সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তাক্বদীর শব্দের ব্যাখ্যা: কার্যকারণবিধি ও সময় | অনন্তের পথে


পূর্বকথা

প্রিয় পাঠক, “স্রষ্টা মানুষের ভবিষ্যত জানেন কিনা, মানুষের ভবিষ্যত পূর্বনির্ধারিত কিনা” ইত্যাদি প্রশ্নের কোনো হ্যাঁ-না জবাব আমি দেইনি। বরং আমি নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে অগ্রসর হয়েছি:

১.”স্রষ্টা ও সৃষ্টি” এই দুই পক্ষের ক্ষেত্রে থার্ড অবজার্ভার প্রবলেম তুলে ধরে থার্ড অবজার্ভারকে নাকচ করেছি।

২. তারপর মানুষের ভাগ্যপ্রশ্নের আসল রূপ নির্ণয় করেছি: “স্রষ্টার দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের ভবিষৎ কীরকম?”

৩. তারপর দেখিয়েছি যে, এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে স্রষ্টার দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে, এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

৪. আর পরম স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ অর্জন তথা ফানাফিল্লাহ হওয়া যে সম্ভব, কুরআন-হাদীস থেকে সেই দলীল দিয়েছি।

কিন্তু আমার আশঙ্কা হয়, ভাগ্যপ্রশ্নের এই জবাবে সম্ভবতঃ কেউ-ই সন্তুষ্ট হবেন না। কারণ পরম স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ অর্জনের যে পদ্ধতি উক্ত হাদীসে বলা হয়েছে, তা অত্যন্ত কঠিন! যুগযুগ ধরে সকল ফরজ কাজ পালন করতে হবে, সকল হারামকে বর্জন করতে হবে, পাশাপাশি এত বেশি নফল ইবাদত করতে হবে যে, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাকে ভালোবেসে ফেলবেন। তখন সে আল্লাহর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে, চিন্তা করবে ও কর্ম করবে।

হ্যাঁ, প্রিয় মুসলিম ভাই! এই কঠিন পথেই আপনাকে হাঁটতে হবে। যদি আপনি সেভাবে জীবন যাপন করতে সক্ষম হন, তখন অবশ্য এই ভাগ্যপ্রশ্নটাই আপনার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হবে। কেননা আপনি আল্লাহ তায়ালাকে রাজিখুশি করে জীবন যাপন করেছেন; আর যারা আল্লাহ তায়ালাকে রাজিখুশি করে জীবন যাপন করে, তাদের পুরস্কারের ওয়াদা তো স্বয়ং আল্লাহপাক করেছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি এই কঠিন পথে না হাঁটেন, তবে “ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত কিনা” এটা জেনেও আপনার খুব একটা লাভ নেই, সম্ভবতঃ আপনার জন্য কঠিন শাস্তিই অপেক্ষা করছে। অতএব, যে মুসলিম ভাইয়েরা আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কে নিজের ধর্মকে জিতানোর মোহে পড়ে মাথা দিয়ে দেয়াল ঠেলছেন, আর তাই করতে গিয়ে থার্ড অবজার্ভার প্রবলেমের ফাঁদে পড়ে গিয়েছেন, তারা একটু থামুন। নিজেকে নিয়ে চিন্তা করুন। কোথায় যাচ্ছেন আপনি?

আশা করি অপছন্দ হলেও পাঠক ভাগ্যপ্রশ্নের এই উত্তরটি মেনে নিয়েছেন যে, সকল ফরজ ও হারাম মেনে চলে নফল ইবাদতের মাধ্যমে যুগযুগ সাধনা করেই এর আসল উত্তরটি পেতে হবে, এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। এখন আমি “মানুষের ভবিষ্যৎ” প্রসঙ্গে কিছু ইন্টেলেকচুয়াল আলোচনা করব।

সময় কী?

