সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

Introduction to Fallacy: Fallacy of Assumption | যুক্তির কাঠগড়ায় ইসলাম


 ফ্যালাসি (fallacy) কী?


যুক্তিবিদ্যায় ফ্যালাসি হলো অপযুক্তি, কুযুক্তি, ভ্রমাত্মক যুক্তি, ভুল যুক্তি, যুক্তির ভ্রম ইত্যাদি। অর্থাৎ এমন ধরণের বাক্য, যেটাকে বাহ্যিকভাবে সঠিক বলে মনে হয়, কিন্তু যুক্তিবিদ্যার বিচারে সেটা আসলে ভুল যুক্তি বা অপযুক্তি। যেমন ধরুন অতিবৃদ্ধ কোনো লোককে যদি জিজ্ঞাসা করি, “দাদু, বউ কি এখনো বেঁচে আছে?” তারমানে আমি ধরেই নিয়েছি যে লোকটা বিবাহিত। তারপর সেই ধারণা বা অ্যাজাম্পশান (assumption) এর উপর ভিত্তি করে প্রশ্ন তৈরী করেছি যে, তার বউ বেঁচে আছে কিনা। অথচ হতে পারে সে জীবনে বিয়েই করেনি! অতএব, যুক্তিবিদ্যার দৃষ্টিতে আমার প্রশ্নটি ফ্যালাসিপূর্ণ (fallacious) একটি প্রশ্ন। এধরণের ফ্যালাসিকে যুক্তিবিদ্যায় “ধারণামূলক অপযুক্তি” বা ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান (fallacy of assumption) বলা হয়ে থাকে।

প্রিয় পাঠক,

এই পর্বে আমরা ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান এর বিস্তারিত চর্চা করব। আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, ‘সঠিক যুক্তি’ না শিখে আমরা কেন ‘ভুল যুক্তি’ বা ফ্যালাসি নিয়ে বিস্তারিত চর্চা করছি? উত্তরে বলতে হয়, ‘সঠিক যুক্তি’ কাউকে শিখাতে হয় না; সঠিক যুক্তি প্রতিটা মানুষের সহজাত জ্ঞান। তাই যুক্তিশাস্ত্রের চর্চায় আমরা মানুষকে ভুলযুক্তি বা ফ্যালাসিগুলো দেখিয়ে দেই, যেন সে ফ্যালাসি এড়িয়ে যুক্তিতর্ক করতে পারে। একারণেই যুক্তিবিদ্যার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ফ্যালাসির আলোচনা।

যাহোক, আমরা সেই দাদুর উদাহরণে ফিরে আসি। প্রশ্নটা ছিল, “দাদু, বউ কি এখনো বেঁচে আছে?” পাঠক, আমরা যদি মূল বাক্যটাকে ভেঙে লুকানো বাক্যগুলো বের করে লিখি, তাহলে সেটা এমন হবে:
১. বৃদ্ধ লোকটি (অতীতে কোনো এক কালে) এক মহিলাকে বিয়ে করেছিল।

২. প্রশ্ন হলো, সেই মহিলা কি এখনো বেঁচে আছে?

কিন্তু ১ নং পয়েন্ট-ই তো মিথ্যা। কারণ বেচারা তো বিয়েই করেনি। অতএব, ২ নং পয়েন্টের উত্তর বা যুক্তিখণ্ডনের প্রশ্নই আসে না। এখানে ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রশ্ন তৈরী করা হয়েছে। কোনো কিছু সম্পর্কে একটা ধারণা করে নিয়ে তারপর তার ভিত্তিতে যুক্তি বা প্রশ্ন তৈরী করা – এটাই হলো ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান।

স্রষ্টাকে নিয়ে নাস্তিকদের প্রশ্নের শেষ নেই। মনে হয় কুরআনে যত আয়াত আছে, তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন/যুক্তি আছে নাস্তিকদের। কেন এত প্রশ্ন? এর কারণ হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা স্রষ্টা প্রসঙ্গে তাদের মনমত নানান কথা ধারণা করে নেয় (assume করে), তারপর সেটার ভিত্তিতে প্রশ্ন তৈরী করে। অথচ স্রষ্টা সম্পর্কে তাদের অধিকাংশ ধারণাই মিথ্যা। আর এসব মিথ্যা ধারণাই জন্ম দেয় হাজারটা নাস্তিক্যবাদী প্রশ্নের। তাই অধিকাংশ নাস্তিক্যবাদী যুক্তিই “ধারণামূলক অপযুক্তি” বা ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান এর দোষে দুষ্ট হয়ে পড়ে। তো পাঠক, যেহেতু নাস্তিক্যবাদী বক্তব্যে ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান খুব বেশি ব্যবহৃত হয়, সেহেতু এই বিশেষ ফ্যালাসিটি আমরা বিস্তারিত দেখব।

প্রশ্ন-১: স্রষ্টা কি এমন ভারী জিনিস তৈরী করতে পারবেন যা তিনি নিজেই তুলতে পারবেন না?

