সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা



কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগুলি গ্রহণ করতে হবে। অথচ সাধারণতঃ মানুষ কী করে? যেমন, একজন খুনী যদি এসে বলে, মানুষ খুন কোরো না। তখন সাধারণতঃ উত্তর যেটা আসে তা হলো, “ব্যাটা নিজেই খুন করেছে ১০১টা, আবার আসছে উপদেশ দিতে। আগে নিজে পালন করো, তারপর উপদেশ দিতে এসো।”

অথচ কুরআনের দর্শন তা নয়। কুরআনের দর্শন হলো, কথা যে-ই বলুক, যার কাছ থেকেই আসুক, প্রতিটা কথাই মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। তারপর যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যাচাই করে ভালো কথাগুলি গ্রহণ করতে হবে। কেননা, যদিও খুনী লোকটা নিজেই নিজের উপদেশ মানে না, কিন্তু তার উপদেশটি তো ভালো! আর ভালো কথা গ্রহণ করা মানে নিজেকেই উন্নত ও সমৃদ্ধ করা।

Innocent until proven guilty

কোনো মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবার আগ পর্যন্ত তাকে নির্দোষ ধরে নেয়া – এটা কুরআনের আইন। এমনকি সেকুলার বিচারব্যবস্থায়ও “innocent until proven guilty” হলো একটা সাধারণ নিয়ম। অর্থাৎ, “অপরাধ প্রমাণিত হবার আগ পর্যন্ত (অভিযুক্ত ব্যক্তি) নিরপরাধ”।

এটা বোঝা যায় কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত থেকে, যখন মুসলমানদের কেউ কেউ “শোনা কথার” ভিত্তিতে একজন নারীর চরিত্র সম্পর্কে কানাকানি করছিল।

لَوْلا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُبِينٌ (١٢)

“তোমরা যখন একথা শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের (মধ্যকার) লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করেনি এবং বলেনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ?” (সূরা নূর, ২৪:১২)

পাঠক দেখুন, “ধারণা”-র প্রসঙ্গ তখনই আসে, যখন একটা বিষয় প্রমাণিত থাকে না। মনে করেন, আপনার সামনে কেউ একটা গাছ থেকে ফল চুরি করলো। আপনি কি বলবেন যে, “আমার ধারণা লোকটা ফল চুরি করেছে?“ না। কারণ এখানেতো সত্য প্রমাণিত, চোখের সামনে ঘটেছে, এখানে ধারণা করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু যেটা আপনি চাক্ষুষ দেখেননি, সেটার ব্যাপারেই না ধারণা করার প্রশ্ন আসে। ইসলামের আইন অনুযায়ী সেক্ষেত্রে উত্তম ধারণা করতে হবে, অর্থাৎ যার নামে কথা বলা হচ্ছে তাকে নির্দোষ ধরে নিতে হবে। কেউ যদি বলে, “আমার ধারণা ওমুক আমাদের গাছের ফল চুরি করেছে”, তখন উল্টা তাকে ধমক দিয়ে বলতে হবে যে, তুমিতো অপবাদ দিচ্ছ। প্রমাণ উপস্থাপন না করে কারো চরিত্র নিয়ে মন্দ কথা বলাটাই হলো অপবাদ দেয়া। এরপর আল্লাহ আরো বিধান দিচ্ছেন যে,

لَوْلا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ (١٣)

“তারা কেন এ ব্যাপারে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করেনি; আর যেহেতু তারা সাক্ষী উপস্থিত করেনি, সেহেতু তারা আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী।” (সূরা নূর, ২৪:১৩)

অতএব, সমাজের যত বড় ব্যক্তিই হোক না কেন, যতই সমাজ তাকে ধার্মিক কিংবা আলেম বলে জানুক না কেন, সে-ও যদি চারজন চাক্ষুষ সাক্ষী ছাড়া কোনো ব্যক্তির চরিত্র নিয়ে খারাপ কথা বলে, তবে সে ঐ ব্যক্তিকে অপবাদ দিলো, এবং তাকে মিথ্যাবাদীই গণ্য করতে হবে।

