সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইনফিনিটিতে বসবাস | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা




-∞… … … 0 … … …+∞

উপরের জিনিসটাকে ম্যাথমেটিক্স তথা গণিতশাস্ত্রে বলা হয় সংখ্যারেখা। মাইনাস ইনফিনিটি টু জিরো টু প্লাস ইনফিনিটি। গাণিতিকভাবে সংখ্যারেখায় এভাবেই অসীমকে দেখানো হয়। একজন গণিতবিদকে যদি বলেন, তবে সে বলবে, স্রষ্টার অবস্থান ঐ মাইনাস ইনফিনিটিতে। কিন্তু আমরা কি গণিতবিদ? নাহ। আমরা দার্শনিক। তাই আমাদের স্রষ্টাভাবনা একটু ভিন্নরকম হবে। যে ব্যক্তি কখনো ম্যাথমেটিক্স পড়েনি, সে-ও আমাদের যুক্তি বুঝতে পারবে। আমাদের যুক্তি হবে সবার জন্যে: সর্বজনীন। সেইযে আমরা বলেছিলাম, পৃথিবীতে কোনো আস্তিক-নাস্তিক-বিজ্ঞানী নেই, কোনো গণিতবিদও নেই – এমন নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত অবস্থায় আপনার স্রষ্টাভাবনা কেমন হত? আমরাতো সেটাই ভাবতে বসেছি।

গত পর্বের প্রসঙ্গ ধরে শুরু করি। পরম স্রষ্টা কি ১,০০০ বছর আগে বেঁচে ছিলেন? হ্যাঁ। ১০,০০০ বছর আগে? হ্যাঁ। তারও আগে? হ্যাঁ। এভাবে যত শূন্যই লাগাই না কেন, যত লক্ষ কোটি বছরের অতীত চিন্তা করি না কেন, তারও আগে তিনি ছিলেন। আর সেই সময়টাকেই আমরা বলছি অসীম, অনন্ত, ইনফিনিটি।

এবার আসুন প্রশ্ন করি। প্রশ্ন: ইনফিনিটির শুরু কোথায়?

উত্তর: আরে ভাই, ইনফিনিটি তথা অসীমের যদি শুরুটা জানাই যেত, তাহলে কি আর সেটা ইনফিনিটি হত?

প্রশ্ন: তাহলে, ইনফিনিটির শেষ কোথায়?

উত্তর: ইনফিনিটির আবার শেষ হয় নাকি?

প্রশ্ন: কেন, ঐযে, ইনফিনিটি টু জিরো – জিরো তে এসে ইনফিনিটি শেষ হয়ে গেছে, ঐ সময়ে পরম স্রষ্টাকে হত্যা করেছে মানুষ। গত পর্বে যে আমরা একটা সম্ভাব্য ঘটনা সাজেস্ট করেছিলাম, মনে আছে?

উত্তর: কিন্তু…

আচ্ছা, এবার তাহলে আবার প্রশ্ন করি। মানব সৃষ্টির লক্ষ কোটি বছর আগে… তারও আগে… তখনও স্রষ্টা বেঁচে ছিল। আর ঐটাই ইনফিনিটি। অধিকতর শুদ্ধভাবে বললে, অসীম সময় বা “ইনফিনিট টাইম”। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাহলে কি মানব সৃষ্টির, ধরেন ১০ বছর আগের সময়টা “ইনফিনিট টাইম” এর অন্তর্ভুক্ত নয়? অতীতের ঠিক কোন মুহুর্ত থেকে ইনফিনিটি শেষ হয়ে গেল যে আপনি বলবেন, তার পরের মুহুর্তটা ইনফিনিটির অন্তর্ভুক্ত নয়?

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ইনফিনিটির শুরু, শেষ বা মাঝামাঝি বলে কিছু নাই। ইনফিনিটি সদা বিরাজমান। টাইম এর প্যারালেল একটা ভিন্ন ডাইমেনশান (সময় এর সমান্তরালে একটি ভিন্ন মাত্রা)। যেটা শুধুমাত্র পরম স্রষ্টার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আসলে ইনফিনিটি শব্দটা দিয়ে মানুষ সময়-উর্ধ্ব ডাইমেনশনকেই বুঝায় (a dimension beyond time)। আর পরম স্রষ্টা ঐ ডাইমেনশনেই আছেন। তাই তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে।

“ইনফিনিট টাইম” বা অসীম সময় কথাটাই আসলে ঠিক না। কারণ, সময় এর সীমা আছে: শুরু আছে, শেষ আছে। আমাদের বলা উচিত ইনফিনিটি তথা অসীম হলো একটা ভিন্ন ডাইমেনশান। যেটা পরম স্রষ্টার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। ইনফিনিটি ছাড়া পরম স্রষ্টাকে চিন্তা করা যায় না। ইনফিনিটি হলো তাঁর জগত। পক্ষান্তরে, সময় হলো আমাদের জগত। বলা যেতে পারে, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা যেমন আমাদের তিনটি ডাইমেনশান, তেমনি সময়ও আমাদেরই একটি ডাইমেনশান। স্রষ্টা যখন আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, ঐ মুহুর্ত থেকেই দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ও সময় – এই চারটি ডাইমেনশান এর সৃষ্টি হয়েছে।

