সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সংজ্ঞায়ন ও নিরপেক্ষ বিচারক | যুক্তির কাঠগড়ায় ইসলাম

আগের পর্ব: First Cause: আদি কারণ | সূচীপত্র দেখুন






এযুগের নাস্তিকদের গুরু ড. রিচার্ড ডকিন্স অক্সফোর্ড ইউনিয়নে বসে বললেন, “Nobody can actually say for certain that anything doesn’t exist.” অর্থাৎ, “কেউ আসলে কখনো নিশ্চিত করে বলতে পারে না যে, কোনো একটা বিশেষ কিছুর অস্তিত্ব নাই।” [QR - Dawkins on Religion: Is religion good or evil? Head to Head, Al Jazeera English] অতএব, কেউ বলতে পারে না যে, God doesn’t exist - স্রষ্টার অস্তিত্ব নাই! নাস্তিকদের গুরু রিচার্ড ডকিন্স নিজেই নাস্তিক্যবাদকে একবাক্যে পরাজিত করে দিলেন! কিভাবে? সেটা জানতে হলে যুক্তিবিদ্যার মৌলিক একটা জিনিস আমাদের জানতে হবে: সংজ্ঞায়ন।



আপনারা যারা যুক্তিবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা ও চর্চা করেছেন, কিংবা আনুষ্ঠানিক বিতর্কের (formal debate) নিয়ম জানেন, তারা জানেন যে, বিতর্কে প্রথম কাজ হলো সংজ্ঞায়ন। অর্থাৎ, সংজ্ঞা দেয়া। যেমন–

“রফিক সাহেব আমার বিরোধী মানুষ।”

প্রশ্ন: আগে সংজ্ঞা দিন। “রফিক” কে? কারণ পৃথিবীতে রফিক নামে অনেক মানুষ থাকতে পারে।

– “১৯৬৫ সালে বরিশাল জিলা স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র রফিক।”

প্রশ্ন: একই ক্লাসে রফিক নামে একাধিক ছাত্রও তো থাকতে পারে। আরো সঠিকভাবে সংজ্ঞা দিন।

– ১৯৬৫ সালে বরিশাল জিলা স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র রফিক, যার পিতা ওমুক, মাতা ওমুক, যার ভাইয়ের নাম এই, বোনের নাম সেই, যার ক্লাস রোল ছিল এত, যার উচ্চতা এত ফিট, ওজন ছিলো এত কেজি…।


হুম, এইবার হয়েছে। অবশেষে এমন সূক্ষ্মভাবে সংজ্ঞা দিয়েছেন যে, এই সংজ্ঞার সব শর্ত মিলালে আমরা ঠিক ঠিক তাকেই পাবো, যার কথা আপনি বুঝাচ্ছেন।

আবারও প্রশ্ন: “বিরোধী” শব্দের সংজ্ঞা দিন। “রফিক সাহেব আপনার বিরোধী মানুষ” বলতে কী বুঝাচ্ছেন?

– “সে সবসময় আমার বিরোধিতা করে।”

প্রশ্ন: আরো সূক্ষ্ম সংজ্ঞা চাই। কোন বিষয়ে আপনার বিরোধিতা করে? রাজনৈতিক? ধর্মীয়? সামাজিক? নাকি খেলায় বিভিন্ন দেশের সাপোর্ট নিয়ে?

– “অন্য বিষয়ে না, আসলে বিরোধিতাটা শুধু ঐ খেলা নিয়েই হয়।”

প্রশ্ন: কোন খেলা নিয়ে বিরোধিতা হয়? ক্রিকেট, ফুটবল… ?

– “ক্রিকেট নিয়ে। ক্রিকেটে আমি বাংলাদেশের সাপোর্টার, আর উনি অস্ট্রেলিয়ার সাপোর্টার।”

হুম, অবশেষে বোঝা গেল, “বিরোধী মানুষ” বলতে কী বুঝাচ্ছেন!

