সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পরম স্রষ্টার মৃত্যু? | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা



প্রশ্ন: আদি পিতা-মাতা মরে গেছে; আদি স্রষ্টাও কি মরে গেছে? শেষ হয়ে গেছে?

শেষটা নিয়ে কথা বলার আগে শুরুটা নিয়ে কথা বলতে হবে। যেমন:

আজকে আপনি বেঁচে আছেন? হ্যাঁ।

গতকাল বেঁচে ছিলেন? হ্যাঁ।

পরশু? তার আগেরদিন? একবছর, দুইবছর, দশবছর আগে? হ্যাঁ।

কিন্তু ১,০০০ বছর আগে? না। কারণ, আপনার তখন সৃষ্টিই (জন্ম) হয়নি।

এবার পরম স্রষ্টার ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রশ্ন করি:

মানব সৃষ্টির সময় তিনি বেঁচে ছিলেন? হ্যাঁ।

তার আগেরদিন বেঁচে ছিলেন? হ্যাঁ।

তার আগেরদিন? তার দশবছর আগে? তারও ১,০০০ বছর আগে? হ্যাঁ।

এভাবে, যত পিছনেই যান না কেন, তিনি বেঁচে ছিলেন। কেননা, তার তো কোনো শুরু নেই, কেউ তাকে জন্ম দেয়নি, সৃষ্টি করেনি, কিন্তু তিনি অস্তিত্বমান। (He exists, but He was never created. He never had any beginning, yet He exists.)

আবারও একটু বলি।

মানব সৃষ্টির ১০,০০০ বছর আগেও কি পরম স্রষ্টা বেঁচে ছিলেন? হ্যাঁ।

১০০,০০০? এভাবে আপনি যতই সংখ্যা বাড়ান না কেন, উত্তর আসবে – হ্যাঁ।

১ এর পিছনে যতই শূন্য লাগান, এভাবে যত বড় সংখ্যা বানানোরই চেষ্টা করেন না কেন, সেই সময়েও তিনি ছিলেন। এটাকে বলা হয়, অসীম, অনন্ত, ইনফিনিটি (infinity)।

প্রিয় পাঠক,

আসুন, এখন নিজেই নিজেকে চ্যালেঞ্জ করি। দার্শনিকেরা নিজের জ্ঞানকে নিজেই চ্যালেঞ্জ করে, এবং এভাবে তারা শুদ্ধতর জ্ঞান অর্জন করে থাকে। সেভাবেই আমরা নিজেদেরকে চ্যালেঞ্জ করব এখন।

আমরা সিদ্ধান্তে এসেছি যে, মানুষের পরম স্রষ্টা অনন্তকাল থেকে বেঁচে ছিলেন… মানব সৃষ্টির সময় পর্যন্ত। কিন্তু মানুষকে সৃষ্টি করার পরে যে তিনি মারা যান নাই, তারই বা নিশ্চয়তা কই? কিংবা মানুষ যে তার স্রষ্টাকে হত্যা করে নাই, তারই বা গ্যারান্টি কী? ধরেন, পরম স্রষ্টা নিজহাতে মানুষ সৃষ্টি করলেন: নারী ও পুরুষ, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা। তারপর সেই মানুষ উল্টা তার স্রষ্টাকেই হত্যা করল! তখন?

অনন্তকাল থেকে বেঁচে থেকেও পরম স্রষ্টা মরে গেল! ব্যস, মানুষের পরম স্রষ্টা বলে আর কিছু নাই! পরম স্রষ্টার আয়ুস্কাল গাণিতিক সংখ্যারেখায় ইনফিনিটি টু জিরো!

