্যালাসির কয়েক স্তরের শ্রেণীবিভাগ আছে, আছে বিস্তারিত জটিল আলোচনা। তার সবকিছু এই বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়। তাছাড়া, এটা যুক্তিবিদ্যার বইও নয়। এটাতো “স্রষ্টাভাবনা।” তাই স্রষ্টা ও ধর্ম সংক্রান্ত তর্ক বিতর্কে যেসব ফ্যালাসি বহুল ব্যবহৃত হয়, তার কয়েকটি আলোচনা করার চেষ্টা করেছি বিগত কয়েকটি পর্বে। আর এই পর্বে সংক্ষেপে আরো দুই-চারটি ফ্যালাসির উপর আলোকপাত করব। আশা করি প্রিয় পাঠক সাথেই থাকবেন, এবং ধৈর্য্য ধরে যুক্তিবিদ্যা শিক্ষা করবেন। কেননা, বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করা তথা যুক্তি ও দর্শন ব্যবহার করাই হলো ঈমান অর্জনের পথ।

১. স্টেরিওটাইপিং: ব্যতিক্রম ঘটনা থেকে সার্বিক সিদ্ধান্ত দেওয়া।

যেমন, “তারা (মুসলমানরা) টুইন টাওয়ারে হামলা করে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করলো; এরপরও যদি মুসলমানরা সন্ত্রাসী না হয়, তো সন্ত্রাসী কারা?”

ফ্যালাসির ব্যাখ্যা: প্রথমতঃ, কাজটি যে মুসলিমদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছিলো, তার প্রমাণ দেওয়া হয়নি, এবং দ্বিতীয়তঃ তা হয়ে থাকলেও একটি ব্যতিক্রম ঘটনা দিয়ে সামগ্রিক সিদ্ধান্ত টানা যায় না।

অপরপক্ষে, যদি বলি যে, বাঙালিরা মশলাদার খাবার খায়, জাপানিরা ভাত খায়, মুসলিমরা নামাজ পড়ে – তাহলে সেটা স্টেরিওটাইপিং হবে না। কেননা এখানে বাঙালি, জাপানি, মুসলিম ইত্যাদি জাতি/গোষ্ঠীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে (এটাকে বলা হয় জেনারালাইজেশান)। এখন আপনি যদি একজন বেনামাজী মুসলিমকে নিয়ে আসেন, তাহলেও কিন্তু বাক্যটা মিথ্যা হয়ে যাবে না। কেননা, “মুসলিমরা নামাজ পড়ে” বলতে সব মুসলিমের সাধারণ (common) বৈশিষ্ট্য বুঝানো হয়েছে, এর মাঝে ব্যতিক্রম অন্তর্ভুক্ত নয়। একইভাবে গুটিকয়েক মুসলিম সন্ত্রাসীর উদাহরণ টেনে সেটাকে ২০০ কোটি মুসলিমের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চালিয়ে দিলে সেটা ফ্যালাসি হবে (ফ্যালাসি অব স্টেরিওটাইপিং)।

আবার দেখুন, ১০ই মহররমে শিয়া মাযহাবের কিছু মানুষ প্রকাশ্যে নিজেদের শরীর রক্তাক্ত করে থাকে। এখন সেটা দেখে কোনো অ্যান্টি শিয়া যদি বলে: “শিয়ারা শরীর রক্তাক্ত করে।” তাহলে এটা একটা ফ্যালাসি হবে। কেননা, বিশ্বের মোট ২০ কোটি শিয়ার সবাই-ই শরীর রক্তাক্ত করে না, এমনি ১০ কোটিও করে না, এমনকি ৫ কোটিও না। বরং হাতে গোনা গুটিকয়েক লোকই এটা করে থাকে। এখন যে ব্যক্তি আগে থেকেই শিয়া বিরোধী, সে মনের অজান্তেই এই ফ্যালাসিটা করে বসবে। বলবে, “শিয়ারা শরীর রক্তাক্ত করে।” অথচ তার বলা উচিত ছিলো: “শিয়াদের মাঝে কেউ কেউ শরীর রক্তাক্ত করে।”

বিপরীতে দেখুন, বাংলাদেশের বিখ্যাত এক মাজারে মানুষজন ভক্তি সহকারে গজার মাছকে খাবার দিয়ে থাকে। ইরান থেকে কোনো শিয়া এসে তাই দেখে যদি বলে যে, “সুন্নিরা গজার মাছ পূজা করে”, তখন কেমন হবে?

