সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

First Cause: আদি কারণ | যুক্তির কাঠগড়ায় ইসলাম



একটি দেয়াল কিভাবে তৈরী হয়? ইটের ‘পর ইট, তার উপরে ইট…। একটি বাড়ি কিভাবে তৈরী হয়? প্রথমে মাটির নিচে বড় বড় পিলার গেড়ে ফাউন্ডেশান বা ভিত তৈরী করতে হয়। তারপর মাটির উপরে একতলা, তার উপরে দ্বিতীয় তলা, তার উপরে তৃতীয় তলা… এইভাবে চলতে থাকে।

যুক্তিও ঠিক তেমন। প্রথমে একটা যুক্তিকে সঠিক প্রমাণ করতে হয়। তারপর সেটার উপর ভিত্তি করে নতুন আরেকটা যুক্তি তৈরী করি। তারপর তার উপর ভিত্তি করে আরেকটা, তার উপর আরেকটা… এভাবে যুক্তির প্রাসাদ গড়ে ওঠে। কিন্তু ধরেন, যদি দেয়ালের একদম নিচের ইটগুলো ধরে টান দিতাম? তাহলে গোটা দেয়াল ভেঙে পড়ত। একইভাবে যদি বিল্ডিঙের নিচতলা ভেঙে যায়? তাহলে উপরের সমস্ত তলা-ই ভেঙে যাবে। কিংবা যদি একদম নিচে, বাড়ির ফাউন্ডেশানের পিলারগুলো ভেঙে যায়? তখন হয়ত রানা প্লাজার মত পুরো বাড়িটাই ধ্বংসে পড়বে! যুক্তিও ঠিক তেমনই।

তো পাঠক, প্রথমে বাড়ির ফাউন্ডেশান, তার ‘পর প্রথম তলা, তার উপর দ্বিতীয় তলা, তার উপর…। এইভাবে করে বলুনতো দেখি, আমাদের “দার্শনিক স্রষ্টাভাবনায়” ফাউন্ডেশান বা ভিতটা কী ছিল? তারপর সেটার উপর ভিত্তি করে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম আমরা? তারপর সেগুলোর উপর ভিত্তি করে আরো নতুন কী কী সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম? এভাবে করে একটা তালিকা করি, আসুন। আপনি এখন চাইলে বইয়ের প্রথম ভাগে একটু চোখ বুলিয়ে তালিকাটা করে আসতে পারেন। তারপর নিচের তালিকার সাথে মিলিয়ে দেখুন, কতখানি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছেন আপনি।

দার্শনিক স্রষ্টাভাবনায় যুক্তির ধাপসমূহ


প্রথম প্রস্তাব: উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য।

দ্বিতীয় প্রস্তাব: মানুষের উৎস সন্ধান করলে আমার মা, তার মা, তার মা,… এভাবে করে পিছনে যেতে যেতে অবশ্যই একজন মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নেই। তিনিই আদি মাতা। আর সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাকেই আমরা বলছি: মানুষের স্রষ্টা।

তৃতীয় প্রস্তাব: সেই মানুষের স্রষ্টারও স্রষ্টা আছে/ছিল কিনা আমরা জানি না, কিন্তু যদি থেকেও থাকে, এবং তারও যদি স্রষ্টা থেকে থাকে, এভাবে করে মানুষের স্রষ্টা, তার স্রষ্টা, তার স্রষ্টা,… এভাবে পিছনে যেতে যেতে অবশ্যই শুরুতে একজন স্রষ্টা থাকতে হবে, যার আর কোনো স্রষ্টা নেই। তিনিই আদি স্রষ্টা। তাকেই আমরা বলছি: পরম স্রষ্টা।

[তৃতীয় প্রস্তাবে এসেই আমরা পরম স্রষ্টাকে প্রমাণ করে ফেলেছি। পরবর্তী প্রস্তাবগুলোতে সেই পরম স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য দার্শনিক যুক্তির মাধ্যমে আবিষ্কার করা হয়েছে। দেখুন সেগুলি: ]