‘ভবিষ্যত’ সংক্রান্ত প্রশ্নের আগে আমাদের জানা উচিত, সময় কী? ঘড়ির কাঁটা-ই কি সময়? নিশ্চয়ই না। চন্দ্র-সূর্যের উদয়-অস্তই কি সময়? আসলে সময় কী? এইযে আমরা বলি, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত – এর মানে কী? ভবিষ্যত কি কোনো একটা লুকানো জিনিস, যেখানে অনেক ঘটনা আছে, যা ধীরে ধীরে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়? নাকি ভবিষ্যত বলে কিছু নেই? টাইম ট্র্যাভেল কি সম্ভব? কেউ যদি টাইম ট্র্যাভেল করে অতীতে গিয়ে তার শিশুকালকে হত্যা করে আসে তাহলে বর্তমানে ফিরে এসে কি তার অস্তিত্ব খুঁজে পাবে? ইতিহাসে এমন হাজারো প্রশ্ন মানব মনে খেলে গিয়েছে।

কিন্তু পাঠক! আসলে সময় বলে আলাদা কিছু নেই। বরং পরিবর্তনশীল সৃষ্টিজগতের পরিবর্তনশীলতাই মানব মনে সময় নামক ধারণার জন্ম দিয়েছে।

হয়ত ভাবছেন যে, এত বড় বড় চিন্তাবিদ, দার্শনিক আর পদার্থবিজ্ঞানীরা সময় নিয়ে মাথা ঘামিয়ে শেষ করতে পারল না, আর কোথাকার কে এসে বলছে, “সময় বলে বিশেষ কিছু নেই”? যদি তেমনটা ভেবে থাকেন, তবে অনুরোধ করব, প্রিয় পাঠক, যুক্তির ময়দানে অথরিটির কোনো মূল্য নেই। যুক্তি ও দর্শনের বিচারে গ্রহণযোগ্য হলে নিরক্ষর মানুষের কথাও মেনে নেব, আর যুক্তি ও দর্শনের বিচারে গ্রহণযোগ্য না হলে আইনস্টাইনের কথাকেও প্রত্যাখ্যান করব। কিন্তু তবু “ফ্যালাসি অব আপিল টু অথরিটি” করব না, ইনশাআল্লাহ।

প্রিয় পাঠক,

বিষয়টি নিয়ে উদার মনে চিন্তা করে দেখুন। ‘গতপরশু’ আপনি অনেক ছোট ছিলেন। ‘গতকাল’ একটু বড় হয়েছিলেন। ‘আজকে’ আরো বড় হয়েছেন। তাই আপনি ভাবছেন, ‘আগামীকাল’ বুড়ো হয়ে যাবেন। গতপরশু, গতকাল, আজ, আগামীকাল – এগুলো সময়সূচক শব্দ। এই শব্দগুলো বাদ দিয়ে চিন্তা করুন। কী ঘটছে আসলে?

আসলে আপনি বুড়িয়ে যাচ্ছেন। আপনার দেহে পরিবর্তন ঘটছে। আপনি চাইলেও থামিয়ে রাখতে পারছেন না। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় আপনার দেহ-মনে পরিবর্তন আসছে। এই পরিবর্তনের একটা ধাপ: শিশু, আরেকটি ধাপ: যুবক, আরেকটি ধাপ: বৃদ্ধ। পরিবর্তনের এই বিভিন্ন ধাপ (stage)-কে আমরা মুখের ভাষায় বর্ণনা করছি। আমাদের মস্তিষ্কের ভিতরে চিন্তাজগতে এই পরিবর্তনের তথ্যগুলো সংরক্ষণ করে রাখছি। এইযে পরিবর্তনের তথ্যগুলো সংরক্ষণ করে রাখছি মস্তিষ্কে ও মুখে প্রকাশ করছি: এটাই হলো সময়। অর্থাৎ, পরিবর্তনশীল সৃষ্টিজগতের পরিবর্তনশীলতার যে অনুভূতি মানব মনে বিদ্যমান, সেই অনুভুতিটিই হলো সময়।

অতএব, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত বলে আলাদা কিছু নেই; বরং আছে পরির্বতনশীল সৃষ্টিজগতের পরিবর্তনশীলতার বিভিন্ন ধাপ। সময় হলো বাইরের খোলস মাত্র, ভিতরের আসল জিনিসটা হলো পরিবর্তনশীলতা। এই পরিবর্তনশীলতা না থাকলে সময় নামক কোনো কনসেপট (concept - ধারণা) থাকত না।