প্রথমতঃ, ঐটা মাছ পূজা কিনা, সেটা প্রমাণিত নয়। দ্বিতীয়তঃ, যদি সেটা মাছ পূজা হয়েও থাকে, তবুও সে কাজটা বিশ্বের দেড়শো কোটি সুন্নি মুসলমানের মাঝে এমনকি দেড় কোটি মানুষও করে না। অর্থাৎ, গজার মাছকে ভক্তিসহকারে খাদ্য দেয়াটা সমগ্র সুন্নিজগতে একটি ব্যতিক্রম ঘটনা। অতএব, “সু্ন্নিরা করে” না বলে তার বলা উচিত ছিল, “সুন্নিদের কেউ কেউ করে”।

মোটকথা, ছোটখাটো দুয়েকটা উদাহরণ/ব্যতিক্রমী ঘটনা দিয়ে সামগ্রিক সিদ্ধান্ত টানলে সেটাই ফ্যালাসি অব স্টেরিওটাইপিং। যেমন: পাকিস্তানীরা খারাপ, বার্মিজরা সন্ত্রাসী, শ্বেতাঙ্গরা চরিত্রহীন, নাস্তিকরা জেনাকারী, ইন্ডিয়ানরা কৃপণ, কিংবা শিয়ারা আলীকে নবী মানে, সুন্নিরা পীরপূজা করে, আহলে হাদীসরা বেয়াদব ইত্যাদি। আমরা প্রায়ই বেখেয়ালে এধরণের ফ্যালাসি করে বসি। এব্যাপারে আমাদের সকলেরই সতর্ক থাকা উচিত।

২. আপিল টু অথরিটি: যুক্তি না দিয়ে নামী-দামী ব্যক্তিদের রেফারেন্স দেয়া।

যেমন নাস্তিকদের এই যুক্তিটি দেখুন: “বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, কোনো উৎস ছাড়াই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হতে পারে। এটাকে বলা হয় কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান। অতএব, মহাবিশ্বের কোনো উৎস বা স্রষ্টা নাই।” অথচ নাস্তিক ব্যক্তিটি হয়ত ঐ বিজ্ঞানীর ল্যাবরেটরিতেই কখনো যায়নি, কিংবা তার রিসার্চ পেপারটাও হয়ত পড়ে দেখেনি। তবু চোখ বুঁজে মেনে নিচ্ছে যাচাই না করেই। এছাড়াও, “বিজ্ঞানী” মানেই যে তার কথা সঠিক হবে, এর কোনো গ্যারান্টি নাই। যুক্তির ময়দানে অক্সফোর্ড/হার্ভার্ড ইত্যাদির সার্টিফিকেটের কোনো মূল্য নেই। কোনো বিজ্ঞানী কত বিখ্যাত, তারও কোনো মূল্য নেই। মূল্য নেই জগদ্বিখ্যাত সায়েন্স জার্নালেরও। যুক্তির ময়দানে শুধু বক্তব্যকে অবজেক্টিভলি যাচাই করা হবে, তা সে বক্তব্য স্টিফেন হকিং এরই হোক, আইনস্টাইনেরই হোক, কি একজন রিকশাচালকেরই হোক।

নামী দামী বিজ্ঞানীদের কথা চোখ বুঁজে মেনে নেব, অথচ ধর্মগুরুরা কিছু বললে তখন যুক্তি চাইবো – এটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ছাড়া আর কী? অপরদিকে দেখুন, মুসলিমরাও এজাতীয় কাজ করে থাকে। সে ছোটবেলা থেকে যেভাবে নামাজ-রোজা করে এসেছে, সেগুলোকে বিনা প্রশ্নে চোখ বুঁজে মেনে নেয়। কিন্তু যখন অন্য কোনো মুসলিমকে একটু ভিন্নভাবে নামাজ-রোজা করতে দেখে, তখন দলীল চায় (তথ্য-প্রমাণ, যুক্তি ইত্যাদি চায়)। অথচ নিজে যেভাবে নামাজ-রোজা করে আসছে ছোটবেলা থেকে, সেটার দলীল কখনো বাপ-মা কিংবা এলাকার হুজুরের কাছে চায় না! এটাও ডাবল স্ট্যান্ডার্ড।