প্রিয় পাঠক,

এটি আস্তিক-নাস্তিক রেসলিঙের স্বার্থে নাস্তিকদের তৈরী করা প্রশ্ন। নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মনের স্রষ্টাভাবনার প্রশ্ন এটা না। প্রসঙ্গতঃ, আধুনিক বাঙালি নাস্তিকরা ইন্টারনেটে ইংরেজিতে এসব প্রশ্ন পড়ে সেটা বাংলায় অনুবাদ করেছে মাত্র। এসব প্রশ্ন তাদের নিজস্ব চিন্তার ফসল নয়, বরং বিদেশ থেকে আমদানীকৃত বলা যেতে পারে। অন্যের দেখাদেখি কপি-পেস্ট নাস্তিক নয়, বরং চিন্তাশীল বাঙালি নাস্তিকের চিন্তাধারা জানতে হলে পড়ুন আরজ আলী মাতুব্বরের বিভিন্ন বই। যদিও তিনি নাস্তিক ছিলেন, কিন্তু স্বকীয়তা ছিল, সেটা উনার লেখা পড়লে ও প্রশ্নের ধরণ দেখলেই বুঝবেন। অন্ততঃ বিদেশীদের লেখা অনুবাদ করে নাস্তিক হননি তিনি। এতটা বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্য ছিল না তার। যাহোক, আমাদের মূল প্রশ্নে ফিরে আসি। “স্রষ্টা কি এমন ভারী জিনিস তৈরী করতে পারবেন যা তিনি নিজেই তুলতে পারবেন না?”

Fallacy of Assumption


মূল বাক্য: “স্রষ্টা কি এমন ভারী জিনিস তৈরী করতে পারবেন যা তিনি নিজেই তুলতে পারবেন না?”

ভেঙে লিখলে:

১. স্রষ্টা বিভিন্ন জিনিস তৈরী করতে পারেন।

২. স্রষ্টার শরীর আছে।

৩. স্রষ্টা তাঁর শরীর ব্যবহার করে বিভিন্ন জিনিস তুলতে পারেন।

৪. স্রষ্টার শরীরের উপর অভিকর্ষজ বল কাজ করে (পৃথিবী যে সব জিনিসকে নিজের দিকে টানে, এটাকে অভিকর্ষজ বল বলে)।

৫. স্রষ্টা পৃথিবী অথবা পৃথিবীর মত অভিকর্ষজ বল সম্পন্ন কোনো গ্রহে বসবাস করেন।

৬. শরীর ব্যবহার করে কিছু জিনিস তুললে সেটা স্রষ্টার কাছে হালকা অনুভূত হয় (অভিকর্ষজ বলের কারণে)।

৭. শরীর ব্যবহার করে কিছু জিনিস তুললে সেটা স্রষ্টার কাছে ভারী অনুভূত হয় (অভিকর্ষজ বলের কারণে)।

৮. (মানুষ যেমন বাড়ি তৈরী করে, কিন্তু সেটা এতই ভারী যে মানুষ নিজেই তা তুলতে পারে না, অনুরূপভাবে) স্রষ্টা কি এমন ভারী জিনিস তৈরী করতে পারবেন, যা তিনি নিজেই তুলতে পারবেন না?