পরম স্রষ্টার মৃত্যু? | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা



কিন্তু আসলেই কি তাই? এটা আমাদের ধারণা মাত্র। আমরা এই কথাগুলো বলেছি “যদি”-র উপর ভিত্তি করে। কিংবা, “ধরেন” - এইভাবে কল্পনা করে নিয়ে। এটা একটা সম্ভাবনা মাত্র। কিন্তু আসলেই কি সেটা ঘটেছে? আমরা এখনো জানি না।

পাঠক, এই জায়গাটা আমাদের খুব খেয়াল করতে হবে। যুক্তিতর্ক করার সময় মানুষ প্রায়ই সম্ভাব্যতা(possibility) আর বাস্তবতা(fact)-কে গুলিয়ে ফেলে। পসিবিলিটি হলো যতরকম ব্যাপার ঘটতে পারে বলে আমরা ধারণা করি, তার একটা লিস্ট। অর্থাৎ, সম্ভাব্য উত্তরের তালিকা। কিন্তু তারপর যাচাই বাছাই করে যুক্তি দিয়ে তথ্য দিয়ে যখন ঐ লিস্টের একটি ঘটনাকে প্রমাণ করে ফেলি, তখন সেটা হয় ফ্যাক্ট (অর্থাৎ বাস্তবতা)।

এখন প্রশ্ন হলো, পরম স্রষ্টার কি দেহ আছে যে তাকে হত্যা করা সম্ভব? হাত-পা-মাথা আছে? আমরাতো কিছুই জানি না! আমরা এ পর্যন্ত শুধু জানি যে, মানুষের একজন পরম স্রষ্টা ছিল। তাকে কেউ সৃষ্টি করেনি, বরং তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তাকে হত্যা করা যায় কিনা, তাতো জানি না।

ওকে। তাহলে আসুন, সিদ্ধান্তে আসি। প্রশ্ন: পরম স্রষ্টা কি এখনো বেঁচে আছে? উত্তর: আমরা জানি না। দেখা যাক, সামনে আরো চিন্তাভাবনা করতে করতে কোনো পথ খুঁজে পাই কিনা!

পাঠক! একজন দার্শনিক একজন প্রকৃত ছাত্রও বটে। সে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নেয়। “জানি না” কথাটা অহরহ বলে। নিজের কাছে বলে, বলে অন্যের কাছে। এটাই তার জ্ঞানার্জনের দরজা খুলে দেয়। পাঠক আসুন, আমরাও প্রকৃত ছাত্রের মত করেই বলি: পরম স্রষ্টা অনন্তকাল থেকে বেঁচে ছিল কমপক্ষে মানব সৃষ্টির সময় পর্যন্ত; কিন্তু এখনো বেঁচে আছে কিনা, তা আমরা জানি না।

পাঠক, আবারো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, খেয়াল রাখবেন, আমরা কারো সাথে তর্কে জিততে আসিনি। আমরা নিজে নিজেই আপনমনে নিজের সাথেই যুক্তিতর্ক করছি। নিজেই যুক্তি দিচ্ছি, নিজেই খণ্ডন করছি। নিজেই জ্ঞানার্জন করছি। একটা একাকী, নিরপেক্ষ, অপ্রভাবিত মনের মতন। আসুন, পরের পর্বে একটু চিন্তাভাবনা করি, অনন্ত/ অসীম/ ইনফিনিটি ব্যাপারটা কেমন?

_______________________________

“পরম স্রষ্টা অনন্ত অতীত (infinite past) থেকে অস্তিত্বমান

(ছিলেন মানব সৃষ্টির সময় পর্যন্ত।)।”

