সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

The Third Observer Problem | অনন্তের পথে

 

চতুর্থ ভাগঅনন্তের পথে

||

পর্ব-১: The Third Observer Problem






প্রিয় পাঠক!

সালামুন আলাইকুম। ‘স্রষ্টাভাবনা’ বইয়ের চতুর্থ ও শেষ ভাগে আপনাকে স্বাগতম। এই ভাগে এসে আমি সেইসব কথা বলব, যা বলার জন্য প্রথম থেকে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে আছি। কিন্তু আমি জানি যে, বর্ণমালা না শিখে বইয়ের পাতা হাজারবার উল্টালেও কোনো লাভ নেই। তাই পাঠককে সাথে নিয়ে যুক্তি ও দর্শনের মৌলিক কিছু বিষয় চর্চা করেছি। এই বইয়ের প্রথম তিন ভাগে যেসব অ-অা-ক-খ শিখেছি, সেসব ব্যবহার করেই আমরা অনন্তের পথে এগিয়ে যাব, ইনশাআল্লাহ। “স্রষ্টা কি মানুষের ভবিষ্যৎ জানেন?” – এই প্রশ্নের উত্তর থেকেই সে যাত্রার শুরু। “মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্রষ্টার জ্ঞান” সংক্রান্ত এই ক্ল্যাসিকাল বিতর্কের যে উত্তর আমার কাছে উন্মোচিত হয়েছে, তা এখন পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাই।

শুরুতেই বলে নিতে চাই যে, আরবী ঈমান শব্দের অর্থ যেমন বিশ্বাস নয়, তেমনি তাক্বদীর শব্দের অর্থও ভাগ্য নয়। কিন্তু তাক্বদীর শব্দের ভুল অনুবাদের প্রসঙ্গ যদি বাদও দিই, তবু প্রশ্ন থেকে যায়: “স্রষ্টা কি মানুষের ভবিষ্যৎ জানেন? উত্তর হ্যাঁ হলে সেক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ পূর্বনির্ধারিত। তাহলে পাপের দায় মানুষের হবে কেন? আর যদি তিনি ভবিষ্যৎ না জানেন, তবে তাঁকে সর্বজ্ঞানী বলা কেন?”

এই সমস্যা নিয়ে হাজার বছর ধরে বহু আস্তিক-নাস্তিক মাথা ঘামিয়েছে, বিতর্ক করেছে, এবং মোটামুটিভাবে ভাগ্যবাদ ও কর্মবাদ – এই দুই তত্ত্বের মাঝেই ঘুরপাক খেয়েছে। এছাড়াও, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অতি সম্প্রতি কিছু জগাখিচুড়ি তত্ত্বও আবিষ্কার হয়েছে, যারা কার্যতঃ তৃতীয় সত্তার আমদানী করে ফেলেছে। কিন্তু ভাগ্য প্রশ্নে উক্ত উত্তরগুলির একটিও গ্রহণযোগ্য নয়। কেন? কারণ এটা হলো আসলে তৃতীয় পর্যবেক্ষক সমস্যা: The Third Observer Problem।


থার্ড অবজার্ভার (third observer) বা তৃতীয় পর্যবেক্ষক কী?

দুজন মানুষ ঝগড়া করছে, এমন একটা দৃশ্য কল্পনা করি।

ব্যক্তি-১: তুমি কেন আমার দিকে চোখ গরম করে তেড়ে আসলে?

ব্যক্তি-২: মোটেও না। মিথ্যা কথা! আমি তেড়ে যাইনি।

ব্যক্তি-১: এখন অস্বীকার করবে না। তুমি মারার ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছিলে। এখন কথা ঘুরাচ্ছো তুমি।

ব্যক্তি-২: …

এভাবে ঝগড়া চলছে। এখন ঐ লোকটি আসলেই চোখ গরম করে তেড়ে গিয়েছিলো কিনা, সেটা তো সে নিজে বুঝতে পারছে না। অপরদিকে, ব্যক্তি-১ হয়ত ঝগড়ার উত্তেজনার কারণে স্বাভাবিক দৃষ্টিকেও চোখ গরম করা মনে করেছে, আর দেহের স্বাভাবিক নড়াচড়াকেই ধরে নিয়েছে যে– “আমার দিকে তেড়ে মারতে আসছে।” এই পরিস্থিতিতে আমাদের একজন তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন, যে কিনা উভয় পক্ষকে পর্যবেক্ষণ করে নিরপেক্ষ মতামত দেবে।