অর্থাৎ, মূল প্রশ্নের ভিতরে সাতটা প্রস্তাবনা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে সুকৌশলে। এটাই ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান বা লুকানো বাক্যের অপযুক্তি।

নাস্তিকের এহেন অপযুক্তি দেখার পর আপনি হয়ত তাকে বলবেন, “মিয়া ফাইজলামি পাইছেন? স্রষ্টার কি শরীর আছে নাকি যে এইসব আবোল তাবোল প্রশ্ন নিয়া হাজির হইছেন?” কিন্তু দেখুন, একটা ছোট্ট সাজানো বাক্যে কতগুলো লুকানো কথা দিয়ে সে কিভাবে প্রশ্নটা তৈরী করেছে! তার কথাটা শুনলে প্রথমে আপনার মনে হবে এটা একটা ভ্যালিড প্রশ্ন। কিন্তু আসলে পুরোটাই ফ্যালাসি (অর্থাৎ অপযুক্তি)।

আচ্ছা, প্রিয় পাঠক, প্রথমে যখন নাস্তিকের প্রশ্নটা শুনলেন, তখন কিন্তু আপনি সাথে সাথে ধরতে পারেননি যে এখানে “ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান” ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু আমি যখন অ্যাজাম্পশানগুলো (সাতটা লুকানো বাক্য) বের করে দেখালাম, তখন সাথে সাথে আপনিই রায় দিয়ে দিলেন: “ফাজলামি নাকি? স্রষ্টার তো শরীরই নাই।”

কিন্তু পাঠক!

আমিতো বিরতির আগে রিভিউ পর্বেই বলেছিলাম যে, এখানে আমরা উচ্চতর যুক্তিতর্ক চর্চা করব। অতএব, শুধু যে নাস্তিকের বাক্যটাকে ভেঙে দেখব তা-ই না, বরং আপনার কথাটাকেও ভেঙে দেখব। লুকানো বাক্যগুলো দেখার সাথে সাথে আপনার কেন মনে হলো: “ফাজলামি”? আপনি এত দ্রুত রায় দিয়ে দিলেন কিভাবে? নিশ্চয়ই আপনার মনের ভিতরে যুক্তি কাজ করেছে। যদিও আপনি হয়ত সেটা সচেতনভাবে বুঝতে পারছেন না। আসুন এবার দেখিয়ে দেই, আপনার মনের ভিতরে আপনি কি ভেবেছেন। আপনি ভেবেছেন যে, নাস্তিকের উচিত ছিলো যুক্তিবিদ্যার নিয়ম মেনে প্রশ্ন করা। আর যুক্তিবিদ্যায় প্রশ্ন করার নিয়মটা কেমন?

প্রশ্ন করার নিয়ম

১. প্রথমে প্রশ্ন করতে হবে: স্রষ্টার কি শরীর আছে?

২. যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তখন দ্বিতীয় প্রশ্ন: স্রষ্টা কি তার শরীর ব্যবহার করে বিভিন্ন জিনিস তুলতে পারে?

৩. যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তখন তৃতীয় প্রশ্ন: স্রষ্টার শরীরের উপর কি অভিকর্ষজ বল কাজ করে?

৪. যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তখন চতুর্থ প্রশ্ন: পৃথিবীপৃষ্টের উপরে এমনও ভারী জিনিস কি স্রষ্টা বানাতে পারবে, যা তুলতে হলে স্রষ্টার শরীরের শক্তির চেয়ে বেশি শক্তি প্রয়োজন হয়?

কিন্তু নাস্তিক একলাফে চার নাম্বার প্রশ্নে চলে গিয়েছে। অর্থাৎ, ১, ২, ও ৩ নং প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ ধরে নিয়েছে সে (assume করেছে)। অথচ ঐ তিনটা প্রশ্নের উত্তরে আমি মুসলিম তো হ্যাঁ বলব না। প্রথম তিনটা প্রশ্নে আমার সাথে একমত না হয়েই কেন সে লাফ দিয়ে চার নাম্বার প্রশ্নে গেল? এমনকি আমার মতামতও জানতে চাইলো না? এখন ওর মূল প্রশ্নটার উত্তর দিতে যাওয়া মানেই ওর ১, ২, ৩ নং মেনে নেয়া। এটা ফাজলামি ছাড়া আর কী? অতএব, ওর প্রশ্নকেই আমি প্রত্যাখ্যান করলাম। কারণ ওর প্রশ্নে ফ্যালাসি তথা অপযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

কিন্তু পাঠক! আপনিতো এসব কথা বললেন না। আপনি বললেন, “মিয়া ফাইজলামি পাইছেন?” এটাতো সঠিক জবাব হলো না, তাই না? তাহলে আসুন আরো গভীরে চিন্তা করে দেখি, আপনি নাস্তিকের জবাবে উপরের আলোচনাটা না করে কেন সরাসরি বললেন, “ফাজলামি পাইছেন?”