পরম স্রষ্টা সময়ের ঊর্ধ্বে

দার্শনিক স্রষ্টাভাবনার সপ্তম প্রস্তাবে আমরা বলেছিলাম যে, পরম স্রষ্টা সময়ের ঊর্ধ্বে, তিনিই প্রকৃত অসীম, অনন্ত, ট্রু ইনফিনিটি। আর এখন যখন জানলাম যে, সময় হলো বাইরের খোলস মাত্র, আসল বিষয় হলো পরিবর্তনশীলতা, তখন আমরা নতুন একটি দাবী উপস্থাপন করতে পারি:

সপ্তম প্রস্তাবের অনুসিদ্ধান্ত-৩: পরম স্রষ্টা (সময়, তথা) সবরকম পরিবর্তনশীলতার ঊর্ধ্বে।

আল্লাহ তায়ালা সময়ের শপথ করে বলেন, “নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত।” (কুরআন: ১০৩)

হ্যাঁ, এই সময় তথা পরিবর্তনশীলতাই হলো ক্ষতি। এই পরিবর্তনশীলতার ঊর্ধ্বে উঠলেই ক্ষতি থেকে মুক্তি পাবেন। আর এই পরিবর্তনশীলতা তথা সময়ের ক্ষতি থেকে মুক্ত কারা? সেটাও আল্লাহপাক পরের আয়াতে বলছেন:

“যারা ‘ঈমান’ অর্জন করে এবং পরস্পরকে ‘হক্ব’ ও ধৈর্যের প্রতি তাকীদ করে।” (সূরা আসর, ১০৩:৩)

প্রিয় পাঠক! স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, মুসলিম হলেই ঈমান অর্জন হয় না, বরং ঈমান অর্জন ভিন্ন একটি ব্যাপার। এ বিষয়ে বইয়ের দ্বিতীয় ভাগের “বিশ্বাস, জ্ঞান ও ঈমান” পর্বে আলোচনা করেছি। সময় তথা পরিবর্তনশীলতার ক্ষতির এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এখন যদি উক্ত পর্বটিতে একটু চোখ বুলিয়ে আসেন, তবে বিষয়গুলো আরো ভালোভাবে আত্মস্থ করতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ। তাই “বিশ্বাস, জ্ঞান ও ঈমান” পর্বের আলোচনাটি এখন আরেকবার দেখে নিতে অনুরোধ করছি।

সময়ের ঊর্ধ্বে ওঠাই ফানাফিল্লাহ হওয়া

পরিবর্তনশীলতা তথা সময় সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য। পক্ষান্তরে, পরম স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা সবরকম পরিবর্তনশীলতা তথা সময় থেকে মুক্ত। একারণেই তিনি প্রকৃত অসীম: ট্রু ইনফিনিটি। আর যখন আপনি ঈমান অর্জন করবেন, অর্থাৎ মুমিন হবেন, তখন আপনি পরিবর্তনশীলতা তথা সময়ের ক্ষতি থেকে মুক্ত হবেন। অর্থাৎ, সময়ের ঊর্ধ্বে উঠবেন। তখন আপনি আল্লাহ তায়ালার নূর দিয়ে দেখবেন: আপনার চোখ হয়ে যাবে আল্লাহর চোখ, আপনার চিন্তা ও কর্ম হয়ে যাবে আল্লাহর চিন্তা ও কর্ম। আপনি সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ অর্জন করবেন, পরম স্রষ্টায় বিলীন (ফানা) হয়ে যাবেন। আর এই বিষয়টিকেই আধ্যাত্মিক সাধনায় ফানাফিল্লাহ (আল্লাহতে বিলীন) বলা হয়ে থাকে।

