সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বিশ্বাস, জ্ঞান ও ঈমান | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা



পাঠক! হয়ত ভাবছেন যে, ঠিক আছে বুঝলাম আল্লাহকে ‘বিশ্বাস করি’ বলাটা উপযুক্ত হয় না। কারণ আল্লাহর অস্তিত্ব বিশ্বাসের চেয়েও উপরের স্তরের: তাঁর অস্তিত্ব আছে, এটা আমরা ‘জানি’, ঠিক যেভাবে ‘জানি’ একজন নারীর গর্ভে আমার জন্ম হয়েছিলো। কিন্তু তাহলে ঈমান শব্দের অর্থ কী?

কুরআন থেকেই সেটার উত্তর দেব ইনশাআল্লাহ। তার আগে একটা ছোট উদাহরণ দেই।

১. বিশ্বাসের স্তর

আপনার বয়স ৫ বছর। আপনাকে শিখানো হয়েছে যে, এই মহিলাটা তোমার মা। তুমি এই মহিলার কথামতো চলবে। আপনি বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, “এটা আমার মা, মায়ের কথা মেনে চলতে হবে।” (পক্ষান্তরে আপনাকে যদি বলা হত এই লোকটার পেটের ভিতর থেকে তুমি বের হয়েছ, এটা তোমার মা, তাহলে কিন্তু ৫ বছর বয়সে আপনি সেটাই ‘বিশ্বাস’ করে নিতেন।) যাহোক, আপনি এখন ‘বিশ্বাস’ করেন যে এটা আপনার মা, তাকে মেনে চলতে হবে। কিন্তু কাজের বেলায় তেলাপোকা খাওয়া, ইলেকট্রিক সকেটে আঙ্গুল ঢুকানো, চুলায় হাত দেওয়া, এইসব করেন।


২. জ্ঞানের স্তর

আপনার বয়স ১৮ বছর। আপনি দুনিয়ার অনেক কিছু দেখেছেন, পর্যবেক্ষণ করেছেন, শিখেছেন। আপনি পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, নারীর গর্ভ হতেই সন্তানের জন্ম হয়। এখন আপনি আর ‘বিশ্বাস’ করেন না, বরং ‘নিশ্চিতভাবে জানেন’ যে এই মহিলাটিই আপনার মা। এখন আপনি বিশ্বাসের চেয়ে উপরের স্তরে আছেন। কিন্তু এখনও আপনি মাকে মেনে চলেন না। আপনি ‘জানেন’ যে মায়ের আদেশ-নিষেধগুলো সবই কল্যাণকর, তবু আপনি জেনেশুনে অমান্য করেন। আপনি লুকিয়ে সিগারেট খান, রাতভর চ্যাটিং করেন, রাতে দেরী করে বাসায় আসেন, বাজে ছেলেদের সাথে মিশে মারামারি করেন, মারও খেয়ে আসেন।


৩. প্রশান্তি ও নিরাপত্তার স্তর

আপনার বয়স এখন ৩৫। দুনিয়ায় বহু নেশার জগত মাড়িয়ে মারামারি করে বারবার ফেল করে কোনোমতে শেষমেষ টেনেটুনে পাশ করে একটা চাকরি নিয়েছেন পাঁচ বছর হলো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে দুটো চাল-ডাল কিনে এনে মায়ের পায়ের কাছে দিয়ে বলেন, “মা, তুমিই ঠিক ছিলে। তোমার কথা আমার শোনা উচিত ছিল।” মা তো মা-ই। মা পরম মমতায় আপনাকে জড়িয়ে ধরেন। সবকিছু ক্ষমা করে দেন।

বিশ্বাস, জ্ঞান ও ঈমান | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা


প্রিয় পাঠক! এই পর্বে আমরা এই তৃতীয় স্তর পর্যন্তই জানবো। এবং দেখবো যে বিশ্বাস, জ্ঞান ও নিরাপত্তার স্তর সম্পর্কে কুরআন কী বলে।

১. বিশ্বাসের স্তর, ‘যান্’(طن)

সূরা নাজম এর ১৯ নং আয়াত থেকে শুরু করে ২৩ নং আয়াত পর্যন্ত আল্লাহপাক মূর্তিপূজারীদের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। তাদের বাপ-দাদারা তাদেরকে যেসব শিখিয়েছে, সেগুলোই তারা বিশ্বাস করে নিয়েছে। মূলতঃ তারা এগুলো যুক্তি ছাড়াই বিশ্বাস করে। আল্লাহপাক বলছেন, তারা ‘যান্’ (طن- বিশ্বাস, অনুমান, ধারণা) ও ‘হাওয়া’র (প্রবৃত্তি, খেয়ালখুশি, কামনা-বাসনার) অনুসরণ করে।

এরপর ২৮ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন যে, তাদের (এহেন ধর্মীয় কথার ভিতরে আসলে) কোনো ইলম (জ্ঞান) নেই, বরং তারা ‘যান্’ (ধারণা/বিশ্বাস/অনুমানের) অনুসরণ করে। অথচ ‘হক্ব’ (সত্য) জানার ক্ষেত্রে ‘যান্’ (অর্থাৎ ধারণা-বিশ্বাস) মোটেই কার্যকরী কিছু নয়।

অতএব, বাপ-দাদার ধর্ম সত্যই হোক, কি মিথ্যাই হোক, মানুষ যখন দেখাদেখি ধর্মপালন করে, তখন তার ধর্মটা থাকে শুধু বিশ্বাস (যান্)। তার কোনো জ্ঞান (ইলম) থাকে না। আর ‘বিশ্বাস’ দিয়ে সত্য (হক্ব) জানা যায় না।


