সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সূরা ইখলাস ও অনন্তের পথে যাত্রা | অনন্তের পথে


পরম স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার সম্পর্কে মানুষের প্রশ্নের শেষ নেই। আর বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উত্তর দেবার প্রচেষ্টাও তো কম হয়নি। তিনি কি “ক্লাস টিচারের মত” করে মানুষের ভবিষ্যত কর্ম প্রেডিক্ট করেন? নাকি তিনি “টাইম ট্র্যাভেলারের মত” ভবিষ্যত দেখে আসেন? অর্থাৎ, আমাদের মস্তিষ্ক বিভিন্ন পরিচিত উদাহরণের সাথে “তুলনা” করে পরম স্রষ্টাকে ব্যাখ্যা করতে চায়। এভাবে যখন নানান কিছুর সাথে আমরা স্রষ্টাকে তুলনা করে বলি যে, তিনি ওমুকের “মত” কিংবা “তিনি এমন”, “তিনি অমন” – তখন আল্লাহ তায়ালা সূরা ইখলাসের শেষ বাক্যে বলে দিচ্ছেন যে, কোনোকিছুই তাঁর সাথে তুলনীয় নয়: “ওয়ালাম ইয়া কুল্লাহু কুফুয়ান আহাদ।”

হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক!

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সাথে কোনোকিছুর তুলনা করে আমরা তাঁকে বুঝতে পারবো না। কেননা, “তাঁর মত” তো আর কোনোকিছুই নেই, কিভাবে তুলনার মাধ্যমে বুঝব? তাই যখনই বিভিন্ন তুলনামূলক উদাহরণের সাহায্যে স্রষ্টা সংক্রান্ত বিষয়কে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়, তখন সেটা হয় অসম্পূর্ণ, কিংবা ভুল। তেমনই দুটি ভুল হলো মানুষের ভাগ্যপ্রশ্নের উত্তরে ক্লাসটিচারের উদাহরণ দেয়া, কিংবা তাঁকে (নাউযুবিল্লাহ) টাইম ট্র্যাভেলার বানিয়ে ফেলা!

পাঠক, তুলনা করা মস্তিষ্কের কাজ। আমাদের মস্তিষ্ক সময়ের সাপেক্ষে স্রষ্টাকে চিন্তা করতে চায়, মাত্রার সাপেক্ষে স্রষ্টাভাবনা করতে চায়। কারণ জন্মের পর থেকে সারা দুনিয়াকে সে নিজের চোখ দিয়ে দেখে এসেছে, নিজের বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে এসেছে। সবকিছুকে সে পরিমাপ করেছে সময়ের তুলনায়, দেখেছে ত্রিমাত্রিক (three dimensional) হিসেবে। এইভাবে চলতে চলতে সে যেন বন্দী হয়ে গিয়েছে নিজের পারস্পেক্টিভের কাছেই। এমতাবস্থায় যখন সে পরিচিত হলো এমন সত্ত্বার সাথে, যিনি সকল মাত্রার ঊর্ধ্বে, যিনি প্রকৃত অসীম, ট্রু ইনফিনিটি – তখন সে স্তম্ভিত হয়ে গেল।

হ্যাঁ, আমাদের মানব মস্তিষ্কের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছি আমরা। মানব মস্তিষ্কের ক্ষমতা নেই যে, সে সীমার ঊর্ধ্বে উঠবে। আমাদের এই গোটা দার্শনিক স্রষ্টাভাবনা তো সূরা ইখলাসের প্রথম তিন আয়াতেই বলা হয়ে যাচ্ছে। তারপর শেষ আয়াতে যেন বলা হচ্ছে যে, “থামো! তোমার ব্রেইন দিয়ে আর চিন্তা কোরো না। কোনো কূলকিনারা পাবে না। বিভিন্ন উদাহরণের সাথে স্রষ্টার তুলনা করবে? তোমার প্রভু তো তুলনার ঊর্ধ্বে! তাঁকে তোমার নিজের চোখ দিয়ে দেখবে? তোমার ঐ চোখ তো সীমিত। তোমার ব্রেইন দিয়ে বুঝবে? তোমার ব্রেইন তো মাত্রার ভিতরে চিন্তা করে, সেতো সীমার ঊর্ধ্বে উঠতে জানে না। তোমার স্রষ্টাকে আরো গভীরভাবে জানতে চাইলে এসো, তোমার মস্তিষ্ককে ত্যাগ করো। সীমার ঊর্ধ্বে ওঠো, স্রষ্টার চোখ দিয়ে দেখো!”

এ যেন মানব মস্তিষ্কে সরাসরি আঘাত! যেন ডিমের খোলস ভেঙে বের করে আনার প্রচেষ্টা। একটা পাখি যখন ডিমের ভিতরে থাকে, তখন সে ওটুকুকেই সমগ্র জগত মনে করে। কিন্তু যখন ডিমে তা দেয়া হয়, সেই উত্তাপই তাকে একটু একটু করে আঘাত করে যেন। তারপর একসময় ডিমের খোলসটা ভেঙে যায়। ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে বিশাল দুনিয়ায় প্রবেশ করে সে। একইভাবে আমরা বুদ্ধিবৃত্তির (intellect) জগতে বন্দী। জগতের সকলকিছুকে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে (intellectually) বুঝতে চেষ্টা করি। স্রষ্টাসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব (intellectual answer) দিয়ে আত্মতৃপ্তি অনুভব করি। কিন্তু সূরা ইখলাসের শেষ আয়াত আমাদের সেই খোলসে আঘাত করছে। আমাদেরকে বের করে আনতে চাইছে ক্ষুদ্র বুদ্ধিবৃত্তিক জগত থেকে। নিয়ে যেতে চাইছে সীমার ঊর্ধ্বে। এমন এক জগতে, যেখানে আমরা সরাসরি অনুধাবন করতে পারব: পরম স্রষ্টার দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের ভবিষত কীরকম? [QR সুবহানাল্লাহ যিকরের তাৎপর্য]


কিন্তু পরম স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ কি অর্জন করা সম্ভব?

