সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কের সঠিক পদ্ধতি | যুক্তির কাঠগড়ায় ইসলাম


প্রিয় পাঠক!

গল্পে গল্পে অনেকদূরই এলাম। সেইযে উৎসের সন্ধানে যাত্রা শুরু করেছিলাম, সেই যাত্রা থেকেই পরম স্রষ্টাকে প্রকৃত ইনফিনিটি হিসেবে জানলাম, পেলাম মহাগ্রন্থ আল কুরআন, এবং দর্শন ও যুক্তিশাস্ত্রের নানান বিষয় চর্চা করে মাথা গরম করে ফেললাম! এখন সময় হয়েছে এর সবকিছুকে গুছিয়ে নেয়ার। পাঠক, যদি রসকসহীন যুক্তিবিদ্যার ক্লান্তিকর চর্চায় উদ্যম হারিয়ে ফেলেন, তবে আপনাকে উৎসাহিত করার জন্য একটি কথা বলতে চাই। আর তা হলো, এই বইয়ে আপনি গল্পে গল্পে দর্শন ও যুক্তিশাস্ত্রের যেসব বিষয় শিখে ফেলেছেন, তা দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষই জানে না। দুনিয়ার বেশিরভাগ ধার্মিক, কিংবা নাস্তিক – তারা জানে না প্রকৃত ইনফিনিটির দর্শন। তারা জানে না যে, পরম স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালাই হলেন প্রকৃত ইনফিনিটি, প্রকৃত অসীম। তারা হয়ত যুক্তিবিদ্যার দুই চারটি নিয়ম জানতে পারে, কিন্তু ধর্মজগতে সেইসব নিয়মকে নিয়ে এসে দর্শনের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে সূরা ইখলাসকে ছুঁতে পারে না। আপনি তা পেরেছেন, প্রিয় পাঠক! দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ ধর্মকে (অন্ধ)বিশ্বাসের বিষয় মনে করে, ঈমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস মনে করে, কিন্তু আপনি জানেন ঈমান শব্দের প্রকৃত অর্থ কী। আপনি আরো অনেক কিছুই জেনেছেন, যার গুরুত্ব কেবল তখনই বুঝবেন, যখন এইসব যুক্তি ও দর্শনকে নিজ জীবনে ধারণ করে মানুষের মাঝে পথ চলবেন। অতএব, আমাদের স্রষ্টাভাবনায় সহযাত্রী হবার জন্য আপনাকে আবারো স্বাগতম। আসুন, আরেকটু ধৈর্য্য ধারণ করে আমাদের যুক্তি ও দর্শনের জ্ঞানগুলোকে গুছিয়ে আনি, এবং আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কের সঠিক পদ্ধতি নির্ণয় করি।

এ পর্যন্ত দর্শনের যেসব প্রাসঙ্গিক ধারণা আমরা আলোচনা করেছি, তা হলো–

১. ব্যাকট্র্যাকিং

২. আদি কারণ - First Cause

৩. ইনফিনিটি

৪. গণিতের ইনফিনিটি বনাম দর্শনের ইনফিনিটি

৫. দার্শনিক স্রষ্টাভাবনার আটটি প্রস্তাব

যুক্তিবিদ্যার যেসব প্রাসঙ্গিক বিষয় আমরা শিখেছি:

১. সংজ্ঞায়ন

২. বার্ডেন অব প্রুফ (প্রমাণের দায়ভার)

৩. প্রমাণের অভাব

৪. ধাপে ধাপে যুক্তির গড়ে তোলার পদ্ধতি

৫. যুক্তির ভিত্তি অনুসন্ধান ও তাতে আঘাত করা

৬. বিভিন্ন প্রকার ফ্যালাসি (অ্যাজাম্পশান, কোট মাইনিং, স্ট্রম্যান, স্টেরিওটাইপিং, আপিল টু অথরিটি, অ্যাড হোমিনেম, মুভিং দ্য গোলপোস্ট, একুইভোকেশান)

আশা করি এই মুহুর্তে উপরের টপিকগুলো সবই আপনার মাথায় আছে। এবার বিতর্কের পদ্ধতি আলোচনা করব।

এই বিতর্কে দুটি পক্ষ: আস্তিক ও নাস্তিক। নাস্তিকের পক্ষটি দুর্বল। সে ততক্ষণ টিকে থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আস্তিকের দিক থেকে পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণের অভাব থাকবে। আস্তিক যখনই উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ হাজির করে ফেলবে, সাথে সাথে নাস্তিকের পক্ষটি অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। অপরদিকে আস্তিকের উপর গুরুদায়িত্ব। সঠিকভাবে যুক্তি ও দর্শন ব্যবহার করতে না পারলে তার “প্রমাণের অভাবের” লাভটা নাস্তিক ঘরে তুলবে এবং বলে বেড়াবে: ধার্মিকেরা স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারেনি।