এই হলো সংজ্ঞায়ন। পাঠক! আপনি কিন্তু অলরেডি যুক্তিবিদ্যার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস শিখে ফেলেছেন: সংজ্ঞায়ন। যেকোনো বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সংজ্ঞায়ন। আপনি কারো সাথে বিতর্ক করলে প্রথমেই দুই পক্ষের প্রত্যেকে সংজ্ঞায়ন করবেন। অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সংজ্ঞা দেবেন। তারপর সেই সংজ্ঞায় উভয় পক্ষ একমত হবেন। আর যদি একমত না হন, তাহলে আর বিতর্ক করেই লাভ নেই। যেমন, আপনারা দুইজন যদি সংজ্ঞায়ন না করে বিতর্ক করেন, তাহলে ধরেন আপনি বললেন, “ইকবাল একজন ভালো মানুষ ছিলেন”, আর আপনার বিরোধী পক্ষ বলল, “ইকবাল একজন খারাপ লোক ছিলেন।” তারপর আপনারা যতই তর্ক করেন না কেন, কখনোই একমত হতে পারবেন না; কেননা আপনিতো ইকবাল বলতে মহাকবি ইকবালকে বুঝাচ্ছেন, আর আপনার বিরোধী পক্ষ তো ইকবাল বলতে তার গ্রামের মোড়ল ইকবালকে বুঝাচ্ছে! অতএব, সংজ্ঞায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

আসুন, যুক্তিবিদ্যার এই নিয়ম মেনে এখন একজন নাস্তিকের সাথে বিতর্ক করি।
নাস্তিক: “God does not exist - গড এর অস্তিত্ব নাই।”

প্রশ্ন: God বলতে কাকে বুঝাচ্ছেন? God এর সংজ্ঞা দিন।

নাস্তিক: এইযে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান এরা যার উপাসনা করে, God বলতে তাকেই বুঝাচ্ছি।

প্রশ্ন: হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান সবার God কি একই?

নাস্তিক: উমম… না, তা না। আসলে God বলতে আমি সাধারণভাবে বুঝাচ্ছি যে, মানুষজন যাকে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা বলে থাকে।

প্রশ্ন: তাহলে God তথা মহাবিশ্বের স্রষ্টা বলে কিছু নাই?

নাস্তিক: না।

প্রশ্ন: প্রমাণ দিন?

নাস্তিক: প্রমাণ দেব কিভাবে? God থাকলে না তার প্রমাণ দিব!

প্রশ্ন: প্রমাণ ছাড়া কথা বলেন কেন?

নাস্তিক: (নিশ্চুপ)

পাঠক! এখানে যুক্তির আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। সেটা হলো, যার অস্তিত্ব আছে কেবল তাকেই প্রমাণ করা যায়। যুক্তিবিদ্যার ভাষায়: “যার অস্তিত্ব আছে, শুধু তারই সংজ্ঞা দেয়া যায়। কিন্তু যার অস্তিত্ব নেই, তাকে সংজ্ঞায়ন করা যায় না।”

ইন ফ্যাক্ট, “যার অস্তিত্ব নেই” কথাটাই একটি ভুল বাক্য। কেননা, “যার, যিনি, তিনি, সে” ইত্যাদি হলো সর্বনাম (pronoun)। আর বিশেষ্য (noun) থাকলেই সেটার সর্বনাম হয়। যেমন, “রফিক সাহেব আমার বিরোধী মানুষ, ‘তিনি’ ক্রিকেটে আমার বিপরীত দল সাপোর্ট করেন, ‘তার’ গ্রামের বাড়ি বরিশাল…।” এখানে রফিক সাহেব নামে একজন আছে বলেই আমরা ‘তার, তিনি’ ইত্যাদি সর্বনাম ব্যবহার করতে পারছি। কিন্তু রফিক সাহেবের অস্তিত্ব না থাকলে আমরা শুধু শুধু ‘তার, তিনি’ ইত্যাদি বলতে পারতাম না। আমরা কি বলতে পারতাম যে – “আমার জানামতে ‘তিনি’ একজন ভালো মানুষ, ‘তার’ নামে কোনো অভিযোগ নাই...”? বলতে পারতাম? না। কারণ তখন প্রশ্ন এসে যেত – “আপনি ‘কার’ কথা বলছেন?” তখন আর উত্তর নাই!

অতএব, “যার অস্তিত্ব নেই” – এটাই একটা ভুল বাক্য। অতএব, শুধুমাত্র যার অস্তিত্ব আছে, তাকেই সংজ্ঞায়ন করা যায়। তাকে নিয়েই কথা বলা যায়। অতএব, God এর অস্তিত্ব থাকলে আপনি সংজ্ঞায়ন করে বলতে পারবেন: “God exists - পরম স্রষ্টা আছেন।” কিন্তু আপনি বলতে পারবেন না: “God does not exist - স্রষ্টার এর অস্তিত্ব নেই।” কেননা God does not exist বলতে হলে আপনাকে –

ধাপ - ১. প্রথমে God এর উপযুক্ত সংজ্ঞা দিতে হবে

ধাপ - ২. তারপর প্রমাণ করতে হবে যে, সেই God এর অস্তিত্ব নেই!

