সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বহুল ব্যবহৃত ফ্যালাসি: কোট মাইনিং | যুক্তির কাঠগড়ায় ইসলাম


কোট মাইনিং (quote mining) কী? কোনো মানুষের বক্তব্য থেকে নিজের সুবিধামত বিভিন্ন অংশ তুলে ধরাটাই কোট মাইনিং। এর খুব সহজ একটা উদাহরণ হলো নাস্তিকদের এই অভিযোগটি:

“ইসলাম একটা সন্ত্রাসবাদী ধর্ম। কারণ কুরআন মুসলিমদেরকে আদেশ দিচ্ছে: ‘আর তাদের যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা করো।’”

ফ্যালাসি শনাক্তকরণ

১. কুরআনের কত নাম্বার আয়াত, সেই রেফারেন্স দেওয়া হয় নাই। একারণে সে বানিয়ে বলেছে নাকি আসলেই ঐ কথাটা কুরআনে আছে তা যাচাই করা যাচ্ছে না।

২. কুরআনের উদ্ধৃত বাক্যটি শুরুই হয়েছে ‘তাদেরকে’ শব্দটা দিয়ে। ‘তাদের’ (them) হলো সর্বনাম (pronoun)। এই সর্বনাম দিয়ে ‘কাদেরকে’ বুঝানো হচ্ছে?

৩. যেহেতু বাক্যটিতে সর্বনাম ব্যবহৃত হয়েছে, সেহেতু নিশ্চয়ই আগের কোনো বাক্যে একটা বিশেষ্য (noun) ব্যবহৃত হয়েছে। সেই আগের বাক্যটি (আয়াতটি) দেওয়া হয়নি কেন?

৪. সেই আগের আয়াত + “তাদেরকে হত্যা করো…” এই আয়াত মিলিয়েই একটা পরিপূর্ণ বক্তব্য হবে।

৫. সেই পুরো বক্তব্য তুলে না ধরে মাঝখান থেকে সুবিধামত একটি অংশকে তুলে ধরাটা একপ্রকার ফ্যালাসি।

যুক্তিবিদ্যার ভাষায় এটাকেই বলে fallacy of quote mining। অর্থাৎ, একটা খনি থেকে মানুষ যেভাবে মাটি কেটে কেটে সুবিধাজনক জিনিস (পাথর/সোনা/হীরা) বের করে আনে, নাস্তিকও ঠিক তেমনি গোটা কুরআন থেকে মাইনিং করে করে তার সুবিধাজনক আয়াতগুলো বের করে এনেছে।

পাঠক, দেখুন, যদি আগের আয়াতে সরাসরি এমন একটা কথা থাকত যে, “নাস্তিকরা পৃথিবীর জঘন্যতম প্রাণী।” আর পরের আয়াতেই থাকত যে, “অতএব তাদেরকে যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা করো।” তখন কিন্তু নাস্তিকরা ঠিকই আগের আয়াতসহ পুরোটা বলত। সব জায়গায় বলে বেড়াত: “কুরআনে আছে যে, নাস্তিকরা পৃথিবীর জঘন্যতম প্রাণী, অতএব তাদেরকে যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা করো।” কিন্তু যেহেতু কুরআনে ওরকম সুবিধাজনকভাবে পাওয়া যায়নি, তাই নিজের সুবিধাজনক অংশটুকু কোট মাইনিং করেছে সে। আসুন এবার আমরা কুরআন থেকে দেখি, এই ‘তাদেরকে’ বলতে কাদেরকে বুঝানো হচ্ছে।


وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ (١٩٠) وَاقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ وَأَخْرِجُوهُمْ مِنْ حَيْثُ أَخْرَجُوكُمْ وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ وَلا تُقَاتِلُوهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيهِ فَإِنْ قَاتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ كَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ (١٩١) فَإِنِ انْتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ (١٩٢)

“আর লড়াই করো আল্লাহর পথে তাদের সাথে - যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে; কিন্তু সীমালঙ্ঘন (বাড়াবাড়ি) করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে পাও সেখানেই এবং তাদেরকে বের করে দাও সেখান থেকে যেখান থেকে তারা বের করে দিয়েছে তোমাদেরকে। বস্তুতঃ ফিতনা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ। আর তাদের সাথে লড়াই করো না মসজিদুল হারামের নিকটে যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে। কিন্তু তারা যদি তোমাদের সাথে (সেখানে) লড়াই করে, তাহলে তাদেরকে হত্যা করো; এই হল কাফিরদের শাস্তি। আর তারা যদি বিরত থাকে, তাহলে (জেনে রেখো যে,) আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু।”(সূরা বাকারা, ২:১৯০-১৯২)