তাই, তিনি মানুষকে সৃষ্টি করার সাথে সাথে টাইম এর ডাইমেনশানটা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি নিজে এই ডাইমেনশানের ঊর্ধ্বে।

অতএব, “গতকাল তো স্রষ্টা বেঁচে ছিল, আজকেও কি বেঁচে আছে” – এমন প্রশ্নই হলো অবান্তর প্রশ্ন। তাঁকে প্রকৃতভাবে অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে ইনফিনিটি বুঝতে হবে। আর সেজন্যে আমাদেরকে সময়ের ঊর্ধ্বে চিন্তা করতে হবে: We have to think beyond the dimension of time.পাঠক! একটু আগেই আমরা বলেছি ইনফিনিটি হলো “সময়ের সমান্তরাল একটি ডাইমেনশান”। কিন্তু আসলে ‘ডাইমেনশান’ কথাটাও ইনফিনিটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। কেননা, ডাইমেনশান মানেই মাত্রা, আর মাত্রা মানেই সীমা। অথচ আমরাতো অসীম নিয়ে কথা বলছি। অর্থাৎ, ইনফিনিটি। অতএব, সকল মাত্রা/সীমা/সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে যিনি, তিনিই পরম স্রষ্টা, তিনিই প্রকৃত ইনফিনিটি (true infinity)।

ইনফিনিটিতে বসবাস | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা



পাঠক, স্বল্প আলোচনা হলেও বিষয়বস্তুটা কিন্তু অনেক ভারী। আর আমরাতো আগে কখনো ইনফিনিটি নিয়ে এভাবে চিন্তা করি নাই। তাই যুক্তিগুলো বুঝতে পারলেও ধারণ করতে একটু সময় লাগবে। প্রয়োজনে নিজেকে সময় দিন। আর দশটা বইয়ের মত করে এই বইটাকেও একটানা না পড়ে বরং বন্ধ করে ফেলুন। এই পর্বে এসেই থেমে যান। নিজেকে সময় দিন। দুই দশদিন রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে আপনমনে ভাবতে থাকুন। আপন মনে দার্শনিক যাত্রা করুন। স্রষ্টাভাবনা করুন, ইনফিনিটিকে অনুধাবন করুন। তারপর আবার বাকিটুকু পড়ুন।

কেননা, ঐযে একজন বিখ্যাত ব্যক্তির উক্তি আছে যে: If you can’t explain in simply, you don’t understand it well enough. অর্থাৎ, আপনি যদি কোনো বিষয়কে সহজে ব্যাখ্যা করতে না পারেন, তার মানেই হচ্ছে বিষয়টা আপনি যথাযথভাবে বোঝেননি। তাই এই পর্যায়ে এসে নিজেকে প্রশ্ন করুন: আরেকটা মানুষকে সহজভাবে ইনফিনিটি বুঝাতে পারবেন কি? ইনফিনিটি সম্পর্কে নিজের জ্ঞানের ভিত্তিটা কি যথেষ্ট দৃঢ়, স্বচ্ছ ও গভীর?

প্রিয় পাঠক! আমরা সীমাবদ্ধ জীব। আমরা যে ভাষায় কথা বলি, তাতে ক্রিয়ার কাল তথা tense ছাড়া কথা বলতে পারি না। জন্ম থেকেই আমরা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা ও সময় – এই চারটি মাত্রায় ব্ন্দী। সময়ের উল্লেখ ছাড়া আমরা কথা বলতে পারি না। আমাদের সকল কথাতেই সময়ের ইঙ্গিত থাকে: “আজ এটা করেছি, কাল ওটা করব, অতীতে তুমি এমন ছিলে না, ভবিষ্যতে ওমুক ঘটনা ঘটবে…” ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ, সময় ব্যবহার করা ছাড়া আমরা কথাই বলতে পারি না। আমাদের বাংলা ভাষাই বলেন কি ইংরেজি, আরবি-ফার্সি, উর্দু-হিন্দি যা-ই বলেন না কেন, সব ভাষার বাক্যই কোনো না কোনো tense এর অন্তর্ভুক্ত হবে।

আর এমনই সীমাবদ্ধ মাধ্যম “ভাষা” ব্যবহার করে যখন সময়ের উর্ধ্ব বিষয় ‘ইনফিনিটি’ বুঝাতে হয়, তখন একটু বেগ পেতে হয় বৈকি! অন্ধকে কিভাবে বুঝাবেন দুধের রঙ কেমন? অনেকটা তেমন ব্যাপার! আর আমাদের গোটা বইটাই তো সেই ইনফিনিটি তথা পরম স্রষ্টাকে নিয়ে। তাই আলোচনা করার সময় আমাদের কথাগুলি মানুষের ভাষারীতি ব্যবহার করেই বলা হবে, কিন্তু সবসময় খেয়াল রাখতে হবে যে, আমরা যাকে নিয়ে কথা বলছি, তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে, তিনি প্রকৃত ইনফিনিটি।

_______________________________

“ইনফিনিটির শুরু, শেষ বা মাঝামাঝি বলে কিছু নাই।

ইনফিনিটি সদা বিরাজমান। পরম স্রষ্টাই ইনফিনিটি।”

এই ধারণাটি কি আপনার কাছে নতুন? নিচের কোডটি মোবাইলে স্ক্যান করে লেখক-পাঠকদের সাথে আপনার ভাবনা শেয়ার করুন।


মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…