কিন্তু আপনি যদি ধাপ-১ সফলভাবে সম্পন্ন করেন, অর্থাৎ God এর সংজ্ঞা সঠিকভাবে দিতে পারেন, তার মানেই হলো God এর অস্তিত্ব আছে। তখন আপনি আর ধাপ-২ প্রমাণ করতে পারবে না।

অতএব, “God exists” - এটা প্রমাণ করা সম্ভব। কিন্তু “God does not exist” - এটা প্রমাণ করা সম্ভব না।

সংজ্ঞায়ন ও নিরপেক্ষ বিচারক | যুক্তির কাঠগড়ায় ইসলাম





পাঠক! প্রয়োজনে একটু সময় নিয়ে ভাবুন। কারণ বিষয়টা একটু ধাঁধার মত লাগতে পারে। তাই মাথাটাকে একদম পরিষ্কার রেখে ঠাণ্ডা মাথায় আবার একটু ভেবে দেখুন: “শুধুমাত্র যার অস্তিত্ব আছে তাকেই সংজ্ঞায়ন করা যায়। কিন্তু অনস্তিত্বের (non-existent এর) সংজ্ঞায়ন করা যায় না।” একারণেই রিচার্ড ডকিন্স ইন্টারভিউয়ের শুরুতেই বলেছেন: “Nobody can actually say for certain that anything doesn’t exist.” অর্থাৎ, “কেউ আসলে কখনো নিশ্চিত করে বলতে পারে না যে, কোনো একটা বিশেষ কিছুর অস্তিত্ব নাই।”

প্রশ্ন: থামেন, থামেন! কিন্তু আমরা যে বলি: “ভূত-প্রেত বলে কিছু নাই”? এটাও কি “স্রষ্টা বলে কিছু নাই” – ঐ একই প্যাটার্নের হয়ে গেল না?

পাঠক! আপনার মন যদি নিরপেক্ষ ও অপ্রভাবিত থাকত, তাহলে এই প্রশ্নটা মাথায় আসতো না। কিন্তু ঐযে, আমাদের সবারই যে কমবেশি ব্রেইনওয়াশিঙ হয়েছে আগে! সবার মাথাই তো এসব নানান জিনিসে বোঝাই। তাই এই প্রশ্নটা লাফ দিয়ে মাথায় চলে এসেছে। আর নাস্তিকদের মনেতো এই প্রশ্নটা সবার আগে আসবে। কারণ তাদের মন অনেক বেশি প্রভাবিত। আপনার-আমার মত নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মনে স্রষ্টাভাবনা তো তারা করেই না (অবশ্য প্রচলিত ধার্মিকেরাও করে না খুব একটা)।

নাস্তিকের যুক্তি: আমরা বলি God does not exist, আর তখন আমাদেরকে সংজ্ঞায়নের প্যাঁচে ফেলে দেয় মুসলমানেরা। বলে, “যার অস্তিত্ব আছে, শুধু তাকেই প্রমাণ করা যায়, সংজ্ঞায়ন করা যায়; অতএব God exists প্রমাণ করা সম্ভব, কিন্তু God does not exist প্রমাণ করা সম্ভব না।” কিন্তু তারা নিজেরা যখন একই প্যাটার্নে বলে: ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই - does not exist, তখন কেন সংজ্ঞায়নের কথা মনে থাকে না?

কথা তো ঠিকই! Does not exist - এটা এমন একটা বাক্য, যেটা প্রমাণ করা যায় না। অতএব, আমরা বলতে পারব God exists - স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে, কিন্তু বলতে পারব না যে - Ghost does not exist - ভূতের অস্তিত্ব নাই। আমরা বলতে পারব আল্লাহ আছে, ফেরেশতা আছে, নবী আছে ইত্যাদি। কিন্তু বলতে পারব না যে, ভূত নাই, প্রেত নাই, পেত্নী নাই…।

পাঠক, আবারও ধাঁধার মত লাগছে? কিন্তু “ভূত-প্রেত বলে কিছু নাই” – এই কথাতো আপনি ছোটবেলা থেকে পানির মত সত্য জেনে এসেছেন! আর এখন কোত্থেকে এক লোক এসে বলছে, “ভূত-প্রেত নাই একথা বলা যাবে না!”

