সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আস্তিকতা ও নাস্তিকতার ভিত্তি | যুক্তির কাঠগড়ায় ইসলাম


দুটো ১০০ তলা বাড়ি, দেখতেও একই রকম। প্রথম বাড়িটায় আপনি ঢুকলেন। নিচতলা, দো’তলা, তিনতলা… একশো তলা পর্যন্ত প্রতিটা তলা পরীক্ষা করে দেখলেন। প্রতিটা পিলার ধরে নাড়া দিলেন, কিন্তু লাভ হলো না। খুব মজবুত পাথরের প্রতিটা পিলার। ভারী, শক্ত, দৃঢ়। আপনি ভাবলেন, এই বাড়িটার ভিত্তি নিশ্চয়ই খুব মজবুত; নাহলে উপরের ১০০টা ফ্লোরের এত ভারী ভারী পিলারের ওজন বহন করতে পারত না।

এবার দ্বিতীয় বাড়িটাকেও পরীক্ষা করার জন্য ঢুকলেন। কিন্তু সেকী! পিলারগুলো বাইরে থেকে দেখতে পাথরের মত হলেও ভিতরে ফাঁকা! আর দেয়ালগুলোও সব কাগজের! দেয়ালে হাত দিলেন তো সেটা ছিঁড়ে গেল, পিলারে হাত দিলেন তো চুরচুর করে গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ল। নাড়া দিলেন তো গোটা বাড়িটাই ধ্বসে গেল মুহুর্তে। আপনি ভাবলেন, পিলারগুলোকে এমন হালকা ও দুর্বল জিনিস দিয়ে তৈরী করেছে কেন? নিশ্চয়ই বাড়িটার ভিত (ফাউন্ডেশান) দুর্বল; অবৈধ জমির উপর দুইদিনে হুটহাট বাড়ি করে ফেলেছে, তাই মজবুত ফাউন্ডেশান করতে পারেনি, আর তাই দুর্বল সব জিনিস দিয়ে পিলারগুলো বানিয়েছে। কারণ পাথরের পিলার দিলে ১০০ তলা বাড়িই দাঁড়াতো না। প্রিয় পাঠক! নাস্তিকতাও ঠিক তেমনই। আসুন এবার একটু মনে করে দেখি, আমাদের এই দার্শনিক স্রষ্টাভাবনায় “আস্তিকতার ভিত্তি” আর “নাস্তিকতার ভিত্তি” কেমন ছিল?

আস্তিকতার ভিত্তি

আস্তিকতার ভিত্তি হলো আমাদের এই বইয়ের প্রথম ভাগ, “দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা”-র আটটি প্রস্তাব। First Cause পর্বে আমরা এই ভিত্তির গোড়ায় নানাভাবে আঘাত করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু লাভ হয়নি। প্রতিটা প্রস্তাবের যুক্তিই খুব মজবুত। প্রতিটা প্রস্তাবই যেন এক একটা পাথরের পিলার। আর তাইতো সেই মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আমরা পেয়েছি কুরআন, যা আমাদেরকে ইসলাম-গৃহ নির্মানের সুযোগ করে দিয়েছে, এবং একটু একটু করে আমরা সেই সুউচ্চ বাড়ি নির্মাণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এভাবে দার্শনিক স্রষ্টাভাবনার উপর ভিত্তি করে কুরআনের সাহায্যে “শেকড় থেকে শিখরের” দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।

অপরদিকে নাস্তিকতার ভিত্তি কী ছিল? কই, বলুন? কী ছিলো? মনে পড়ছে? আদৌ কোনো ভিত্তি ছিল কি? বরং নাস্তিকদের গুরু রিচার্ড ডকিন্স-ই তো বলে দিয়েছেন যে: actually you cannot say for certain that anything doesn’t exist, অর্থাৎ “স্রষ্টা নেই”- একথা বলা যাবে না। এবং পাঠক, “সংজ্ঞায়ন ও নিরপেক্ষ বিচারক” পর্বে আমরা দেখিয়েওছি যে, আসলে নাস্তিকতার কোন ভিত্তিই নাই।

