সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

শত ব্যক্তি যখন এক হয়ে যায়… | অনন্তের পথে


পাঠকের প্রতি অনুরোধ

প্রিয় পাঠক!

যুক্তি ও দর্শন – এগুলো সবই ব্রেইনের কাজ: বুদ্ধিবৃত্তিক কর্ম (intellecual activity)। বইয়ের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আমার প্রতিটা দাবীকে আমি ইন্টেলেকচুয়ালি প্রতিষ্ঠা করেছি যুক্তি ও দর্শন ব্যবহার করে। কিন্তু এখন যখন এমন এক বিষয় আপনার সামনে তুলে ধরতে চাইছি, যা যুক্তি ও দর্শনের ঊর্ধ্বে – তখন আমার সীমাবদ্ধতাকে ক্ষমা করবেন। বইয়ের এই শেষ ভাগে আমি যে বিষয়গুলো পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করছি, সেগুলি যুক্তিতর্কের বিষয় নয়। তবে পাঠককে আশ্বস্ত করতে চাই যে, এই ভাগে আমি যেসব বিষয়ে কথা বলব তা একেবারে অবাস্তব গালগল্পও নয়। বরং যুক্তি ও দর্শনের সাহায্যে প্রমাণিত অকাট্য গ্রন্থ আল কুরআনই আমার সামনে সেই দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে। আশা করি নিছক বিতার্কিকের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে হৃদয় দিয়ে বোঝার চেষ্টা করবেন কথাগুলিকে। খোদামুখী যাত্রায় সঙ্গী হবার জন্য আপনাকে আবারো ধন্যবাদ, প্রিয় পাঠক!

এখন পাঠক, আপনার কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগান। থার্ড অবজার্ভার প্রবলেমের আলোচনায় যে ঝগড়ার উদাহরণ টেনেছিলাম, সেটা মনে আছে? সেই ঝগড়ার ঘটনায় ফিরে যান। আর মনে করেন, কোনো এক বিশেষ জাদুর মাধ্যমে আপনি আর ব্যক্তি-২ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছেন। আপনিই সে, সে-ই আপনি। আপনি একদিকে ব্যক্তি-২ হয়ে ঝগড়া করছেন, অপরদিকে থার্ড অবজার্ভার হিসেবে নিজেই নিজেকে নিরপেক্ষভাবে অবজার্ভ করছেন: “আমি কি চোখ গরম করে তেড়ে যাচ্ছি?” শুধু তা-ই না, আপনি এত বেশি পাওয়ারফুল যে, ব্যক্তি-১ এর মনের ভিতরে ঢুকে দেখে আসছেন যে, সে কি মিথ্যা অভিযোগ করছে, নাকি আসলেই ভয় পেয়ে মনে করেছে যে আপনি তাকে তেড়ে মারতে গিয়েছেন?

মোট কথা, এই ঝগড়ার ঘটনায় এখন শুধুমাত্র দুটি পক্ষ: ব্যক্তি-১ ও ব্যক্তি-২, কিন্তু থার্ড অবজার্ভার হিসেবে তৃতীয় ব্যক্তির আর প্রয়োজন নেই। কারণ ব্যক্তি-২-ই থার্ড অবজার্ভার। সে-ই ব্যক্তি-২, আবার সে-ই থার্ড অবজার্ভার! আপনি যদি থার্ড অবজার্ভারের পয়েন্ট অব ভিউ জানতে চান, তাহলে আপনাকে ঐ ব্যক্তি-২ এর কাছেই যেতে হবে!

এখন পাঠক আপনার কল্পনাশক্তিকে আরো একটু কাজে লাগান। মনে করেন, পৃথিবীর আর সব মানুষ হলো সাধারণ মানুষ, কিন্তু ব্যতিক্রম হলো ঐ ব্যক্তি-২। সে নিজেই নিজেকে দেখতে পায়, এমনকি অন্যের মনের কথা পর্যন্ত পড়ে আসতে পারে: অর্থাৎ সর্বদ্রষ্টা (third person omniscient) পয়েন্ট অব ভিউ এর অধিকারী। সেইসাথে পৃথিবীতে আরো একজন মানুষ এধরণের সুপারন্যাচারাল পাওয়ারের অধিকারী, আর সেটা হলেন আপনি। এমতাবস্থায় ঐ ঝগড়ার স্থলে আপনি গিয়ে উপস্থিত হলেন থার্ড অবজার্ভার হিসেবে। তখন ব্যাপারটা কেমন হবে?