আমাদের দার্শনিক ও যৌক্তিক বিচারে কুরআনকে স্রষ্টার গ্রন্থ হিসেবে পেয়েছি, আর যেহেতু সংজ্ঞানুসারে স্রষ্টার গ্রন্থে কোনো ভুল থাকতে পারে না, সেহেতু এখন আমরা কুরআনের সকল আয়াতকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে পারি। পৃথিবীর আর কোনো গ্রন্থ কি অনুরূপ? নিশ্চয়ই নয়। এমনকি হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনচরিত আমরা যেসব গ্রন্থে পাই (ইতিহাস ও হাদীস গ্রন্থে), সেসব গ্রন্থও মানুষের সংকলিত। অতএব, সেসব গ্রন্থকে ১০০% নির্ভুল হওয়ার গ্যারান্টি দেওয়া যায় না। অতএব, কুরআন ছাড়া অন্য যেকোনো গ্রন্থের/বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইসাপেক্ষ। অর্থাৎ, যুক্তি দ্বারা প্রমাণ করে দেখাতে হবে যে কথাটি সত্য; ওমুক সহীহ হাদীস গ্রন্থে আছে, কিংবা ওমুক বিখ্যাত ইমাম বলেছেন – এভাবে অথরিটির দোহাই দিলে চলবে না।

প্রিয় পাঠক!

আমি জানি না আপনি মুসলিম ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ হয়ে থাকলে এখনও নিরপেক্ষ দৃষ্টিটা বজায় রাখতে পেরেছেন কিনা। তবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে চিন্তা করে দেখুনতো, যেখানে আল্লাহ তায়ালাই খোদ কুরআনকে অন্ধভাবে মেনে নিতে বলেননি, বরং যুক্তি দেখিয়েছেন, সেখানে কিভাবে এটা সম্ভব যে, “সহীহ” লেবেল দেয়া কোনো হাদীস গ্রন্থের হাদীসকে আমরা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারব না? আল্লাহপাক কুরআনে বলেন:

“এরা কি কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না? এ কিতাব যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট থেকে আসতো, তাহলে তারা অবশ্যই এর মধ্যে অনেক গরমিল পেতো।” (সূরা নিসা, ৪:৮২)

অর্থাৎ, আল্লাহপাক যেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন যে, পারলে কুরআনকে মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে যতখুশি যাচাই বাছাই করো, কিন্তু এর মাঝে কোনো ভুল খুঁজে পাবে না। তাহলে পাঠক, “সহীহ হাদীস” নামে যেসব গ্রন্থ পাওয়া যায়, সেসব কি কুরআনের চেয়েও ঊর্ধ্বে উঠে গেল যে, তার কোনো হাদীস নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না? কী আশ্চর্য স্ববিরোধিতায় উপনীত হয়েছি আমরা যে, নাস্তিকের প্রশ্নের জবাবে কুরআনের প্রতিটা আয়াতকে যুক্তিসম্মত প্রমাণ করার চেষ্টা চালাই, অথচ সেই একই মুসলমান “সহীহ” লেবেলের হাদীসগ্রন্থের কাছে এসে যুক্তি ও দর্শনকে ছুঁড়ে ফেলে অন্ধবিশ্বাসী হয়ে যাই! না, প্রিয় পাঠক, এটা হতে পারে না। আপনার নিজেকে এধরণের স্ববিরোধিতায় পতিত হতে দেবেন না। আক্বল তথা বিচারবুদ্ধিকে কখনো পরিত্যাগ করবেন না। যারা বিচারবুদ্ধি তথা যুক্তি ও দর্শনকে ত্যাগ করে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে কলুষিত করে দেন, ফলে তারা ঈমানই অর্জন করতে পারে না। প্রিয় পাঠক, নিশ্চয়ই আপনি নিজেকে তা হতে দেবেন না!