নাস্তিকতার ভিত্তি
নাস্তিকতার কালেমা হলো এই বাক্যটি: “স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই - God does not exist.” অথচ যুক্তিবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি ভুল বাক্য, ভিত্তিহীন কথা। কেননা, “স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই” একথা প্রমাণ করতে হলে –

ধাপ-১: প্রথমে স্রষ্টার সংজ্ঞা দিতে হবে, এবং তারপর

ধাপ-২: দেখাতে হবে যে সেই স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই।

অথচ যখনই একজন নাস্তিক সফলভাবে ধাপ-১ পার করবে, তখনই সে নিজমুখেই স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করে ফেলবে, কারণ সে একজন স্রষ্টার সংজ্ঞা দিয়েছে, অতএব সেই স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে। ফলে ধাপ-২ অটোমেটিক মিথ্যা হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে, ধাপ-১ পার করতে না পারলে সে ধাপ-২ এ যেতে পারবে না। অতএব, কোনোভাবেই ধাপ-২ কে সত্য প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তাই নাস্তিকতার কালেমা “God does not exist” হলো একটি স্বপরাজিত বাক্য (এমন বাক্য, যে নিজে থেকেই হেরে বসে আছে)। যুক্তিবিদ্যার ভাষায় বললে, স্ববিরোধী বাক্য।

(প্রিয় পাঠক!

উপরের যুক্তিটা আপনার কাছে অবশ্যই অবশ্যই ক্রিস্টাল ক্লিয়ার হতে হবে। অর্থাৎ, পানির মত সহজভাবে বুঝতে হবে। যে কাউকে সহজে বুঝাতে পারার মত করে বুঝতে হবে। প্রয়োজনে আবার পড়ে আসতে পারেন “সংজ্ঞায়ন ও নিরপেক্ষ বিচারক” পর্বটি। সেখানে দেখুন রফিক সাহেবের উদাহরণ দিয়ে আমরা প্রমাণ করেছি যে, “সংজ্ঞা কেবল তারই দেয়া যায়, যার অস্তিত্ব আছে।”)

এখন পাঠক!

যে বাড়ির ফাউন্ডেশান দেয়া নাই, সেটার পিলার আর দেয়ালগুলো যে কাগজের হবে, এটাই স্বাভাবিক। যে মতবাদের ভিত্তিটাই যুক্তিবিদ্যায় ধোপে টেকে না, যুক্তিশাস্ত্র যাকে “স্ববিরোধী বাক্য” বলে বাতিল করে দেয়, তার বাকিসব যুক্তি কেমন হবে, আপনিই বলুন? তখন নাস্তিকতার প্রাসাদের দেয়াল, পিলার সবই হবে ফ্যালাসির। ফ্যালাসির এক মহা প্রাসাদ। আপনার হাত দুটি যদি হয় যুক্তিবিদ ও দার্শনিকের হাত, তাহলে নাস্তিকতার প্রাসাদের যেখানেই আপনি ধরবেন, হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। এবং এপর্যন্ত সেটাই হয়েছে, প্রিয় পাঠক!

প্রিয় পাঠক!