২. জ্ঞানের স্তর, ‘ইলম’


قَالَتِ الأعْرَابُ آمَنَّا قُلْ لَمْ تُؤْمِنُوا وَلَكِنْ قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الإيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ


“আরবরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। বলুন, তোমরা ঈমান আনোনি, বরং বলো - ‘আমরা আত্মসমর্পন করেছি’ (‘আসলামনা’ - ইসলাম গ্রহণ করেছি)। এখনও তোমাদের ক্বলবসমূহে ঈমান প্রবেশ করেনি।…” (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৪)

অর্থাৎ, মূর্তিপূজারী আরবরা বিশ্বাসের স্তর থেকে যখন জ্ঞানের স্তরে উঠলো, তখন তারা জেনে নিলো, কোনটা সত্য (হক্ব)। তাই তারা তাত্ত্বিক ও মৌখিকভাবে (বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে - intellectually, ব্রেইনের ভিতরে) ইসলামকে সঠিক বলে মেনে নিলো। তখন তারা হলো ‘মুসলিম’, অর্থাৎ আত্মসমর্পনকারী। কিন্তু তখনও তাদের ক্বলবে (হৃদয়ে) ঈমান (প্রশান্তি ও নিরাপত্তা) প্রবেশ করেনি। অর্থাৎ, মুসলিম বটে, কিন্তু ঈমানদার নয়।

অতএব, ইসলাম গ্রহণ করলেই ঈমান অর্জন হয় না, ঈমান অর্জন ভিন্ন জিনিস।


৩. প্রশান্তি ও নিরাপত্তার স্তর, ‘ঈমান’ [QR - প্রসঙ্গ: ঈমান বনাম বিশ্বাস]

আরবী ঈমান শব্দটা আমানা (آمن-আলিফ-মিম-নুন) শব্দমূল (word root বা মাছদার) থেকে এসেছে। যার অর্থ প্রশান্তি। এর আরো একটি অর্থ হলো নিরাপত্তা। কিন্তু এর কোনো অর্থ ‘বিশ্বাস’ নয়। যেমন, সূরা কুরাইশ-এ আল্লাহপাক বলছেন,

و آمنهم من خوف

(... ওয়া ‘আমানা’ হুম মিন খওফ।) অর্থ: এবং যিনি (আল্লাহ) তাদেরকে ভয়ভীতি থেকে ‘আমানা’ (নিরাপদ) করেছেন। (সূরা কুরাইশ, ১০৬:৪)

এখানে আপনি “ভয়ভীতি থেকে ‘বিশ্বাস’ করেছেন” অনুবাদ করতে পারবেন না। আরবী আমানত শব্দটাও একই শব্দমূল থেকে এসেছে। আমরা যখন কোনো জিনিস কারো কাছে আমানত রাখি, তখন সেটা নিরাপদে থাকে। তেমনি আমাদের হৃদয়ে যখন ঈমান প্রবেশ করবে, তখন আমরা নিরাপদ ও প্রশান্ত হয়ে যাব। পরকালীন বিপদের হাত থেকে নিরাপদ হয়ে যাব, এবং দুনিয়াবী দুঃখ-কষ্টও আমাদেরকে আর বিচলিত করবে না, কারণ আমরা প্রশান্ত হয়ে যাব।



সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দুনিয়ার সাথে যুদ্ধ করে ছেলেটা যখন দুটো চাল-ডাল কিনে এনে মায়ের পায়ের কাছে বসে, আর বলে, মা, তুমিই ঠিক, আমি ভুল ছিলাম, আমাকে ক্ষমা করে দিও, আর মা যখন পরম মমতায় ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন, তখন যে প্রশান্তি ও নিরাপত্তার গল্প রচিত হয়, তা কেউ নষ্ট করতে পারে না। আর সেটাই ঈমান।

অতএব, হে প্রিয় মুসলিম ভাই! ঈমান শব্দকে ‘বিশ্বাস’ অনুবাদ করে আমাদেরকে কি ইসলাম থেকেই দূরে সরিয়ে রাখা হয়নি? “ধর্ম হলো বিশ্বাসের বিষয়” এসব কথা যে আজ সবার মুখে মুখে, এর দায় কারা নেবে, বলুন? আমাদেরকে ‘যান্’ (ধারণা/বিশ্বাস) এর স্তরে বন্দী করে রাখা হয়েছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে আমাদেরকে জ্ঞান (ইলম) এর স্তরে উঠতে দেয়া হচ্ছে না, রুখে দেয়া হচ্ছে যত বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি ও দর্শনের চর্চা (মানতিক, ফালসাফা ও আক্বলী চর্চা - logic, philosophy and intellectual practices)। ফলশ্রুতিতে আমরা মুসলিমই হতে পারিনি, প্রশান্তি ও নিরাপত্তা তথা ঈমান অর্জন তো দূরের কথা।

_______________________________

সত্য জানার ক্ষেত্রে ‘বিশ্বাস’(طن) কোনো কাজে আসে না। (সূরা নাজম, ৫৩:২৩)

ঈমান (ايمان) শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রশান্তি ও নিরাপত্তা, বিশ্বাস নয়।

উপস্থাপিত যুক্তির ব্যাপারে আপনার নিরপেক্ষ মতামত আশা করছি।



মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…