আপনার ভাবনা শেয়ার করুন


মন্তব্যসমূহ

সর্বাধিক জনপ্রিয়

ব্যাকট্র্যাকিং | দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা

আগের পর্ব: উৎসের সন্ধানে | সূচীপত্র দেখুন


আদি পিতা-মাতাকে কে তৈরী করল? কোন সে পুতুল কারিগর? একজন ভাস্কর যেভাবে পাথর কুঁদে মানুষের মূর্তি তৈরী করেন, কিংবা মাটি দিয়ে তৈরী করেন পুতুল! এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই ব্যাকট্র্যাকিং পদ্ধতিতে।
মানুষের ব্যাকট্র্যাকিং
আমাকে জন্ম দিয়েছেন (সৃষ্টি করেছেন) আমার মা। আর আমার মা-কে জন্ম দিয়েছেন আমার নানী, কিন্তু তাঁরও তো মা ছিল! আমরা যদি এভাবে পিছনের দিকে যেতে শুরু করি, তাহলে:
আমার মা, তার মা, তার মা… এভাবে করে একদম শুরুতে অবশ্যই এমন এক মা থাকতে হবে, যার আর কোনো মা নাই। সে-ই পৃথিবীর প্রথম মা। এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় ব্যাকট্র্যাকিং (backtracking)। অর্থাৎ, কোনোকিছুর পিছনের কারণকে খুঁজে বের করা।
স্রষ্টার ব্যাকট্র্যাকিং
আচ্ছা, সেই আদি মাতার সৃষ্টি হলো কিভাবে? তার নিশ্চয়ই কোনো মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি, কারণ সে-ই তো প্রথম মা, আদি মাতা! অতএব, নিশ্চয়ই কোনো পুতুল কারিগর নিজ হাতে গড়েছিলেন মানবজাতির আদি মাতাকে! তো, সেই আদি মাতাকে যিনি সৃষ্টি করলেন, সেই স্রষ্টাকেই আমরা বলছি “মানুষের স্রষ্টা”।
এখন কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, “মানুষের স্রষ্টাকে” সৃষ্টি করলো কে? তখন উত্তরে বলতে হয়: আচ্…

স্রষ্টাভাবনা

প্রথম ভাগ: দার্শনিকের স্রষ্টাভাবনা | | পর্ব-১: উৎসের সন্ধানে উৎসের সন্ধান করা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষ তার আশেপাশের জিনিসের উৎস জানতে চায়। কোথাও পিঁপড়ার লাইন দেখলে সেই লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করে। নাকে সুঘ্রাণ ভেসে এলে তার উৎস খোঁজে। অপরিচিত কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা যেকোনো অচেনা জিনিস দেখলে চিন্তা করে – কোথা থেকে এলো? কোথাও কোনো সুন্দর আর্টওয়ার্ক দেখলে অচেনা শিল্পীর প্রশংসা করে। আকাশের বজ্রপাত, বৃষ্টি, রংধনু কিংবা সাগরতলের অচেনা জগৎ নিয়েও মানুষ চিন্তা করে। এমনকি ছোট শিশু, যে হয়তো কথাই বলতে শেখেনি, সে-ও কোনো শব্দ শুনলে তার উৎসের দিকে মাথা ঘুরায়। অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলপ্রবণ।

একটা বাচ্চা জ্ঞান হবার পর চিন্তা করে – আমি কোথা থেকে এলাম? আরো বড় হবার পর চিন্তা করে – আমার মা কোথা থেকে এলো? এমনি করে একসময় ভাবে, পৃথিবীর প্রথম মা ও প্রথম বাবা, অর্থাৎ আদি পিতা-মাতা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকের গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখি, গ্রহ-নক্ষত্র-মহাবিশ্ব – এগুলিরই বা সৃষ্টি হয়েছে কিভাবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন উৎসুক মনে খেলে যায়।

তখনই শুরু হয় সমস্যা। নিরপেক্ষ মানব মনকে চার…

কুরআনের দর্শন | দার্শনিকের কুরআন যাত্রা

আগের পর্ব: সূরা ইখলাস ও নিরপেক্ষ মন | সূচীপত্র দেখুন

কুরআনের দর্শন (philosophy) কেমন? আসলে একটি ছোট লেখায় কখনোই গোটা কুরআনের দর্শন পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব না। কুরআনের যেকোনো ছাত্র একবাক্যে স্বীকার করবে যে, মৃত্যু পর্যন্ত একজন ছাত্রের “কুরআন যাত্রা” শেষ হয় না। তাই “কুরআনের দর্শন” শিরোনামের যেকোনো লেখাই অসম্পূর্ণ। এই লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবুও আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

অপরের বক্তব্য শুনতে হবে


فَبَشِّرْ عِبَادِي (١٧) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الألْبَابِ (١٨)

“অতএব, (হে রাসূল!) সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা কিছু অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। এরাই হচ্ছে তারা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানবান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৭-১৮)

অর্থাৎ, কুরআনের দর্শন হলো মুক্ত আলোচনার দর্শন। সবার মতামত শুনতে হবে, তারপর সেগুলি যাচাই করতে হবে। যুক্তিবুদ্ধির মানদণ্ডে যেগুলি উত্তম বলে বিবেচিত হবে, সেগ…