মুসলিম জগতের একটি প্রচলিত যুক্তি হলো– “এত বড় বড় আলেম কি তাহলে ভুল বুঝেছেন?” অথচ প্রিয় পাঠক! মেজরিটি কখনো সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড হতে পারে না। সত্যের মানদণ্ড তো কেবল যুক্তি ও দর্শন।

৩. অ্যাড হোমিনেম: ব্যক্তিগত আক্রমণ।

যেমন, “আপনার যুক্তি দেখে হাসবো না কাঁদবো বুঝতেছি না।” কিংবা “ভাই এইডা আপনি কী কইলেন? খাড়ান একটু হাইস্যা লই। হাহাহা, হিহিহি, হোহোহো…।” অথবা, “ওরে ভাই, দেখেন, এছলামী আইনস্টাইন আইছে, এখন মেরাজ শিখাইবো, সবাই তাড়াতাড়ি আসেন…।” অথবা, “এত বুদ্ধি নিয়ে ঘুমান কেমনে?”

পাঠক! আপনারা কখনো টিভিতে রেসলিং শো দেখেছেন? লক্ষ্য করেছেন কি, অপর পক্ষকে উত্তেজিত করার জন্য কিভাবে গালিগালাজ করে, এটা সেটা বলে? এসব ফ্যালাসি হলো সেধরণের নিকৃষ্ট কাজ।

ধরুন, আপনি হয়তো নাস্তিককে একটা যুক্তি দিলেন। তখন সে বলল, “ঐযে, আইছে আরেকজন। জোকার নায়কের শিষ্য। হাহাহা, you’re funny…” অর্থাৎ, সে আপনার যুক্তিকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা না করে ব্যক্তি আক্রমণ করছে। যেন আপনি উত্তেজিত হয়ে যুক্তির পথ থেকে ছিটকে পড়ে ওর সাথে রেসলিঙে লিপ্ত হন। যেমন, আপনি যদি তখন বলেন, “অবশ্যই আমি জাকির নায়েকের শিষ্য, আপনার কোনো অসুবিধা আছে? আপনাদের নাস্তিকদের মত নেশাখোর চরিত্রহীনদের অনুসারী না।”

ব্যস! শুরু হয়ে গেল রেসলিং। এধরণের বহু রেসলিং ফেইসবুকে দেখে থাকবেন হয়ত। অথচ আপনার তখন বিনয়ের সাথে বলতে হবে যে, “আমার যুক্তি কারো সাথে মিলে যেতেই পারে। যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে হবে, ব্যক্তি আক্রমণ দিয়ে নয়। ফ্যালাসি করবেন না দয়া করে।”

আবার দেখুন, বেচারা জাকির নায়েক যাবে কোথায়। একদিকে নাস্তিকদের ফ্যালাসির আক্রমণের শিকার, অপরদিকে তার নিজের ঘরের লোক, অর্থাৎ মুসলমানরাও তাকে ব্যক্তি আক্রমণ করে থাকে। যেমন: “আরে রাখেন আপনার জাকির নায়েক। সুন্নতি পোশাক নাই, খ্রিষ্টানদের মত টাই পরে, এখন তার কাছ থেকে শিখতে হবে ইসলাম? ওতো ইহুদিদের এজেন্ট।”

অথচ যুক্তি যে ব্যক্তির মুখ থেকেই আসুক না কেন, তা যুক্তি। আফসোস, যেসব মুসলিম এজাতীয় কথা বলে থাকে, তারা কুরআনের দর্শনটাই জানে না। কুরআনের দর্শন হলো, মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে কথা শুনতে হবে, তারপর যাচাই বাছাই করে তার থেকে উত্তমটুকু গ্রহণ করতে হবে।