আসলে লুকানো বাক্যগুলো বের করার পর আপনি বুঝতে পেরেছেন যে, নাস্তিক লোকটা জেনেশুনেই ফ্যালাসি ব্যবহার করে প্রশ্ন তৈরী করেছে, যেন আপনি আটকা পড়ে যান। কারণ আপনার যে যুক্তিবিদ্যার চর্চা কম! এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে সে। আর একারণে আপনার রাগ হয়েছে। আপনি বুঝতে পেরেছেন যে, এধরণের ফ্যালাসিমূলক প্রশ্ন যেসব নাস্তিক তৈরী করে, তারা সত্যপ্রেমী না, তারা মানুষকে ভালোও বাসে না। তারা আসে শুধু বিরক্ত করতে। তাই শেষমেষ বিরক্ত হয়ে আপনার মুখ দিয়ে যে কথাটা বেরিয়েছে তা হলো: “মিয়া ফাইজলামি পাইছেন?”

প্রিয় পাঠক, দেখেছেন, একটা বাক্যের পিছনে আমাদের ব্রেইনে কত ক্যালকুলেশান আর কত অনুভূতি কাজ করে!

এখন পাঠক!

আপনিতো বুঝে গেলেন যে ও ফাজলামিই করতে এসেছে। মুক্তমনার ছদ্মবেশে বদ্ধমনা নাস্তিক, খোদাপ্রেমিকদেরকে বিরক্ত করাই যার কাজ। এখন আপনি যদি বিরক্ত হয়ে নাস্তিকের মাথায় একটা “কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান চাঁটি” মেরে বসেন, তাহলে আমার বলার কিছু নেই। কারণ আস্তিক-নাস্তিক রেসলিং শো শুরু হয়ে গেছে। এখন দর্শক হর্ষধ্বনি করবে আর হাততালি দেবে। ওসবে আমার কাজ নেই। আমি ফিরে চললাম আমার একাকী স্রষ্টাভাবনায়।

প্রশ্ন-২: স্রষ্টা কি নিজেকে ধ্বংস করতে পারবেন?

প্রিয় পাঠক!

নিশ্চয়ই শিরোনাম দেখেই বুঝে ফেলেছেন যে, এটিও বাঙালী নাস্তিকদের বিদেশ থেকে আমদানীকৃত অনুবাদ-যুক্তি। আসলে বাংলা ভাষায় নাস্তিকদের মৌলিক লেখা খুবই কম। বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানীকৃত অনুবাদ-নাস্তিকতা। অন্যের থেকে ধার করা বুদ্ধি দিয়ে আর কতদিন চলা যায়? তাই আপনি যখন মৌলিক দর্শন ও যুক্তি দিয়ে তাদের কথার জবাব দেবেন, তখন রানা প্লাজার মত হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে তাদের নাস্তিকতার প্রাসাদ। কেননা নাস্তিক্যবাদী যুক্তিগুলো বাহ্যিকভাবে দেখতে চকচকে হলে কী হবে, ভিতরে অন্তঃসারশূন্য এবং নিচে কোনো ভিত্তি নেই। আর যে বাড়ির ভিত শক্ত নয়, তার পিলার ধরে একটু নাড়াচাড়া করলে সেটাতো ভেঙে পড়তেই পারে! সেটা কি তাদের দোষ, যারা পিলার ধরে নাড়াচাড়া করে?

যাহোক, আসুন আমরা বাক্যটাকে ভেঙে লিখি। লুকানো বাক্য বের করি। মূল বাক্য: “স্রষ্টা কি নিজেকে ধ্বংস করতে পারবেন?” ভেঙে লিখলে:

১. স্রষ্টা বিভিন্ন জিনিস ধ্বংস করতে পারে।

২. স্রষ্টা নিজেও ধ্বংসযোগ্য একটি বিষয়/জিনিস।

৩. (মানুষ যেভাবে নিজেকে ধ্বংস (অর্থাৎ আত্মহত্যা) করতে পারে, অনুরূপভাবে) স্রষ্টা কি নিজেই নিজেকে ধ্বংস করতে পারবে?