চতুর্থ প্রস্তাব: যেহেতু পরম স্রষ্টার কোনো স্রষ্টা নেই, সেহেতু তিনি অসৃষ্ট। অর্থাৎ, তিনি অস্তিত্বমান, কিন্তু সৃষ্টি বলে কোনো ব্যাপার তাঁর ছিল না।

পঞ্চম প্রস্তাব: মানব সৃষ্টির ১,০০০ বছর আগেও তিনি বেঁচে ছিলেন, বেঁচে ছিলেন ১০,০০০ বছর আগেও; এভাবে ১ এর পিছনে যত শূন্যই লাগাই না কেন, তার আগেও তিনি বেঁচে ছিলেন। আর সেই অসীম অতীতকালকেই আমরা বলছি ইনফিনিটি।

ষষ্ঠ প্রস্তাব: পরম স্রষ্টা অসীম অতীত (অনন্তকাল তথা ইনফিনিটি) থেকে শুরু করে কমপক্ষে মানব সৃষ্টির সময় পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।

সপ্তম প্রস্তাব: “মানব সৃষ্টির, ধরেন ১০ বছর আগের সময়টা কি ইনফিনিটির অন্তর্ভুক্ত নয়? ইনফিনিট টাইম ঠিক কোন মুহুর্তে এসে শেষ হয়ে গেল যে আপনি বলবেন, ইনফিনিট টাইমের শেষ প্রান্ত এটা?” যেহেতু তা বলা সম্ভব না, অতএব আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, ইনফিনিট টাইম বলে কিছু নাই, বরং ইনফিনিটি হলো সময়ের উর্ধ্ব একটি বিষয়, যা কেবল পরম স্রষ্টার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অতএব, তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে, এবং তিনিই প্রকৃত ইনফিনিটি (true infinity)।

অষ্টম প্রস্তাব: একই ক্যাটেগরির আরেকটি সৃষ্টি হলে তার সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে, কিন্তু যেহেতু চতুর্থ প্রস্তাব অনুযায়ী পরম স্রষ্টার ক্ষেত্রে সৃষ্টি বলে কোনো ব্যাপার থাকতে পারে না, সেহেতু পরম স্রষ্টাকে সৃষ্টি করা যায় না। অতএব, একাধিক পরম স্রষ্টা থাকতে পারে না (অর্থাৎ, পরম স্রষ্টার তাওহীদ তথা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হলো)।

সপ্তম প্রস্তাবের অনুসিদ্ধান্ত-১: যেহেতু তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে, সেহেতু সময় সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সপ্তম প্রস্তাবের অনুসিদ্ধান্ত-২: যেহেতু ইনফিনিটির শুরু ও শেষ নেই, অতএব সৃষ্টি (শুরু) ও ধ্বংস (শেষ) পরম স্রষ্টার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

[চতুর্থ, সপ্তম ও অষ্টম প্রস্তাবে আমরা পরম স্রষ্টার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দার্শনিক যুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করলাম।]

প্রিয় পাঠক,

এবার উপরের আটটি প্রস্তাব খুব ভালোভাবে আত্মস্থ করুন। কারণ আমাদের গোটা বইয়ের প্রাণ হলো এই আটটি প্রস্তাব। এর উপর ভিত্তি করেই সূরা ইখলাসকে সত্য বলে যাচাই করেছি, এর উপর ভিত্তি করেই কুরআনকে সত্য গ্রন্থ হিসেবে পেয়েছি, এবং এই আটটি প্রস্তাব ও কুরআনের সমন্বয়েই আমরা যুক্তির ময়দানে নেমেছি।
First Cause: আদি কারণ | যুক্তির কাঠগড়ায় ইসলাম



তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের এই আটটি প্রস্তাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই আটটি প্রস্তাবে কোনো ফাঁক থাকা চলবে না। এর কোনো একটি প্রস্তাবও যদি ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলেই আমাদের পুরো বিল্ডিং ধ্বসে পড়বে। কিন্তু পাঠক! আমরাতো উদারমনা দার্শনিক। যুক্তি ও দর্শন আমাদের প্রধান হাতিয়ার। আর নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মনে সত্যকে উন্মোচন করাই আমাদের লক্ষ্য। পাঠক! আমরা যদি কখনো এই আটটি প্রস্তাবে ভুল খুঁজে পাই, তবুও কি আমরা অন্ধের মত সেটিকে আঁকড়ে ধরে থাকব? নাকি ভুল স্বীকার করে সত্যকে গ্রহণ করে নেব? নিশ্চয়ই আমরা সত্যকে গ্রহণ করে নেব, এবং নিজমুখে স্বাক্ষ্য দেব যে, আমি ভুল ছিলাম! এবং এটা কুরআনের নীতিও বটে। এবার পাঠক! আসুন, উদার মনে আমাদের এই আটটি প্রস্তাব একজন নাস্তিকের সামনে পেশ করি। এখন নাস্তিক কী করবে?

তিনি যদি প্রকৃতপক্ষেই মুক্তমনা ও নিরপেক্ষ মানুষ হন, তাহলে তিনি আটটি প্রস্তাব গ্রহণ করে নেবেন। খুব সহজভাবেই বলবেন যে, আমি এতদিন ভুলের মাঝে ছিলাম, আজ আমি সত্যকে গ্রহণ করে নিলাম। পক্ষান্তরে তিনি যদি মুক্তমনা না হয়ে বদ্ধমনা হন, উদারমনা নাস্তিক না হয়ে গোঁড়া নাস্তিক হন, যুক্তিবাদী না হয়ে অপযুক্তিবাদী হন, তাহলে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আটটি প্রস্তাবকে অস্বীকার করার নানান উপায় খুঁজবেন। আসুন দেখি, এধরণের একজন বদ্ধমনা নাস্তিক কিভাবে চিন্তা করেন।

নাস্তিকের ভাবনা: “হুমম… আটটা প্রস্তাবের যুক্তি তো খুব শক্ত যুক্তি। কিন্তু একটা দশতলা বাড়িকে ধ্বংস করতে হলে সবচেয়ে ভালো উপায় কী? নিচতলাটা বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া। তাহলে পুরো বাড়িই ভেঙে পড়বে। অতএব, ওদের আটটি প্রস্তাবের একদম প্রথম প্রস্তাব নিয়ে টানাটানি করতে হবে। প্রথম প্রস্তাবগুলো কিছুতেই স্বীকার করা যাবে না। ওগুলোর একটাকেও যদি স্বীকার করে নেই, তাহলেই বিপদ। তখন অষ্টম প্রস্তাব পর্যন্ত মেনে নেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। তাহলে…”

নাস্তিকের বক্তব্য: দার্শনিক স্রষ্টাভাবনার প্রথম প্রস্তাবের সাথে আমি একমত: উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। আমিও স্বীকার করি যে মানুষ বৈশিষ্ট্যগতভাবেই অনুসন্ধিৎসু। তবে দ্বিতীয় প্রস্তাবের সাথে পুরোপুরি একমত নই। আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন তার মা। কিন্তু এভাবে করে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগে মানবজাতির আদি মাতার জন্ম হয়েছিলো বানর থেকে। আর সেই বানরের সৃষ্টি হয়েছিলো বিবর্তন প্রক্রিয়ায়। বিবর্তন প্রক্রিয়ায় একটি কেমিকাল স্যুপ থেকে সকল প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছিলো, এবং বিবর্তনের মাধ্যমে এক প্রাণী থেকে আরেক প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছে।

আমাদের জবাব: অর্থাৎ, আপনি বলতে চাইছেন যে আপনার নানীর নানী, এইভাবে করে আপনার সবচেয়ে বড় নানী ছিল বানর? ঠিক আছে। কিন্তু তার প্রমাণ? হয় চাক্ষুষ প্রমাণ দিন, নাহয় যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করুন।

