সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা





আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।

মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং

আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:

আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।

স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং

আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।

এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্ছা, ধরে নিলাম “মানুষের স্রষ্টারও” একজন স্রষ্টা ছিল। এমনকি যদি সেই স্রষ্টারও স্রষ্টা থেকে থাকে, এবং তারও স্রষ্টা থেকে থাকে… এভাবে করে মানুষের স্রষ্টার স্রষ্টা, তার স্রষ্টা, তার স্রষ্টা…। এভাবে আমরা যতই কল্পনা করি না কেন, পিছনে যেতে যেতে অর্থাৎ ব্যাকট্র্যাকিং করতে করতে একটা পর্যায়ে গিয়ে অবশ্যই এমন একজন স্রষ্টা থাকতে হবে, যার আর কোনো স্রষ্টা নেই। যাকে কেউ সৃষ্টি করেনি, যে অসৃষ্ট, কিন্তু অস্তিত্বমান ছিল (uncreated, but existent)। সে-ই সর্বপ্রথম স্রষ্টা: আদি স্রষ্টা, পরম স্রষ্টা। দর্শনশাস্ত্রে এই আলোচনাটাকে বলে first cause বা আদি কারণ।

তো, এই first cause-কেই আমরা বলছি, “পরম স্রষ্টা”। এমন এক স্রষ্টা, যার সৃষ্টি হয়নি: যে সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে, কিন্তু অস্তিত্বমান ছিল মানব সৃষ্টির সময়ে। অতএব, মানুষের একজন পরম স্রষ্টা ছিল।

কিন্তু এখানেই আমাদের স্রষ্টাভাবনা শেষ হয়ে যায় না। যদি হতই, তবে সেটা আজকের এই বইয়ের আকার ধারণ করত না। ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে আমরা পরম স্রষ্টার অস্তিত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম শুধু। কিন্তু তখনই উৎসুক মনে নতুন প্রশ্নের উদয় হয়: “আদি মাতা তো মরে গেছে। তেমনি করে আদি স্রষ্টা তথা পরম স্রষ্টাও কি মরে গেছে? নাকি আজও বেঁচে আছে?” এমনি আরো কত প্রশ্ন!

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা



এতো গেলো নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মনের চিন্তা। অপরদিকে, প্রভাবিত মন (biased mind) কিভাবে চিন্তা করে দেখুন:
মুসলিম: “এই লেখক আসলে কী বুঝাতে চাচ্ছে? সে স্রষ্টার পক্ষে যুক্তি দিলো, তারমানে সে নাস্তিকদের বিপক্ষে। কিন্তু লোকটা ইসলামের পক্ষে তো? শেষমেষ না আবার বহু ঈশ্বরবাদের গল্প ফেঁদে বসে, কে জানে?”

হিন্দু: “স্রষ্টাকে uncreated বলল ঠিক আছে। কিন্তু পরে আবার অবতারবাদের বিরুদ্ধে যুক্তি দেবে নাতো? এই লোকের যুক্তিগুলো খুব খেয়াল করে দেখতে হবে…।”

খ্রিষ্টান: “নাস্তিকদেরকে যুক্তিতে হারালো, কিন্তু শেষমেষ খ্রিষ্টধর্মের পক্ষে যাবেতো? নাকি আবার ইসলামের দিকে টেনে নিয়ে যাবে? কারণ লেখকের নাম তো দেখছি মুসলিম নাম।”

নাস্তিক: “আরে ও তো মুসলমান। ওতো স্রষ্টাকে প্রমাণের চেষ্টা করবেই। আবার বলছে যে তার যুক্তিগুলো নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মনের গবেষণার ফসল। হাহাহা…।”

বিবর্তনবাদী: “কিন্তু ডারউইনের বিবর্তনবাদ বলে যে…।”

বিজ্ঞানবাদী: “দুইলাইন লিখেই স্রষ্টাকে প্রমাণ করে ফেলল? কোনো সায়েন্টিফিক এভিডেন্স নাই, কিছু নাই, আর হয়ে গেল?”…

প্রিয় পাঠক!

কিন্তু একবার ভেবে দেখুন তো, আপনি যদি ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম বা খ্রিষ্টধর্মের নামই না শুনতেন, কিংবা কোনো নাস্তিকের কাছে বিবর্তনবাদ, বিগ ব্যাং ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন থিয়োরি না শুনতেন, তখন কি আপনার মনে এসব প্রশ্ন আসত? নিশ্চয়ই না! তখন আপনার মনে স্রষ্টাভাবনা কেমন হত? তাই আমি আবারও আহবান করছি, আসুন, আমরা একটি নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মন নিয়ে চিন্তা করি। সবরকম আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তা করি। আপনি যেই ধর্মের মানুষই হোন না কেন, সেই ধর্মের সব চিন্তাকে দুটো ঘন্টার জন্য পাশে সরিয়ে রাখুন। স্রষ্টার পক্ষে-বিপক্ষে আপনি এযাবত যতকিছু শুনেছেন, সব আপাততঃ ভুলে যান। তারপর আসুন, একটা এক্সপেরিমেন্ট করি। দেখি, আমাদের নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মন কিভাবে চিন্তা করে? কী যুক্তি দাঁড় করায়? কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছে?

যদি আমরা তা করতে পারি, তবে এটাই হলো দার্শনিকের যাত্রা। যদি আপনি সেভাবে চিন্তা করতে সক্ষম হন, তবে আপনিও একজন দার্শনিক।

পাঠক, এবার আপনিই বলুন, আমি কি ঐসব বিভিন্ন ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত মনকে খুশি করব, নাকি আপনাকে? নাকি কাউকেই খুশি করার চেষ্টা না করে নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মনকে বাধাহীন নদীর মত বয়ে যেতে দিব? আর দেখব, সে জ্ঞানের কী কী মণিমুক্তা তুলে আনে!

যদি ঐসব প্রভাবিত মনকে খুশি করতে চাই, তাহলেতো নাস্তিক ব্যক্তি প্রথমেই নাখোশ হয়ে গেছে। কারণ অলরেডি আমি first cause বা পরম স্রষ্টাকে যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করে ফেলেছি। অপরদিকে আস্তিকেরা প্রত্যেকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে: “যুক্তিগুলো শেষমেষ আমার ধর্মের পক্ষে যাবে তো?”

যাহোক, আমাদের প্রশ্নে ফিরে আসি। প্রিয় পাঠকের সাথে নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মনের অ্যাডভেঞ্চারে ফিরে যাই। মানুষের একজন পরম স্রষ্টা ছিল, যে অসৃষ্ট (uncreated)। এখন নতুন সব প্রশ্নের উদয় হলো: সেই পরম স্রষ্টা এখনও বেঁচে আছে কিনা? থাকলে কোথায় আছে? তার বৈশিষ্ট্য কী? এই নিয়ে আমরা দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করব।

_______________________________

“পরম স্রষ্টা হলেন এমন একজন স্রষ্টা, যাকে কেউ সৃষ্টি করেনি।

তিনি অসৃষ্ট, কিন্তু অস্তিত্বমান, তিনিই আদি কারণ বা first cause.”

এবিষয়ে লেখক ও পাঠকদের সাথে আলোচনা করতে মোবাইল দিয়ে নিচের QR কোডটি স্ক্যান করুন।

মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…