অতএব, “তাদেরকে হত্যা করো যেখানে পাও সেখানেই” বাক্যে ‘তাদেরকে’ বলতে বুঝানো হয়েছে যারা আমার সাথে যুদ্ধ করবে, তাদেরকে। অর্থাৎ, কেউ আমাকে হত্যা করতে আসলে আমিও তাকে হত্যা করব – মুসলমানদেরকে আল্লাহ তায়ালা এই অনুমতি দিচ্ছেন মাত্র। গণহারে কাফির নিধন করতে আদেশ করেননি। কিন্তু পাঠক, তাহলেতো ইসলামকে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে দেখানো গেলো না! ইসলামবিদ্বেষীরা এখন কী করবে তাহলে? তারা এখন কোট মাইনিং ফ্যালাসি করবে। আয়াতের সুবিধাজনক অংশ তুলে ধরে সারা দুনিয়াতে বলে বেড়াবে, “কুরআন আদেশ করছে বিধর্মীদের ধরে ধরে হত্যা করতে: “তাদেরকে যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা করো।” অতএব ইসলাম একটি সন্ত্রাসবাদী ধর্ম।”

পাঠক, এই ফ্যালাসিটা আপনি আরো একভাবে ধরতে পারেন। সেটা হলো, সংজ্ঞায়ন। আসলে সংজ্ঞায়ন এতই মোক্ষম একটা জিনিস যে, এই জায়গাটা ঠিকমত ধরতে পারলে আপনি যেকোনো যুক্তিতর্কে জিততে পারবেন। যেমন ধরুন নিচের আর্গুমেন্ট–
নাস্তিক: কুরআনে আছে তাদেরকে যেখানেই পাও হত্যা করো... তাই কুরআন সন্ত্রাসবাদী গ্রন্থ।

মুসলিম: কুরআনের সংজ্ঞা দিন।

নাস্তিক: আপনার হাতের ঐ গ্রন্থটাকেই আমি কুরআন বলছি।

মুসলিম: কুরআনের কোথায় আছে দেখিয়ে দিন।

নাস্তিক: এইযে দেখুন, সূরা বাকারার ১৯১ নাম্বার আয়াত।

মুসলিম: জ্বী, দেখলাম। কথা সত্য। ২:১৯১ আয়াতে এই কথা আছে।

নাস্তিক: তাহলে মেনে নিচ্ছেন কুরআন সন্ত্রাসবাদী গ্রন্থ?

মুসলিম: এখনো না। আরো একটা শব্দের সংজ্ঞায়ন করতে হবে আপনাকে। “তাদেরকে হত্যা করো” – এই বাক্যে ‘তাদেরকে’ বলতে কাদেরকে বুঝানো হচ্ছে? সংজ্ঞা দিন।

নাস্তিক: …!

কিন্তু পাঠক, নাস্তিক তো আর সেই সংজ্ঞা দেবে না। তাহলে যে তার গেইম ওভার হয়ে যাবে!

পাঠক, প্রসঙ্গক্রমে আপনার মনে হয়ত প্রশ্ন জেগেছে যে, কেউ আমাকে আঘাত করলে আমি পাল্টা আঘাত করব – এটাতো স্বাভাবিক নিয়ম। এটা আবার অনুমতি দেয়ার কী হলো? আল্লাহ তায়ালা কেন কুরআনে আলাদাভাবে অনুমতি দিয়ে আয়াত নাযিল করলেন? এটা কি একটি বাহুল্য কাজ বলেই মনে হয় না?


প্রিয় পাঠক!