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা



দুইপক্ষের কথা শোনার আগে এমনকি মন্তব্যও করা যাবে না

একবার দুই ভাই দেয়াল ডিঙিয়ে হুট করে নবী দাউদ (আ.) এর নামাজের ঘরে ঢুকে পড়লো। তারপর বলল যে, আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে বিচার করে দিন। কী অভিযোগ? একজন বলল:

إِنَّ هَذَا أَخِي لَهُ تِسْعٌ وَتِسْعُونَ نَعْجَةً وَلِيَ نَعْجَةٌ وَاحِدَةٌ فَقَالَ أَكْفِلْنِيهَا وَعَزَّنِي فِي الْخِطَابِ (٢٣) قَالَ لَقَدْ ظَلَمَكَ بِسُؤَالِ نَعْجَتِكَ إِلَى نِعَاجِهِ وَإِنَّ كَثِيرًا مِنَ الْخُلَطَاءِ لَيَبْغِي بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ إِلا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَقَلِيلٌ مَا هُمْ وَظَنَّ دَاوُدُ أَنَّمَا فَتَنَّاهُ فَاسْتَغْفَرَ رَبَّهُ وَخَرَّ رَاكِعًا وَأَنَابَ (٢٤)


“সে আমার ভাই; সে নিরানব্বইটি দুম্বার মালিক, আর আমি মালিক একটি মাদী দুম্বার। এরপরও সে বলে: এটিও আমাকে দিয়ে দাও। আর সে কথাবার্তায় আমার উপর জোর খাটায়।” সে (দাউদ) বলল : “সে তোমার দুম্বাটিকে নিজের দুম্বাগুলোর সাথে যোগ করতে চেয়ে তোমার প্রতি অবিচার করেছে। আর শরীকদের অনেকেই একে অপরের প্রতি জুলুম করে থাকে, তবে তারা ব্যতীত যারা আল্লাহতে ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম সম্পাদন করে; অবশ্য এমন লোকের সংখ্যা অল্প।” আর (তখনই) দাউদের খেয়াল হল যে, আমি তাকে পরীক্ষা করছি। তাই সে (দাউদ) তার রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল, সেজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করল।” (সূরা ছোয়াদ, ৩৮:২৩-২৪)

আসলে ঐ দুই ভাই আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো ফেরেশতা ছিলেন। দাউদ (আ.)-কে বিচারকার্য শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে আল্লাহপাক তাদেরকে মানুষরূপে পাঠিয়েছিলেন। লক্ষ করুন, দাউদ (আ.) কিন্তু বিচার করে দণ্ড দেননি, তিনি কেবল মন্তব্য করেছিলেন। অথচ দুই পক্ষের কথা শোনার আগে এমনকি মন্তব্যও করা ঠিক না। এটাই আল্লাহর আইন। কিন্তু আফসোস! আমাদের সমাজে একপক্ষের কথা শুনে কত বাড়াবাড়িই না করা হয়ে থাকে!

সত্য গোপন করা যাবে না

وَلا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ (٤٢)

“তোমরা জেনেশুনে সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং সত্যকে গোপন কোরো না।” (সূরা বাকারা, ২:৪২)

পাঠক! আপনারা জানেন যে, মিথ্যা বলার সর্বোত্তম কৌশল হলো তার সাথে একটু সত্য মিশিয়ে বলা। তখন মিথ্যা ঘটনার গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয় ঐ সত্যটুকুর সূত্র ধরে। যেমন, কেউ হয়ত সিগারেট খায়, কিন্তু এরচেয়ে বেশি কিছু না। আপনি যদি মানুষজনের কাছে গিয়ে তার সম্পর্কে বলেন, “ওমুক গাঁজাখোর”, তাহলে সবাই আপনাকে মিথ্যাবাদী বলবে। আপনার কথা বিশ্বাস করতে চাইবে না। কিন্তু যদি এভাবে বলেন: “ওমুক ছেলেটা এমনিতে ভালো, তবে ঐ একটু সিগারেটের অভ্যাস আছে। বন্ধুদের সাথে বসে স্মোক করে। এসব ছেলেপেলে অনেকে আবার গাঁজাও খায়…।”