পাঠক! আপনারা জানেন যে, ডারউইনের বিবর্তনবাদ একটা তত্ত্ব মাত্র, কোনো প্রমাণিত সত্য নয়। এমনকি যদি প্রমাণিত সত্যও হয়ে থাকে, যুক্তির খাতিরে ধরে নিলাম যে বিবর্তনবাদ প্রক্রিয়ায় সকল প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছে; তবুও সেটা পরম স্রষ্টার ধারণাকে নাকচ করে না। বিবর্তনবাদের প্রথম কথা হলো: একটি কেমিকাল স্যুপ থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন হলো, সেই কেমিকাল স্যুপ কে তৈরী করলো?

পাঠক! আমাদের দ্বিতীয় প্রস্তাবে আমরা বলেছিলাম যে, “সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, তাকেই আমরা বলছি ‘মানুষের স্রষ্টা’।” এই দ্বিতীয় প্রস্তাবের “আদি মাতা” শব্দটার জায়গায় “আদি কেমিকাল স্যুপ” বসান। এতেও বাকী প্রস্তাবগুলো অক্ষত থাকবে, যেমন:

দ্বিতীয় প্রস্তাব: … সেই আদি কেমিকাল স্যুপ এর স্রষ্টাকেই আমরা বলছি মানুষের স্রষ্টা বা কেমিকাল স্যুপ এর স্রষ্টা।

তৃতীয় প্রস্তাব: … মানুষের স্রষ্টা বা কেমিকাল স্যুপ এর স্রষ্টা, তার স্রষ্টা, তার স্রষ্টা… এভাবে করে শুরুতে একজন স্রষ্টা অবশ্যই থাকবে হবে, যার আর কোনো স্রষ্টা নাই। তিনিই পরম স্রষ্টা।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের আটটি প্রস্তাবের দ্বিতীয় প্রস্তাবে আঘাত করে কোনো লাভ হলো না। এবার আসুন দেখি আমাদের যুক্তিপ্রাসাদের তৃতীয় তলা, অর্থাৎ তৃতীয় প্রস্তাবে একজন নাস্তিক কিভাবে আঘাত করার চেষ্টা করেন।

নাস্তিকের ভাবনা: “আদি মাতার জায়গায় আদি কেমিকাল স্যুপ বসিয়ে দিলেতো ওদের যুক্তির স্ট্রাকচারে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। তাহলে কী করা যায়? তাহলে তৃতীয় প্রস্তাবে গিয়ে আদি স্রষ্টাকে অস্বীকার করে বসি। দেখি, ইন্টারনেট থেকে অনুবাদ করে কোনো যুক্তি এনে দিতে পারি কিনা।”

এখন সেই যুক্তিটি শুনবেন? যুক্তিটিকে তারা বলে –

“Something from nothing.”


যুক্তিটি হলো: “মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে একটি আদি কণায় বিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে। কিন্তু সেই আদি কণার সৃষ্টি হয়েছিলো শূন্য থেকে: Something from nothing। [QR - Something From Nothing ? Richard Dawkins & Lawrence Krauss] কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান বলা হয় এটাকে। অতএব, আদি কণার কোনো উৎস নাই। আদি কণা শূন্য বা nothing থেকে সৃষ্টি হয়েছে।“



আমাদের জবাব: আমরাও সেটাই বলছি। আদি কণার বিস্ফোরণের মাধ্যমেই হোক কি হঠাৎ করে গোটা মহাবিশ্ব একযোগেই সৃষ্টি হোক, যেভাবেই হোক না কেন, তা শূন্য থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথম বস্তু বা matter সৃষ্টির আগে আর কোনো বস্তু (পরমাণু, অনু, আলো, শক্তি যা-ই বলেন না কেন, সেটা) ছিল না। শূন্য থেকে বস্তু সৃষ্টি করেন কে? আদি স্রষ্টা তথা পরম স্রষ্টা। আপনারা যে “from nothing” বলছেন, এই from শব্দটাই কি উৎস বুঝায় না? তাহলে মহাবিশ্বের কোনো উৎস নাই – একথা বলেন কিভাবে?