নাস্তিকের অবস্থান: নাস্তিককে অবশ্যই তার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। “স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই - God does not exist” – এমন অবস্থান গ্রহণ করা চলবে না। কেননা, God does not exist একটি স্বপরাজিত বাক্য। এই বাক্যটি উচ্চারণ করামাত্রই নাস্তিক হেরে যাবেন, এমনকি বিতর্ক শুরু হবার আগেই। অতএব, নাস্তিক বড়জোর এই অবস্থানটি গ্রহণ করতে পারেন যে: “স্রষ্টার অস্তিত্বের সপক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তিপ্রমাণ নেই।” এরপর তিনি আস্তিককে অনুরোধ জানাবেন স্রষ্টার সপক্ষে উপযুক্ত যুক্তিপ্রমাণ হাজির করার। এরপর আস্তিক ব্যক্তিটি যুক্তিপ্রমাণ উপস্থাপন করতে থাকবে, আর নাস্তিক বিচারকের দৃষ্টিকোণ থেকে তা বিচার করবেন।

বার্ডেন অব প্রুফ: স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণের দায়ভার অবশ্যই আস্তিকের। যেহেতু স্রষ্টার ধারণা সে-ই নিয়ে এসেছে, সেহেতু প্রমাণও তাকেই করতে হবে। নাস্তিকের এখানে কোন কাজ নেই। তার কাজ মূলতঃ আস্তিকের উপস্থাপিত বক্তব্যকে যুক্তি ও দর্শনের মানদণ্ডে বিচার করা।

আস্তিকের অবস্থান: আস্তিকের অবস্থান হলো: “গোটা সৃষ্টিজগতের একজন পরম স্রষ্টা আছেন।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, আস্তিক তার বক্তব্য কিভাবে উপস্থাপন করবেন। একজন আস্তিকের কখনোই উচিত হবে না এজাতীয় অবস্থান গ্রহণ করা: “আমি এখানে যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে সত্য প্রমাণ করতে এসেছি।” বরং আস্তিকের অ্যাপ্রোচ হতে হবে নিরপেক্ষ, উৎসুক মানুষের মত। তার বক্তব্য এভাবে শুরু করতে হবে যে–

১. “উৎসের সন্ধান করা প্রতিটি মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য।”

২. তারপর দেখাতে হবে যে, সেই উৎসের সন্ধান করতে গিয়েই মানুষ একটা সময় আদি পিতা-মাতার সৃষ্টিপ্রক্রিয়া নিয়ে চিন্তা করে। আর সেই চিন্তা থেকেই পরম স্রষ্টার ধারণায় উপনীত হয়। অর্থাৎ, ব্যাকট্র্যাকিং।

৩. তারপর দেখাতে হবে যে, পরম স্রষ্টা হলেন অসৃষ্ট স্রষ্টা।

৪. তারপর ইনফিনিটির ধারণা নিয়ে আসতে হবে, এবং দেখাতে হবে যে, তাঁর ক্ষেত্রে সৃষ্টি ও ধ্বংস প্রযোজ্য নয়, প্রযোজ্য নয় সংখ্যা, কিংবা যেকোনো ধরণের সীমাবদ্ধতা: তিনিই প্রকৃত অসীম (true infinity)।

৫. এরপর এগুলির উপর ভিত্তি করে পরম স্রষ্টার আরো বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করা যেতে পারে। যেমন: যেহেতু তিনি সৃষ্টির ঊর্ধ্বে, সেহেতু একাধিক পরম স্রষ্টা সম্ভব নয়।

নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব

এবং এই গোটা প্রক্রিয়ার সময় এমনকি আস্তিকেরও উচিত হবে নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করা। নিজের ধর্মকে সঠিক প্রমাণ করার মানসিকতা থাকা চলবে না। অর্থাৎ, একজন প্রকৃত দার্শনিক কোনো বিশেষ টার্গেটের দিকে অগ্রসর হন না। কোনো বিশেষ টার্গেটকে সত্য প্রমাণ করতে গেলেই নিরপেক্ষতা আর থাকে না। ইসলামকে সত্য প্রমাণ করা, কিংবা স্রষ্টার অস্তিত্বকে সত্য প্রমাণ করা – এধরণের মানসিকতা নিয়ে বিতর্কের মঞ্চে ওঠা যাবে না। যদিও অপর পক্ষ, অর্থাৎ নাস্তিক হয়ত “আমিই সঠিক” প্রমাণ করার জন্য এসেছে, কিন্তু আপনাকে এর ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। এবং অপর পক্ষকেও এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। এই উদার মানসিকতা উভয় পক্ষের মধ্যে সঞ্চার না হলে বিতর্ক সফল হবে না। বিতর্কে আস্তিক জয়ী হয়ে আসবেন হয়ত ঠিকই, কিন্তু নাস্তিককে জয় করতে পারবেন না। তাই পারস্পরিক সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাটা আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কের ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। উভয় পক্ষের মাঝে এধরণের সম্পর্ক সৃষ্টি হলেই কেবল উভয়েই সত্যকে গ্রহণ করে নেবে। তা না হলে বিতর্ক হবে বটে, কিন্তু সত্যগুলো কারো হৃদয়ে প্রবেশ করবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের অধিকাংশ ধার্মিকই এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন না। তারা বিতর্কে জিতে “আমিই সঠিক” এর আত্মতৃপ্তি লাভ করতে চান। অর্থাৎ, জয়ী হতে চান, কিন্তু জয় করতে চান না। তাই বিতর্ক শেষে নাস্তিক নাস্তিকই রয়ে যায়, আর আস্তিক আস্তিকই রয়ে যায়। মাঝখানে লাভ হয় শুধু দুই পক্ষের মাঝে অহঙ্কার, রাগ বিরক্ত ইত্যাদি নানান অযাচিত অনুভূতি সৃষ্টি হয়।