আর এই তৃতীয় পক্ষকেই আমরা বলছি তৃতীয় পর্যবেক্ষক বা থার্ড অবজার্ভার (third observer)। কেন এই থার্ড অবজার্ভারের আমদানী করতে হলো? কারণ ঝগড়ার ঘটনাটি যখন ঘটমান ছিল, তখন ব্যক্তি-১ ও ব্যক্তি-২ উভয়েই যদিও ঘটনাটি অবজার্ভ করেছে (অর্থাৎ দেখেছে) এবং সেই অর্থে তারাও অবজার্ভার (observer-পর্যবেক্ষক), কিন্তু তাদের দেখায় ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা আছে। তারা উভয়েই –

১. নিজের চেহারার এক্সপ্রেশান নিজে দেখতে পায়নি

২. নিজের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ নিজে পুরোপুরি দেখতে পায়নি

৩. এবং হয়ত উত্তেজিত থাকার কারণে অপরপক্ষের স্বাভাবিক কথা/ কর্মকে ভুল বুঝেছে।

কিন্তু পাঠক, থার্ড অবজার্ভার হিসেবে আপনার এই সীমাবদ্ধতাগুলি নেই। আপনি দুইজনকেই দেখেছেন সাদাচোখে, অর্থাৎ নিরপেক্ষভাবে। একারণে এই ঝগড়ার দৃশ্যপটে আপনি একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি: থার্ড অবজার্ভার।

থার্ড অবজার্ভার কেইস (third observer case):

“একজন নিরপেক্ষ, তৃতীয় পর্যবেক্ষক হলে কী করত” – আমরা অহরহ এমন থার্ড অবজার্ভার কেইস (third observer case) তৈরী করে থাকি। এমনকি ভাষা সাহিত্যে এর একটি বিশেষ নামই আছে: সর্বদ্রষ্টা তৃতীয় পক্ষের চোখে দেখা (third person omniscient view)। এধরণের সাহিত্যে লেখক নায়কের মনের চিন্তাটাও লেখেন, নায়িকার মনের চিন্তাটাও লেখেন, লেখেন ভিলেনের মনের চিন্তাও। অর্থাৎ, লেখক যে শুধু তাদের বাহ্যিক প্রেম-ভালোবাসা-শত্রুতার বর্ণনা দেন তা-ই না, তিনি তাদের মনের ভিতরেও ঢুকে যান। এমন একটা পারস্পেক্টিভ থেকে তিনি লেখেন, যেখানে তার কোনো বাধা নেই: তিনি সবার মনের ভিতরে ঢুকতে পারেন। এভাবে তিনি গল্পের প্রকৃত চিত্রটা তুলে ধরেন।

সম্ভব কল্পনা বনাম অসম্ভব কল্পনা (possible case vs. impossible case):

পাঠক, আবারো কল্পনা করুন, দুজন ব্যক্তি ঝগড়া করছে। কিন্তু এবার ব্যক্তি দুইজন হলেন আপনি (পাঠক) ও আমি (লেখক)। আরো কল্পনা করুন যে, পৃথিবীতে আর কোনো মানুষ নাই। এমতাবস্থায় আপনি কি একটি থার্ড অবজার্ভার কেইস তৈরী করতে পারবেন? নিশ্চয়ই না। কারণ এখানে দুইটি পক্ষ, লেখক ও পাঠকের বাইরে তৃতীয় কোনো মানুষেরই তো অস্তিত্ব নাই, থার্ড অবজার্ভার আসবে কোত্থেকে? এক্ষেত্রে আপনি যদি থার্ড অবজার্ভার কেইস তৈরী করেন, তবে সেটা হবে ইম্পসিবল কেইস (impossible case-অসম্ভব কল্পনা)।

তৃতীয় পর্যবেক্ষক সমস্যা (The Third Observer Problem):

একইভাবে পাঠক! একদিকে পরম স্রষ্টা, অপরদিকে সৃষ্টিজগত – এই দুইয়ের বাইরে কোনো থার্ড অবজার্ভার কি থাকা সম্ভব? এমন থার্ড অবজার্ভার, যে মানুষের চোখ দিয়েও দেখে না, স্রষ্টার চোখ দিয়েও দেখে না, যে কিনা – শুধুই ‘নিরপেক্ষ’? আর সেই ‘নিরপেক্ষ থার্ড অবজার্ভার’ দূর থেকে দেখে বলে দেবে যে, মানুষের জন্মের আগেই স্রষ্টা তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে রাখছেন কিনা?