পাঠকের মনে হয়ত প্রশ্ন আসতে পারে, ‘আমি’ যদি পরিবর্তনশীলতা তথা সময়ের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহতে বিলীন হয়ে যাই, কিন্তু আমার শরীর-মন তো ঠিকই পরিবর্তনশীল থাকছে, তাহলে আসলে ‘আমি’ কে? “আমি কে”- এটিও দর্শনে, বিশেষতঃ ধর্মীয় দর্শনের একটি ক্ল্যাসিকাল আলোচনার বিষয়। আধ্যাত্মিক ধারায় বলে, আত্মদর্শনে খোদাদর্শন। এ বিষয়ে আমরা ইনশাআল্লাহ আত্মদর্শন পর্বে আলোচনা করব। আপাততঃ সময়ের আলোচনাটা শেষ করি।

টাইম ট্র্যাভেল কি সম্ভব?

এখন পাঠক বুঝতে পারছেন যে, টাইম ট্র্যাভেল বিষয়টি আসলে একটি অবাস্তব কনসেপ্ট। টাইম তথা সময় হলো খোলসমাত্র, ভিতরের আসল ব্যাপার হলো পরিবর্তনশীলতা। টাইম ট্র্যাভেল কথাটার গোড়া যদি তাই অনুসন্ধান করি, তাহলে দেখব যে, “পরিবর্তনশীলতা তথা সময়ের ঊর্ধ্বে ওঠা সম্ভব কিনা” – এটিই হলো মূল প্রশ্ন। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তা সম্ভব। ইসলামী দর্শনে সে প্রশ্নের উত্তর মেলে। ইসলামী দর্শন বলে যে, সীমাবদ্ধতা/ পরিবর্তনশীলতা/ সময় এর ঊর্ধ্বে ওঠা মানে হলো আল্লাহর সাথে এমনভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া যে, তখন বান্দা স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ অর্জন করে। আর এটাতো প্রতিটা মানুষেরই জন্মগত ইচ্ছা যে, সে তার সীমাবদ্ধতাগুলিকে অতিক্রম করবে, অসীম হবে! সসীমের ভিতরে অসীম হবার বাসনা প্রবল: সৃষ্টির ভিতরে স্রষ্টার সাথে মিলেমিশে একাকার হবার বাসনা প্রবল। এগুলি তো আমাদের রক্তের ভিতরে আছে। তবু মানুষ কিভাবে তার স্রষ্টাকে অস্বীকার করে? এ যে নিজের মাকে অস্বীকার করার চেয়েও বেশি কিছু, এ যেন নিজের রক্তকে অস্বীকার করা!

আমাদের ইসলামী দর্শনে কী নেই? আমাদের সব আছে। সূরা ইখলাস আমাদেরকে মস্তিষ্কের সীমা অতিক্রম করে অনন্তের পথে আহবান করে। সূরা আসর আমাদেরকে সময়ের সংজ্ঞা নিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে। আমরা মুসলিম, আমরা জানি সময় কী জিনিস। কিন্তু আফসোস! আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কে ‘বাপ-দাদার ধর্ম’ হিসেবে ইসলামকে জিতানোর জন্যে আমরা আল্লাহকে টাইম ট্র্যাভেলার বানিয়ে ফেলছি, নাউযুবিল্লাহ! ইয়া আল্লাহ! আমাদেরকে ক্ষমা করুন। এমনকি ন্যুনতম যুক্তিবিদ্যার জ্ঞানটুকু অনুসরণ করে যদি ‘সময়’ এর সংজ্ঞায়ন করতাম, তাহলেইতো আর এধরণের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা আসতো না। যেখানে মহান আল্লাহ তায়ালা হলেন সুবহান (পরম প্রমুক্ত সত্তা), সেখানে তাঁকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমরা তাঁর উপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করছি, সময় তথা পরিবর্তনশীলতা আরোপ করছি, আর তারপর টাইম ট্র্যাভেলের মত গোঁজামিল ব্যাখ্যা দিয়ে বিতর্কে জেতার চেষ্টা করছি? এ কোথায় যাচ্ছি আমরা সকলে মিলে!