তীর্যক মন্তব্য, কটাক্ষ, উস্কানি, উপহাস, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, দাড়ি-টুপি-পোষাক নিয়ে বিদ্রুপ করা, জঙ্গী/সন্ত্রাসী বলা, বিভিন্ন গালি দেয়া – এগুলো সবই ব্যক্তিগত আক্রমণ, ফ্যালাসি অব অ্যাড হোমিনেম। এসব ফ্যালাসি মানুষ তখনই করে, যখন তার কাছে মোক্ষম যুক্তি থাকে না। কারণ, শক্তিশালী যুক্তি থাকলে প্রতিপক্ষের দিকে সেই যুক্তি ছুঁড়ে দিতে মানুষ এক মুহুর্ত দেরী করে না। যখন যুক্তি থাকে না, তখনই ব্যক্তি আক্রমণের ফ্যালাসি করে বসে।

আবার দেখুন, হয়ত কেউ বলল: জোরে আমিন বলা বিদআত। তখন আরেকজন বলল: তারমানে আপনি বলতে চান আমি বিদাতী? আমার বাপ-দাদা বিদাতী? আপনি কী বলতে চান, হ্যাঁ? আপনি বলতে চান তারা জাহান্নামে গেছে? কী মনে করেন নিজেকে? খুব সহীহ হয়ে গেছেন?

(এরপর মারামারি, মাথা ফাটাফাটির একটা দৃশ্য হবে।)

প্রিয় পাঠক!

সত্য কারো বাপ-দাদার সম্পত্তি নয়। বরং সত্য হলো আল্লাহর: Truth belongs to God. অতএব, যেখানেই সত্য পান, সেটাকে কুড়িয়ে নিন, এমনকি কাদামাটির মধ্যে হলেও।

৪. মুভিং দ্য গোলপোস্ট: প্রসঙ্গ ঘুরানো।

Is religion good or evil – এই শিরোনামে নাস্তিক ড. রিচার্ড ডকিন্স এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক মেহদি হাসান। পাঠক! লক্ষ্য রাখবেন, মূল বিষয়বস্তু কিন্তু “ধর্ম ভালো নাকি খারাপ।” এবার দেখুন, এই প্রসঙ্গেই সাংবাদিক মেহদি হাসান রিচার্ড ডকিন্সকে প্রশ্ন করলেন (ইউটিউবে ভিডিওটির ১৪ মিনিট থেকে দেখুন [QR - Dawkins on religion: Is religion good or evil, Al Jazeera English]) –


মেহদি: “ধর্ম মানুষের কী কী ক্ষতি করেছে, তার প্রচুর এভিডেন্স আপনার (The God Delusion) বইয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমার অবাক লাগে, নিরপেক্ষতার খাতিরে কি “ধর্মের ভালো কাজগুলোও” আপনার উল্লেখ করা উচিত ছিল না?”

ডকিন্স: বৈজ্ঞানিক সত্যই আমার মূল লক্ষ্য। কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ, এসব নিয়ে আমি আসলে খুব একটা কেয়ার করি না। কোনটা সত্য, আমি সেটা নিয়েই কেয়ার করি…। আই মিন, আপনাদের ইসলাম ধর্মে যে আছে মুহাম্মদ চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেছিল, আপনি কি সেটা বিশ্বাস করেন? আপনি কি বিশ্বাস করেন সে ডানাঅলা ঘোড়ায় চড়ে স্বর্গে গিয়েছিলো? আমি (ভদ্রতাস্বরূপ) ধরে নিতে চাই যে আপনি সেটা বিশ্বাস করেন না।

মেহদি: (দৃঢ়ভাবে) না, আমি বিশ্বাস করি। আমি মিরাকল (miracles - মুজিজা) বিশ্বাস করি।

ডকিন্স: (কণ্ঠে বিস্ময় ঢেলে) আপনি এটা বিশ্বাস করেন!!

মেহদি: হ্যাঁ।

ডকিন্স: (কণ্ঠে বিস্ময়ের মাত্রা বাড়িয়ে) আপনি বিশ্বাস করেন যে মুহাম্মদ ডানাঅলা ঘোড়ায় চড়ে স্বর্গে গিয়েছিলো!!