আসলে এই আয়াতের পিছনে একটি উদারমনা দর্শন খুঁজে পাওয়া যায়: একজন প্রকৃত মুসলিমের দর্শন। একজন মুসলিম জানেন যে, পৃথিবীর সকল কিছুর মালিক আল্লাহ তায়ালা, এমনকি ঐ অবাধ্য কাফির-মুশরিকদেরও মালিক তিনি। অতএব, আমাকে সে যতই আঘাত করতে আসুক না কেন, সেতো আল্লাহর জিনিস! আর আল্লাহর জিনিসকে আমি কিভাবে আঘাত করব, তাঁর অনুমতি ছাড়া? মুসলমানেরা এমন মহৎ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে বলেই আল্লাহ তায়ালা কুরআনে “পাল্টা আঘাতের অনুমতি” দিয়ে দিচ্ছেন। একইসাথে বলে দিচ্ছেন যে, যদি তারা যুদ্ধ বন্ধ করে দেয়, তাহলে মুসলমানরাও যেন যুদ্ধ বন্ধ করে দেয়। আর সেইসাথে ঐ যুদ্ধনীতিটা তো আছেই যে, কোনো শত্রু আশ্রয় চাইলে তাকে হত্যা করা যাবে না, উপরন্তু নিরাপত্তা দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে। অর্থাৎ, শত্রুর দেহটাকে ধ্বংস করা মুসলিমের মূল উদ্দেশ্য নয়। বরং তার দেহের ভিতরে যে আত্মা আছে, সেটাতে কুরআনের আলো পৌঁছিয়ে দেয়াটা একজন মুসলিমের কাছে যুদ্ধজয়ের চেয়ে বড় সাফল্য।

যাহোক, ইসলামের মহত্ব নিয়ে লেকচার দেবার জায়গা এটি নয়; আমরা নিছক যুক্তিবিদ্যার চর্চা করছিলাম। তাই আবার যুক্তির কথায় ফিরে আসি। আচ্ছা ধরুন, মনে করি কুরআনে ঐখানে শুধু বলা আছে, “কাফিরদেরকে যেখানেই পাও হত্যা করো।” অপরদিকে আরেক আয়াতে বলছে যে, “তারা আশ্রয় চাইলে তাদেরকে হত্যা করা যাবে না” (৯:৬)। তখন একজন নিরপেক্ষ বিচারক হলে কী বলত? সে বলত যে, “কুরআন এক জায়গায় বিনা বিচারে বিধর্মীদের হত্যা করতে বলেছে, আবার আরেক জায়গায় বেশি উদারতা দেখিয়ে বলেছে যে শত্রুকে সিকিউরিটি দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে। আমার দুটোরই বিপক্ষে।”

কিন্তু পাঠক! আপনি কি কখনো কোনো নাস্তিককে এমনটা বলতে শুনেছেন? না। কোনো নাস্তিকের মুখে কখনো ইসলামের এই উদার যুদ্ধনীতির প্রশংসা শুনেছেন? না। কুরআনের সেইসব দর্শনের প্রশংসা করতে শুনেছেন, যেসব আমরা বইয়ের দ্বিতীয় ভাগে তুলে ধরেছি? না। এর কারণ হলো, অধিকাংশ নাস্তিকই নিরপেক্ষ বিচারক নয়। বরং নিরপেক্ষতা ও মুক্তমনার ছদ্মবেশে ইসলামবিরোধী মানুষ। আস্তিক-নাস্তিক সকল পাঠককে আমি তাই আবারো অনুরোধ করছি, প্রিয় পাঠক, দয়া করে আপনার ‘নিরপেক্ষ বিচারকের’ আসনের অমর্যাদা করবেন না। বরং ইসলামের সত্যযুক্তি ও সত্য দর্শনকে উদার মনে গ্রহণ করে নিন।


যাহোক, প্রিয় পাঠক!

ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান এর আলোচনায় আমরা মোট ১০টি নাস্তিক্যবাদী যুক্তি ও বক্তব্য তুলে ধরে তার অ্যাজাম্পশানগুলি শনাক্ত করেছিলাম। একইভাবে এই পর্বে আমরা কোট মাইনিং ফ্যালাসিরও বেশকিছু উদাহরণ দেখব। আমরা দেখব যে, একদিকে নাস্তিকরা যেমন কুরআনের ভিতর থেকে বিভিন্ন সুবিধাজনক আয়াত তুলে এনে ফ্যালাসি করছে, অপরদিকে মুসলিমদের মাঝেও প্রত্যেক গ্রুপ তার নিজস্ব চিন্তাধারার পক্ষে যায় এমন খণ্ড খণ্ড অংশ তুলে ধরছে। খোদ কুরআনই যেন আজ মজলুম হয়ে পড়েছে: মুসলিম-অমুসলিম সকলেই তাতে কোট মাইনিং করে চলেছে।