কার্যকারণবিধি: Law of Causality

পাঠক, আমার আবেগকে ক্ষমা করবেন। কিছু ইন্টেলেকচুয়াল আলোচনা করতে চেয়েছিলাম। সেই আলোচনায় ফিরে আসি। এখন সংক্ষেপে কার্যকারণবিধি তথা law of causality নিয়ে আলোচনা করব, এবং তারপরই আমরা দেখব, তাক্বদীর আসলে কী।

তো, যা বলছিলাম। পরিবর্তনশীলতা সৃষ্টিজগতের অপরিহার্য অংশ। একটা মানুষের রক্ত-মাংস-হাড় ইত্যাদি নিয়ে গেলে যেমন তার জীবদেহের আর অস্তিত্ব থাকে না, তেমনি পরিবর্তনশীলতা ছাড়া সৃষ্টিজগতকে চিন্তা করা যায় না। আর এই পরিবর্তনশীলতার বিভিন্ন নিয়ম/ সূত্রকেই আমরা বলছি কার্যকারণবিধি বা law of causality। সৃষ্টিজগতের সবকিছুই বিভিন্ন কার্যকারণবিধির অধীন। যেমন, মানুষের কার্যকারণবিধিগুলোর মধ্যে একটা হলো, তার মাথা কেটে ফেললে তার মৃত্যু ঘটে। রক্ত ছাড়া সে বাঁচে না। আবার, পানি যেসব কার্যকারণবিধির অধীন, তার মধ্যে একটি হলো, ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সে বাষ্প হয়ে যায়। শূন্য ডিগ্রিতে সে জমে বরফ হয়ে যায়। আবার বিভিন্ন বায়ুচাপে এই তাপমাত্রা বিভিন্ন হয়, ইত্যাদি।

কার্যকারণবিধি ও ফাংশন

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সৃষ্টিজগত বিভিন্ন সূত্র বা নিয়মের অধীন। গণিত বা কম্পিউটার প্রোগ্রামের ভাষায় বলতে গেলে, ছোট ছোট অসংখ্য ফাংশনের অধীন হলো এই সৃষ্টিজগত। যেমন–

ফাংশনের নাম: মানব হত্যা

ইনপুট: মাথা কেটে ফেলা/ সব রক্ত বের করে নেয়া/ দম বন্ধ করে দেয়া ইত্যাদি।

আউটপুট: মৃত্যু।

আর এই ফাংশনে ইনপুট দেবার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে মানুষকে। বাঘসহ বিভিন্ন পশুও অবশ্য মাঝে মাঝে এই ফাংশনে ইনপুট দিয়ে থাকে। তবে মানুষই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই ইনপুটগুলো দিয়ে থাকে, যা পত্র-পত্রিকায় আর ফেইসবুক ফিডে আপনারা অহরহ দেখতে পান।

যাহোক, আরেকটি ফাংশন বিবেচনা করি।

ফাংশনের নাম: পানি বাষ্পীভূতকরণ।

ইনপুট: ১০০ ডিগ্রি তাপ।

আউটপুট: পানি বাষ্প হতে শুরু করবে।

মজার ব্যাপার হলো, মাউন্ট এভারেস্ট পাহাড়ের চুড়ায় গিয়ে আপনি দেখবেন যে, “১০০ ডিগ্রি তাপ”-ই উক্ত ফাংশনের একমাত্র ইনপুট না। বরং “৭১ ডিগ্রি তাপ” ইনপুট দিলেই পানি ফুটতে শুরু করবে সেখানে। উক্ত ফাংশনের এই ইনপুটটি কি মানুষ আগে জানত? না। মানুষ মাউন্ট এভারেস্টে গিয়েছে, কিংবা হিসাব নিকাশ করে বের করেছে বায়ুচাপ ও পানির বয়েলিং পয়েন্টের সম্পর্ক। তখন বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছে, “পানি বাষ্পীভূতকরণ” ফাংশনের আরো অনেক ইনপুট আছে! একইভাবে “মানব হত্যা” ফাংশনের যে আরো কতরকম ইনপুট আছে, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে আমরা বের করেছি। যেমন, রক্তে বিষ ঢুকিয়ে দেয়া, ফুসফুসে বিষাক্ত গ্যাস ঢুকিয়ে দেয়া ইত্যাদি। কেজানে, আরো কত ইনপুট আমরা আবিষ্কার করব! কেজানে, এসব ফাংশনে হয়ত এমন অনেক ইনপুট আছে, যেগুলিতে আমাদের কারো অ্যাক্সেস (access-প্রবেশাধিকার) নেই। হয়ত সেই ইনপুটগুলো স্রষ্টা তার নিজের জন্যে রেখেছেন!