এখানে ১ নং পয়েন্ট সত্য হলেও ২ নং পয়েন্ট সত্য নয়। কেননা, পরম স্রষ্টার ক্ষেত্রে সৃষ্টি ও ধ্বংস প্রযোজ্য নয়। অতএব, এখানেও নাস্তিক ফ্যালাসি করেছে (ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান)। পাঠক, First Cause পর্বের আলোচনাটা মনে আছে? সেখানে বলেছিলাম যে যুক্তি হলো একটা বাড়ির মত। ইটের উপর ইট, একতলার উপর দ্বিতীয় তলা, তার উপর তৃতীয় তলা … এভাবে করে তৈরী করতে হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখুন, উপরের ৩টি পয়েন্টকে একটা তিনতলা বাড়ি কল্পনা করলে:

১ম তলা ঠিক আছে।

২য় তলা মিথ্যা হবার কারণে বুলডোজার দিয়ে আমরা ভেঙে দিলাম।

অতএব, ৩য় তলা অটোমেটিক ধ্বংস হয়ে গেল।

একইভাবে “স্রষ্টা ও ভারী বস্তুর” যে প্রশ্নটা নাস্তিকরা তৈরী করে, সেটা হলো আটতলা বিশিষ্ট একটা বাড়ির মত, যার দ্বিতীয় তলায় বলা হয়েছে: স্রষ্টার শরীর আছে। কিন্তু এটাতো মিথ্যা কথা। অতএব, এটারও দ্বিতীয় তলা আমরা ভেঙে দিলাম বুলডোজার দিয়ে। ব্যস, আটতলা বাড়ি পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেল। অতএব, প্রিয় পাঠক! আপনি যদি সঠিক নিয়মে অগ্রসর হন, তাহলে নাস্তিকের যুক্তির প্রাসাদ যদি ১০০ তলাও হয়, তবুও আপনি হয়তো যুক্তির বুলডোজার দিয়ে ওটার গোড়াতেই আঘাত করে তা ধ্বংস করে দিতে পারবেন! কিন্তু সেজন্যে শান্ত মাথায় যুক্তিবিদ্যার চর্চা করতে হবে।

বক্তব্য-৩: “স্রষ্টার একটা অক্ষমতা হলো, তিনি মিথ্যা বলতে পারেন না।”

পাঠক! এটাও বাঙালী নাস্তিকদের একটা আমদানীকৃত অনুবাদ-যুক্তি। এদেশের কিছু সাহিত্যিক যেমন বিদেশী সাহিত্য অনুবাদ না করে সাহিত্যিক হতে পারেন না, তেমনি এরাও বিদেশী নাস্তিকতা অনুবাদ করা ছাড়া নাস্তিক হতে পারে না। সে যাকগে। আসুন এটারও লুকানো বাক্যগুলো খুঁজে বের করি।

এখানে লুকানো বাক্যগুলো হলো:

১. স্রষ্টার বিভিন্ন চাহিদা/প্রয়োজন আছে।

২. সেসবের কিছু চাহিদা পূরণ করতে গেলে স্রষ্টার মিথ্যা কথা বলার প্রয়োজন পড়ে।

৩. কিন্তু স্রষ্টা বৈশিষ্ট্যগতভাবেই মিথ্যা বলতে অক্ষম।

৪. অতএব, স্রষ্টার কমপক্ষে একটি অক্ষমতা আছে।

এখন দেখুন, ১ ও ২ নং পয়েন্টই তো মিথ্যা! পরম স্রষ্টার কোন চাহিদাই নেই, মিথ্যা বলার প্রয়োজন তো দূরের কথা। তিনি তো সীমার ঊর্ধ্বে (beyond limitations); তিনি অসীম, প্রকৃত ইনফিনিটি (true infinity)। পক্ষান্তরে, সীমা/সীমাবদ্ধতা/চাহিদা ইত্যাদি তো সৃষ্টিজগতের বৈশিষ্ট্য। এগুলি তো পরম স্রষ্টার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যই হতে পারে না। বিষয়টা আরেকটু বিস্তারিতভাবে বলা যেতে পারে।

অক্ষমতা দুইভাবে হতে পারে:

১. সমগোত্রীয়রা যা পারে, কেউ তা পারছে না। যেমন, আর সব মানুষ কথা বলতে পারছে, একজন পারছে না। আর সব মানুষ দুই পায়ে হাঁটতে পারছে, কেউ হয়তো পারছে না। যারা পারছে না, তাদের অক্ষমতা আছে বলবো।

২. ইচ্ছা/ আকাঙ্খা/ চাহিদা/ অভাব/ প্রয়োজন আছে, কিন্তু পারছে না। যেমন, মানুষের ইচ্ছা আছে পাখির মত উড়বে, কিন্তু পারছে না। কোনো মানুষের দৈনিক এক লাখ টাকার চাহিদা আছে, কিন্তু অত টাকা সে উপার্জন করতে পারছে না। যারা পারছে না, তাদের অক্ষমতা আছে বলবো।