মেহদি: হ্যাঁ, আমি স্রষ্টায় বিশ্বাস করি, আমি মিরাকল বিশ্বাস করি…। (তারপর নিজেকে একটু গুছিয়ে আবার সাংবাদিকসুলভ কন্ঠে–) আই মিন, আসল পয়েন্ট হলো যে – আচ্ছা ধরেন আমি ভুল। ধরে নিলাম আমি ভুল, কিন্তু ব্যাপার হলো…

পাঠক, নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে প্রসঙ্গ ঘুরে গিয়েছে। মেহদি হাসান প্রশ্ন তুলেছিলেন ডকিন্সের নিরপেক্ষতা নিয়ে (যে কেন তিনি ধর্মের শুধু খারাপগুলিই লিখলেন, ভালোগুলি লিখলেন না)। আর ডকিন্স সেখান থেকে ইসলামের দিকে ফোকাস নিয়ে গেল। এখন আবেগী মুসলিম হলে সে নিজের ধর্মকে সঠিক প্রমাণ করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে (মেরাজ বা চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজবে হন্যে হয়ে)। ওদিকে প্রসঙ্গ কিন্তু অলরেডি বদলে গেছে!

একারণেই লক্ষ্য করবেন যে, কিছু মানুষ হেরে যেতে বসলেই সুকৌশলে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দেয়। অর্থাৎ, আপনি একটা ফুটবল নিয়ে যদি সোজা এগিয়ে যেতে থাকেন প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের দিকে, আপনি গোল দিয়ে দেবেন একদম নিশ্চিত, এমন সময় যদি তারা গোলপোস্টটাকে টান দিয়ে ডানে/বামে সরিয়ে দেয়, তাহলে কি আপনি কোনোদিন গোল দিতে পারবেন? নিশ্চয়ই না! একারণেই এই ফ্যালাসির নাম হয়েছে মুভিং দ্য গোলপোস্ট - গোলপোস্ট বা প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দেবার ফ্যালাসি।

প্রিয় পাঠক!

আর সে যদি প্রসঙ্গ না ঘুরিয়ে একই প্রসঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা সূক্ষ্ম তর্ক বিতর্ক করতে থাকে, তাহলে কি দর্শক হিসেবে আপনি মজা পাবেন? নিশ্চয়ই না। আপনি বলবেন, “ধুর একটা জিনিস নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ত্যানা পেঁচাচ্ছে…।” যে মানুষ বিতর্ক করে (আস্তিক-নাস্তিক রেসলিং শো করে) মানুষকে মজা দেয়ার জন্য, কিংবা হাততালি পেয়ে বিখ্যাত হবার জন্য, সে কি দর্শককে বিরক্ত করতে চাইবে? নিশ্চয়ই না। তখন সে ইচ্ছা করেই ফ্যালাসি করবে, প্রসঙ্গ ঘুরাবে, প্রতিপক্ষকে হালকা অপমান করবে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে। এভাবে সে মানুষের মন জয় করবে। কিন্তু সত্য? সত্য পড়ে রইবে ডিবেট মঞ্চের বাইরে।

৫. একুইভোকেশান : যখন যেখানে যে অর্থ নিলে সুবিধা হয়, শব্দের সেই অর্থ গ্রহণ করা।

আসলে পাঠক! যুক্তিবিদ্যা অনেকাংশেই ভাষার খেলা। Fallacy of equvocation সেধরণেরই একটা ব্যাপার। একই শব্দ তো অনেক অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। যখন যেখানে যে অর্থ গ্রহণ করলে যুক্তির পক্ষে সুবিধা হয়, তখন সেই অর্থ গ্রহণ করাটাই ফ্যালাসি অব একুইভোকেশান। যেমন দেখুন নাস্তিক আরজ আলী মাতুব্বরের সত্যের সন্ধান বইয়ে ‘বিশ্বাস’ শব্দটার ইচ্ছামত ব্যবহার:

“ধর্মের মূল ভিত্তি বিশ্বাস (ঈমান)। ধর্ম এই বিশ্বাসকেই আঁকড়াইয়া আছে। কিন্তু এই বিশ্বাস কি বা ইহা উৎপত্তির কারণ কি, ধর্ম তাহা অনুসন্ধান করে না।”