ধর্মে বর্ণিত ‘কার্যকারণবিরোধী’ বিষয়ের ব্যাখ্যা

হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক!

সকল কার্যকারণবিধির যিনি স্রষ্টা, এই মহাবিশ্বকে যিনি অসংখ্য জটিল ফাংশনের জালে আবদ্ধ করে রেখেছেন, কেবলমাত্র তিনিই জানেন এই ফাংশনগুলির সকল ইনপুট। কিছু ইনপুটকে তিনি নিজের জন্য এক্সক্লুসিভ করে রেখেছেন। কিংবা কিছু ইনপুটকে এক্সক্লুসিভ করে রেখেছেন তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য। এই বুঝ যাদের আছে, তারা যেমন নবী-রাসুলগণের (আ.) মুজিজাকে অস্বীকার করবে না, তেমনি ওলি-আউলিয়াগণের কারামতকে অস্বীকার করবে না। চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করাও তাই তাদের কাছে “অবৈজ্ঞানিক ও কার্যকারণবিরোধী” মনে হবে না। তারা সহজেই বুঝে নেবে যে, এটাও স্রষ্টার তৈরী ফাংশনেরই অংশ, কেবল মানবজাতির সেটা আগে থেকে জানা ছিল না। কিংবা ঐ ফাংশনের ইনপুট অ্যাক্সেস তাদের ছিল না।

আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছা করেন বিভিন্ন ফাংশনের বিভিন্ন ইনপুট ক্ষমতা দান করেন। সাগরের পানি দুই ভাগ করা, মৃত পাখিকে জীবিত করা, লাঠিকে সাপে পরিণত করা, চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করা – ইত্যাদি সবই সম্ভব, যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন (অর্থাৎ কোনো মানুষকে সেইসব ফাংশনের সেইসব ইনপুটে অ্যাক্সেস দেন)। এতে তাঁর কার্যকারণবিধি ভঙ্গ হয় না, এটা ‘বিজ্ঞানবিরোধী’-ও নয়। বরং এতে তাঁর সৃষ্টিজগতের কার্যকারণবিধির নতুন দিক ও নতুন ফাংশন উন্মোচিত হয়, যা আমাদেরকে বরং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করে (যেমন, ইউসুফ (আ.) এর জামা চোখে বুলানোয় ইয়াকুব (আ.) এর চোখের ছানি ভালো হয়ে গিয়েছিল)।

তাক্বদীর

এখন পাঠক আসুন তাক্বদীর প্রসঙ্গে। আরবি তাক্বদীর শব্দটি ক্বাদার ( قدر) শব্দমূল (word root- মাছদার) থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো সুপরিমিত করা, যথাযথভাবে নির্ধারণ করা, মূল্যায়ন করা, শক্তি ইত্যাদি। বাংলা ভাষাতেও এসকল অর্থে শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্যনীয়। যেমন, “আল্লাহর কুদরতে (শক্তিতে) এটা হয়েছে”, কিংবা “তিনি আমাকে অনেক কদর (মূল্যায়ন) করেন”, ইত্যাদি। উক্ত উদাহরণ দুটিতে কুদরত/ কদর এর পরিবর্তে ভাগ্য শব্দটি বসিয়ে দেখুনতো কেমন হয়? একইভাবে নিম্নোক্ত আয়াতেও আপনি ক্বাদার এর অর্থ ‘ভাগ্য’ করতে পারবেন না:


তাক্বদীর শব্দের ব্যাখ্যা: কার্যকারণবিধি ও সময়اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ

“আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করেন এবং (যার জন্যে ইচ্ছা রিজিক) ‘ক্বাদার’ ( قدر - পরিমিত, limited) করে দেন।…” (সূরা রা’দ, ১৩:২৬) কিংবা নিম্নোক্ত আয়াতের ‘তাক্বদীর’ শব্দের অর্থ ভাগ্য করতে পারবেন না:


وَجَعَلَ اللَّيْلَ سَكَنًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ حُسْبَانًا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ

“…আর তিনি (আল্লাহ্) রাত্রিকে আরামদায়ক এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাব স্বরূপ (বর্ষ ও তিথি গণনায় সহায়ক) বানিয়েছেন। এ হচ্ছে মহাপরাক্রান্ত মহাজ্ঞানীর ‘তাক্বদীর’ (নির্ধারণ, অর্থাৎ তাঁর নির্ধারিত প্রাকৃতিক বিধান)।” (সূরা আনআম, ৬:৯৬)

মোটকথা, কুরআনের কোথাও পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য অর্থে ক্বাদার/ তাক্বদীর শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। বরং –

১. মূল্যায়ন অর্থে ক্বাদার শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ৬:৯১, ২২:৭৪, ৩৯:৬৭, ৬৫:৩ আয়াতে।

২. পরিমাপ/ নির্ধারণ অর্থে তাক্বদীর শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ৬:৯৬, ৭৬:১৬, ২৫:২ আয়াতে।

৩. আরো দেখুন ৩৬:৩৯ ও ২৩:১৮ আয়াত।

তাক্বদীর শব্দের ভুল অনুবাদের ভয়াবহতা

পাঠক! তাক্বদীর শব্দের এইযে ভুল অনুবাদ করা হয়েছে, এর দায় কে নেবে, বলুন? একদিকে ঈমান শব্দের ভুল অনুবাদ করে ধর্মকে (অন্ধ)বিশ্বাসের বস্তু বানিয়ে ফেলা হয়েছে। অপরদিকে তাক্বদীর শব্দের ভুল অনুবাদ থেকে জন্ম নিচ্ছে স্রষ্টা ও ধর্ম সম্পর্কে হাজারো ভুল ধারণা। কেউবা আবার জোরপূর্বক সেই ভুল ধারণাকে সত্য প্রমাণ করার জন্য স্রষ্টার উপর সময় আরোপ করছেন, তাকে বানাচ্ছেন টাইম ট্র্যাভেলার। কেউবা আবার বানাচ্ছেন ক্লাস টিচার: গোঁজামিল ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্রষ্টা ও সৃষ্টির বাইরে তৃতীয় সত্ত্বার আমদানী করছেন। অপরদিকে যেসব মানুষ বিভিন্ন পাপকর্ম করে মনে মনে অনুতাপে ভুগছে, তাদেরকে যখন এসব ‘ধার্মিকেরা’ শুনাচ্ছে যে কে পাপী আর কে পুন্যবান হবে তা আগেই ‘তাক্বদীরে’ আছে, জান্নাত-জাহান্নাম সবই ‘ভাগ্যে’ লেখা আছে – তখন সেই মানুষেরা আরো হতাশ হয়ে ইসলাম থেকেই দূরে সরে যাচ্ছেন। তারা ভাবছেন যে, আমিতো অলরেডি অনেক পাপ করে ফেলেইছি, আমাকে মনে হয় আল্লাহ জাহান্নামেই নেবে। জন্ম নিচ্ছে হতাশা, মানুষ ধাবিত হচ্ছে হতাশাবাদ তথা নাস্তিকতার দিকে।

মানবজাতির উপর এই মহা জুলুমের দায় কে নেবে, বলুন! ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে শেষমেষ তাদের কথা হলো, “ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত”। একথার মাধ্যমে তারা যে পৃথিবীর সকল অন্যায় অপকর্মের দায় আল্লাহর উপর চাপাচ্ছেন, সেকথা নাহয় বাদই দিলাম। আল্লাহ গাফুরুর রহীম, তিনি ক্ষমা করে দিবেন; কিন্তু এহেন অপব্যাখ্যা যে আরো অনেক মানুষকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার থেকেই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, ঠেলে দিচ্ছে নাস্তিকতার দিকে, তাদেরকে বঞ্চিত করছে তওবার সৌন্দর্য থেকে – এর দায় কে নেবে, বলুন?? হে আল্লাহ! আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আমরা অনেক বড় জুলুম করে ফেলেছি মানবজাতির উপর!