প্রিয় পাঠক!

এখনই হয়ত আপনি একগাদা ইন্টেলেকচুয়াল প্রশ্নের শিকলে নিজেকে বন্দী করে ফেলছেন! ভাবছেন, সসীম সত্তা কিভাবে অসীম সত্তার পারস্পেক্টিভ থেকে দেখবে? মাত্রার ঊর্ধ্বে ওঠা কি আদৌ সম্ভব? তাহলে তো সসীমের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকে না। ইত্যাদি আরো কত দার্শনিক ভাবনা এসে আঘাত করছে আপনাকে। ধর্মীয় দর্শনের চর্চা থেকে থাকলে এজাতীয় কথা হয়ত আপনার কাছে নতুন নয়। কিন্তু সেসবই মানব মস্তিষ্কের চিন্তা। চলুন আমরা এগিয়ে যাই, দেখি বুদ্ধিবৃত্তির খোলস ভেঙে বের হতে পারি কিনা। সূরা ইখলাস যে অনন্তের পথে যাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেই পথ খুঁজে পাই কিনা! হাতটি ধরুন, আসুন, এগিয়ে যাই…

_______________________________

সূরা ইখলাসের শেষ বাক্যই অনন্তের পথে যাত্রা।

“কোনোকিছুই তাঁর (আল্লাহর) সাথে তুলনীয় নয়।”

সসীমের পক্ষে কি সীমার ঊর্ধ্বে ওঠা সম্ভব? অন্য পাঠকেরা কী ভাবছেন?

মন্তব্য

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

খোদার ন্যায়বিচার | অনন্তের পথে

আগের পর্ব: আল্লাহ কেন পথভ্রষ্ট করেন? | সূচীপত্র দেখুন
প্রশ্ন: এমনও অনেকে আছে, যারা ইসলামের নামও শোনেনি, যাদের কাছে কুরআন পৌঁছায় নাই, তাদের কী হবে? তারা কেন জাহান্নামে যাবে? তাদের কী দোষ? কোথায় খোদার ন্যায়বিচার?

নাস্তিকদের একটা কমন প্রশ্ন এটা। এবং প্রশ্নটা অবশ্যই অত্যন্ত যৌক্তিক। কিন্তু আফসোস! অধিকাংশ মুসলমানই ইসলামকে যৌক্তিক ও দার্শনিক মানদণ্ডে যাচাই করে তারপর সত্য হিসেবে গ্রহণ করে মানে না, বরং তারা মানে বাপ-দাদার ধর্ম হিসেবে, (অন্ধ)বিশ্বাসের বস্তু হিসেবে। আর তাই এসকল প্রশ্নের যৌক্তিক সত্য জবাবও তারা দিতে পারেন না। দেবেনই বা কিভাবে, নিজেই তো জানেন না! উপরন্তু নিজের (অন্ধ)বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার জন্য গোঁজামিলে পরিপূর্ণ ভুলভাল ব্যাখ্যা হাজির করেন। তাই তারা বলেন, “মুসলমান না হলে জান্নাতে যেতে পারবে না। অমুসলিম মাত্রেই জাহান্নামী”, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ একটা পতিতালয়ে যে মেয়েটির জন্ম হয়, সে মেয়েটি কী দোষ করেছিল তাহলে? ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে এমন সব প্রশ্নকে দূরে ঠেলে “মুসলিম না হলে জান্নাতে যেতে পারবে না ব্যস” বলে বসেন। অথচ জন্ম ও বেড়ে ওঠার উপর কারো হাত নেই। দুনিয়ার প্রতিটা মানুষই ভিন্ন ভিন্ন প…

আত্মদর্শন | অনন্তের পথে

আগের পর্ব: জ্ঞানের জগত ও হৃদয়ের জগত | সূচীপত্র দেখুন
আমি কে?

“I am not this hair, not this skin

But the soul that lies within.” - Maulana Rumi

আমি কে - এই প্রশ্ন যুগে যুগে দার্শনিকদেরকে চিন্তিত করেছে। অনেকে বলেছে, মানব মস্তিষ্কেই কেবল আমিত্বের অনুভূতি বিদ্যমান। কথা হয়ত সত্য। তবে যেহেতু তারা ক্বলবের জগত সম্পর্কে বেখবর, তাই তারা তাদের সীমিত জ্ঞানবৃত্তের ভিতরেই উত্তর দেবার চেষ্টা করেছে।


মানুষের আত্মা হলো আসল খলিফা



وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَنْ تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ (١٧٢) أَوْ تَقُولُوا إِنَّمَا أَشْرَكَ آبَاؤُنَا مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا ذُرِّيَّةً مِنْ بَعْدِهِمْ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ (١٧٣)



“আর (হে রাসূল!) যখন আপনার রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে বহির্গত করলেন তাদের সন্তানদেরকে এবং তাদের নিজের ওপর তাদেরকে সাক্ষ্য করলেন; (তাদেরকে প্রশ্ন করলেন,) আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। (…