ভাগ্যবাদ বনাম কর্মবাদ

“পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের উপরে (আপনা হতে) কোনো বিপদ আসে না, কিন্তু সে(ই বিপদ)টাকে আমরা অস্তিত্বমান করার পূর্বেই তা আছে এক কিতাবে।…” (সূরা হাদীদ, ৫৭:২২)

এই আয়াতটিকে যুক্তি হিসেবে দেখিয়ে একজন ভাগ্যবাদী মুসলিম বলেন যে, “পৃথিবীতে যত বিপদ ঘটবে, সেগুলি আল্লাহ আগে থেকেই লিখে রেখেছেন।” কিংবা একজন নাস্তিক অভিযোগ করেন যে, “সব বিপদ-আপদ অন্যায়-অপকর্ম যদি আল্লাহ আগে থেকেই লিখে রেখে থাকেন, তাহলে মানুষকে দোষ দেয়া কেন?”

পাঠক, নাস্তিকের প্রশ্নটা কিন্তু চিন্তা করার মত! যদিও মুক্তমনার ছদ্মবেশে অধিকাংশ নাস্তিকই ইসলামবিরোধী, কিন্তু যখন সে একটি ভালো প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, তখন সেটি নিয়ে চিন্তা গবেষণা করলে আমার নিজেরই লাভ। এ নিয়ে আমরা বইয়ের চতুর্থ ভাগে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ। আমরা দেখব যে, কেন আল্লাহ তায়ালা (বাহ্যতঃ) নিজের উপর দায় নিচ্ছেন এবং কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বলছেন যে, “আমি অন্তরে মোহর মেরে দেই”, “আমি মানুষকে পথভ্রষ্ট করি”, “আমি বিপদ আনয়ন করি”…।

অপরদিকে দেখুন কুরআনের কিছু আয়াতে কর্মবাদের কথা আছে কিভাবে – “তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল…।” (সূরা শূরা, ৪২:৩০)

আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। (সূরা রাদ, ১৩:১১)

এই আয়াতগুলি দেখিয়ে একজন কর্মবাদী মুসলিম বলেন যে, “মানুষের ভবিষ্যত ভাগ্য আল্লাহ লিখে রাখেননি। তিনি মানুষকে স্বাধীন এখতিয়ার দিয়েছেন।” তখন একজন নাস্তিক প্রশ্ন করবেন যে, “মানুষ যদি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই নিজের অবস্থা পরিবর্তন করতে সক্ষম, তাহলে আল্লাহ কর্তৃক পরিবর্তন করার কথা কেন বলা হচ্ছে? কেন এভাবে দেখানো হচ্ছে যে, একটি জাতি প্রথমে তাদের অবস্থা পরিবর্তন করে, তারপর আল্লাহ সেটা পরিবর্তন করে দেন? একটি জাতি যখন নিজেদের অবস্থার উন্নতি করেই ফেলেছে নিজে নিজে, তখন আবার আল্লাহ এসে নতুন করে কী অবস্থা পরিবর্তন করে দেবেন?”

পাঠক! প্রশ্নটি কিন্তু যথেষ্ট যৌক্তিক প্রশ্ন। আমি আশা করব যে, আপনি অস্থির হয়ে নিজের বাপ-দাদার ধর্মকে জাস্টিফাই করার জন্য ব্যাখ্যা খুঁজবেন না। বরং একজন কৌতুহলী দার্শনিকের মত করেই রহস্য অনুসন্ধান করবেন যে, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা কেন এভাবে কথা বলেছেন। তবে আপাততঃ নিরপেক্ষ বিচারকের আসনে যেহেতু বসেছেনই, আর আপনার সামনে ভাগ্যবাদী ও কর্মবাদী দুই মুসলিম এসে যুক্তিতর্ক করছে, আর নাস্তিকও নানান প্রশ্ন করে যাচ্ছে, তখন আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করুন। তাদেরকে বলুন যে, তারা তো কোট মাইনিং করছে! ভাগ্যবাদী মুসলিম তার সুবিধাজনক আয়াত নিয়ে এসেছেন। একইভাবে কর্মবাদীও এনেছেন তার সুবিধামত আয়াত। অপরদিকে নাস্তিক এই সুযোগে দুইজনকেই প্রশ্ন করে প্যাঁচে ফেলছে ঠিকই, কিন্তু অন্য সময় সে-ও কুরআনে কোট মাইনিং করে তার সুবিধাজনক আয়াতগুলোই তুলে আনছে। এখন বিচারক হিসেবে এই তিনজনকেই সশ্রম কারাদণ্ড দেবেন, নাকি অন্য কোনো শাস্তি দেবেন, তা আপনার বিবেচনা, প্রিয় পাঠক! তবে আমি হলে শাস্তিস্বরূপ তাদের তিনজনকেই যুক্তি ও দর্শনের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতাম আর কোট মাইনিং না করে উদার মনে গোটা কুরআন পড়তে বলতাম!