পাঠক! আসলে এইখানে এসে নাস্তিকেরা ভাষার খেলা খেলেন। Nothing এর ভিতর থেকে যদি কোনো thing-ই বের হবে, তাহলে সেটা nothing হয় কিভাবে? তা সেই thing আলো/শক্তি/পরমাণু/ইলেকট্রন/আদি কণা যা-ই হোক না কেন। কিন্তু nothing শব্দের সংজ্ঞানুসারেই তো এর ভিতরে কিছু থাকতে পারবে না, কোনো সম্ভাবনাও থাকতে পারবে না। এর ভিতর থেকে যদি কোনোকিছু বের হয় (কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশানের মাধ্যমে), তাহলেই সেটাকে আর nothing বলা যাবে না। বরং সেটাকে বলতে হবে, something। কারণ তার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। তার ভিতরে কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান ঘটে বিভিন্ন thing সৃষ্টি হয়(যেমন আদি কণা কিংবা মহাবিশ্ব)।

অতএব, কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান দ্বারাও এটা প্রমাণিত হয় না যে, মহাবিশ্বের/সৃষ্টিজগতের কোনো উৎস নাই! যখনই from শব্দটা ব্যবহার করা হবে, তখনই সেটার উৎস আছে।

(প্রসঙ্গতঃ, নাস্তিকরা বলার চেষ্টা করছে ‘nothing’ থেকে গোটা সৃষ্টিজগত অস্তিত্বমান হয়েছে। আর আস্তিকরা বলছে, পরম স্রষ্টাই হলেন গোটা সৃষ্টিজগতের উৎস। পার্থক্য শুধু শব্দচয়নে। মূলতঃ আস্তিকেরাও একটা উৎস দেখাচ্ছেন, আর নাস্তিকেরা স্রষ্টাকে অস্বীকার করতে গিয়ে শেষমেষ একটা ঊৎসই দেখাচ্ছেন, শুধু তার নাম দিচ্ছেন ‘nothing’!)

তাহলে কেন নাস্তিকেরা উৎসকে অস্বীকার করতে এত উঠেপড়ে লেগেছে? সেটার উত্তর নাহয় পরে দেয়া যাবে। তবে পাঠক, আপনার যদি কোনো নাস্তিক বন্ধু থেকে থাকে, যার সাথে খুবই ভালো সম্পর্ক, তাহলে একটা কাজ করতে পারেন। তার মাথার পিছনে একটা চাঁটি মারবেন। তারপর যখন সে মাথা ঘুরিয়ে আপনার দিকে কটমট করে তাকাবে, তখন বলবেন, “ও কিছু না বন্ধু, কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান হয়েচে, something from nothing, তাই না বন্ধু? হাহাহা…”

যাহোক, first cause এর আলোচনার মাধ্যমে আমাদের আটটি প্রস্তাবকে আরো ভালোভাবে যাচাই করা হলো। এবং আমাদের “আটটি প্রস্তাবের দার্শনিক স্রষ্টাভাবনার” ভিত যে খুবই মজবুত, এবং যুক্তিগুলো যে অকাট্য যুক্তি, তা আরো একবার প্রমাণিত হলো। এছাড়াও, ইটের উপর ইট গেঁথে দেয়াল তোলার মত করে একটার ‘পর একটা যুক্তি তৈরী করে কিভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়, সেটাও আমরা দেখলাম।