“বিজ্ঞান প্রত্যক্ষ ও অনুমানের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে আমাদের সন্দেহ নাই। বিজ্ঞান যাহা বলে, তাহা আমরা অকুণ্ঠিত চিত্তে বিশ্বাস করি। কিন্তু অধিকাংশ ধর্ম এবং ধর্মের অধিকাংশ তথ্য অন্ধবিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। অধিকাংশ ধর্মীয় বিধি-বিধান প্রত্যক্ষ বা অনুমানসিদ্ধ নহে।”

“ধর্মের মূল ভিত্তি বিশ্বাস (ঈমান)।…”

আরবী ঈমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস নয়, নিরাপত্তা। এ নিয়ে আমরা দার্শনিকের কুরআন যাত্রা-র শেষ পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ঈমান হলো নিশ্চিত জ্ঞানকে অবলম্বন করে নিজেকে নিরাপদ করা। যেমন, আপনি জানেন যে আগুনে হাত দিলে ক্ষতি হবে। এটা নিশ্চিত জ্ঞান। এই জ্ঞান অনুযায়ী আমল করলে (আগুনে হাত না দিলে) আপনি ঈমান তথা নিরাপত্তা অর্জন করলেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বাস আর ঈমান একেবারেই ভিন্ন দুটি জিনিস। কিন্তু নাস্তিক আরজ মাতুব্বর ঈমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস ধরে নিয়ে, তারপর সেটাকে অন্ধবিশ্বাস বলে চালিয়ে দিয়ে সেটাকে মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দিয়ে উনার ইসলামবিদ্বেষী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করলেন। অথচ ইসলামে বিশ্বাস/ধারণার কোনো স্থান নেই।

“তাই কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে আমাদের সন্দেহ নাই। বিজ্ঞান যাহা বলে, তাহা আমরা অকুণ্ঠিত চিত্তে বিশ্বাস করি।”

পাঠক! হাসবেন না দয়া করে। আমাদের মত ইন্টারনেট যুগের মানুষ ছিল না আরজ মাতুব্বর। বরিশালের অজপাড়া গাঁয়ের এক নাস্তিক যখন কিছু লাইব্রেরিতে ঢোকার সুযোগ পেয়েছে, তখন বিজ্ঞানের উপর ক’টা বই পড়েই ভক্তিতে সেজদায় পড়ে গেছে। তাই - “বিজ্ঞান যাহা বলে, উনি তাহা অকুণ্ঠ চিত্তে বিশ্বাস করেন।” কোনো তথ্যপ্রমাণ চান না। ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখতেও চান না যে, ল্যাব টেস্ট এর রেজাল্টটা বিজ্ঞানী সঠিক লিখল, নাকি ভুল লিখল? উনি শুধু বিজ্ঞানীদের ‘অকুন্ঠচিত্তে বিশ্বাস’ করেন।

“যাহা প্রত্যক্ষ তাহা সর্বদাই বিশ্বাস্য। মানুষ যাহা কিছু প্রত্যক্ষ করে, তাহা তাহার চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যেই করে এবং যাহা কিছু প্রত্যক্ষ করে, তাহাই বিশ্বাস করে। আমি স্বচক্ষে যাহা দেখিয়াছি, স্বকর্ণে যাহা শুনিয়াছি, স্বহস্তে যাহা স্পর্শ করিয়াছি তাহাতে আমার সন্দেহের অবকাশ কোথায়? যাহা আমাদের প্রত্যক্ষীভূত, তাহাতেই আমাদের অটল বিশ্বাস।”

- নাস্তিক আরজ মাতুব্বর

একজন বিজ্ঞানী যখন ল্যাবে একটা জিনিস নিজচোখে দেখেন, তখন সেটাতে উনি আস্থা রাখেন। কিন্তু বরিশালের অজপাড়া গাঁয়ের নাস্তিক আরজ মাতুব্বর কি বিজ্ঞানী ছিলেন? তিনি কি বিজ্ঞানী যেভাবে দেখেছেন, সেভাবে করে ল্যাবরেটরিতে ‘স্বচক্ষে দেখিয়াছেন’? “স্বকর্ণে শুনিয়াছেন?” নিশ্চয়ই না! কিন্তু ইসলাম থেকে পালাতে গিয়ে নিরুপায় হয়ে উনি বিজ্ঞানীদের কথার উপর অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করলেন। হ্যাঁ পাঠক, এই জায়গায় বিশ্বাস শব্দটা উপযুক্তভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