পৃথিবীতে মন্দ কাজের দায় কার?

এই প্রশ্নের জবাবে দেখুন একজন মুসলিম কিভাবে তার ধর্মকে জাস্টিফাই করার জন্য কুরআন থেকে কোট মাইনিং করছে: “(যারা জাহান্নামী হয়েছে,) আমি (আল্লাহ) তাদের প্রতি জুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই জালিম ছিল।” (সূরা যুখরুফ, ৪৩:৭৬) কিংবা– “তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল…।” (সূরা শূরা, ৪২:৩০)

অতএব, মন্দ কাজের দায় আল্লাহর নয়, বরং মানুষের। এছাড়াও, এই আয়াত থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, মানুষ স্বাধীনভাবে কাজ করে। অতএব, মানুষের কর্মের দায় মানুষেরই।

কিন্তু পাঠক, এখন তো নাস্তিক ঐ আয়াতটি নিয়ে আসবে, যেখানে বলা হয়েছে, সকল বিপদ-আপদ একটি কিতাবে আছে (সূরা হাদীদ, ৫৭:২২)। সেই আয়াত দেখিয়ে সে বলবে যে, পৃথিবীর সকল বিপদ-আপদের দায় স্রষ্টার!


ইসলামে কি গণতন্ত্র আছে?

গণতন্ত্রবাদী মুসলিম: কুরআনে আছে, "হে নবী!…কাজেকর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন।…" (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯) অতএব সবার মতামত নিয়ে কাজ করা, অর্থাৎ গণতন্ত্র কুরআনে আছে।

গণতন্ত্রবিরোধী মুসলিম: কুরআনে আছে, “আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মেনে নেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে…।”(সূরা আনআম, ৬:১১৬) অতএব, মেজরিটির মতামত মেনে নেয়া যাবে না। সুতরাং গণতন্ত্র হারাম। [QR - ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত?]



কুরআন কি তবে পাগলের প্রলাপ?

এখন পাঠক!

আমরা দুটো অবস্থান গ্রহণ করতে পারি। এক, নাস্তিক ড. রিচার্ড ডকিন্স যেমনটা বলেছেন যে, ধর্মগ্রন্থের এক আয়াতে এক কথা থাকে তো আরেক আয়াতে তার বিপরীত কথা থাকে; আর সবাই তা থেকে যার যার পছন্দমত জিনিস খুঁজে নিয়ে (অর্থাৎ কোট মাইনিং করে) ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করে, একারণে এধরণের গ্রন্থকে পরিত্যাগ করা উচিত। অথবা দ্বিতীয় অবস্থান এমনটা গ্রহণ করতে পারি যে–


কুরআন এমন একটি গ্রন্থ, যার কিছু আয়াতকে বাহ্যিকভাবে পরস্পরবিরোধী মনে হয়। কিন্তু একইসাথে সেখানে আছে উচ্চস্তরের যুক্তি ও দর্শন, যা আমরা বইয়ের দ্বিতীয় ভাগ, “দার্শনিকের কুরআন যাত্রা”-য় দেখেছি। এমতাবস্থায় একে কিছুতেই পাগলের প্রলাপ বলে মনে হয় না। এবং এটাও মনে হয় না যে, এই গ্রন্থের লেখক ভুলবশতঃ এধরণের বাহ্যিকভাবে পরস্পরবিরোধী কথা লিখেছেন। আর ইচ্ছাকৃতভাবে পরস্পরবিরোধী কথা লিখে সৃষ্টিকে পথভ্রষ্ট করাও পরম স্রষ্টার সাথে মানানসই নয়। তাহলে নিশ্চয়ই এধরণের আয়াতগুলোর রহস্য আছে। কী সেই রহস্য? সেটা জানার পদ্ধতিই বা কী? এসব বিষয়ে ইনশাআল্লাহ বইয়ের চতুর্থ ভাগে আলাপ করব।