এখন, একটা বিড়াল কখনো ক্রিকেটার হতে পারবে না, আমরা জানি। আমরা যদি বলি – "বিড়াল ক্রিকেট খেলতে পারে না, এটা বিড়ালের অক্ষমতা", তবে কি সেটা উপরের দুটি বিবেচনায় অক্ষমতা হবে? কারণ আমরা জানি যে কোনো বিড়ালই ক্রিকেট খেলতে পারে না, তাদের ইচ্ছাও হয় না, তাদের চাহিদাও নেই, প্রয়োজনও নেই। চিন্তা করুন, একটা বিড়াল আরেকটা বিড়ালকে বলছে – "আরে মানুষের তো লেজ-ই নাই, রাগের সময় লেজ নাড়াবে কিভাবে? হাহাহা… মানুষের অক্ষমতা দেখেছো?” কিংবা একটা গরু আরেক গরুকে বলছে, “আহারে মানুষ ছানা! একটা লেজ পর্যন্ত নাই যে মাছিগুলো তাড়াবে।” কিন্তু আসলে কি এটা আমাদের অক্ষমতা? না, কারণ একদিকে যেমন লেজ নাড়ানো আমাদের জন্য প্রযোজ্য বিষয় না, অপরদিকে আমাদের এটা ইচ্ছাও হয় না, এবং এর চাহিদাও আমাদের নেই। এখন পাঠক, যদি কারো ইচ্ছা হয় যে – "ইশ! যদি লেজ নাড়াতে পারতাম!” কিংবা মনে হয় যে – “ইশ, যদি বানর হতাম!” তাহলে আমার কিছু বলার নেই। তাহলে ঐ মানুষের জন্য ঐ গরুর বক্তব্যটাই হয়ত সঠিক! তখন ঐ মানুষ সগর্বে বলে বেড়াবে: “আমার লেজ নেই, এটা আমার অনেক বড় অক্ষমতা।”

কিন্তু অপরদিকে দেখুন, যেমন, আমাদের মাঝেমাঝে পাখির মতো উড়ে বেড়ানোর ইচ্ছা হয়। ইচ্ছা আছে, প্রয়োজন আছে, কিন্তু বৈশিষ্ট্যগত কারণে পারছি না উড়তে (কারণ আমাদের ডানা নেই)। তখন সেটাকে আমরা সীমাবদ্ধতা বলে গ্রহণ করি। অক্ষমতা বলি।

কিন্তু দেখুন, সর্বশক্তিমান স্রষ্টার না এমন কোনো অভাব/ চাহিদা আছে, আর না এটা তাঁর বৈশিষ্ট্য যে তিনি সসীম হবেন। কোন অভাব পূরণের জন্য তিনি দেহ ধারণ করতে চাইবেন? খারাপ মানুষের সাথে যুদ্ধ করার জন্য? তিনিতো ইচ্ছা করলেই সাথে সাথে ঐ মানুষের মৃত্যু ঘটবে! কেননা সমস্ত সৃষ্টিজগত তাঁর আদেশের অধীন। অতএব, কেন তিনি দেহ ধারণ করবেন? মানুষের পাপের বোঝা বইবার জন্য? তিনিতো চাইলেই মুহুর্তে যে কাউকে ক্ষমা করে দিতে পারেন! কেন তিনি সসীম হবেন, দেহ ধারণ করবেন? কী তাঁর অভাব? মানুষকে তাঁর বাণী পৌঁছে দেওয়া? সেটাতো তিনি ইচ্ছা করলেই মানুষের মস্তিষ্কের ভিতরে তাঁর কথা জেগে উঠবে! কেননা, গোটা সৃষ্টিজগতের সকল অনু-পরমাণুই তো তাঁর ইচ্ছার অধীন! কেন তিনি দেহ ধারণ করে ভারী বস্তু তুলতে চাইবেন? তিনিতো আদেশ করলে পৃথিবীর ঘূর্ণন যাবে থেমে, অভিকর্ষজ বল নাই হয়ে যাবে, কিংবা তাঁর আদেশে পাহাড়গুলো তুলার মত উড়বে! তিনিতো গোটা সৃষ্টিজগতের উপর সুপ্রিম কমান্ডের অধিকারী!