না, প্রিয় পাঠক! এটা সম্ভব নয়। সৃষ্টিজগতের ভিতরে আমরা ‘নিরপেক্ষ’ থার্ড অবজার্ভার আমদানী করতে পারি। কিন্তু পক্ষ যখন হয় “স্রষ্টা ও সৃষ্টি”, তখন সেখানে কোনো ‘তৃতীয় পক্ষ’ নাই। এখানে পয়েন্ট অব ভিউ বা পারস্পেক্টিভ শুধুমাত্র দুটি: এক. পরম স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ, দুই. সৃষ্টি হিসেবে মানুষের পারস্পেক্টিভ। কিন্তু তৃতীয় কোনো পারস্পেক্টিভ থাকা সম্ভব না। কেননা, স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টির বাইরে তৃতীয় কোনো সত্ত্বার অস্তিত্বই তো নেই, থার্ড পারস্পেক্টিভ আসবে কোথা থেকে!

আপনি যদি এক্ষেত্রে থার্ড অবজার্ভার কেইস তৈরী করার চেষ্টা করেন, তবে সেটা হবে অসম্ভব কল্পনা (impossible case)। আর অবাস্তব জিনিসের উপর ভিত্তি করে বাস্তব বিষয়ের ব্যাখ্যা দেয়া যায় না। যে থার্ড অবজার্ভারের অস্তিত্বই সম্ভব নয়, তার চোখ দিয়ে দেখে মানুষের ভাগ্য প্রশ্নের সমাধান আপনি দিতে পারবেন না। আপনাকে হয় স্রষ্টার চোখ দিয়ে দেখতে হবে, নাহয় সৃষ্টির চোখ দিয়ে দেখতে হবে। এর বাইরে তৃতীয় পক্ষ থাকা সম্ভব নয়।

অতএব, এমনটা সম্ভব নয় যে, একজন তৃতীয় পক্ষ দূর থেকে বসে বসে দেখবে যে: “ঐযে স্রষ্টা তাক্বদীর নামক ডায়রিতে সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখছে… ঐ দিলো স্টার্ট বাটন প্রেস করে… ব্যস শুরু হয়ে গেল দুনিয়ার খেলা। মানুষের জন্ম হচ্ছে, মৃত্যু হচ্ছে, মানুষ তার ভাগ্য বিষয়ে বিতর্ক করছে… কিন্তু সবই তো আসলে স্রষ্টার লেখা স্ক্রিপ্টে আছে, হা হা হা…।” না, এমনটা সম্ভব নয়।

“মানুষের ভবিষ্যৎ স্রষ্টা কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত কিনা” – এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আসা যেকোনো মানুষকে তাই জিজ্ঞাসা করুন: “আপনি কার দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তর দিচ্ছেন? সৃষ্টির? নাকি স্রষ্টার? নাকি ‘নিরপেক্ষ’ থার্ড অবজার্ভারের?”

যদি সে থার্ড অবজার্ভারের অবস্থান গ্রহণ করতে চায়, তবে তাকে বলুন যে, এটা ইম্পসিবল কেইস। আর বাকী থাকে স্রষ্টার দৃষ্টিকোণ ও সৃষ্টির দৃষ্টিকোণ। সৃষ্টির দৃষ্টিকোণ থেকে তো কোনো উত্তর নেই, আছে শুধু একটি প্রশ্ন: “স্রষ্টা কি মানুষের ভবিষ্যৎ জানেন?” আর বাকী থাকলো স্রষ্টার দৃষ্টিকোণ।

স্রষ্টার দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের ভবিষ্যত কীরকম?