নাস্তিকদের অপমান বা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আস্তিক-নাস্তিক রেসলিং শো খেলে মানুষের হাততালি নেয়ার নীতিতেও আমরা বিশ্বাসী নই। মানুষ হিসেবে সবাইকেই আমরা সম্মান করি ও ভালোবাসি, এবং প্রথম থেকেই আমরা উদার দার্শনিক পদ্ধতিতে অগ্রসর হচ্ছি। সেভাবেই অগ্রসর হতে হতে দেখলাম যে, নাস্তিক্যবাদের গোড়ায় রয়েছে স্ববিরোধিতা। নাস্তিকতা একটি ভিত্তিহীন মতবাদ। একারণে নিছক যুক্তিবিদ্যার চর্চার জন্যেই আমরা এখন নাস্তিক্যবাদী বিভিন্ন যুক্তি নিয়ে নাড়াচাড়া করবো। তাতে খুব স্বাভাবিকভাবেই নাস্তিকতার প্রাসাদ ভেঙে পড়বে। এতে পাঠক আনন্দে হাততালি দেয়া কিংবা রাগে দাঁত কিটমিট করা– কোনোটাই করবেন না আশা করি। আশা করি সেই নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মনের কথাটি ভুলে যাননি, যে কথা বইয়ের শুরু থেকেই বারবার বলে আসছি। অতএব, আমাদের পরবর্তী যুক্তিতর্কের সময় নিজেকে একেবারে নিরপেক্ষ রাখুন। নিজেকে কোনো এক ইউনিভার্সিটির যুক্তিবিদ্যার প্রফেসর মনে করে নিন। কিংবা এমন একটা সফটওয়্যারের মত, যাকে বিভিন্ন যুক্তি দিলে সে ওটার ফ্যালাসি বের করে দেয় শুধু: হাততালিও দেয় না, রাগান্বিতও হয় না।

সত্যের সন্ধানে আমাদের নিজেদেরও কি তেমন নিরপেক্ষ হওয়াই উচিত নয়?

_______________________________

স্রষ্টাভাবনার আটটি প্রস্তাব আমাদের আস্তিকতার ভিত্তি।

পক্ষান্তরে, যুক্তিবিদ্যার দৃষ্টিতে নাস্তিকতার কোনো ভিত্তিই নেই।

God does not exist- একটি স্বপরাজিত বাক্য।

আপনার ভাবনা শেয়ার করুন

মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

খোদার ন্যায়বিচার | অনন্তের পথে

আগের পর্ব: আল্লাহ কেন পথভ্রষ্ট করেন? | সূচীপত্র দেখুন
প্রশ্ন: এমনও অনেকে আছে, যারা ইসলামের নামও শোনেনি, যাদের কাছে কুরআন পৌঁছায় নাই, তাদের কী হবে? তারা কেন জাহান্নামে যাবে? তাদের কী দোষ? কোথায় খোদার ন্যায়বিচার?

নাস্তিকদের একটা কমন প্রশ্ন এটা। এবং প্রশ্নটা অবশ্যই অত্যন্ত যৌক্তিক। কিন্তু আফসোস! অধিকাংশ মুসলমানই ইসলামকে যৌক্তিক ও দার্শনিক মানদণ্ডে যাচাই করে তারপর সত্য হিসেবে গ্রহণ করে মানে না, বরং তারা মানে বাপ-দাদার ধর্ম হিসেবে, (অন্ধ)বিশ্বাসের বস্তু হিসেবে। আর তাই এসকল প্রশ্নের যৌক্তিক সত্য জবাবও তারা দিতে পারেন না। দেবেনই বা কিভাবে, নিজেই তো জানেন না! উপরন্তু নিজের (অন্ধ)বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার জন্য গোঁজামিলে পরিপূর্ণ ভুলভাল ব্যাখ্যা হাজির করেন। তাই তারা বলেন, “মুসলমান না হলে জান্নাতে যেতে পারবে না। অমুসলিম মাত্রেই জাহান্নামী”, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ একটা পতিতালয়ে যে মেয়েটির জন্ম হয়, সে মেয়েটি কী দোষ করেছিল তাহলে? ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে এমন সব প্রশ্নকে দূরে ঠেলে “মুসলিম না হলে জান্নাতে যেতে পারবে না ব্যস” বলে বসেন। অথচ জন্ম ও বেড়ে ওঠার উপর কারো হাত নেই। দুনিয়ার প্রতিটা মানুষই ভিন্ন ভিন্ন প…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…