অতএব, যুক্তির বুলডোজারের আঘাতে প্রথম ও দ্বিতীয় তলা ভেঙে দিলাম আমরা। ফলে গোটা যুক্তিটাই ধ্বসে পড়লো। আসলে পাঠক, নাস্তিক্যবাদী অধিকাংশ যুক্তিই এমন বিভিন্ন ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরী করা। তাই ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান ঠিকমত শনাক্ত করতে পারলেই ভেঙে পড়বে নাস্তিকতার যত প্রাসাদ। দেখুন এজাতীয় আরো কিছু ফ্যালাসিপূর্ণ যুক্তি/প্রশ্ন/বক্তব্যের লুকানো বাক্যগুলো।

প্রশ্ন-৪: ঈশ্বর কোথায় আছেন?

উত্তর: এখানে স্রষ্টাকে স্থান দ্বারা সীমিত ধরে নেয়া হয়েছে (assume করা হয়েছে)। অথচ স্থান (space) বিষয়টা সৃষ্টিজগত ও বস্তুজগতের সাথে সম্পর্কিত, পরম স্রষ্টার সাথে নয়। তিনি বস্তুজগতকে সৃষ্টি করার সাথে সাথে স্থান ও কাল নামক মাত্রাগুলি তৈরী হয়েছে। তিনি নিজে এই সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। [দার্শনিক স্রষ্টাভাবনার সপ্তম প্রস্তাব]

পাল্টা প্রশ্ন: তাহলে কুরআনে যে আল্লাহর কুরসি বা চেয়ার এর কথা বলা হয়েছে?

উত্তর: যখন আমরা বলি যে, “ওমুক লোকটা গদির লোভে নির্বাচন করছে”, তখন কি আমরা গদিআঁটা আরামদায়ক কোনো চেয়ারকে বুঝাই?

বক্তব্য-৫: ঈশ্বর সর্বব্যাপী, তিনি সব জায়গায় আছেন, তাই তিনি ময়লা জিনিসের মধ্যেও আছেন।

জবাব: ১. ঈশ্বর এর সংজ্ঞা দিন। ২. প্রমাণ করুন তিনি সর্বব্যাপী। ৩. তারপর প্রমাণ করুন তিনি ময়লার মধ্যে আছেন।

কিন্তু পাঠক!

একজন নাস্তিক কখনো সেটা পারবে না, কেননা সংজ্ঞায়ন পর্বেই সে আটকে যাবে। এছাড়াও, এখানেও ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান ব্যবহার করা হয়েছে। স্রষ্টাকে বস্তুজগতের অন্তর্ভুক্ত ধরে নেয়া হয়েছে (assume করা হয়েছে)। অথচ তিনি বস্তুজগতের স্রষ্টা, এবং বস্তুজগতের সাথে তাঁর স্থানিক সম্পর্ক হতে পারে না।

প্রশ্ন-৬: ঈশ্বরের স্রষ্টা কে?

ফ্যালাসি: ঈশ্বরকে “সৃষ্টিযোগ্য জিনিস/বিষয়” ধরে নেয়া হয়েছে (assume করা হয়েছে)। অথচ ‘পরম স্রষ্টা’ কথাটার অর্থই হলো যিনি first cause, যাঁর কোনো স্রষ্টা নেই অথচ যিনি অস্তিত্বমান।

প্রশ্ন-৭: ঈশ্বরের আগে কী ছিল?

ফ্যালাসি: স্রষ্টাকে সময়ের অধীন ধরে নেয়া হয়েছে (assume করা হয়েছে)। অথচ সময় হলো দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতার মতই একটি মাত্রা, যা সৃষ্টিজগতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, পরম স্রষ্টার ক্ষেত্রে নয়। পরম স্রষ্টা তো প্রকৃত অসীম (true infinity)।

প্রশ্ন-৮: সৃষ্টির আগে ঈশ্বর কী করতেন? তাঁর কি তখনো কোনো কাজ ছিল না?