এখন আপনাকে আর কিছু করতে হবে না। বাকীটা ঐ শ্রোতাই কল্পনা করে তৈরী করে নেবে: “বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এভাবেইতো ছেলেরা নেশার জগতে ঢোকে… ছেলেটার চেহারা দেখেছ? চোখের দৃষ্টিই তো কেমন…” ইত্যাদি। অথচ হয়ত সে বেচারার রাতজাগার অভ্যাস বিধায় কম ঘুমের কারণে দিনেরবেলা চোখ লাল হয়ে থাকে।

এধরণের জঘন্য কাজ থেকে বিরত থাকার সুস্পষ্ট আদেশ এসেছে কুরআনে উক্ত আয়াতের মাধ্যমে: সত্য-মিথ্যা মিশানো যাবে না, আর যেখানে একটা সত্য জানানো উচিত, সেখানে সেটা গোপনও করা যাবে না।

নিজের বিরুদ্ধে হলেও সত্য সাক্ষ্য দিতে হবে


يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا


“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোনো লোকদের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সুবিচার না করার জন্য প্ররোচিত না করে।”(সূরা মায়েদা, ৫:৮)


يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالأقْرَبِينَ .... فَلا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُوا وَإِنْ تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا (١٣٥)


“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য সাক্ষী হিসেবে ন্যায়ের উপর অটল থাকো; এমনকি তা যদি তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্নীয়-স্বজনের বিরুদ্ধেও হয়। .… তোমরা সুবিচার করতে গিয়ে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর তোমরা যদি ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তাহলে (জেনে রেখো,) অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজকর্ম সম্পর্কেই অবগত।” (সূরা নিসা, ৪:১৩৫)

প্রিয় পাঠক!

হায়, যদি মুসলমানেরা কুরআনের দর্শন তাদের ব্যক্তিজীবনে ধারণ করত! তাহলে এমনকি অমুসলমিরাও তাদের বিচারের জন্য মুসলমানদের কাছে আসত। বলত: “যা-ই বলো ভাই, বিচারের বেলায় মুসলমানদের তুলনা নাই। ন্যায়বিচারের স্বার্থে ওরা প্রয়োজনে নিজের বিরুদ্ধে কথা বলে, নিজের সমাজ ও পরিবারের বিরুদ্ধে যায়, তবুও ন্যায়বিচার করতে ছাড়ে না। ওরা দুইপক্ষের কথা শুনেই বিচার করে। ওরা মুসলমান।”

আফসোস! ক’টা মুসলিম কিংবা অমুসলিম কুরআনের এই দর্শনকে জীবনে ধারণ করে? অথচ আস্তিক-নাস্তিক রেসলিং খেলায় হারজিতের উদ্দেশ্যে কম মানুষতো আর কুরআন পড়ে না! এছাড়াও আরো কতভাবেই তো কুরআনের চর্চা হয়। কিন্তু প্রয়োগ কোথায়?

অন্য ধর্মাবলম্বীদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা যাবে না


وَلا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ

“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ডাকে (উপসনাকরে), তোমরা তাদেরকে গালি দিয়ো না।” (সূরা আন’আম, ৬:১০৮)


لا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ

“দ্বীনে (ধর্মে) কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা বাকারা, ২:২৫৬)