পাঠক! এটাই হলো আমাদের আসল প্রশ্ন। “স্রষ্টা ও মানুষের ভাগ্য” সংক্রান্ত সকল প্রশ্নের মূলকথা এটাই। অর্থাৎ, সৃষ্টির চোখে ‘সময়’ (অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত) যেমন, স্রষ্টার চোখেও কি সময় তেমনই? এই প্রশ্নের জবাবে অনেকে বলেন, “স্রষ্টার কাছে অতীত-বর্তমান ভবিষ্যত নাই, সবই তাঁর কাছে ‘স্থির’, সবকিছু তাঁর সামনে ঘটে বসে আছে।” কিন্তু এই দাবীর কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা তারা আর দিতে পারেন না। কেননা, তারা তো আর স্রষ্টার চোখ দিয়ে (অর্থাৎ স্রষ্টার দৃষ্টিকোণ থেকে) দেখে আসেন নাই!

আসলে পাঠক! এসব ব্যাখ্যা হলো আপনার-আমার কল্পনা, যা আমরা স্রষ্টার উপর চাপিয়ে দিচ্ছি। ঠিক যেভাবে কেউ কেউ স্রষ্টাকে ক্লাস টিচার বানিয়েছে, কেউবা আবার টাইম মেশিনে করে ঘুরিয়েছে!

অথচ মূল ব্যাপার হলো, আমরা মাত্রার ভিতরে থেকে মাত্রাকে যেভাবে দেখি, পরম স্রষ্টা মাত্রার ঊর্ধ্বে থেকে মাত্রাকে কি সেভাবে দেখেন? নিশ্চয়ই না!

কথাটা জটিল মনে হলে একটু সহজে বুঝিয়ে বলি। স্থান, কাল, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা ইত্যাদি হলো আমাদের বিভিন্ন মাত্রা (ডাইমেনশান- dimension)। আমাদের ব্রেইন সকল বস্তুকে দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতার মাত্রায় দেখে। আশেপাশের বিভিন্ন ঘটনাকে সময়ের মাত্রায় দেখে। এইযে যতরকম মাত্রা বা সীমা আমাদের আছে, সেগুলিকে যখন আমরা দেখি, তখন কি আমরা সীমার ঊর্ধ্বে উঠে দেখি? নিশ্চয়ই না। বরং আমার সীমা তথা মাত্রার ভিতরে থেকেই মাত্রাকে দেখি!

মানব মস্তিষ্কের শেষ সীমা

আমাদের ব্রেইনের চিন্তাক্ষমতা মাত্রা দ্বারা সীমিত। আমরা সবকিছুকে মাত্রাসহ দেখি ও চিন্তা করি। এমতাবস্থায় আমরা যখন এমন এক সত্ত্বার মুখোমুখি হলাম, যিনি সকল মাত্রার ঊর্ধ্বে: কোনোরূপ সীমাবদ্ধতা যাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যিনি প্রকৃত অসীম, ট্রু ইনফিনিটি – তখন আমাদের ব্রেইন আর কাজ করে না, স্তম্ভিত হয়ে যায়। আমাদের ব্রেইন শুধু এতটুকু বুঝতে পারে যে: “আমাদের ব্রেইন দিয়ে তাঁকে বোঝা অসম্ভব প্রায়।”

এমতাবস্থায় আমরা কিভাবে বুঝবো যে, স্রষ্টার দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের ভবিষ্যৎ কেমন? কিংবা, আরো ভালোভাবে বলতে গেলে, স্রষ্টার দৃষ্টিতে ‘সময়’ ব্যাপারটা কেমন? সেটা বুঝতে হলে যে আমাদেরকে স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ অর্জন করতে হবে, উঠতে হবে মাত্রার ঊর্ধ্বে! কিন্তু সেটা কি আদৌ সম্ভব?

চলুন এগিয়ে যাই…

_______________________________

ভাগ্যপ্রশ্নের অধিকাংশ প্রচলিত উত্তর থার্ড অবজার্ভার প্রবলেমের ফাঁদে আটকা পড়েছে।

পরম স্রষ্টা ও সৃষ্টি -- এর বাইরে তৃতীয় কোনো পক্ষ (থার্ড অবজার্ভার) থাকতে পারে না।

ভাগ্যপ্রশ্নের উত্তরে The Third Observer Problem একটি অনন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। পাঠকের মতামত আশা করছি


মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…