কুরআনকে দেখতে হবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে

কেউ যদি নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করার নিয়তে পক্ষপাতিত্বের চশমা চোখে লাগিয়ে সুবিধাজনক আয়াত খুঁজতে থাকে, তাহলে কুরআন কখনোই তার সামনে স্বরূপে আবির্ভূত হবে না। বরং কুরআনের প্রতিটা ছত্রে সে তার নিজের চিন্তাধারারই প্রতিফলন দেখতে পাবে। এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিম ও অধিকাংশ নাস্তিকই এই অবস্থায় পতিত হয়েছে। তারা নিজেদের মনমত জিনিস কুরআনে চায়, একারণে কুরআনের সৌন্দর্য তাদের কাছে উন্মোচিত হয় না। এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য নিজেকে নিরপেক্ষ ও অপ্রভাবিত রাখার কোনো বিকল্প নেই। আর সেকথাই এই বইয়ের শুরু থেকে বারবার বলে আসছি: আস্তিক-নাস্তিক ব্রেইনওয়াশিঙের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ ও অপ্রভাবিত মনে দার্শনিক স্রষ্টাভাবনা করতে, নিরপেক্ষ দার্শনিক হয়ে কুরআনের অভ্যন্তরে যাত্রা করতে। প্রিয় পাঠক! আমাদের সংগ্রাম তো নিজেদের বিরুদ্ধে: নিজেদেরকে পুরোপুরি নিরপেক্ষ করে ফেলার সংগ্রাম। তবেই কেবল মহাগ্রন্থ আল কুরআন আমাদের সামনে তার স্বরূপে আবির্ভুত হবে।


বাহ্যিকভাবে পরস্পরবিরোধী এসব আয়াতের সমাধান কী?

আমার বন্ধুরা প্রায়ই একটি অভিযোগ করে, তা হলো, আমি নাকি ইসলাম সম্পর্কে নাস্তিকদের মত করে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করি, কিন্তু উত্তরটা আর দেই না। এতে নাকি ইসলামের ক্ষতি হয়। আমি তখন ওদেরকে বলি যে, প্রশ্ন উত্থাপন তো খুবই ভালো একটি কাজ। এজন্যে নাস্তিকদেরকে ধন্যবাদ দেয়া দরকার। অন্ততঃ নাস্তিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েও যদি মুসলমানেরা একটু যুক্তি, দর্শন ও কুরআনের চর্চা করত! কিন্তু না। অধিকাংশ মানুষই সেই পরিশ্রমটুকু করতে রাজি নয়। তারা প্রশ্নও চায়, উত্তরও একইসাথে দেখতে চায়। কী আর করা! আমাকেও তাই উত্তর দিতে হবে। যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করলাম, অন্ততঃ সেগুলির উত্তর তো দিতে হবে! তবে সেই উত্তর এখানে নয়। সেটা নিয়ে ইনশাআল্লাহ আলোচনা হবে বইয়ের চতুর্থ ভাগে। এই পর্বে আপাততঃ কোট মাইনিং ফ্যালাসি শনাক্ত করার চর্চা করুন। দুই দশটা নাস্তিক বনাম মুসলিম ডিবেইট দেখুন/ পড়ুন। আরো দেখুন মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন মাযহাবী বিতর্ক। তারপর দেখুনতো, সেখানে কয়টা ফ্যালাসি শনাক্ত করতে পারেন? পাঠক! যুক্তিবিদ্যা একটি ব্যবহারিক শাস্ত্র। অতএব, আপনাকে সময় দিতেই হবে। চর্চা করতেই হবে। যত চর্চা করবেন, ততই আপনার যুক্তিবিদ্যার জ্ঞান শানিত হবে, ইনশাআল্লাহ।

_______________________________


কারো বক্তব্য থেকে নিজের সুবিধাজনক অংশটুকু তুলে ধরাই কোট মাইনিং ফ্যালাসি।

আস্তিক-নাস্তিক উভয়ের হাতেই কুরআন আজ কোট মাইনিং ফ্যালাসির শিকার।


আপনার নিরপেক্ষ মতামত আশা করছি

মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…