সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

একাধিক স্রষ্টা | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: ভুল প্রশ্ন | সূচীপত্র দেখুন

পরম স্রষ্টা কি এক, নাকি একাধিক?
মানুষের স্রষ্টা, তার স্রষ্টা, তার স্রষ্টা… এভাবে একদম শুরুতে “মানুষের পরম স্রষ্টা”।
বিড়ালের স্রষ্টা, তার স্রষ্টা, তার স্রষ্টা… একইভাবে একদম শুরুতে “বিড়ালের পরম স্রষ্টা”।
এভাবে করে যদি চিন্তা করি, তাহলে দেখা যাবে যে, উপরে যত স্রষ্টার কথা বলা হয়েছে, তারা মোট দুই ক্যাটেগরিতে বিভক্ত:
১. পরম স্রষ্টা
২. দ্বিতীয় স্তরের স্রষ্টা (যাদের স্রষ্টা আছে)।
উপরের উদাহরণে পরম স্রষ্টা পেলাম দুইজন: মানুষের পরম স্রষ্টা ও বিড়ালের পরম স্রষ্টা।
কিন্তু দ্বিতীয় স্তরের স্রষ্টা? অনে...ক! মানুষ + মানুষের স্রষ্টা, তার স্রষ্টা, তার স্রষ্টা… (ধরি, ১০০ জন) + বিড়াল + বিড়ালের স্রষ্টা, তার স্রষ্টা, তার স্রষ্টা… (ধরি, ১০০ জন) = ২০২ জন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, দ্বিতীয় স্তরের স্রষ্টার সংখ্যা অনেক। এতে কোনো সন্দেহ নাই। অন্ততঃপক্ষে মানুষ, বিড়াল, বাবুই পাখি, পিঁপড়া, মৌমাছিসহ পৃথিবীর প্রায় সব জীবই কিছু না কিছু সৃষ্টি করে, সেই অর্থে তারা স্রষ্টা। কিন্তু তারা দ্বিতীয় স্তরের স্রষ্টা। কেননা, তাদেরও স্রষ্টা ছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের পরম স্রষ্টা কি একজনই? নাকি প্রত্যেকের আলাদা আলাদা?
পাঠক, আসুন এটা নিয়ে একটু চিন্তা করে দেখি। আবারও আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, এই দার্শনিক চিন্তাপ্রক্রিয়ায় আপনার মনকে নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত রাখার চেষ্টা করুন। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। কোনো আস্তিক কিংবা নাস্তিকের যুক্তি যেন আপনার চিন্তাপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে। কোনো বিশেষ ধর্ম যেন আপনাকে প্রভাবিত না করে। তারপর আসুন, আলোচনা করি।
আমাদের মূল প্রশ্ন: পরম স্রষ্টা কি একাধিক হতে পারে? অর্থাৎ, পরম স্রষ্টার সংখ্যা কত?
তাহলে আসুন চিন্তা করে দেখি, সংখ্যা কী জিনিস?
পাঠক, আসলে সৃষ্টির সাথেই সংখ্যার সম্পর্ক। যখনই কোনো একটা জিনিস সৃষ্টি করা হয়, তখন সে হয় ‘প্রথম’। আপনার হাতের স্মার্টফোনটার কথাই ধরুন। পৃথিবীতে যখন প্রথম স্মার্টফোন তৈরী করা হলো, তখন সেটা কী ছিল? “১ম স্মার্টফোন।” আর পৃথিবীতে স্মার্টফোনের “সংখ্যা” ছিল কত? উত্তর: ১ (এক)।
এবার যখন কারখানা থেকে আরেকটি স্মার্টফোন বের হলো, তখন সেটা কী? “২য় স্মার্টফোন।” আর পৃথিবীতে স্মার্টফোনের মোট সংখ্যা কত হল? উত্তর: ২ (দুই)। এভাবে করে যত স্মার্টফোন সৃষ্টি হতে থাকবে, ততই তার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

একাধিক স্রষ্টা | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা




আসলে সংখ্যা জিনিসটাই সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একই ক্যাটেগরির নতুন একটা জিনিস সৃষ্টি করা হলে তার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। যেমন, আপনি এই বাক্যটি পড়ার মুহুর্তেই পৃথিবীতে কমপক্ষে চারজন মানুষ জন্মগ্রহণ করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, বর্তমান পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে গড়ে চারজন মানুষের জন্ম হয়। আর মানুষও তো একপ্রকার স্রষ্টা, তবে দ্বিতীয় স্তরের স্রষ্টা। তাহলে, পৃথিবীতে প্রতি ঘন্টায় “দ্বিতীয় স্তরের স্রষ্টা” কমপক্ষে ১৫,০০০ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কারণ, এসব স্রষ্টার “সৃষ্টি” হচ্ছে।

কিন্তু পরম স্রষ্টা? সংজ্ঞানুসারে তাঁর তো সৃষ্টি হয় না! কিন্তু তিনি আছেন, তিনি অস্তিত্বমান। আপনিতো আর একটা “পরম স্রষ্টা” তৈরী করে দিয়ে বলতে পারবেন না যে, এই নিন ভাই, এখন পরম স্রষ্টা দুইজন হয়ে গেলো!