ফ্যালাসি: স্রষ্টাকে সময়ের অধীন ধরে নেয়া হয়েছে (assume করা হয়েছে)। অথচ ‘সময়’ বিষয়টারই স্রষ্টা তিনি।

বক্তব্য-৯: ঈশ্বর যদি তাঁর সৃষ্ট থেকে ভিন্ন হন, তাহলে তাঁর সর্বব্যাপিতা থাকে না। আর ঈশ্বরের সর্বব্যাপীতা অক্ষুণ্ম রাখলে বিশ্বের যাবতীয় পদার্থই ঈশ্বরময়। (নাস্তিক আরজ মাতুব্বরের সত্যের সন্ধানে বই থেকে)

ফ্যালাসি: “ঈশ্বর সর্বব্যাপী”, “যাবতীয় পদার্থ ঈশ্বরময়” ইত্যাদি কথার মধ্যে স্রষ্টাকে বস্তুজগতের কোনো বস্তু/বিষয় হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে (assume করা হয়েছে)। অথচ তিনি বস্তুজগতের অংশ নন, বরং তিনিই গোটা বস্তুজগতের স্রষ্টা। বস্তুজগতের সাথে তাঁর স্থানিক সম্পর্ক হতে পারে না।

বক্তব্য-১০: বিশ্বজগত সৃষ্টি করার পর মনে হচ্ছে স্রষ্টার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে।

ফ্যালাসি: স্রষ্টাকে সময়ের অধীন ধরে নেয়া হয়েছে (assume করা হয়েছে)। যেমন: “ ‘গতকাল’ স্রষ্টার কোনো কাজ ছিল না। ‘আজকে’ তিনি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলেন। ‘আগামীকাল’ তার কোনো কাজ থাকবে না।” অথচ আজ, গতকাল, আগামীকাল – ইত্যাদি হলো সময় নির্দেশক শব্দ। এগুলি পরম স্রষ্টার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় (দার্শনিক স্রষ্টাভাবনার সপ্তম প্রস্তাব)। আমরা মানুষ যেহেতু সময়ের অধীন, তাই আমাদের ভাষায় ক্রিয়ার কাল (tense) থাকেই। তাই স্রষ্টা সংক্রান্ত আলোচনায়ও আমরা সময়সূচক শব্দ ব্যবহার না করে পারি না। প্রকৃতপক্ষে, পরম স্রষ্টাকে সত্যিকারভাবে বুঝতে হলে এই ভাষার জগতের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।

প্রিয় পাঠক!

আশা করি বইয়ের এই পর্যায়ে এসে আপনি অনুভব করতে পারছেন যে, আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক আসলে কোনো ব্যাপারই না। একটু নিয়ম মেনে অগ্রসর হলেই যেকোনো নাস্তিক্যবাদী যুক্তিকে আপনি পরাজিত করতে পারবেন, তা সেটা যুক্তির যত বড় পাহাড়ই হোক না কেন। আর আপনি এটাও বুঝতে পারছেন যে, নাস্তিকদের অধিকাংশ যুক্তিই প্রকৃত যুক্তি নয়, বরং ফ্যালাসি। তাদের প্রশ্নগুলো অসংখ্য লুকানো কথার ফ্যালাসিতে ভরপুর। আপনি যদি তাদের বিভিন্ন যুক্তিকে ভেঙে লিখতে পারেন, তাহলে দেখবেন যে লুকানো বাক্যগুলির মাঝেই মিথ্যা/ভুল লুকিয়ে আছে। আপনি সেই জায়গাটিতে আঘাত করুন। ব্যস, ১০০ তলা যুক্তির প্রাসাদও নিমিষে ধ্বসে পড়বে।

কিন্তু পাঠক, বলুনতো নাস্তিকতাকে টিকে থাকার জন্য কেন ফ্যালাসি ব্যবহার করতেই হয়? নাস্তিক্যবাদী যেকোনো যুক্তি/প্রশ্ন দেখুন, সবই যেন ফ্যালাসিতে ভরপুর। এ কেমন মতবাদ যে, তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ফ্যালাসিতে পরিপূর্ণ? একটাও সঠিক যুক্তি নেই? সব শুধু – “ফাজলামি”? কারণটা পরিষ্কার। সেজন্যে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সেই বিল্ডিঙের উদাহরণে। দেখতে হবে আস্তিকতা ও নাস্তিকতার ভিত্তি।

_______________________________

কোনোকিছু ‘ধরে নিয়ে’ তার উপর যুক্তি/ প্রশ্ন তৈরী করাই ফ্যালাসি অব অ্যাজাম্পশান।

স্রষ্টা সংক্রান্ত অধিকাংশ নাস্তিক্যবাদী যুক্তিই এই দোষে দুষ্ট।

প্রচলিত আরো কোন কোন নাস্তিক্যবাদী যুক্তিতে এই ফ্যালাসি পেয়েছেন? শেয়ার করুন

মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…