কী মুশকিল! আমি বারবারই বলছি যে, আপনার মনকে নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত রাখুন। দেখুন, পৃথিবীতে যদি আর কোনো মানুষ না থাকতো, যদি কেউ এসে ভূত-পেত্নীর ভয় না দেখাতো আপনাকে, তখন কি আপনার “স্রষ্টাভাবনার” ভিতরে এসব প্রশ্ন আসতো? না। আসতো না। কিন্তু কী আর করা। যেহেতু ব্রেইনওয়াশিং হয়েই গেছে, এখন কষ্ট করে করে ঘষে ঘষে ঐসব মরিচা তোলা ছাড়া উপায় নাই। তাই যুক্তিবিদ্যার আরো একটি জিনিস একটু শিখে যান। সেটা হলো –

প্রমাণের অভাব

আমরা যখন বলি, “ভূত-প্রেত বলে কিছু নাই,” তখন এই কথাটার মধ্যে একটা গল্প লুকিয়ে থাকে। গল্পটা এরকম:

শহুরে এক বাচ্চা গ্রামে গেল। রাত বারোটায় বাড়ির উঠানে বসে দাদু গল্প বলছে।

দাদু: ঐযে ঐ তেঁতুল গাছটা দেখছো? কেমন শব্দ হচ্ছে, পাতাগুলো নড়ছে…। ঐ তেঁতুল গাছে থাকে এক ভূত, আর এক পেত্নী।

আধুনিক বাচ্চা: বললেই হলো? প্রমাণ দাও?

দাদু: ওমা, সেকী কথা! আমরাতো সবসময় বাচ্চাদেরকে ভূতের গল্প বলে এসেছি, আর তারা প্রশ্ন ছাড়াই মেনে নিয়েছে, ভয় পেয়েছে। এ কোন যামানা পড়লোরে বাবা, প্রমাণ চায়! প্রমাণতো আমি দিতে পারব না বাপু।

আধুনিক বাচ্চা: অতএব, ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই।

পাঠক, এবার বুঝেছেন, কথাটা কিভাবে এসেছে? দাদু প্রমাণ দিতে না পারায় আমরা বলছি: “ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই।” যদিও আমাদের আসলে বলা উচিত ছিল: “ভূত-প্রেত এর অস্তিত্বের পক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তি-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”

নাস্তিক: হুম, আমরাও তো সেরকমই। আপনারা আল্লাহ-ওয়ালারা যখন এসে স্রষ্টার কথা বলেন, তখন আমরাও বলি যে, “স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই - God does not exist”. আর তখনই যুক্তিবিদ্যার সংজ্ঞায়নের প্যাঁচে পড়ে ধরা খেয়ে যাই! কিন্তু আসলে আমরা যেটা বলতে চাই তা হলো, “স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তি-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”

তো পাঠক, ভূতের কথা প্রথম বলল দাদু। কিন্তু প্রমাণ দিতে পারলো না। এজন্য বাচ্চাটা বলছে যে, ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই (অর্থাৎ, সে বলতে চেয়েছে যে, ভূত-প্রেতের অস্তিত্বের পক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণ পাওয়া যায়নি)। একইভাবে স্রষ্টায় বিশ্বাসীরা যখন স্রষ্টার কথা বলল, কিন্তু প্রমাণ দিতে পারলো না, তখন কিছু মানুষ বলল, “স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই” (অর্থাৎ, তারা আসলে বলতে চেয়েছে যে, স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণ পাওয়া যায়নি)। আর তাদেরকেই লোকে বলে নাস্তিক। (একইভাবে ঐ বাচ্চাটাকেও তাহলে বলা উচিত না-ভূতিক বা এই টাইপের কিছু একটা!)

নিরপেক্ষ বিচারক
কিন্তু পাঠক! আপনি যখন আদালতে বিচারকের আসনে বসে আছেন, আর আপনার সামনে দুই পক্ষ যুক্তিপ্রমাণ পেশ করছে, তখন আপনার দায়িত্ব কী? একটা লোক হয়ত আসলেই খুন করেছে, কিন্তু যেহেতু “পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণ পাওয়া যায়নি”, সেহেতু আপনি বলবেন যে, “লোকটার খুনী হবার পক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।” কিন্তু আপনি যদি বলেন যে, “লোকটা খুনী না”, তাহলে তো কথাটা ভুল হলো! কারণ সেতো আসলেই খুন করেছে। তবে কেবল আদালতে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ দিতে পারে নাই। তাই একজন সত্যিকার নিরপেক্ষ বিচারক তার রায়ে লিখবে: “ওমুক লোকটার খুনী হবার পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”