আপনি একটা মানুষকে সামনে এনে বলতে পারেন: “১টা (দ্বিতীয় স্তরের) স্রষ্টা।” তারপর আরেকটা মানুষ নিয়ে আসুন। কী হলো? ২টা (দ্বিতীয় স্তরের) স্রষ্টা। তাহলে, দ্বিতীয় স্তরের স্রষ্টার সংখ্যাবৃদ্ধি হয়। আবার, একজনকে সরিয়ে নিয়ে গেলে সংখ্যা কমে গেল। তারপর, একটা মানুষকে কেটে অর্ধেক করে ফেললে? “অর্ধেক স্রষ্টা!” অর্থাৎ, দ্বিতীয় স্তরের স্রষ্টা বিভাজ্য। গণনাযোগ্য। একাধিক।

কিন্তু পরম স্রষ্টা অবিভাজ্য, গণনার ঊর্ধ্বে। তিনি একক।

অতএব, একাধিক পরম স্রষ্টা সম্ভব নয়। পরম স্রষ্টা একজনই। তিনি একক, অবিভাজ্য।

অতএব, মহাবিশ্বে যাকিছুর সৃষ্টি হয়েছে, যাকিছুর শুরু আছে, তারই পরম স্রষ্টা তিনি। এবং তিনি সংখ্যার ঊর্ধ্বে (beyond the limitations of number)।

তাহলে আসুন একটা তালিকা করে ফেলি। পরম স্রষ্টার কয়টি বৈশিষ্ট্য জানলাম?
১. তিনি অসৃষ্ট। অতএব, তিনি জন্মগ্রহণ করেননি।

২. তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে। ইনফিনিটিতে তাঁর বাস। তিনিই ইনফিনিটি।

৩. তাঁর সৃষ্টিক্ষমতা আছে। তিনি শূন্য থেকে সৃষ্টি করতে পারেন।

৪. তিনিই মহাবিশ্বের পরম স্রষ্টা: তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।

৫. তিনি সংখ্যার ঊর্ধ্বে। তিনি একক, অবিভাজ্য।

_______________________________

“সংখ্যা বিষয়টিই সৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত।

পরম স্রষ্টার ক্ষেত্রে সংখ্যা প্রযোজ্য না। একাধিক পরম স্রষ্টা হতে পারে না।”

লেখক-পাঠক নিরপেক্ষ আলোচনায় অংশগ্রহণ করুন


মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

খোদার ন্যায়বিচার | অনন্তের পথে

আগের পর্ব: আল্লাহ কেন পথভ্রষ্ট করেন? | সূচীপত্র দেখুন
প্রশ্ন: এমনও অনেকে আছে, যারা ইসলামের নামও শোনেনি, যাদের কাছে কুরআন পৌঁছায় নাই, তাদের কী হবে? তারা কেন জাহান্নামে যাবে? তাদের কী দোষ? কোথায় খোদার ন্যায়বিচার?

নাস্তিকদের একটা কমন প্রশ্ন এটা। এবং প্রশ্নটা অবশ্যই অত্যন্ত যৌক্তিক। কিন্তু আফসোস! অধিকাংশ মুসলমানই ইসলামকে যৌক্তিক ও দার্শনিক মানদণ্ডে যাচাই করে তারপর সত্য হিসেবে গ্রহণ করে মানে না, বরং তারা মানে বাপ-দাদার ধর্ম হিসেবে, (অন্ধ)বিশ্বাসের বস্তু হিসেবে। আর তাই এসকল প্রশ্নের যৌক্তিক সত্য জবাবও তারা দিতে পারেন না। দেবেনই বা কিভাবে, নিজেই তো জানেন না! উপরন্তু নিজের (অন্ধ)বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার জন্য গোঁজামিলে পরিপূর্ণ ভুলভাল ব্যাখ্যা হাজির করেন। তাই তারা বলেন, “মুসলমান না হলে জান্নাতে যেতে পারবে না। অমুসলিম মাত্রেই জাহান্নামী”, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ একটা পতিতালয়ে যে মেয়েটির জন্ম হয়, সে মেয়েটি কী দোষ করেছিল তাহলে? ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে এমন সব প্রশ্নকে দূরে ঠেলে “মুসলিম না হলে জান্নাতে যেতে পারবে না ব্যস” বলে বসেন। অথচ জন্ম ও বেড়ে ওঠার উপর কারো হাত নেই। দুনিয়ার প্রতিটা মানুষই ভিন্ন ভিন্ন প…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…