কুরআনের দর্শন মানুষকে একদিকে যেমন সত্য ও ন্যায়ের ক্ষেত্রে আপোষহীন হতে বলেছে, অপরদিকে তেমনি সকল মানুষের প্রতি নম্র ভদ্র আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। জোর করে কাউকে ধর্ম পালন করানো ইসলামের নীতিবিরুদ্ধ। আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে সবারই মর্যাদার অধিকার রয়েছে। প্রতিটা মানুষের মর্যাদাই রক্ষা করতে হবে। অন্য ধর্মের উপাস্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যাবে না। তবে তার মানে এই নয় যে অযৌক্তিক উপাস্যের ধারণাকে মেনে নিতে হবে, কিংবা মেনে নিতে হবে যুক্তিহীন নাস্তিক্যবাদকে। বরং তাদের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা-বিতর্কের মাধ্যমে এক আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছে দিতে হবে। আর সেই বিতর্ক করার পদ্ধতিটা কী? দেখুন কুরআন কী বলছে।

বিতর্ক করতে হবে উত্তম পন্থায়


ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

“(হে রাসুল!) আপনার রবের দিকে আহবান করুন অকাট্য জ্ঞান ও উত্তম উপদেশ সহকারে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন (যা তাদের কথার চেয়ে) অধিকতর উত্তম (তা) সহকারে।” (সূরা নাহল, ১৬:১২৫)

আর সেই উত্তম পন্থাটা কেমন? সেটা জানতে হলেও কুরআনের কাছেই যেতে হবে। আসুন দেখি, কুরআন কিভাবে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করে? জোর জবরদস্তির মাধ্যমে, নাকি যুক্তি দিয়ে? এই নিয়ে আমাদের পরের পর্ব - কুরআন কি যুক্তিবাদী?

_______________________________

“অপরের বক্তব্য শোনো, তন্মধ্যে সর্বোত্তমটা গ্রহণ করো।”

“নিজের বিরুদ্ধে গেলেও সত্য স্বীকার করো।”

- কুরআনের দর্শন

আমাদের ব্যক্তিজীবনে এই দর্শনের প্রতিফলন কতটুকু? লেখক-পাঠক আলোচনায় অংশ নিন


মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

খোদার ন্যায়বিচার | অনন্তের পথে

আগের পর্ব: আল্লাহ কেন পথভ্রষ্ট করেন? | সূচীপত্র দেখুন
প্রশ্ন: এমনও অনেকে আছে, যারা ইসলামের নামও শোনেনি, যাদের কাছে কুরআন পৌঁছায় নাই, তাদের কী হবে? তারা কেন জাহান্নামে যাবে? তাদের কী দোষ? কোথায় খোদার ন্যায়বিচার?

নাস্তিকদের একটা কমন প্রশ্ন এটা। এবং প্রশ্নটা অবশ্যই অত্যন্ত যৌক্তিক। কিন্তু আফসোস! অধিকাংশ মুসলমানই ইসলামকে যৌক্তিক ও দার্শনিক মানদণ্ডে যাচাই করে তারপর সত্য হিসেবে গ্রহণ করে মানে না, বরং তারা মানে বাপ-দাদার ধর্ম হিসেবে, (অন্ধ)বিশ্বাসের বস্তু হিসেবে। আর তাই এসকল প্রশ্নের যৌক্তিক সত্য জবাবও তারা দিতে পারেন না। দেবেনই বা কিভাবে, নিজেই তো জানেন না! উপরন্তু নিজের (অন্ধ)বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার জন্য গোঁজামিলে পরিপূর্ণ ভুলভাল ব্যাখ্যা হাজির করেন। তাই তারা বলেন, “মুসলমান না হলে জান্নাতে যেতে পারবে না। অমুসলিম মাত্রেই জাহান্নামী”, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ একটা পতিতালয়ে যে মেয়েটির জন্ম হয়, সে মেয়েটি কী দোষ করেছিল তাহলে? ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে এমন সব প্রশ্নকে দূরে ঠেলে “মুসলিম না হলে জান্নাতে যেতে পারবে না ব্যস” বলে বসেন। অথচ জন্ম ও বেড়ে ওঠার উপর কারো হাত নেই। দুনিয়ার প্রতিটা মানুষই ভিন্ন ভিন্ন প…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…