First cause এর ধারণা মানুষের মাঝে জন্মগত

হ্যাঁ, পাঠক, First cause বা আদি কারণ বা “সৃষ্টির উৎস স্রষ্টা”-র ধারণা যে মানুষের মাঝে জন্মগত একটা ব্যাপার, সেটা বোঝা যায় ইতিহাস পর্যালোচনা করলে। কুরআনকে এমনকি যদি শুধু ১৪০০ বছর আগের একটি দার্শনিক গ্রন্থ হিসেবেও দেখেন, তবুও দেখবেন যে, সেখানে একটি ছোট্ট বাক্যে সৃষ্টি উৎস বা first cause এর যুক্তি দেয়া হয়েছে–
“তারা কি কোনোকিছু (কোনো সৃষ্টি-উৎস/ সৃষ্টিকর্তা) ছাড়াই (নিজে নিজেই/ শূন্য থেকেই) সৃষ্ট হয়েছে, নাকি তারা (নিজেরাই নিজেদের) সৃষ্টিকর্তা?” (সূরা তূর, ৫২:৩৫)

১৪০০ বছর আগের বইয়েও দেখা যাচ্ছে first cause এর যুক্তি আছে, আবার আমরাও যখন নিরপেক্ষভাবে উৎসের সন্ধান করেছি, তখন first cause এর যুক্তিই এসেছে (দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রস্তাব দেখুন)। অতএব, আমরা একটা অনুসিদ্ধান্তে আসতে পারি যে: First cause বা আদি কারণ বা পরম স্রষ্টার ধারণা মানুষের মাঝে জন্মগত।

প্রিয় পাঠক! বিগ ব্যাং কিংবা কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশানের সাথে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। কসমোলজি তথা মহাবিশ্বের সৃষ্টিবিদ্যার সাথেও কোনো বিরোধ নেই। পরম স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টিজগত নিয়ে গবেষণা করা তো খুবই ভালো একটি কাজ। কিন্তু আমাদের বিরোধ শুধু এই জায়গায় যে, যখন কেউ আল্লাহর সৃষ্টিজগতের ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি-থার্মোডাইন্যামিক্স এর বিভিন্ন সূত্র ব্যবহার করে আল্লাহরই বিরুদ্ধে কথা বলতে চায়, এবং বলতে চায় যে, স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই: God does not exist!

অথচ যুক্তিবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে এটাও একটা ভুল বাক্য। কীরকম, তা আমরা পরের পর্বে আলোচনা করব।

[পাঠক!

যুক্তিবিদ্যা একটি ব্যবহারিক শাস্ত্র। একটানা চর্চা করলেই যে সব শিখে যাবেন, তা নয়। বরং কিছুটা শেখার পর বিরতি নেয়া ও পিছনের বিষয়গুলোর রিভিউ করা জরুরি। এজন্যে এখন চোখ বুঁজে মনে মনে নিজের সাথেই যুক্তিতর্কগুলো করার চেষ্টা করুন। যদি না দেখেই মনে মনে আটটি প্রস্তাব ও First cause argument করতে পারেন, তাহলে পরের পর্বটি পড়ুন। তা না হলে এই পর্বে একটু বিরতি নিন।]

_______________________________

Something from nothing আর্গুমেন্ট ভাষার খেলা মাত্র।

First cause (আদি কারণ, পরম স্রষ্টার) ধারণা মানুষের মাঝে জন্মগত।

লেখক-পাঠক যুক্তিবিদ্যার চর্চায় মেতে উঠুন…

মন্তব্যসমূহ

  1. Every argument here is based on specific word(s). If GOD exist, is it the religious GOD ? It is silly question, if I agree or disagree, does GOD cares about it ?

    উত্তরমুছুন
  2. একজন লিখেছেন: "Every argument here is based on specific word(s). If GOD exist, is it the religious GOD ? It is silly question, if I agree or disagree, does GOD cares about it ? "
    আমি বলতে চাই -- সেই God রিলিজিয়াস গড কিনা, এই ভাবনা কি আমার নিরপেক্ষ অবস্থান ও নিরপেক্ষ যাত্রা থেকে আসছে? নাকি আশেপাশের ধার্মিক-অধার্মক দলাদলির কারণে আসছে?

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মতামত জানান...

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…