নাস্তিকদের প্রশ্নের জবাব
নাস্তিকদের প্রশ্নের শেষ নেই। মুহাম্মদ কেন ঐ যুদ্ধটি করেছিল? কুরআনে নারীদের অধিকার এমন কেন? কুরআনের ওমুক ঘটনাটা বিজ্ঞানসম্মত না কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের হাজারো প্রশ্নের ভিড়ে আস্তিক সহজেই বেসামাল হয়ে পড়ে। অস্থির হয়ে নিজের বাপ-দাদার ধর্মকে সঠিক প্রমাণ করতে চেষ্টা করে। তাই ধরে ধরে তাদের প্রতিটা প্রশ্নের জবাব দিতে ছুটাছুটি করে হয়রান হয়। একটা প্রশ্নের উত্তর দেয় তো নাস্তিক আরেকটা নতুন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। সেটার উত্তর দেয় তো আরেকটা… এভাবে চলতেই থাকে।

অথচ এটা আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কের সঠিক পদ্ধতি নয়। বার্ডেন অব প্রুফ আস্তিকের, আর এই প্রমাণের সঠিক পদ্ধতিটা হলো উৎসের সন্ধান প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করে প্রকৃত ইনফিনিটির দর্শন দিয়ে আলোচনা শেষ করা, যা আমরা এই বইয়ে করেছি। আর এসব এমনই অকাট্য যুক্তি যে, যেকোনো নিরপেক্ষ উদারমনা যুক্তিবাদী মানুষ তা মেনে নিতে বাধ্য। এরপর আপনি নাস্তিককে বলুন, “পরম স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। এখন নিজেকে নাস্তিক বলা বন্ধ করুন। আর ইসলাম সঠিক, কি অন্য কোনো ধর্ম সঠিক – সেটা এবার আপনি নিজেই খুঁজে নিন।”

ব্যস, এখানেই আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক শেষ করে দিন। এর চেয়ে বেশি অগ্রসর হবেন না। সেটা প্রয়োজনও নেই। হযরত মুহাম্মদ (সা.) কি নাস্তিকদের ছুঁড়ে দেয়া প্রতিটা প্রশ্নের পিছনে ছুটেছিলেন? তবে আপনি কেন ছুটছেন? হ্যাঁ, আপনি একারণেই ছুটছেন যে, আপনার নিজের হৃদয়ে আপনি নিজেই জানেন না যে, ইসলাম সঠিক, আল্লাহ আছেন, কুরআন সঠিক। আপনিতো বাপ-দাদার ধর্মকে অন্ধভাবে ‘বিশ্বাস’ করে আঁকড়ে ধরে আছেন। তাই সেই অন্ধবিশ্বাসকে যখন নাস্তিকেরা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তখন আপনি ‘বিশ্বাস’ টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করছেন। অথচ তাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তরও যদি দিয়ে দেন, কিংবা পৃথিবীর সকল নাস্তিকও যদি আজকে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয় – তাতে তো আর আপনার ধর্ম সত্য হয়ে যাচ্ছে না! আপনার ধর্মকে সত্য হতে হলে সেটাকে নিজগুণে যুক্তি ও দর্শনের উপর ভিত্তি করে সত্য হতে হবে। আর যখন তেমন দৃঢ় যুক্তি ও সত্যদর্শনের উপর ভিত্তি করে আপনি চিনে নেবেন পরম স্রষ্টা, প্রকৃত ইনফিনিটি, মহান আল্লাহ তায়ালাকে, যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমে চিনে নেবেন কুরআনকে, তখন আপনার হৃদয়ে আপনি এক প্রশান্তিপূর্ণ দৃঢ়তা অনুভব করবেন। তখন নাস্তিকদের হাজারো প্রশ্ন দেখে বরং মনে মনে হয়ত একটু হেসে দেবেন যে, কিসের মাঝেই না তারা ঘুরপাক খেয়ে হরয়ান হয়ে মরছে!

_______________________________

নাস্তিকের মুখ বন্ধ করলেই ইসলাম সত্য হয়ে যায় না।

সত্য ধর্মকে নিজগুণে যুক্তি ও দর্শনের উপর দাঁড়িয়ে সত্য হতে হয়।

আস্তিক-নাস্তিক উভয় পাঠকই একমত হবেন আশা করি


বিরতি

________________________________________________________________

যুক্তিবিদ্যার সকল প্রাসঙ্গিক প্রয়োজনীয় আলোচনা শেষ হলো।

এই পর্যায়ে এসে বইটি আবারো বন্ধ করুন।

ব্রেইনকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন।







মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…