থার্ড অবজার্ভার হিসেবে আপনি যা দেখবেন, ব্যক্তি-২-ও তা-ই দেখবে, আপনি যা সিদ্ধান্ত দেবেন, সে-ও তা-ই সিদ্ধান্ত দেবে। অর্থাৎ, ব্যক্তি-২ যখন ঝগড়া করে, তখন সে নিজের মত করে চিন্তা ও কর্ম করে; কিন্তু যখন সে থার্ড অবজার্ভার হিসেবে দেখে, তখন আপনার আর তার মাঝে কোনো পার্থক্য থাকে না। আপনি যেন তার মাঝে বিলীন (ফানা) হয়ে যান। আপনার চোখ হয়ে যায় তার চোখ, আপনার হাত হয়ে যায় তার হাত, আপনার মুখ হয়ে যায় তার মুখ। অর্থাৎ, এরকম শত শত “ব্যক্তি থার্ড অবজার্ভার” থাকুক না কেন, সেটাকে আমরা দেখব একজন হিসেবে: শুধু “থার্ড অবজার্ভার”। কারণ তারা শত জনে বিলীন হয়েছে একের মাঝে।

কিন্তু একইভাবে কি আল্লাহতে বিলীন (ফানাফিল্লাহ) হওয়া সম্ভব?

যদি পাঠকের উৎসুক মনে এই প্রশ্ন জেগে থাকে, তবে স্বাগতম! কিন্তু যদি মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয় যে, “লেখকের উদ্দেশ্যে কী, সে কোন তরিকার মানুষ, কোন পন্থী” ইত্যাদি – তাহলে অনুরোধ করব, প্রিয় পাঠক! লাগামহীন ঐ ব্রেইনের লাগাম টেনে ধরুন। সে যেন আপনার ঘাড়ে চেপে না বসে। বরং আপনার ব্রেইনকে পরিচালিত করুন আপনার প্রয়োজনমত। খোদামুখী এই মহান যাত্রাতো একান্তই আপনার। আশা করি সেই কথাটি ভুলে যাননি, যা বইয়ের শুরু থেকে বারবার বলে আসছি: পৃথিবীতে তর্ক বিতর্ক করার আর একটি মানুষও যদি না থাকত, তবু তো আপনি স্রষ্টাভাবনা করতেন! করতেন একাকী খোদামুখী যাত্রা! আর সেই যাত্রাপথে যদি এই লেখকের দুটো কথা বিন্দুমাত্র হলেও উপকারে আসে, তবে সেটুকু গ্রহণ করুন। তা না হলে ছুঁড়ে ফেলে দিন, তবু আপনি এগিয়ে যান!

পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক বলেন:

وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى

“আর (হে রাসূল!) আপনি যখন (মাটির মুষ্ঠি) নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন তা আপনি নিক্ষেপ করেন নি, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন স্বয়ং আল্লাহ।…” (সূরা আনফাল, ৮:১৭)

রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, “তোমরা মুমিনের দূরদৃষ্টিকে ভয় কর, কেননা সে আল্লাহ তায়ালার নূরের মাধ্যমে দেখে থাকে।” পাঠক! লক্ষ্য করবেন, এখানে ‘মুসলিমের’ দৃষ্টির কথা বলা হয়নি, বরং ‘মুমিনের’ দৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। আর বইয়ের দ্বিতীয় ভাগের “বিশ্বাস, জ্ঞান ও ঈমান” পর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, মুসলিম হলেই মুমিন হওয়া যায় না। মুসলিমের ক্বলবে ঈমান প্রবেশ করলে তখন সে হয় মুমিন। আর সেই মুমিন হবার পদ্ধতিটি কী? দয়াল নবীজি (সা.) তা শিক্ষা দিয়েছেন নিম্নোক্ত হাদীসে কুদসীতে:

"আল্লাহ তায়ালা বলেন- যে ব্যক্তি আমার কোন ওলির সাথে শত্রুতা পোষণ করে আমি তার বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করি। আমার বান্দার প্রতি যা ফরজ করেছি তা দ্বারাই সে আমার অধিক নৈকট্য লাভ করে। আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য হাসিল করতে থাকে। অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার কর্ণ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমি তার চক্ষু হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাই, যে পা দিয়ে সে চলাফেরা করে। সে আমার কাছে যাকিছু প্রার্থনা করে, আমি তাকে তা দেই। সে যদি আমার নিকট আশ্রয় চায়, তাহলে আমি তাকে আশ্রয় দেই।”

হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক!

অবাস্তব থার্ড অবজার্ভারের impossible case তৈরী করে ইন্টেলেকচুয়ালিটির জগতে দিশাহারা ঘুরপাক না খেয়ে আল্লাহর সাথে মিলেমিশে একাকার হবার চেষ্টা করুন। তখন আল্লাহর চোখ দিয়ে দেখে আপনার প্রশ্নের উত্তর আপনি পেয়ে যাবেন: ভবিষ্যত কি পূর্বনির্ধারিত?

_______________________________

ফানাফিল্লাহ কনসেপ্ট প্রচলিত যুক্তি ও দর্শনের ঊর্ধ্বের বিষয়।

কিন্তু এর মাঝেই ভাগ্যপ্রশ্নের প্রকৃত উত্তর পাওয়া সম্ভব।

বুদ্ধিবৃত্তির ঊর্ধ্বের জগতকে আপনি স্বীকার করেন কি? ফেইসবুকে আলোচনা করুন

মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…