তাক্বদীর: ফাংশন

বরং তাক্বদীর তো হলো কার্যকারণবিধি। কার্যকারণবিধির ফাংশনসমূহই হলো তাক্বদীর। অনেক ছোট ছোট ফাংশন মিলিয়ে যেমন হয় মহা ফাংশন, তেমনি ছোট ছোট তাক্বদীর মিলিয়ে হলো মহা তাক্বদীর। আপনাকে স্বাধীন এখতিয়ার দেয়া হয়েছে; আপনি স্বাধীনভাবে কর্ম করতে পারবেন, অর্থাৎ সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন ফাংশনে ইনপুট দিতে পারবেন। একটি ফাংশনের আউটপুট, আরেকটি ফাংশনের ইনপুট হিসেবে কাজ করছে। এভাবে করে ছোট ছোট অনেক তাক্বদীরে (unit function)-এ আপনি ইনপুট দিচ্ছেন। এক তাক্বদীর থেকে আরেক তাক্বদীরে প্রবেশ করছেন। নিজের তাক্বদীর নিজেই নির্ধারণ করছেন। ঠিক যেন জটিল কোনো কম্পিউটার গেইমের মত। যেখানে অনেকগুলো উপায়ে খেলে গেইমটা শেষ করা যায়; কিন্তু যখন একটা নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়ে হাঁটা শুরু করেন, তখন হয়ত আরো চার-পাঁচটা রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। অপরদিকে হয়ত একইসাথে নতুন দুয়েকটা রাস্তা খুলে যায়। এইভাবে আপনার নিজের তাক্বদীর আপনি নিজে গড়তে থাকেন… দুনিয়ার মহা জটিল তাক্বদীর জালের ভিতরে আপনার গেইমপ্লে আপনি নিজে নির্ধারণ করতে থাকেন।

প্রশ্ন: মানুষ যদি স্বাধীনভাবেই তার তাক্বদীর নির্ধারণ করবে (অর্থাৎ বিভিন্ন ফাংশনে ইনপুট দেবে), তাহলে আল্লাহ কেন কুরআনে বলেছেন যে, ‘তিনি’ পথভ্রষ্ট করেন, ‘তিনি’ অন্তরে মোহর মেরে দেন, ‘তিনি’ মানুষের অবস্থার পরিবর্তন করেন…? প্রিয় পাঠক, এ নিয়ে বইয়ের তৃতীয় ভাগের “কোট মাইনিং ফ্যালাসি” পর্বে ভাগ্যবাদ বনাম কর্মবাদ উপশিরোনামে আলোচনা করেছিলাম। সেখানে দেখিয়েছিলাম যে, কুরআনের কিছু আয়াত দেখলে কর্মবাদকে সঠিক মনে হয়, আবার কিছু আয়াত দেখলে ভাগ্যবাদকে সঠিক মনে হয়। এই বাহ্যিক পরস্পরবিরোধিতার সমাধান কী? এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু সেখানে দেইনি, প্রিয় পাঠক! তবে এবার দেব। “সবই যদি কার্যকারণবিধি মোতাবেক হয়ে থাকবে, তাহলে আল্লাহ কেন বিভিন্ন ঘটনার সাথে নিজের কর্তৃত্ব সংযুক্ত করেন?” এ বিষয়ে আমরা পরের অধ্যায়ে আলোচনা করব।

_______________________________

পরিবর্তনশীল সৃষ্টিজগতের পরিবর্তনশীলতাই মানব মনে সময় নামক ধারণা সৃষ্টি করেছে।

ভাগ্য নয়, বরং মূল্যায়ন, পরিমাপ ও নির্ধারণ অর্থে তাক্বদীর শব্দটি কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে।

পরিমাপ/ নির্ধারণ তথা তাক্বদীর হলো আসলে কার্যকারণবিধি। আপনার মতামত আশা করছি

মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…