আফসোস! ইসলাম থেকে পালাতে গিয়ে এইসব নাস্তিক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীপূজায় লিপ্ত হয়েছে। না আছে তাদের নিজেদের কোনো সায়েন্সের জ্ঞান, না কোনোদিন চোখে দেখেছে কোনো ল্যাবরেটরি, আর না জানে ম্যাথমেটিক্সের জটিল সব সূত্র, যা বৈজ্ঞানিক গবেষণার হাতিয়ার – বরং আছে শুধু বিজ্ঞানীদের প্রতি অন্ধ ভক্তি। বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীপূজারী এসব নাস্তিকের অবস্থা এমন হয়েছে যে, এখন এমনকি যদি সায়েন্টিস্টরা নিজেরাও এসে এদেরকে বলে যে, “আমাদেরকে অন্ধভাবে বিশ্বাস কোরো না, বরং ল্যাবরেটরিতে এসে নিজচোখে দেখে যাও, কিংবা আমার রিসার্চ পেপারটা অন্ততঃ পড়ে দেখো” – তখন তারা সায়েন্টিস্টদের কথাও শুনবে না। বরং তাদের পায়ে বারবার সেজদায় লুটিয়ে পড়বে: “হে মহান বিজ্ঞানী! দয়া করে এমন কিছু আমাদেরকে বলুন যেন তা ব্যবহার করে নাস্তিকতার বিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে পারি!”

পাঠক! এতদূর এসে যদি ক্লান্ত/বিরক্ত হয়ে ভাবেন যে, তাহলে কেন নাস্তিকরা এমন করছে? কেন তারা স্রষ্টা থেকে পালাতে চায়? আর সেজন্যে বিজ্ঞানীদের অন্ধপূজায় লিপ্ত হয়? বিগব্যাং, বিবর্তনবাদ, কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান, ইত্যাদির উপর ভর করে স্রষ্টা ও ধর্মকে ভুল প্রমাণের দুর্বল চেষ্টা চালায়? তাদের তো –

১. উৎসের সন্ধানের ইচ্ছাই নেই

২. দার্শনিক, যুক্তিবাদী, মুক্তমনা ও নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মনই নেই

৩. নাস্তিকতার আড়ালে ধর্মবিদ্বেষ (মূলতঃ ইসলামবিদ্বেষ)-ই তাদের মূল এজেন্ডা

৪. নাস্তিকতার পক্ষে তারা যত কথা বলে, তার সবই ফ্যালাসিতে পরিপূর্ণ

তবু কেন নাস্তিকতার মত ভিত্তিহীন ও দুর্বল একটি মতবাদকে তারা আঁকড়ে ধরে রেখেছে? যেখানে যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের প্রাথমিক কিছু জিনিসের আঘাতেই ধ্বসে পড়ছে নাস্তিকতার প্রাসাদ? তবু কেন নাস্তিক হওয়া? আর গায়ের জোরে ফ্যালাসি করে স্রষ্টার বিরোধিতা করে যাওয়া?

উত্তরটা হয়ত এরকমই…

“Most people believe in the evolution theory not because of science, but because of their sins.”

ভাবানুবাদ: মানুষের বিবর্তনবাদে বিশ্বাসের কারন বিজ্ঞান নয়, বরং তাদের পাপ।

“I think most people can’t find God for the same reason a thief can’t find a policeman.”

ভাবানুবাদ: আমি মনে করি নাস্তিকেরা ঠিক সেই কারণেই স্রষ্টাকে খুঁজে পায় না, যে কারণে একজন চোর কখনো খুঁজে পায় না পুলিশকে।

_______________________________

সত্য কোনো দল/ মতের নিজস্ব সম্পত্তি নয়। Truth belongs to God.

সত্য যেখানেই পান, তা কুড়িয়ে নিন।

এই অধ্যায়ের ফ্যালাসিগুলোর সাথে আরো কিছু যোগ করুন স্রষ্টাভাবনার ফেইসবুক পেইজে

মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…