একইভাবে আসুন, আপনি-আমি, আস্তিক-নাস্তিক-সংশয়বাদী সবাই মিলে ঐ নিরপেক্ষ বিচারকের চেয়ারে বসি। তারপর যারা দাবী করে যে “স্রষ্টা আছে”, তাদেরকে বলি: “প্রমাণ আনুন, যদি সত্যবাদী হয়ে থাকেন!” তারপর যদি তারা ঐ গল্প বলা দাদুর মত আমতা আমতা করে, উপযুক্ত যুক্তিপ্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হয়, তখন আমরা রায় লিখব: “স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।” কিন্তু কখনোই লিখব না: “স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই।”

আর পাঠক! এই রায় লেখার পরে কি আপনি নিজের পরিচয় “নিরপেক্ষ বিচারক” থেকে বদলে “নাস্তিক” দিয়ে দেবেন? কখনোই না। কারণ “স্রষ্টা মামলা” হলো আপনার যুক্তির আদালতে আর দশটা মামলার মতই একটা মামলা। ঐ লোক খুনী হওয়ার পক্ষে যেমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তেমনি স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষেও আপনি হয়ত যুক্তিপ্রমাণ পাননি। তাই আপনি দুইটা রায়েই লিখেছেন: “পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।” কিন্তু আপনি কি ঐ “খুন মামলা”-র রায় অনুযায়ী নিজের পরিচয় বদলে ফেলবেন? নিশ্চয়ই না!

তাহলে প্রিয় নাস্তিক ভাই! কেন আপনি “স্রষ্টা মামলা”-র রায়ের পরে নিজের পরিচয় বদলে ফেলছেন? কেন নিজেকে “নিরপেক্ষ বিচারক” পরিচয় না দিয়ে “নাস্তিক” পরিচয় দিচ্ছেন? এটা কি বিচারক হিসেবে আপনার গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে না? সমাজের মানুষের কি এটাই মনে হচ্ছে না যে, “ও ব্যাটা আল্লাহর বিরুদ্ধে লেগেছে?”

আপনি যদি প্রকৃতপক্ষেই মুক্তমনা, যুক্তিবাদী ও সত্যপ্রেমী হয়ে থাকেন, তবে নিজেকে সেটাই বলুন। কিন্তু নাস্তিক বলবেন না দয়া করে। এটা আপনার নিরপেক্ষতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। লোকে ভাববে, “ঐ লোকটার যুক্তির আদালতে আরো কত বিষয় আসলো গেল, কিন্তু সে স্রষ্টা নিয়েই পড়ে রইল।” এখন, প্রিয় নাস্তিক ভাই, আপনি নিজের বিবেকের কাছেই প্রশ্ন করুন, আপনি কি পুরোপুরি নিরপেক্ষ ও অপ্রভাবিত আছেন? নাকি কিছুটা স্রষ্টাবিরোধী হয়ে পড়েছেন? মনে রাখবেন, একজন প্রকৃত নায়বিচারক কখনোই তার মামলার বিষয়বস্তু দ্বারা ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত হয় না।


কিন্তু প্রিয় পাঠক!

আপনি আস্তিক-নাস্তিক যে-ই হন না কেন, আপনাকে সেই নিরপেক্ষ বিচারকের আসনে বসিয়ে আমি স্রষ্টার পক্ষে যুক্তিপ্রমাণ উপস্থাপন করেছি (দার্শনিক স্রষ্টাভাবনার মোট আটটি প্রস্তাবে)। এবং মাননীয় বিচারক! আপনি নিজেই দেখেছেন যে, এই আটটি প্রস্তাব কতটা অকাট্য, এবং যুক্তি ও দর্শনের বিচারে শতভাগ গ্রহণযোগ্য। অতএব, আমি আশা করি আপনার যুক্তির কাঠগড়ায় “স্রষ্টা মামলা”-র নিরপেক্ষ রায়ই আমি পাবো। এবং আমি আশা করি আপনার রায়ের পর্যবেক্ষণে লেখা থাকবে: “স্রষ্টার সপক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। অতএব, স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে - God exists.

_______________________________


যার অস্তিত্ব আছে, কেবল তারই সংজ্ঞায়ন করা যায়।

God exists- প্রমাণযোগ্য, God doesn’t exist- প্রমাণযোগ্য নয়।

নাস্তিকরা বড়জোর “স্রষ্টার অস্তিত্বের সপক্ষে ‘প্রমাণের অভাব’ ” দাবী করতে পারেন।


প্রিয় পাঠক! আপনার বিচারে কি স্রষ্টার সপক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণ পাওয়া গিয়েছে? আপনার ভাবনা শেয়ার করুন

মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…